বাতাসে পোড়া গন্ধ

কাওসার পারভীন

শুক্রবার , ১৫ জুন, ২০১৮ at ৮:২৫ পূর্বাহ্ণ
187

ঐ যে চাঁদটা দেখেছিস? কী সুন্দর আলো ছড়াচ্ছে। পৃথিবীময় আলো ছড়িয়ে রাণীর মত আকাশে বিরাজ করছে। আদিকাল থেকে অনন্তকাল সে এভাবেই থাকবে। তার আসনে বসে জোছনা ছড়াবে। রাতের আকাশময় তার একা রাজত্ব। অথচ হঠাৎ মেঘ এসে ব্যাঘাত ঘটায়, লুকিয়ে যায় সে মেঘের আড়ালে। এতো আলোময় একটা চাঁদ,সেও মেঘের ভয়ে লুকিয়ে যায়। জোছনা পুলকিত একটা মায়াবী রাতকে মেঘের গর্জনে থেমে যেতে হয়।মিলিয়ে যেতে হয় গভীর গুমোট গহ্বরে। আর আমরা তো সামান্য মানুষ। মানুষের কি বা মুল্য আছে এ জগতে?

বুবু আজ তোমার কী হয়েছে ?

কখনো ভাবিনি এমন একা হয়ে যাবো জানিস!

এমন কথা কেন বলছো? আমি আছি বুবু, আমি আছি তো তোমার সাথে।কোথাও যাবোনা তোমায় ছেড়ে।

পাগলি,তুই আমার সঙ্গে সারাজীবন থাকলে তোর সংসারটা করবে কে শুনি!

আমার সংসার ? খিলখিলিয়ে হেসে উঠে অণু।

ওমা, এতে হাসার কী হলো। একদিন বিয়ে হবে,সংসার হবে এটাই তো স্বাভাবিক।

বিয়ে তো তোমারও হয়েছে বুবু। সেকি ধুমধাম করে তোমার বিয়ে হলো। আমি তখন ছোট্ট হলেও বরের গেট ধরার টাকা পাইনি বলে মন খারাপ হয়েছিল খুব। কেঁদে কেটে মার কাছে গিয়ে বললাম। পরে মা আমাকে বোঝালো,আমরা ছিলাম তোমাদের বাড়িতে আশ্রিত। মা কাজকর্ম করতো। আমার মাত্র তিনমাস বয়সের সময় বাবা মারা যায়। মায়ের আপন বলতে কেউ ছিল না। আমাকে কোলে নিয়ে মা তোমাদের বাড়িতে আশ্রয় পেয়েছিল কিভাবে যেন। । আমার জন্য মা আর বিয়ে করেনি। তবে সেদিন গেট ধরার টাকা কিন্তু আমি ঠিক পেয়েছিলাম। হাসতে হাসতে বলে।

থাক না আজ এসব কথা।তোকে কষ্ট দেবার জন্য আমি বলিনি রে। বাস্তব কথাটাই বললাম। এই আমি বেঁচে থাকলে তোকে ঠিক একদিন ধূমধাম করে বিয়ে দেবো দেখিস।

আবার?

আচ্ছা বাবা আর বলবোনা। এবার হলো?

সত্যি এই মেয়েটা বড় দুখী। রিনিতার বিয়ের সময় মেয়েটার বয়স মাত্র চার কিংবা পাঁচ। তখনই অনেক বুদ্ধিমতি ছিল। নইলে সেই কবেকার কথা আজও মনে রেখে দেয়?

অণুর বয়স এখন কত হবে? উনিশ? বিশ?। রিনিতার একটা মেয়ে থাকলে আজ হয়তো ওর কাছাকাছিই বয়স হতো।

নাইট গাডের্র বাঁশীর শব্দে খেয়াল করে রাত দু’টো।গল্পে গল্পে ওরা খেয়ালই করেনি কখন এতো রাত হয়ে গেছে।

আচ্ছা বুবু, ভাইয়া আসবে কবে গো ?

