বাহাদুরের চোখে জল খাবার খায়নি দুদিন

ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া

রবিবার , ২৫ আগস্ট, ২০১৯ at ১০:১৮ পূর্বাহ্ণ
809

মাহুত ভদ্রসেন চাকমা (৫৫) একনাগাড়ে ১৫ বছর ধরে কক্সবাজারের চকরিয়ার ডুলাহাজারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের প্রশিক্ষিত হাতি ‘শেখ বাহাদুর’-এর সঙ্গী ছিলেন। গত ২১ আগস্ট তিনি নিহত হন আরেক প্রশিক্ষিত হাতি ‘সৈকত বাহাদুর’-এর হাতে। এতে ওইদিন সকাল থেকে সঙ্গীহীন হয়ে পড়ে শেখ বাহাদুর। এরপর থেকে খাওয়া ছেড়ে দিয়ে শোকাচ্ছন্ন হয় শেখ বাহাদুর। এ অবস্থায় দুদিন ধরে অঝোর ধারায় চোখের পানি ফেলে প্রশিক্ষিত এই হাতি। অবশ্য অন্য হাতির মাহুতের যত্নে শুক্রবার থেকে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। শোক কাটিয়ে খাবারও খাছে বাহাদুর। পার্কে থাকা চারটি প্রশিক্ষিত হাতির দেখভাল করতেন চারজন মাহুত। তারা ১৫ বছর ধরে এই পার্কে মাহুত হিসেবে কর্মরত। কিন্তু দুর্ভাগ্য, চার মাহুতের মধ্যে সবার সিনিয়র মাহুত ভদ্রসেন চাকমাকে প্রাণ দিতে হলো প্রশিক্ষিত হাতি সৈকত বাহাদুরের হাতে।
শোকাচ্ছন্ন শেখ বাহাদুর যাতে শোক কাটিয়ে স্বাভাবিক হতে পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয় পার্ক কর্তৃপক্ষ। আবার নির্দিষ্ট স্থানে যাতে অবস্থান করতে পারে সেজন্য বড় একটি গর্জনগাছের সঙ্গে আবদ্ধ করা হয়েছে তাকে। অপরদিকে আপাতত হাতির বেষ্টনীর কাছে মাহুত ছাড়া কোনো দর্শনার্থী যাতে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করছেন কর্মচারীরা। এতে করে পার্কের কার্যক্রম অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। গত শুক্রবার বন্ধের দিন রেকর্ডসংখ্যক দর্শনার্থী পার্ক ভ্রমণ করেছেন।
জানা গেছে, পার্ক প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পেরিয়েছে। ১৫ বছর আগে পার্কে আনা হয় প্রশিক্ষিত চারটি হাতি। এর মধ্যে পুরুষ হাতি ‘শেখ বাহাদুর’ ও ‘সৈকত বাহাদুর’। নারী হাতি ‘শান্তি রাণী’ ও ‘রাজ রাণী’। চার মাহুতের নাম ভদ্রসেন চাকমা, সুশীল চাকমা, ভাগ্যধন চাকমা ও ফারুক হোসেন। নিহত মাহুত ভদ্রসেন খাগড়াছড়ি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার মারিশ্যা ইউনিয়নের বঙ্গলটুলি গ্রামের রাঙা মোহন চাকমার পুত্র।
সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তত্ত্বাবধায়ক) মো. মাজহারুল ইসলাম চৌধুরী দৈনিক আজাদীকে বলেন, ভদ্রসেন চাকমা ছিলেন সবার সিনিয়র। তিনি ২৫ বছর ধরে হাতির সঙ্গী হিসেবে কাজ করেছেন। নিজ জেলায় একটানা ১০ বছর হাতির সঙ্গে কাজ করেছেন। এরপর তাকে শেখ বাহাদুরের মাহুত হিসেবে আনা হয়। এখানে ১৫ বছর কাজ করেছেন।
তিনি বলেন, এ কারণে স্বাভাবিকভাবে নিজের মাহুত ভদ্রসেন চাকমাকে না দেখে দুদিন ধরে নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দেয় শেখ বাহাদুর। নিজের সঙ্গীকে হারিয়ে ফেলার শোকে এই দুদিন চোখের পানিও ফেলেছে। বাহাদুরসহ চার হাতিকে গভীর পর্যবেক্ষণে রাখা হবে বলে জানান তিনি।
খাবারের সন্ধানে পার্কে বন্যহাতির পাল : চকরিয়া ও লামার সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় খাবারের সংকটের মুখে একদল বন্যহাতি সীমানা পেরিয়ে ঢুকে পড়েছে পার্কের অভ্যন্তরে। ক্ষুধার্ত এই পালে বন্যহাতির সংখ্যা ১৭টি। এর মধ্যে দুটি বাচ্চাও রয়েছে। এই অবস্থায় পার্কের পূর্ব সীমান্ত এলাকার সাত কিলোমিটার তথা অংসার ঝিরি ও মালুম্যাতে দর্শনার্থী প্রবেশে রেড অ্যালার্ট জারি করেছে পার্ক কর্তৃপক্ষ। তবে যারা ইচ্ছুক তারা পার্কের নিজস্ব পরিবহনে ওই এলাকা ভ্রমণ করছেন। সাথে থাকছেন পার্কের সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা।
পার্কের তত্ত্বাবধায়ক মো. মাজহারুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, পার্কের জেব্রা বেষ্টনীর কিছু স্থাপনা ভেঙে বন্য হাতিগুলো আজ (গতকাল) শনিবার সকালেই পার্কের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে এবং জেব্রা বেষ্টনীর পাশে শাপলা, ঘাসসহ বিভিন্ন লতাগুল্ম খায়। বর্তমানে এসব বন্যহাতি পার্কের প্রশিক্ষিত হাতির অভয়ারণ্যে অবস্থান করছে। এসব বন্যহাতির গতিবিধি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, যাতে তারা পুরো পার্কে ছড়িয়ে পড়তে না পারে।

x