বাসন্তী ঝলকের কবি : বসনে যতটা ততটাই মনে-প্রাণে

ফেরদৌস আরা আলীম

শনিবার , ২৪ আগস্ট, ২০১৯ at ১১:১২ পূর্বাহ্ণ
8

নজরুল-মূল্যায়ন ও তাঁর সাহিত্য সমালোচনার ধারাটি বিশেষ করে নজরুল জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে আমাদের গুণী নজরুল গবেষক-অধ্যাপকদের কল্যাণে যেমন সমৃদ্ধ হয়েছে তেমনি নজরুল-মূল্যায়নে সুদীর্ঘকালের অবহেলা বা অসম্পূর্ণতার এবং ইচ্ছাকৃত বা অসাবধানতাজনিত কিছু ভুলভ্রান্তিরও অবসান ঘটেছে। তবে আমরা জানি যে মহৎ বা বিশাল প্রতিভার স্বরূপ নির্ণয়ে শেষ কথা বলে কিছু থাকে না। কারণ সেক্ষেত্রে তাঁর জীবনজোড়া প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, সাফল্য-ব্যর্থতা, ব্যক্তি জীবনের চাওয়া-পাওয়া, প্রেম-প্রতারণা সব, সবকিছুই গ্রাহ্য। তাছাড়া বিশালত্বে বৈপরীত্যও স্বাভাবিক। নজরুলের নামের সঙ্গে নানা সূত্রে অথবা কার্যকারণসূত্রে জড়িয়ে পড়া কিছু নারীর নাম নজরুলের জন্য তো বটেই, নামধেয়দের জন্য এমনকি যে-কোনও নারীর জন্যও স্বস্তিদায়ক বা সুখকর থাকছে না। কবিপ্রদত্ত ‘নার্গিস’ নামটি নিয়েই বেঁচে রইলেন দৌলতপুরের সৈয়দা আসার খানম বা দুবরাজ। প্রচুর লেখালেখি হয়েছে তাঁকে নিয়ে এমনকি উপন্যাসও বটে। কবির জন্মশতবর্ষে (১৯৯৯) দৈনিক ইত্তেফাকে (২৮.৫.১৯৯৯) ‘নার্গিস-নজরুল-প্রমীলা’ শিরোনামে লিখেছেন শিহাম জোহেব। দাদাভাই রোকনুজ্জামান খান এই লেখককে টেলিফোনে জনৈক রুহুল আমিনের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেন। রুহুল জানান তাঁর অশীতিপর মা মোমিনা খাতুন (আলী আকবর খানের চাচাতো বোন) প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী থাকাকালীন ৮/৯ বছর বয়সের দেখা নজরুলের স্মৃতি তখনও পর্যন্ত লালন করে যাচ্ছিলেন সযত্নে। তিনি চান লোকে জানুক সেসব কথা। লেখক তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। এই লেখাটির সঙ্গে মোমিনা খানমের একটি ছবিও রয়েছে। সে ছবি এবং খানম পদবী আসার খানমের সঙ্গে মেলে। সন-তারিখ দিনক্ষণসহ মোমিনা খানম চৈত্রে এসে শ্রাবণ অব্দি দৌলতপুরে থাকা দিব্যকান্তি নজরুলের খানবাড়ির শিশুদের সঙ্গে নাচে-গানে-কবিতায় ও সাঁতারে মেতে থাকার গল্প বলেন। নাচ-গানের আসরে তাঁর চেয়ে বয়সে বড় এবং ধর্মভীরু দুবরাজের (সৈয়দ আসার খানম) উপস্থিতির কথা তিনি নাকচ করে দেন। তাঁর ভাষ্যমতে বিএ পাস মুন্সী আব্দুল জব্বার নজরুল-দুবরাজের বিয়ে পড়ান; স্বয়ং পিতার হাত ধরে তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর মতে, বিয়ের ৭ দিন পরে মহা ধূমধামে বিবাহোত্তর-অনুষ্ঠানে জ্বরজনিত অসুস্থতার কারণে তিনি উপস্থিত ছিলেন না। কিন্তু অনেক রাতে বাড়িতে কান্নার রোল শুনে সবার সঙ্গে ঘাটে যান। ততক্ষণে কান্দিরপাড় থেকে আসা অতিথিদের সঙ্গে (বিরজাসুন্দরী দেবী, গিরিবালা দেবী ও আশালতাসহ অন্যরা) নজরুল নৌকায় উঠে গেছেন। অতঃপর কবি আর কখনো দৌলতপুরে যাননি।