ঠিক নেই। কদিন বৃষ্টি বৃষ্টি করে ঠাণ্ডাটা ভালোই পড়েছে। একেবারে শীতকালের মত তাই না রে? রিনিতা উঠতে চাইলেই অণু বলে

কোথায় যাও বুবু? অণু বুঝেছে।ভাইয়ার কথাটা এখন তোলা ঠিক হলো না।

এই ঠাণ্ডায় একটু গরম কফি হলে ভালোই জমবে কি বলিস।

তা মন্দ বলনি,তুমি বসো আমি বানিয়ে আনছি।

ঠিক আছে যা।এই শোন্‌ তোর ঘুম আসছে না তো ?

আরে না, তোমার সাথে জমিয়ে আড্ডা দিতে ভালোই লাগছে।

বলতে বলতে ডাইনিং এর দিকে যায় অণু।রিনিতা হাসে। ম্লান হাসি। মেয়েটা আছে বলে রক্ষা। নইলে কি যে হতো! অণু সেই এতোটুকু বয়স থেকে ওদের সঙ্গে বড় হয়েছে। এস এস সি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। মনেপ্রাণে অনেকটাই আধুনিকমনা।

অণুর সঙ্গ আজ রিনিতার জীবনে অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। আজ রিনিতার মাও বেঁচে নেই। অনুর মাও নেই।

নিঃসন্তান রিনিতার কাছে কি মনে করে অণুকে মাঝে মধ্যে পাঠিয়ে দিতো মা। ধীরে ধীরে অণু এ বাড়িতেই মায়ার বন্ধনে আটকে যায়। মেয়েটাকে সর্বক্ষণ নিজের মত করে আগলে রাখে রিনিতা ।

রিনিতা একা, ভীষণ একা। রিনিতার জীবনটাকে আরও বেশি একা করে দিয়েছে ফরহাদ। নিজেকে নিয়ে ভীষণ রকম ব্যস্ত সে।

চাকরির মেয়াদ শেষ হতেই রিটায়ার্ড ফরহাদ নিজেকে নিয়ে পরম সুখেই আছে। রিনিতার ইচ্ছে অনিচ্ছার দাম কখনোই দেয়নি সে। সেকি সন্তান না হওয়ার অপরাধে? নাকি রিনিতাকে কখনো ভালোই বাসেনি সে? মানুষটাকে আজও চিনতে পারেনি রিনিতা। অনেকগুলো বছর পেরিয়ে আসার পরেও তার মনে রিনিতার জায়গাটা কোথায় আজও স্পষ্ট নয়।

যেদিন অফিস থেকে ফেয়ার ওয়েল দেয়া হলো , ঘরে ফিরে মনমরা হয়েছিল ফরহাদ।

আলতো করে কপালে হাত রেখে রিনিতা বলেছিল,

মন খারাপ করছো কেন? এটাই তো স্বাভাবিক। ভালোই তো হলো কি বল। এখন থেকে আমরা দুজন শুধু বেড়াবো , ঘুরবো। এখনো কত জায়গা দেখা হয়নি জানো , আমাদের এই দেশটাতেই তো দেখার মত কত জায়গা আছে, যা আমরা এখনো দেখিনি

থামো তো! মাথা ধরেছে খুব। যাও এক কাপ চা নিয়ে এসো ।

— – না,আসলে আমি ভাবলাম তোমার মনটা ভালো নেই

তোমার এসব স্বপ্নবিলাসী কথায় মন ভালো হয়না বুঝেছো।

হতভম্ব রিনিতা থেমে যায়।

পাশের ঘর থেকে অণু শুনেছিল কথাগুলি।। রান্নাঘরে চা বানাতে গিয়ে লজ্জায় অপমানে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিল সেদিন।

এরপর থেকে নিজের রুটিন মত চলেছে ফরহাদ। বন্ধু বান্ধবের অভাব নেই। আজ এখানে পার্টি তো কাল ওখানে। মাঝামাঝে দেশের বাইরেও চলে যায় দলবল নিয়ে বেড়াতে । রিনিতা যাবার ইচ্ছে প্রকাশ করলে বলেছে,

এখানে সবাই সিঙ্গেল। ফ্যামিলি যাচ্ছে না।

আচ্ছা ! একটা ছেলে বা মেয়ে থাকলেও কি ফরহাদ এমনটি করতো? হয়তো না। কিংবা পুরো ভাবনাটাই ভুল রিনিতার।। সন্তান থাকলেই কি আজ এখানে থেকে যেতো বাবা মায়ের কাছে? মোটেও না। ওরা বড় হতো। বিয়ে থা হয়ে যার যার সংসারে থাকতো কিংবা পড?াশোনার জন্য দেশের বাইরে থাকতো। নিজ মনেই হাসে রিনিতা। কী অদ্ভুত, অবাস্তব সব ভাবনায় জেঁকে বসেছে তাকে।

