বাপ-দাদার পেশা ছাড়ছে অনেকে

তিন শতাধিক পাল পরিবার অভাব-অনটনে

লিটন কুমার চৌধুরী : সীতাকুণ্ড

সোমবার , ১৩ মে, ২০১৯ at ৫:২১ পূর্বাহ্ণ
62

ব্যবসার প্রয়োজনীয় পুঁজি সংকট, আধুনিক তৈজসপত্রের প্রচলন ও সঠিক বাজারদরের অভাবসহ বহুমুখী সমস্যায় বিলুপ্তির পথে সীতাকুণ্ডের মৃৎশিল্প। উপজেলার পৌরসদর, সৈয়দপুর ইউনিয়ন, বাঁশবাড়িয়া, ভাটিয়ারী এলাকার প্রায় ৩শতাধিক মৃৎশিল্পী পরিবার বর্তমানে অভাব-অনটনে দিন কাটছে। ইতিপূর্বে অভাব ঘুচাতে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত অনেকেই বাপ-দাদার এ পেশা ছেড়ে জড়িয়ে পড়ছে অন্য পেশায়। জানা যায়, এক সময়ে এই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৭ শতাধিক পাল পরিবার মৃৎশিল্পের এই পেশার সঙ্গে জড়িত ছিল। মৃৎশিল্পীরা তাদের নিপুণ হাতে তৈরি মাটির কলসি, হাড়ি, মাটির পাতিল, মাটির পুতুল, মাটির খোড়া, মাটির সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বালানোর ধুপতীসহ মাটির তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করত। তখনকার সময়ে গ্রামগঞ্জে মাটির তৈরি জিনিসের চাহিদা থাকায় রাতদিন কাজে ব্যস্ত সময় পার করতো মৃৎশিল্পীরা। এতে স্বাচ্ছন্দময় ছিল তাদের জীবন-যাপন। কিন্তু বর্তমান সময়ে স্টিল, সিলভার ও মেলামাইনের তৈরি আধুনিক তৈজসপত্রের কারণে মাটির তৈরি জিনিসের প্রতি মানুষের আগ্রহ না থাকায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এ শিল্প। এতে অভাব অনটন নেমে আসে এ শিল্পের সাথে জড়িত পরিবারগুলোর।
শত অভাব-অনটনের মাঝেও পূর্ব পুরুষের এই পেশাকে এখনো আঁকড়ে ধরে আছে সীতাকুণ্ড পৌরসদরের পাল পাড়ার পুষ্প রানী পাল, সাধন পাল, সতিশ পাল, অজিত পাল সহ ১০টি মৃৎশিল্পী পরিবার। মৃৎশিল্পীরা জানান, ভাদ্র,পৌষ ও মাঘ মাসে শীতকালিন পিঠা-পুলি তৈরির কারণে এলাকাজুড়ে মাটির জিনিসের চাহিদা থাকলেও চড়া দামে মাটি ক্রয়ের কারণে এবং বিক্রি মূল্যের সমতা না থাকায় বেশিরভাগ সময় লোকসান গুনতে হয়। এক সময় মৃৎশিল্পীরা সহজে মাটি সংগ্রহ করলেও বর্তমানে অনেক দূর থেকে ট্রাক প্রতি ২হাজার টাকা দরে মাটি কিনতে হচ্ছে তাদের।
পৌর সদরের পাল পাড়ার মৃৎশিল্পী পুষ্প রানী পাল বলেন, আমি দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে এ পেশার সাথে জড়িত। একটা সময় গ্রামাঞ্চলে মাটির তৈরি জিনিসের চাহিদা থাকায় বিক্রি ছিল আশানুরূপ। কিন্তু বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়ায় এ শিল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে সবাই। শীতকালীন পিঠা-পুলি তৈরির সময়ে মাটির তৈরি জিনিস বিক্রি হলেও বছরের ৭/৮ মাস বিক্রি কমে যাওয়ায় অনেকটা অলস সময় কাটাতে হয় আমাদের। এতে বেশির ভাগ মৃৎশিল্পী পরিবারকে দিন কাটাতে হয় অনাহারে।
অপর মৃৎশিল্পী জগদীশ পাল জানান, বাপ দাদার এ পেশাকে টিকিয়ে রাখতে বেসরকারি সংস্থা আশা থেকে ৯০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছি। এতে পরিবারের খরচের পাশাপাশি প্রতি সপ্তাহে ১৫’শ টাকা কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। বছরের ৩/৪ মাস স্বস্থিতে কাটলেও বর্ষাকালীন সময়ে ব্যবসা বন্ধ থাকায় অর্থ কষ্টে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এ সময় কিস্তির টাকা পরিশোধে মৃৎশিল্পীরা তাদের ভিটে মাটি বিক্রি করতে বাধ্য হয় বলে জানিয়েছেন তিনি। এ শিল্পের সাথে জড়িত পরিবারগুলোর দাবি, পরিবারভিত্তিক ব্যাংক ঋণ ও আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ সম্পর্কে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে মৃৎশিল্পীকে একমাত্র অবলম্বন করে এখনও টিকে থাকা সম্ভব।

x