বাবা ও ইলিশ মাছ

রুহুল আমিন রাকিব

মঙ্গলবার , ১১ জুন, ২০১৯ at ১১:৩৮ পূর্বাহ্ণ
95

মা আমি ইলিশ মাছ খাব,আজ কতদিন ধরে বাবাকে বলছি ইলিশ মাছ কিনে আনতে।
রাফির কথা শুনে, ঠোঁটের কোণে এক চিলতে শুকনো হাসি এনে বলল।এই’তো বাবু আজকে হাটবার। তোমার বাবা কাজ শেষ করে হাটে যাবে,আজ অবশ্য-ই তোমার জন্য ইলিশ মাছ নিয়ে আসবে।
মায়ের মুখের কথা শুনেও ভরসা পায় না রাফি।
কারণ আজ কয়েক দিন ধরে এই একই কথা বলে আসছে।
সন্ধ্যার একটু আগে রাফির বাবা কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরলে দৌড়ে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে।
আজ হাটবার স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলল, বাবা বাবা আজ কিন্তু আমি ইলিশ মাছ দিয়ে ভাত খাব।
আজ তুমি যদি ইলিশ মাছ সাথে করে নিয়ে বাড়িতে না আসো, তবে আমি আজ রাতে ভাত খাব না।
এমন কি রাতে ঘুমাবও না।
কত হবে রাফির বয়স, সাত বছর। তবে এই বয়সের ছেলেমেয়েরা যেরকম হয়, রাফিও ঠিক একই রকম স্বভাবের হয়েছে, প্রচন্ড জেদি।
রাফির বাবা দিনমজুর,অন্যের জমিতে কাজ করে রোজ যা আয় করে কোনরকমে খেয়ে পরে চলছে ওদের সংসার।
রাফির মা,একজন জন্মগত প্রতিবন্ধি ডান হাতে শক্তি কম। ভারি কোনো কাজ ঠিকমতো করতে পারে না। ওদের পরিবারে একমাত্র উপার্জন ক্ষমতাবান ব্যাক্তি হলো রাফির বাবা।
হাত মুখ ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে,বাজার খরচের ব্যাগ হাতে নিয়ে দূর্গাপুর হাটে চলল আজমত মিয়া।
বাড়ি থেকে বের হয়ে পুকুরপাড়ে আসতেই রাফি দৌড়ে এসে আবার বলল,বাবা আমার কথা মনে আছে তো? আজ কিন্তু আমি ঘুমাব না তুমি ইলিশ মাছ নিয়ে আসলে, তবেই আমি ওই মাছ দিয়ে ভাত খাব তারপরে ঘুমাব। ছেলের কথার কোনো উত্তর দেয় না আজমত মিয়া।
পায়ে হেঁটে দূর্গাপুর হাটে এলো। ময়লা ভাঁজ পরা পাঞ্জাবির পকেটে হাত দিয়ে, টাকা বের করল।
কাল সকালে একটা সমিতির কিস্তির টাকা দিতে হবে। দুই সপ্তাহ ধরে বকেয়া পরে আছে। এই সপ্তাহে কিস্তি দিতে না পারলে অনেক বড় অপমান সহ্য করতে হবে।
পকেটে মাত্র পাঁচশ টাকা আছে। কিস্তি দিতে হবে তিন’শো টাকা। চাল কিনতে হবে, তরিতরকারি কিনতে হবে। আবার ছেলের আবদার ইলিশ মাছ কিনতে হবে।
এই সব ভাবতে ভাবতে সন্ধ্যা শেষে রাত হয়ে এলো।
হাট জুড়ে লোকের অনেক ভিড়! আজমত মিয়া, তিনশ টাকা আলাদা ভাঁজ করে রাখে।
বাকি টাকা থেকে কয়েক কেজি চাল কেনে।
বাদবাকি টাকা নিয়ে দূর্গাপুর বাজারের উত্তরে মাছ বাজারে যায়।
বড় বড় ইলিশ মাছ দেখে, দাম করার সাহস হয় না।
দূর থেকে শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে।
আজমত আলি মনে মনে ভাবে, কেন যে ছেলেটা বুঝে না, এই সব বড়-বড় মাছ হলো বড়-বড় কর্তা বাবুদের জন্য। আমাদের জন্য ইলিশ মাছ কেনা তো দূরের বিষয়, কাটাও কেনার সাধ্য নাই।
অনেক সময় ধরে মাছ বাজারে ঘোরা-ঘুরি করার কারণে, এক লোকের সন্দেহ হলো আজমত মিয়াকে। কাছে ডেকে জানতে চাইল এত সময় ধরে এখানে কেন ঘোরাঘুরি করছে! ইলিশ মাছ কেনার মতো টাকা হাতে নেই। এই কথা লজ্জা শরমে সবার সামনে বলতে পারল না। কথার কোনো উত্তর না পেয়ে আজমত মিয়াকে চোর উপাধি দিয়ে সবাই মিলে গণ-পিটুনি দিল। আজমত মিয়া যদিও সবাইকে চিৎকার করে বলছে, সে চোর নয়। তবে কে শোনে এই কথা! হাটের মানুষ সবাই হুজুগে মাতাল। মার খেয়ে মাথায় আর কানে প্রচন্ড রকম আঘাত পায় আজমত মিয়া। লাল-লাল তাজা রক্তর স্রোত বয়ে যায় মাছ বাজারের মেঝেতে। এক সময় মাথা ঘুরে পড়ে যায় মেঝেতে। কেউ একজন এগিয়ে এসে ধরাধরি করে নিয়ে যায় পাশের এক ঔষুধ ফার্মেসি’তে। তবে তার অনেক আগেই, চোর উপাধি নিয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করছে আজমত মিয়া।
অথচ রাফি তখনও বার বার ঘর থেকে দৌড়ে বাইরে আসছে। আর রাস্তার দিকে উঁকি মেরে তাকিয়ে দেখে আজমত মিয়া ইলিশ মাছ নিয়ে কখন আসবে! আহা! বাবা আজ ইলিশ মাছ নিয়ে আসবে,মা রান্না করবে,ম-ম ঘ্রাণ ছড়াবে ঘর জুড়ে!
রান্না শেষে সবাই মিলে বসে মজা করে পেট পুরে ভাত খাবে। রাফি তখনও জানে না, তার বাবা আর ইলিশ মাছ নিয়ে বাড়ি ফিরবে না। চলে গেছে না ফেরার দেশে, রাফিকে সারাজীবন বেঁচে থাকতে হবে চোরের বাচ্চা উপাধি নিয়ে।

x