দূরের আকাশে চাঁদটা এখনো আলো ছড়াচ্ছে। মেঘের আড়ালে এখনো লুকোয়নি। জ্যৈষ্ঠ মাসের এ সময়টা এমনই। এই আকাশ পরিষ্কার, আবার একটু পরই হয়তো মেঘের গর্জনে বৃষ্টি নেমে আসবে।। আজ যেন তা না হয়। আজ চাঁদের আলোয় ঝুল বারান্দায় বসে থাকতে ভালো লাগছে। রাত গভীরেও রিনিতার ভয় নেই। আজকাল কত কিছু হচ্ছে। পত্রিকায় কত খবর। ডাকাতি , চুরি , খুন। কতজন সাবধান কর্তে

–‘ফরহাদ বেশিরভাগ বাইরে থাকে তুমি সাবধানে থেকো। কদিন না হয় আমার বাসায় এসে থাকো।

শুভাকাঙ্‌ক্ষীদের এমনই কতরকম কথা। অথচ আড়ালে কতজন হাসে,তাচ্ছিল্য করে তাকে নিয়ে।সব বুঝেও চুপ থাকে রিনিতা। কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না।

নিজের জন্য ভয় নেই। শুধু ভয় হয় অণুর জন্য। তার জন্য মেয়েটার যেন কোন বিপদ না হয়।

কফি নিয়ে অণু চলে এসেছে ততক্ষণে।

বাতাসে হাসনাহেনার গন্ধ ভেসে আসছে । ভালো লাগছে। কিন্তু এর মাঝে আবার সেই গন্ধ! বিশ্রী কটকটে পোড়া গন্ধ! মাঝে মাঝে রিনিতা ঝাঁঝালো এই গন্ধটা পায়।

অণু ! সেই গন্ধটা পাচ্ছিস?

ধ্যাত! কি যে বল না বুবু! কী সুন্দর ফুলের গন্ধ আর তুমি পাচ্ছ পোড়া গন্ধ।

না না, তুই পাচ্ছিস না ,আমি পাচ্ছি। ঘামতে থাকে রিনিতা।গায়ের ওড়নাটা কাঁধ থেকে সরিয়ে দেয় দ্রুত। কপালের ঘাম মুছতে থাকে।

বুবু! তোমার শরীর খারাপ লাগছে ?

অণু ! আমায় একটু ঘরে নিয়ে চল্‌ তো।

কফির মগ পড়ে রইলো বারান্দার টেবিলে। অণু জানে, এ নিত্যদিনের দৃশ্য। বুবুর শরীরটা

এই ভালো তো এই খারাপ।

রিনিতাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ব্লাড প্রেসারটা দেখে নিল অণু । প্রেসার স্বাভাবিক এর চেয়ে একটু বেশি। এ অবস্থায় ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোন ওষুধ দেয়া যাবে না। কারণ রাতে একটা ওষুধ খেয়েছে। এক গ্লাস পানি এনে ঘুমের ওষুধটা খাইয়ে দিল সে। একটু আগে রিনিতা বলছিল ঠাণ্ডা লাগছে আর এখন দরদর করে ঘামছে। অণু রুমের এ সি অন করে দিল।

ফ্ল্যাট বাড়িগুলোতে যার যার ফ্ল্যাটে দরজা বন্ধ করে দিলে কার বাড়িতে কি হচ্ছে বোঝা যায় না। অণু একটু ঘাবড়ালো। এতো রাতে কাউকে ডেকেও তো পাওয়া যাবে না।

দুশ্চিন্তার মধ্য দিয়ে এক সময় ভোরের আলো ফুটে ওঠে।

ফ্ল্যাটটা ফরহাদের নিজের কেনা।

ফরহাদ নিজের খেয়াল খুশি মত চলে আর নিশ্চিত করে রিনিতাকে বলে,—নিচে গার্ড আছে ।এছাড?া আশেপাশের ফ্ল্যাটে সবাই পরিচিত। কোন সমস্যা হলে ওদের বলবে।

