বাম্পার ফলনেও হতাশ বোরো চাষিরা

বৃষ্টির কারণে শুকানো যাচ্ছে না ধান, বাজার দরে উৎপাদন খরচ উঠে আসছে না, দাবি কৃষকদের

চৌধুরী শহীদ, চন্দনাইশ

সোমবার , ১১ জুন, ২০১৮ at ৫:৫০ পূর্বাহ্ণ
36

বোরো মৌসুম সবেমাত্র শেষ হয়েছে। তবে অব্যাহত অকাল বর্ষণের কারণে এখনো অনেক কৃষক তাদের উৎপাদিত ফসল গোলায় তুলতে পারেন নি। এরি মধ্যে তাদের মধ্যে বিরাজ করছে চরম হতাশা। চলতি বছর চন্দনাইশে বোরোর বাম্পার ফলন হলেও বর্তমান বাজারে ধানের যে দাম তাতে চাষিদের উৎপাদন খরচও উঠে আসছে না বলে দাবি উঠেছে। মে মাসের প্রথম দিক থেকে প্রায় প্রতিদিন নিয়মিত বৃষ্টির কারণে রোদের দেখা না পাওয়ায় কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ধান শুকিয়ে সংরক্ষণ করার সুযোগ পাচ্ছেন না। ফলে উৎপাদিত ধান উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে ফাড়িয়া বা মধ্যস্বত্ত্বভোগী অথবা রাইস মিল মালিকদের কাছে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। শুধু চন্দনাইশ নয়; দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাত উপজেলাসহ সারাদেশে বোরো ধানের বাজার চিত্র প্রায় এরকমই বলে কৃষি বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

উৎপাদন খরচের চেয়ে কমদামে বিক্রি : সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, চন্দনাইশের বিভিন্ন এলাকায় বোরোতে আবাদ হওয়া মোটা ধান প্রতিমণ ৬০০ থেকে সাড়ে ৬০০ টাকায় এবং চিকন ধান ৭০০ থেকে সাড়ে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর বোরো ধানের উৎপাদন ব্যয় পড়েছে মনপ্রতি ৮০০ টাকার উপরে। কিন্তু অব্যাহত বৃষ্টির কারণে উৎপাদিত ধান শুকাতে না পেরে ভেজা অবস্থায় কম দামে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। বিশেষ করে গত আমন মৌসুমে কৃষকরা আমন ধানের ভালো দাম পেয়ে চলতি বোরো মৌসুমে অধিক জমিতে বোরোর চাষ করেছিলেন। কিন্তু তাদের সেই ‘আশায় গুঁড়েবালি’ হয়। এখন তারা বোরো ধানের যে দাম পাচ্ছেন তাতে উৎপাদন খরচও উঠে আসছে না বলে দাবি করেছেন। অথচ গত আমন মৌসুমে কৃষকরা প্রতিমন ধান বিক্রি করতে পেরেছিলেন ৯০০ থেকে সাড়ে ৯০০ টাকায়।

লক্ষ্যমাত্রার বেশি জমিতে আবাদ : চলতি বছর চন্দনাইশ উপজেলায় মোট বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল তিন হাজার ৪০০ হেক্টর জমি। তবে এবার সেখানে আরো ১০০ হেক্টর বেশিসহ সর্বমোট সাড়ে তিন হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। অতিরিক্ত জমিতে বোরোর আবাদের বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, চলতি বছর বোরো চাষের সময়ে প্রাকৃতিক পরিবেশ পুরোপুরি অনুকূলে ছিল। তাছাড়া কৃষি বিভাগের সরাসরি তদারকি এবং কৃষকদেরকে দেয়া বিভিন্ন পরামর্শ যথাযথভাবে কাজে লাগানোটাই ছিল অন্যতম।

বাম্পার ফলন : এবছর বোরোর ফলনে অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট কৃষি বিভাগ সূত্রের। সূত্র জানায়, কোনো ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত না হানা এবং কৃষি বিভাগের সার্বিক সহযোগিতার কারণে বোরোর ফলন লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করতে পেরেছে। চন্দনাইশ উপজেলায় চলতি বছরে বোরো ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৩ হাজার ৬৪৬ মেট্রিক টন। সেখানে লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে উৎপাদন হয়েছে ১৩ হাজার ৯৭৯ মেট্রিক টন।

চন্দনাইশ উপজেলার কৃষকরা জানিয়েছে তারা বর্তমানে প্রতিমন ধান ৬০০ থেকে সাড়ে ৬০০ টাকায় বিক্রি করে দিচ্ছেন। চলতি রোজা ও সামনের ঈদের খরচ মেটাতেও অনেকেই ভেজা ধান ধানকল মালিকের কাছে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানা যায়। বোরো ধান কাটা শুরুর পর থেকে প্রতিদিন নিয়মিত অবিরাম বর্ষণের কারণে ক্ষেতে অনেক ধান নষ্ট হওয়ার পরও এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। উৎপাদন বেশি হওয়ার কথা নিশ্চিত করে বোরোচাষি মোহাম্মদ নুরুল হক ও মোহাম্মদ ওয়াছনবী বলেন, বেশি উৎপাদনের সাথে সাথে বেশি দাম পাওয়া গেলে কৃষকদেরও বেশি লাভ হতো। দাম কম থাকায় বোরো উৎপাদনে এখন কৃষকদের লোকসানই হচ্ছে বেশি। এছাড়া বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় খড়কুটোগুলোও তুলতে পারছেন না কৃষকরা। ফলে তাদেরকে গরুর খাদ্য ও পরিবারের জ্বালানি সংকটেও ভুগতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন।

রাইস মিল মালিক কোরবান আলী মধু ও মাহমদুল হক ধানের দাম কম হওয়া প্রসঙ্গে বলেন, চলতি বোরো মৌসুমে শুধু চন্দনাইশ সাতকানিয়ায় নয় পুরো দেশে ফলন অত্যধিক ভালো হওয়া এবং বিদেশি চাল আমদানি অব্যাহত থাকার কারণে ধানের দাম নিম্মমুখী রয়েছে। তারা আরো জানান, বর্তমানে মিয়ানমার থেকে অধিকহারে পুরোনো চাল দেশের বাজারে চলে আসায় দেশে উৎপাদিত নতুন ধানের চাহিদা অনেকটা কম। ফলে বোরোধান বেশিদামে কেনা কোনো ভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।

চন্দনাইশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কামরুন মোয়াজ্জেমা বোরো ধানের দাম উৎপাদন খরচের চেয়ে কম হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, সরকার সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহের ব্যবস্থা গ্রহণ করলে কৃষকরা ধানের ন্যায্য মূল্য পেতেন। এখন খাদ্যগুদামে বিক্রির জন্য ধান নিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের যে অনীহা তা কাজে লাগিয়ে ধানকল মালিক ও মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধান কিনে নিচ্ছেন। ফলে ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকরা। তবে কৃষকদের জন্য একটি সুখবর অপেক্ষা করছে জানিয়ে এই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, কৃষকদের প্রতি বছরের এ ক্ষতি পোষাতে সরকার প্রতি উপজেলায় কৃষি বিপনন কেন্দ্র খোলার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি জায়গায় পাইলট প্রকল্প হিসাবে এসব কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। সারাদেশে এ প্রকল্পটি চালু হলে কৃষকদেরকে তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রয়ে আর ভোগান্তি পোহাতে হবে না বলে আশা প্রকাশ করেন এই কর্মকর্তা।

x