সে-যাত্রায় কান্দিরপাড়ে (কুমিল্লায়) কবির ২১ দিনের অবস্থান, দ্বিতীয় দফায় (একই বছর দুর্গাপূজা উপলক্ষে) প্রায় ১ মাস এবং তৃতীয়বারে (১৯২২) ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত অবস্থানকালে আশালতার সঙ্গে কবির সম্পর্ক গভীর হয়।
ধূমকেতুর পূজা সংখ্যায় ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা প্রকাশের পর ১ বছরের জন্য কবি কারারুদ্ধ হন। কারামুক্তির পর কবি কান্দিরপাড়ের আতিথ্যে থাকাকালীন গিরিবালা দেবী কবির সঙ্গে কন্যার বিয়ে দিতে উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। কিন্তু পরিবারের আর সকলের প্রবল বিরোধিতার মুখে গিরিবালা কন্যাসহ বিহারের সমস্তিপুরে ভ্রাতৃগৃহে যাবেন বলে মনস্থির করেন। কলকাতা হয়ে সমস্তিপুরে যাবার পথে নজরুল তাঁদের সঙ্গী ছিলেন। ‘প্রমীলা-নজরুল’ শিরোনামে এ বিষয়ে বিশদ করে লিখেছেন মুহাম্মদ আসাদ। (দৈনিক জনকন্ঠ, জুন ৬, ২০১৪) নজরুল-প্রমীলার বিয়ে থেকে সংসার জীবনে পুত্রদের জন্ম-মৃত্যু, প্রমীলার পক্ষাঘাতগ্রস্ততা থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এ লেখাটি প্রমীলার জন্য পাঠককে আর্দ্র করে।
‘ফজিলাতুন্নেসা’ নজরুল জীবনের এক উত্তুঙ্গ অর্বাচীনতার অন্য নাম। এই সম্পর্কটি নজরুলকে রূঢ় প্রত্যাখ্যানের স্বরূপ চিনতে বাধ্য করেছিল। বিশ্বজিৎ চৌধুরী বলেছেন, ‘উপেক্ষার শক্তি ছিল তাঁর। ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ-অবহেলায় তিনি ক্ষত-বিক্ষত করেছেন কবি-হৃদয়।’ আসলে রোমান্টিক কবি-স্বভাবের প্ররোচনায় কবি যা করেছেন ফজিলাতুন্নেসার মেধা ও ব্যক্তিত্ব তা সহজভাবে নিতে পারেনি। করটিয়ার জমিদারের সামান্য এক কর্মচারির এই কন্যাটি ঢাকায় ছোট বোনসহ ভাড়া বাসায় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত শাস্ত্রে পড়াশুনা করতেন। পরবর্তীকালে প্রথম শ্রেণিতে ১ম স্থান পেয়ে এই মেয়ে উচ্চ শিক্ষার্থে বিলেত যান। তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষা, আত্মপ্রত্যয়, যুক্তিবাদ ও বিবেচনাবোধ ছিল যথেষ্ট। ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলন উদ্বোধন করতে এসেছিলেন নজরুল। ফজিলাতুন্নেসা সে অনুষ্ঠানে ‘নারী জীবনে আধুনিক শিক্ষার আস্বাদ’ শিরোনামে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র সম্পাদক কাজী মোতাহার হোসেনের বর্ধমান হাউসে কবির দশ দিনের আতিথ্য গ্রহণের ফলে মোতিহার-নজরুলের প্রগাঢ় বন্ধুত্বের যে সম্পর্ক রচিত হয়েছিল ফজিলাতুন্নেসার প্রতি কবির অনুরাগ তাতে কিছুটা ইন্ধন পায়। এক মধ্যরাতে কবির শূন্য শয্যার রহস্য নিয়ে নজরুল একাডেমি পত্রিকার ১ম বর্ষ ১ম সংখ্যায় যে-গল্প কাজী মোতাহার হোসেন লিখেছেন এবং ঢাকা ছাড়ার পরপর কবি তাঁর মোতিহারকে যে সাত খানা চিঠি লিখেছেন সেই সঙ্গে ফজিলাতুন্নেসাকে লেখা কবির চিঠি এবং নজরুল একাডেমিতে রক্ষিত কবির গানের খাতায় ফজিলাতুন্নেসার উদ্দেশ্যে লেখা কবিতায় যে নজরুলকে আমরা পাই তিনি শেষ পর্যন্ত এক বেহিসেবী রোমান্টিক প্রেমিক। ফজিলাতুন্নেসা কবিকে মান দেননি অন্যদিকে প্রচণ্ড অভিমানী কবি পুনর্বার মান খোয়াতে অনিচ্ছুক ছিলেন। তাই লিখেছেন,
দিনের আলোকে ভুলিও তোমার রাতের দুঃস্বপন
ঊর্ধ্বে তোমার প্রহরী দেবতা
মধ্যে দাঁড়ায়ে তুমি ব্যথাহতা
পায়ের তলায় দৈত্যের কথা ভুলিতে কতক্ষণ?
২৪-২-২৮
প্রভাত।
কবির নিজেরও কি ভুলতে বেশি সময় লেগেছে? আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘দার্জিলিঙে নজরুল’ (মে, ২৮। ১৯৯৮/ দৈনিক সংবাদ সাময়িকী) নিবন্ধে আমরা পাচ্ছি জাহানারা বেগম চৌধুরী, নোটন মৈত্র (প্রফেসর সুরেন মৈত্রের কন্যা) এবং প্রবোধচন্দ্রগুহের নাট্যনিকেতনের গায়িকা নীহারবালাকে। সদলবলে (দীনেন্দ্রনাথ, প্রতিমা দেবী, মৈত্রেয়ী দেবী ও রথীন্দ্রনাথসহ) রবীন্দ্রনাথ তখন দার্জিলিঙে। এখানে ‘ডালাভর্তি’ পান, পাশে জরদার কৌটো, ঘন ঘন গরম চায়ের পেয়ালা এবং সেই সঙ্গে সংগীতের সুরধুনী ধারায় ভেসে যাওয়া নজরুলের মাসখানেকের দার্জিলিং বাসের ছবি আর যাই বলুক কোনো নারীর সঙ্গে গভীর প্রেমের কথা বলে না। জাহানারা চৌধুরী তাঁর রহস্যময় সৌন্দর্যের ঘেরাটোপে থেকেছেন এবং রবীন্দ্রনাথ-নজরুল দু’জনেরই প্রতিভামুগ্ধ ছিলেন সারাজীবন। নজরুল এক্ষেত্রেও কিছু রটনার শিকার ছিলেন।
নজরুলের সঙ্গে বাদবাকী যাদের নাম ঘুরে-ফিরে আসে তারা সকলেই সঙ্গীত ভুবনের মানুষ। ফিরোজা বেগম তাঁর কিশোরী দিনে কলকাতায় এইচ এম ভি’র প্রধান প্রশিক্ষক নজরুলকে দেখার স্মৃতি নিয়ে লিখেছেন, ‘কবির সান্নিধ্যে।’ (প্রথম আলো ২০ মে ২০১১) বালিকা ফিরোজা গান শোনাবেন কবিকে শুনে কবির হাসি থামে না। কিন্তু গান শুনে অবাক কবি মেয়েটিকে আর ছাড়েন না। গল্পে গল্পে বিগড়ে যাওয়া কিশোরীকে সহজ করে আবারও শুনলেন তাঁর গান এবং ডেকে পাঠালেন ফিরোজা বেগমেরই ভবিতব্য কমল দাশগুপ্তকে। বিরক্ত বালিকা এবারে গানের মাঝপথে গান থামিয়ে উঠে পড়েন। এই গানপাগল কবিকে একদা আমরা বনগাঁয় রানু সোমের পিতৃগৃহে দেখেছি। হুটহাট তখন কবির ঢাকায় চলে আসাটা রণজিৎ বিশ্বাসের ভাষায়, ‘শেয়ালদা স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে হাঁটতে হাঁটতে বাদাম খাচ্ছিলেন; দেখেন ঢাকার ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। চট করে উঠে পড়লেন। না ভাবলেন অভাবে ডোবা পরিবারের কথা, না দেখলেন পকেটের অবস্থা। একটাই যুক্তি, সেও বড় অদ্ভুত, সেও বড় নজরুলীয়। দিলীপ (দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পুত্র, সুরশিল্পী, নজরুলসখা) তো যখন-তখন চলে যায়। সুতরাং তিনিও যাবেন। গান শেখাবেন রানু সোমকে। মেয়েটি যে বড় হচ্ছে, তাকে ঘিরে পরিবারে উৎকন্ঠা থাকতে পারে কিন্তু নজরুলকে বোঝাবে কে? প্রসঙ্গত অশোক মিত্রের ‘এ ধরায় দে বিদায় অধরায় প্রাণ চায়’ প্রবন্ধের (প্রবন্ধসংগ্রহ, অশোক মিত্র) গল্পটি শোনাই। অশোক মিত্র জানাচ্ছেন, ‘পাড়ায় বখাটে ছেলে ছোকরাদের অভাব ছিল না, তাদের অধিকারবোধ প্রবল, নজরুল তা তিনি যতই বিখ্যাত হোন পাড়ার মেয়ের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করবে তা তাদের ঘোর অপছন্দ। একদিন সন্ধ্যায় পুরসভার টিমটিম রাস্তার আলো, রানু সোমদের দোরগোড়ায় ঘোড়ার গাড়ি থামল, নজরুল চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে গাড়ি থেকে নামলেন সঙ্গে সঙ্গে কতিপয় যুবক তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে কিল-চড়-ঘুষির বর্ষণ; সেই মুহূর্তে যে জনপ্রবাদ ঢাকা শহরে পরিব্যাপ্ত হয়েছিল, নজরুলের সকাতর ঐতিহাসিক উক্তি: ওরে, তোরা ভুল করেছিস, আমি দিলীপ নই, দিলীপ নই, আমি নজরুল।’ কানন বালার স্মৃতিকথাও এখন বাজারে। তবু রটনায় কারাগারে বন্দী থাকাটা যেন নজরুলের নিয়তি। কবির ঘটনাবহুল, রুদ্ধশ্বাস সৃজনশীল জীবনে রটনার অর্থহীন বটে তবে ব্যর্থ কি? সৃজনবেদনের অংশ হয়ে এরাও কি কবির ভাঁড়ার সোনার ফসলে ভরিয়ে দেয়নি?
প্রেমেন্দ্র মিত্র নজরুলকে প্রথম দেখার স্মৃতিকথনে দূর থেকে দেখা বাসন্তীরঙের চোখ-ধাঁধানো ঝলকের কথা বলেছেন। নজরুল নামের সঙ্গে কিছু নারীর নামও ওই বাসন্তি রঙের ঝলকের মতোই। সত্য এইকটুকুই যে এঁরা ছিলেন। এবং নজরুলের সৃজনভুবনে কখনো না কখনো, কোনো না কোনো উপলক্ষে এঁরা প্রেরণা হয়েই ছিলেন। চিন্তায়-অনুভবে বা আত্ম আবিষ্কারে রোমান্টিকতার যে আবেগে নজরুল নিজে ভেসেছেন, ভাসিয়েছেন বাঙালি মুসলমানকে তার পেছনে এঁদের অবদান অনস্বীকার্য। কবির চিরজীবিতার পথে এঁরা আলো জ্বেলেছিলেন, দীপ হয়ে জ্বলেছিলেন তাঁর কবিতায়, গানে-কবি নিজে তা বারংবার বলে গেছেন। আজ আমরা অপার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় কবিকে স্মরণ করি। সেই সঙ্গে বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই কবির নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেই নামগুলো বা নামের মানুষদের স্মরণ করি বা না করি কোনোভাবেই যেন তাঁদের অশ্রদ্ধা বা অপমান না করি।

x