রিনিতা কোনদিন কোন সমস্যার কথা বলবেনা কারও কাছে। কোন ফ্ল্যাটেই যাওয়া আসা করে না। মানুষ দুর্বল জায়গায় আঘাত করতে সদা প্রস্তুত। নানা জনের নানা কথা শুনতে ভালো লাগে না।

—————–

দিন তিনেক পর ফরহাদ ফিরেছে।

আবার নিজের রুটিন বাঁধা জীবন নিয়েই পড়ে থাকে। রিনিতার সঙ্গে প্রয়োজনীয় কথা ছাড়া তেমন কোন কথা হয় না।

একটা সময়ে যখন নানাদিক থেকে চাকরির অফার এসেছিল, রিনিতা এই ফরহাদের জন্যই ফিরিয়ে দিয়েছিল। বেচারা অফিস শেষে এসে একটু আরাম করবে।দুজনেই বাইরে কাজ করলে তা সম্ভব হবে না। এসব চিন্তা ওর একার ছিল তাও নয়। ফরহাদই তাকে বুঝিয়েছিল এভাবে।

আজকের পত্রিকায় চোখ বুলাতে বুলাতে মোবাইল ফোনটা মাত্র রাখলো কথা শেষ করে।

আজ আবার কোথায় যাওয়ার প্ল্যান হচ্ছে গো?

হাসি মুখে জানতে চায় রিনিতা।

আর বোলোনা, মাসুদ সাহেব আজ সবাইকে খাওয়াবেন। আজ লাঞ্চটা রেস্টুরেন্টেই হবে বুঝলে?

আজ তোমার পছন্দের অনেকগুলো পদ নিজ হাতে রাঁধলাম।

রেখে দাও কাল খাবোক্ষণ।

খুব সহজেই কথাগুলো বললো।

বিষণ্‌ন মনে রিনিতা বলে , এইতো কদিন আগে বাইরে থেকে ঘুরে এলে। আজকের নিমন্ত্রণটা না নিলেও পারতে।

বলে দ্রুত চলে যায় সেখান থেকে।

ফরহাদ এসবের অর্থ বোঝে না। মনের আবেগ ,কষ্ট , আনন্দ এসব বোঝার ক্ষমতা এ জগতে কিছু মানুষকে বিধাতা স্বয়ংই দেননি হয়তো।

রিনিতার মন দিনের পর দিন কঠিন হতে থাকে। আজকাল ফরহাদের কথায় তেমন গুরুত্ব দেয় না সে।কোনরকম যন্ত্রের মত চলে যায় দিনগুলি।

ফরহাদের হাতে চায়ের কাপ দিয়ে চলে যাচ্ছিলো

হঠাৎ অদ্ভুত কথায় ফিরতে হলো

এতো সুন্দর করে হাসতে পারো তুমি! অথচ দেখিনা কতদিন ..

এখন দেখলে কি করে ?

ছবিতে !

! কোন্‌ ছবিতে?

এই যে তোমার মোবাইলে ।

গতকাল বিকেলে ছোটবোন ঈশিতা এসেছিলো। বুঝতে পারলো ওদের ছবি দেখেই হায়দার একথা বলছে।

আচ্ছা,আমার সংগে একটু হেসে কথা বলতে পারো না ?

না পারি না।

কেন?

উত্তর না দিয়ে চলে যায় রিনিতা।

নিজের মনেই কথা বলে কি করে হাসবো! অদেখা এক পৈশাচিক নির্মমতায় তুমি যে আমার হাসি কেড?ে নিয়েছ বহু আগে। আমি হাসতে পারিনা। তোমায় দেখলে আমার হৃৎপিণ্ডের মাঝে একটা শক্ত কাঠিন্য অনুভব করি। আমার ভালো লাগে না। কিছুই ভালো লাগে না।

এর নামই কি জীবন? সব ছাড়িয়ে অণুর সঙ্গে দুটো কথা বলে রিনিতা শান্তি খুঁজে পায়।

—————

ইদানীং অণু কিছুটা অন্যমনস্ক। রিনিতা জানতে চাইলে এড়িয়ে যায়।

নিজের মনের সাথে যুদ্ধ আর বোঝাপড়া নিয়ে চাপা কষ্টের মাঝে নিজেকে লুকিয়ে রাখে অণু। রিনিতার চোখ এড়াতে পারেনি শেষ পর্যন্ত।

