বাণিজ্যিক রাজধানী বাস্তবায়ন

সমস্যা কোথায়?

জাহেদুল কবির

বৃহস্পতিবার , ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ১০:৫১ পূর্বাহ্ণ
756

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের সিংহভাগ আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণেও চট্টগ্রাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রামে পাহাড়, সাগর যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে সমতল ভূমিও। সাগর, নদী, পাহাড় পরিবেষ্টিত চট্টগ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্যের ইতিহাস শত শত বছরের পুরনো। সাগরপথে এক সময় বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা ব্যবসার কাজে এই চট্টগ্রামে আসতেন। তাই চট্টগ্রামকে ব্যবসা বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান সূতিকাগারও বলা হয়। কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চট্টগ্রামকে এখনো রাজধানী ঢাকার ওপর নির্ভর করতে হয়। এক সময় চট্টগ্রামে বিভিন্ন ব্যাংক-বীমার হেড অফিস থাকলেও এখন কিছুই নেই। সবগুলো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হেড অফিস এখন রাজধানী ঢাকায়। উল্টো অল্প যে ক’টি হেড অফিস চট্টগ্রামে ছিল, পরবর্তীতে সেগুলোও ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে।
তবে, বর্তমানে চট্টগ্রামে বিভিন্ন সরকারি ও আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানের শাখা অফিস থাকলেও কর্মকর্তাদের হাতে কোনো নির্বাহী ক্ষমতা নেই। তাদেরকে ঢাকার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর থাকতে হয়। তাই চট্টগ্রাম নামেই কেবল বাণিজ্যিক রাজধানী, এর কোনো ভিত্তি নেই বলছেন বিশিষ্টজনরা।
ব্যবসায়ীরা জানান, ১৯৯১ সালে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী ঘোষণা করে তৎকালীন সরকার। এরপর কেটে গেছে প্রায় ২৮ বছর। এখনো পর্যন্ত একটি বাণিজ্যিক রাজধানী গড়ে তুলতে হলে যে সকল শর্ত পূরণ করা প্রয়োজন, তার কোনোটিই পূরণ হয়নি। বাণিজ্যিক রাজধানীকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সরকারকে আরো বেশি উদ্যোগী হতে হবে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিমান ও রেলপথের কানেক্টিভিটি উন্নত করতে হবে। কন্টেনার পরিবহনের জন্য আলাদা রেললাইন নির্মাণ করা অত্যন্ত জরুরি। এতে সড়কপথে চাপ কমবে। ফলে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে যেসব পণ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাচ্ছে, তা খুব কম সময়ে যেতে পারবে। অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে হবে। সেই লক্ষ্যেই মূলত মীরসরাই ইকোনোমিক জোনটি দ্রুত নির্মাণ করতে হবে। এছাড়া এলএনজি গ্যাস সঞ্চালন লাইনে দেওয়ার পরও মিটেনি গ্যাসের সংকট। এটি চট্টগ্রামের শিল্পায়নের ক্ষেত্রে অনেক বড় বাধা। অপরদিকে যত দ্রুত সম্ভব বে-টার্মিনাল ও কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ সম্ভব হবে, তত দ্রুত বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে চট্টগ্রাম পরিপূর্ণতা লাভের দিকে এগিয়ে যাবে।
অন্যদিকে, কর্ণফুলী নদীর দিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। বর্তমানে দখলে দূষণে কর্ণফুলী খুব নাজুক অবস্থায় আছে। যদিও সমপ্রতি ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী কর্ণফুলী পাড়ের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শুরু করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চট্টগ্রাম বন্দরের একটি বড় সমস্যা। ট্রাফিক সিস্টেমের দুর্বলতার কারণে চট্টগ্রাম শহরে যানজট ও দুর্ঘটনা বাড়ছে। বড় স্থাপনা নির্মাণ করার সাথে সাথে পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও করতে হবে। এছাড়া জলাবদ্ধতা চট্টগ্রামের জন্য অনেক বড় একটি সমস্যা। প্রতি বছর বর্ষায় চট্টগ্রামের নিচু এলাকা বিশেষ করে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ পানিতে তলিয়ে যায়। এতে ব্যবসায়ীরা শত শত কোটি টাকার লোকসান গুনেন।
