বাবা দিবসের ভাবনা

কাজী রুনু বিলকিস

শনিবার , ২২ জুন, ২০১৯ at ১১:০৩ পূর্বাহ্ণ
19

‘বাবা ছিলেন আরিয়াল বিলের
প্রচণ্ড চিলের মতো তার ছায়া দেখলেই
মুরগির বাচ্চার মতো আমরা মায়ের
ডানার নিচে লুকিয়ে পড়তাম’
হুমায়ুন আজাদ

১৭ জুন বাবা দিবস ছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভেসে গেছে আবেগে বাবার স্মৃতি কথায়। সাহিত্যে গল্প উপন্যাস গান কিংবা কবিতায় আমরা মা-কে যেভাবে পাই বাবাকে সেইভাবে পাই না। বাবা বনফুলের পাপড়ি হয়ে মায়ের মতো ঝরে ঝরে পড়ে না। বাবা মায়ের তিন বেলা দুধভাত হয়ে উঠতে পারে না। বাবা টলমলে অশ্রুবিন্দুও নয় গ্রাম থেকে নগর পর্যন্ত। বাবা পরিবারের প্রধান স্তম্ভ। পুরো পরিবারের দায় বাবার ওপর। বাবা মানেই সন্তান এবং পরিবারের চাহিদা। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নারীর ক্ষমতায়নে বাবার দায়িত্বভার কিছুটা কমে আসলেও সাধারণভাবে যদি আমরা দেখি বাবারাই পরিবারের হাল ধরে রাখেন। বাবা মানেই সন্তানদের মাথার ওপর তপ্ত রোদে শীতল ছায়া। বাবার সাথে আমার তেমন কোনো স্মৃতি নেই। বাবার কথা মনে আসলেই মনে আসে কয়েকটি ছোট ছোট রঙিন চিরুনি। বাবা আমাকে এনে দিয়েছিলেন। ঐ চিরুনিগুলো অনেকদিন বাবা হয়েছিল আমার কাছে। তারপর একদিন হারিয়ে ফেলি। বাবা ছাড়াই আমার জীবন। বাবাহীন পরিবারের সন্তানদের পৃথিবী অবারিত হয় না, সবসময় ঠিকমত গড়ে উঠতে পারে না। মায়েদের কোমল হাতে সংসারের হাল ধরা কঠিন হয়ে পড়ে। বাবাকে নিয়ে সাহিত্যে আবেগের বাড়াবাড়ি না থাকলেও বাবা শব্দটার বুকের ভেতর এক ধরনের মায়াময় উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। বাবারা যত নরমই হোক কঠিনের আবরণে থাকতেই পছন্দ করে। বাবারা চাহিদা পূরণ করতে করতে ক্ষয়ে যায়। হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন পৃথিবীতে অসংখ্য খারাপ পুরুষ আছে কিন্তু একটাও খারাপ বাবা নেই। বাবার ভালোবাসা ফল্গুধারায় বয়ে চলে না মায়ের মতো। বাবার ভালোবাসা নীরবে লুকিয়ে থাকে। আমার স্কুলে যাওয়ার শুরু আর বাবার চলে যাওয়া। আমার অনেক অর্জন আছে। আমার ভাল দিন আছে আমার কিছু বিশেষ দিনও আছে সেই ভাল কিংবা বিশেষ দিনগুলোতে আমার মাথায় বাবার হাতের স্পর্শ ছিল না। বাবার শূন্যতা পুড়িয়েছে ঠিকই কিন্তু জীবন থেমে থাকেনি।
জীবন চলেছে জীবনের নিয়মে। বাবা মায়ের মিলিত সংসারগুলো পূর্ণতা পায়। বাবার শাসন আর মায়ের স্নেহে যে সন্তানগুলো বড় হয় তারা কখনো হীনম্মন্যতায় ভুগে না। মৃত্যু একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বাবা কিংবা মায়ের মৃত্যুতে সন্তানদের ওপর যে প্রভাব পড়ে তার চেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বিচ্ছিন্ন পরিবার বা ভাঙা পরিবারগুলোতে। এই বিচ্ছিন্ন পরিবারের সন্তানদের বেড়ে উঠা কঠিন হয়ে পড়ে। তাদের মনস্তাত্ত্বিক চাপ থাকে এবং তাদের জীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। আসলে সন্তানদের জন্য বাবা-মা দু’জনেরই ভীষণ প্রয়োজন। এই দু’টি স্তম্ভের ওপর ভর করে সন্তানেরা উঠে দাঁড়ায়। ব্রোকেন ফ্যামিলির বাচ্চাদের উপর সমাজের মনোভাবও নেতিবাচক থাকে। অনেকেই মনে করে বিচ্ছিন্ন পরিবারের সন্তানদের বেড়ে উঠার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসে। সামাজিকভাবে ছোট হওয়ার কারণে অনেক সময় তুখোড় মেধাবী ছাত্ররা ঝরে পড়ে। লিখতে বসেছিলাম বাবাকে নিয়ে, সন্তানদের কথা চলে এল। এটাও ঠিক বর্তমান সময়ে সবরকম সম্পর্কে একটা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এসেছে। আমাদের দেখা সম্পর্কগুলো আর বর্তমান সময়ের সম্পর্কগুলোর মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান আমরা লক্ষ্য করি। বাবা-মা দু’জনেরই জন্য আমাদের আবেগের জায়গা থাকুক। পৃথিবীর সব বাবা-মারাই ভালো থাকুক। একটা সন্তানের জীবনে বাবা-মা পরিবার সব কিছুর দরকার। এর কোনোটি যদি সন্তানের জীবন থেকে হারিয়ে যায় তাহলে তার জীবনটা এলোমেলো হয়ে যায়। ঠিক একইভাবে তিলে তিলে গড়ে তোলা সন্তানেরা যদি বাবা-মায়ের দেখাশোনার দায় এড়িয়ে চলে তখন বাবা-মায়ের জীবনটাও বদলে যায়। সন্তানের আশ্রয় না পেয়ে বৃদ্ধাশ্রমের ঠিকানা খোঁজে। এই বৃদ্ধাশ্রমগুলোকে আমরা মনে হয় এখন স্বাভাবিকভাবে দেখা শুরু করেছি।

x