তরুণ বয়সী সিকিউরিটি গার্ড শফিকের সঙ্গে মনের সম্পর্ক হয়েছে অণুর। শফিক মনেপ্রাণে অণুকে চায়। কিন্তু অণু তা চায় না। কারণ একটাই। বুবুকে ছেড়ে সে কোথাও যাবে না। কান্নায় ভেঙ্গে পরে সে। সব শুনে রিনিতা হাসে। অণুর পিঠে হাত রাখে।

পাগলি কোথাকার ! আগেই এতকিছু ভেবে নিলে হবে? আগে দেখ সে সত্যি সত্যিই তোকে ভালোবাসে কিনা?

শফিক সত্যিই অণুকে ভালোবাসে আর অণুও। রিনিতাকে আরও একা হতে হলো। নিজের জন্য এই মেয়েটির জীবনটা নষ্ট করার কোন অধিকার তার নেই। ভাইবোনদের সঙ্গে কথা বলে নিল রিনিতা। কারণ অণুর শৈশব কেটেছে তাদের বাড়িতেই। সবার মতামত নেয়া জরুরী। শফিকের বাড়ির খোঁজ খবর নিয়ে এক বাক্যে সবাই মত দিল। দেশের বাড়িতে জায়গা জমি আছে। চাষাবাদ করে বেশ ভালোই ওদের দিনকাল চলে। তবে শফিকের বাবা মায়ের ইচ্ছে , বউ তাদের সঙ্গে গ্রামেই থাকবে। অণু শহুরে পরিবেশে বড় হয়েছে তারপরেও শফিকের বাবা মায়ের ইচ্ছেকে মেনে নিতে হলো। তবে শফিক কথা দিয়েছে, সুযোগ সুবিধে মতো পরে একটা বাসা ভাড়া করে অণুকে নিয়ে আসবে।

শফিক ছুটিছাঁটায় গ্রামে যায়। অণুর খোঁজ খবর পায় রিনিতা। বিয়ের সব উপহারের সঙ্গে দামী একটা মোবাইল ফোনও কিনে দিয়েছিল অণুকে। কিন্তু শাশুড়ির ভয়ে অণু নিজের ইচ্ছে মত বুবুর সঙ্গে মন খুলে কথা বলতে পারে না।

অণু নেই। সবকিছু ফাঁকা লাগে। বাড়িটা শূন্য হয়ে গেছে। নিঃসন্তান রিনিতার অন্তরে কেমন করে যে ঠাঁই করে নিয়েছিল অনাথ এই মেয়েটা তা কেবল রিনিতাই জানে।

ফরহাদ কয়েকবার বলেছেচার পাঁচ হাজার টাকা মাইনে দিলে একটা কাজের মেয়ে পাওয়া যায়। এতো ভাবছো কেন?

ছি, অণুকে তুমি কাজের মেয়ের সঙ্গে তুলনা করলে? পাঁচহাজার কেন, লক্ষ টাকা দিলেও অণুর মত কাউকে পাবো আমি? ডুকরে কেঁদে ওঠে রিনিতা।

ফরহাদ অবাক হলো। এমন আবেগীয় সম্পর্কগুলোর অর্থ সে বোঝে না। কখনও অনুভব করে না।

অর্থহীন দৃষ্টি নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো।

আজও ফরহাদ বাইরে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছে। একের পর এক ফোন কল আসছে। দলবলসহ আজ আবার কোথায় যেন যাবে। রিনিতা ভেবেছিলো অণু চলে যাবার পর হয়তো বদলে যাবে মানুষটা। কিন্তু না,রিনিতার জীবনে আমূল পরিবর্তন এলেও ফরহাদের কোন পরিবর্তন হয়নি। নিজের মত করে একই ভাবে চলছে সে। এভাবে চলতে চলতে একটা যন্ত্রযানের মত হয়ে গেছে রিনিতা নিজেও।

বলছিলাম,আজ আমার শরীরটা ভালো লাগছে না। একটু তাড়াতাড়ি ফিরে এসো প্লিজ।

কেন? কেমন লাগছে? ওষুধ খাওনি?