তবে আশার কথা হচ্ছে, ব্যবসায়ীদের দাবি মেনে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) চাক্তাই খালের কর্ণফুলী মোহনায় স্লুইস গেট নির্মাণ করছে। এছাড়া খাল খনন ও কর্ণফুলীর ড্রেজিং কাজও দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। এর বাইরে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বিশেষ করে বে-টার্মিনাল নির্মাণ, বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ, কর্ণফুলী নদীর ক্যাপিটাল ড্রেজিং, দোহাজারী-কঙবাজার-ঘুনধুম রেললাইন নির্মাণ, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা, কর্ণফুলী টানেল, এলএনজি সরবরাহ, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার পর্যন্ত মহাসড়ক ৪ লেন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হওয়ার সাথে চট্টগ্রামও সত্যিকারের বাণিজ্যিক রাজধানীতে পরিণত হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য ও শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, দেশের সবগুলো বিভাগীয় শহরের সক্ষমতা বৃদ্ধি করাটাই বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। একইভাবে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে সত্যিকারের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা হবে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রামে অনেকগুলো মেগা প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। কিছু চলমান রয়েছে। যেহেতু এই চট্টগ্রামেই রয়েছে দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দর; তাই বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে যা কিছু করা দরকার তার সবই করবে সরকার।
এ ব্যাপারে চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, আমার মতে, বাণিজ্যিক রাজধানীর কনসেপ্টটি এখন অনেক পুরনো। সারা দেশেই তো এখন সমানতালে উন্নয়ন হচ্ছে। অনেকেই বলে, চট্টগ্রামে কোনো ব্যাংকের হেড অফিস নেই। হেড অফিস থাকলে যে চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী হয়ে যাবে, বিষয়টি তা নয়। এখন দেশ ডিজিটালাইজড হচ্ছে। এছাড়া চট্টগ্রাম নগরীর উন্নয়ন তো এখন খুব দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। নগরীতে ফ্লাইওভার হয়েছে। এলিভেটেড এঙপ্রেসওয়ে হচ্ছে। আউটার রিং রোডের কাজ চলমান রয়েছে। কর্ণফুলীর তলদেশ দিয়ে টানেল নির্মাণ সমাপ্ত হলে আনোয়ারাসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামে শিল্প বিপ্লব হবে।
মেয়র বলেন, এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহার ছিল গ্রাম হবে শহর। গ্রামে এখন শহরের সুযোগ-সুবিধাগুলো সৃষ্টি করা হবে। যাতে মানুষ গ্রামে বসে নগরীর সুযোগ-সুবিধা নিতে পারে। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে, বে-টার্মিনাল করা হচ্ছে। তাই আমি চট্টগ্রাম আসলে বাণিজ্যিক রাজধানী হয়েছে কি হয়নি এভাবে পরিমাপ করতে চাই না।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ প্রফেসর মু. সিকান্দার খান বলেন, সব সরকারই চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী বলে ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু কোনো সরকার সত্যিকার বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য যে সকল সুযোগ-সুবিধা থাকা দরকার, সেগুলোর দিকে মনোযোগ দেয়নি। এটি সরকারের ঘোষিত নীতির সাথে মানায় না। চট্টগ্রামে এখনো কোনো ব্যাংকের হেড অফিস নেই। কিন্তু একসময় এখানে ব্যাংকসহ অনেক প্রতিষ্ঠানের হেড অফিস ছিল। এখন দেখা যায়, অনেক ব্যবসায়ী তাদের ব্যবসা সমপ্রসারণের স্বার্থে ঢাকায় হেড অফিস করেছেন। কারণ ঢাকা থেকে সব কিছু নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই চট্টগ্রামে যদি অন্তত কয়েকটি ব্যাংক কিংবা বড় বড় প্রতিষ্ঠানের হেড অফিস করা না হয়, তাহলে বাণিজ্যিক রাজধানীর বিষয়টি কেবল মুখেই থেকে যাবে।
চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, সত্যিকারের বাণিজ্যিক রাজধানী গড়তে হলে আমাদেরকে অবশ্যই পার্শ্ববর্তী দেশ মুম্বাইকে অনুসরণ করতে হবে। আমাদের চট্টগ্রামে কোনো ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হেড অফিস নেই। অন্তত কিছু প্রতিষ্ঠানের হেড অফিস চট্টগ্রামে আনতে হবে। ঢাকা কেন্দ্রিক চাপ কমাতে হবে। বিকেন্দ্রীকরণ না হলে বাণিজ্যিক রাজধানী কখনো বাস্তবায়ন হবে না।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বার সহ-সভাপতি এ এম মাহবুব চৌধুরী বলেন, বাণিজ্যিক রাজধানী বাস্তবায়ন করতে হলে চট্টগ্রামের ১৬ জন এমপিকে এগিয়ে আসতে হবে। তারা যদি একযোগে কাজ করে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী ঘোষণার প্রজ্ঞাপন জারি করাতে পারেন, তাহলে বাণিজ্যিক রাজধানীর বাকি সুযোগ-সুবিধাগুলো অটোমেটিক্যালি সৃষ্টি হবে। এখন আমাদের আমদানি-রপ্তানি থেকে সব কাজের জন্য রাজধানীর ওপর নির্ভর করতে হয়।
প্রসঙ্গত, একসময় বহুজাতিক কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো, বার্জার পেইন্টস, রেকিট বেনকিজার, গ্ল্যঙোস্মিথক্লাইনসহ বেশ কিছু কোম্পানির হেড অফিস ছিল চট্টগ্রামে। কিন্তু কোম্পানির কর্তারা পরবর্তীতে তাদের হেড অফিস ঢাকায় স্থানান্তর করেন।

x