বাদ্যযন্ত্রের নিপুণ কারিগর কৃষ্ণ

মাহবুব পলাশ : মীরসরাই

সোমবার , ২২ অক্টোবর, ২০১৮ at ৬:২৪ পূর্বাহ্ণ
36

শতাব্দীর পর শতাব্দীতেই কিছু মানুষ বংশপরম্পরায় দেখা যায় যে আবহমান গ্রামবাংলায় লোকজ জ্ঞানে এবং সৃজনশীল মেধায় বাদ্য যন্ত্রের সমৃদ্ধিতে তাঁদের নিজস্ব অভিজ্ঞতাকেই যেন ব্যবহার করে আসছে। তাঁরা আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যেন স্বহস্তে নানা বাদ্য যন্ত্র তৈরিতে ব্যস্ত। বলা যায় যে, কোনো ভাবে পেটে ভাতে জীবন ধারণ করেই আসছেন। আসলেই তাঁদের নেই উন্নত প্রযুক্তি কিংবা আধুনিক প্রশিক্ষণ, তাছাড়াও তাঁদের পুঁজির অভাবেই এ শিল্পের বেহাল দশা দিনে দিনেই বৃদ্ধি পাচ্ছে, এখন এমন এ শিল্পের অনেকাংশে যেন ভাটা পড়তে বসেছে। তবুও কেউ না কেউ আনন্দের ধারা অব্যাহত রেখেই গানের সুরে বলছেন, টাকডুম টাকডুম বাজাই, বাংলাদেশের ঢোল। সব ভুলে যাই, সব ভুলে যাই। তাও ভুলিনা বাংলা মায়ের কোল। এই ধরণের রসিকতার মানুষের দেখা মিলে যায় সত্যিই ভাবতে অবাক লাগছে। তাঁরা যেন প্রাণের টানেই বা পেটের ক্ষুধা নিয়ে এই বাদ্যযন্ত্রের শৈল্পিক কারিগর হয়ে আছেন। বাপদাদার ঐতিহ্য মনে করেই কেউ কেউ এই পেশাটিকে ছাড়তে নারাজ। এমন পেশার সুদক্ষ কারিগর মীরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ বাজারের বিশ্বকর্মা সুর বিতানের কৃষ্ণ দাস, বয়স তাঁর ৪৫ বছর। তাঁর পিতা প্রয়াত মন্টু কুমার দাসের হাত ধরে ঢাকা মানিকগঞ্জ থেকে এখানে বাদ্যযন্ত্র মেরামতের কাজ শেখা।
মাসে স্বল্প আয় দিয়ে টেনেটুনে চলছে তাঁর সংসার। কিন্তু এই ব্যবসার আশঙ্কায় আবারও বলেন, আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের প্রভাবে এখন বিলুপ্তির পথেই ঐতিহ্যবাহী বাংলার বাদ্যযন্ত্র। ভবিষ্যতে এই পেশার কেমন বেহাল দশা হয় তা ভাবনায় রয়েছে। যেমন: ঢাক, ঢোল, ঢুগি, তবলা, নাল, ঘটঘটি, খমো, মাদল, খনজনি, একতারা এবং দোতারাসহ আরো অনেক প্রকারের বাদ্যযন্ত্র যেন আগের মতোই বিক্রি হয় না। দেশিয় লোকজ অনেক বাদ্যযন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। তা না হলে এমন নান্দনিক বাদ্যযন্ত্রগুলোকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হয়তো চিনিয়ে বা পরিচয় করিয়ে দিতেই জাদুঘরের দ্বারস্থ হতে হবে।
কি দিয়ে তৈরি করেন এই সব বাদ্য যন্ত্র? উত্তরে বলেন, মাটির খোল, কাঠের ঢোল, তবলা কাঠের ও মাটির ঢুগি তৈরির সহিত আজকের আধুনিক যুগের লোহার ড্রামসেট এবং প্লেন শিটের সমন্বয়েই হরেক রকমের বাদ্যযন্ত্রের শৈল্পিক ও সুদক্ষ কারিগর ছিলেন তাঁর বাবা। বাবার কাছ থেকে শেখা। তিনি আরও বলেন, হারিয়ে যাচ্ছে এই দেশিয় বাদ্যযন্ত্রের চাহিদা, আগের মতো দেশিয় বাদ্যযন্ত্রের চাহিদা নেই বললেই চলে। খুুব কষ্ট করে বাপ-দাদার জাত পেশাটি তিনি ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। বংশপরম্পরায় তাঁর পূর্বপুুরুষরা বাদ্যযন্ত্র ও সঙ্গীত চর্চার সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন। পূর্ব পুরুষদের মৃতদেহ আগুনে সৎকারে উদ্দেশ্যে যে খোল বাজানো হয় তা বংশের ঐতিহ্য। বাদ্যযন্ত্র তৈরিতে চামড়া ব্যবহারে গরু, মহিষ, খাসির চামড়া ও বরকীর চামড়া ক্রয় করে নিয়ে এমন শিল্প গুলো নির্মাণ করেন। আবার ড্রাম সেটের পেপার বা স্ক্রিন পেপার ক্রয় করে এনে কাজে ব্যবহার করেন।
কৃষ্ণ দাসের নিপুণ হাতের তৈরি ঢাক-ঢোল, খোল, তবলা, কড়কা, একতারা, খমর, খঞ্জুনি, দো-তারা, লাল, ঢোলক, ডমরু ও সাইড ড্রাম তার দোকানে শোভা পাচ্ছে। এই বাদ্যযন্ত্রগুলো তিনি তৈরি ও মেরামত করেন।
কৃষ্ণ দাস বলেন, আগের মতো দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের চাহিদা নেই। শুধু পূজা আসলে ঢাক-ঢোল, মৃদঙ্গের চাহিদা বেড়ে যায়। আধুনিক যন্ত্রের কাছে এগুলো এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে বাবা-দাদার জাত পেশা ধরে রাখার চেষ্টা করছি। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ডিজিটাল বাদ্যযন্ত্রের পাশাপাশি দেশীয় হাতে তৈরি হারমোনিয়াম, তবলা ও ঢাক-ঢোল এবং খোলের চাহিদা এখনো ফুরিয়ে যায়নি।
তবে সঙ্গীতজ্ঞদের মতে- গান শিখতে হাতে তৈরি দেশীয় বাদ্যযন্ত্র হারমোনিয়াম, তবলা ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজা-অর্চনায় ঢাক-ঢোল ও খোলের বিকল্প বাদ্যযন্ত্র আজো আবিষ্কৃত হয়নি।
এ ব্যাপারে সাংস্কৃতিক কর্মী সুভাষ সরকার জানান, দেশীয় বাদ্যযন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় আধুনিকীকরণ করার দরকার। তা না হলে বাংলার ঐতিহ্য ঢাক-ঢোল, খোল, তবলা, একতারা, দো-তারা একদিন হারিয়ে যাবে।

x