খেয়েছি।

ঠিক আছে। তুমি খেয়ে নিও। খুব খারাপ লাগলে ফোনে কল দিও।

রিনিতা নীরবে দরজা বন্ধ করে ঘরে ফিরে আসে।

রান্নাঘর থেকে খাবার বেড়ে নিয়ে টেবিলে এলো। ইচ্ছে করছে না কিছু খেতে।

ঈশিতার কাছে একটা ফোন করলে কেমন হয়। না থাক। ও হয়তো ব্যস্ত এখন।

না খেয়ে শুয়ে রইলো রিনিতা। সন্ধ্যা হয়ে গেছে কখন টেরই পায়নি। বিছানা ছেড়ে উঠলো।

একি! মাথাটা এমন করে ঘুরছে কেন?

ঢলে পড়ে যেতেই বেড সাইড সোফার হাতল ধরে দাঁড়িয়ে যায়। ঠিকভাবে দাঁড়াতে পারছে না। ধপ করে বসে পড়ে বিছানায়।

পানি ! একটু পানি খাবো। পানি! অস্ফুট কথা বের হয়ে আসে মুখ থেকে।

কেউ নেই , কেউ নেই। একা ঘরে অসহায়ের মত এটা ওটা ধরে উঠে দাঁড়াতে চায়, পারছে না।দু চোখ অন্ধকার হয়ে আসে। গল গল করে বমি করে দিল।

সারা শরীর ঘেমে জবজব করছে। রিনিতা বুঝতে পারছে ব্লাড প্রেসার প্রচণ্ড রকম বেড়ে গেলে এভাবে বমি হয়।ওয়াশ রুমে যাবার শক্তি নেই। একটা ওষুধ খেয়ে নিলে হতো।কিন্তু নাহ! পারছে না।

এসির সুইচটা অন করার চেষ্টা করলো, পারলো না।

কোন রকম নিজেকে টেনে নিয়ে ওয়াশরুমে যাবার চেষ্টা করতে হবে। বালিশের পাশে রাখা মোবাইল ফোনটার দিকে হাত বাড়ালো।

রাত বারোটায় ফরহাদের গাড়ী এসে থামে। এত লোক কেন এখানে?

ভীষণ শোরগোলের ভিতর দিয়ে লিফ্‌েটর সামনে এসে দাঁড়ালো। কেউ বলছে কোথায় ছিলেন আপনি? কেউ বলছেস্যারের মোবাইলে অনেক চেষ্টা করেছি নেটওয়ার্ক পাইনি।

ঘরে ঢুকে কান্নার রোল শুনতে পায়। আত্নীয় স্বজনরা কীভাবে যেন খবর পেয়ে চলে এসেছে।

রিনিতা শেষ ফোনটা করতে পেরেছিল তার সবচেয়ে মমতার জায়গা ,একান্ত আপন অণুর কাছে। তেমন কিছু বলার আগেই হাত থেকে মোবাইলটা পড়ে গিয়েছিলো। অণু কেঁদে শফিককে ফোন করে জানায়। শফিক অন্য গার্ডদের নিয়ে দ্রুত দরজা ভেঙ্গে ভেতরে আসে। ততক্ষণে সব শেষ।

কাঁদছে ফরহাদ। পাষাণ হৃদয়ের ফরহাদের চোখে আজ পানি। রিনিতা এ দৃশ্য দেখছে না।

লোবান আর আগরবাতির গন্ধ ছাড়িয়ে ফরহাদের নাকে হঠাৎ একটা পোড়া গন্ধ অনুভূত হলো। মাঝে মাঝে রিনিতা একটা পোড়া গন্ধ পেতো যা অন্য কেউ পেতো না। ফরহাদ কখনও গুরুত্ব দেয়নি রিনিতার এসব কথায়। আজ দিচ্ছে। আজ সে নিজেই কটকটা একটা পোড়া গন্ধ পাচ্ছে।

ভোরের দিকে অণু এসে পৌঁছেছে।

বুবুগো…… আমাকে আরও আগে কেন ফোন করলে নাকেন এমন করলে গো বুবু ..বুবু কথা বল…… বুবু তোমার কেমন লেগেছিলো বুবু ? কেমন কষ্ট হয়েছিলো বলবুবু বল……

অণুর গগন বিদারী কান্নায় আর বিলাপে বাতাস ভারী হয়।লাশবাহী গাড়ী ধীরে ধীরে এগুতে থাকে গন্তব্যের দিকে।

x