বাজারে প্লাস্টিক বস্তার ছড়াছড়ি

সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষিত ।। কারখানা বন্ধ করে দেয়ার দাবি ব্যবসায়ীদের

জাহেদুল কবির

শুক্রবার , ১২ অক্টোবর, ২০১৮ at ৫:০৫ পূর্বাহ্ণ
67

পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পাটের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে ধান, চাল, গম, ভুট্টা, সার ও চিনিসহ ১৯টি পণ্য পরিবহন ও মজুদের ক্ষেত্রে পাটের তৈরি বস্তার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। কিন্তু এর পরেও এসব পণ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে প্লাস্টিক বস্তা। বিশেষ করে চালের আড়তগুলোতে এখন এসব বস্তার ছড়াছড়ি। তবে পাটের তৈরি বস্তার ব্যবহার নিশ্চিত করতে অভিযান চলমান রয়েছে বলে জানায় জেলা প্রশাসন।
প্লাস্টিক বস্তা ব্যবহারের বিষয়ে আড়তদাররা জানান, ‘উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের চালের মিল থেকে এখনো প্লাস্টিক বস্তায় চাল আসছে। মাঝে মধ্যে প্রশাসন আড়তে এসব বস্তার বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। কিন্তু আমরা (আড়তদাররা) তো চাল উৎপাদন করি না। আমদানিকারক বা মিলাররা যেভাবে চাল সরবরাহ করেন সেভাবে কিনেই বিক্রি করি। এছাড়া প্লাস্টিক বস্তায় আমদানি করা অনেক চাল এখনো ব্যবসায়ীদের গুদামে রয়ে গেছে। সেখানে থেকেই তারা সরবরাহ করছেন।’ চট্টগ্রাম চাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. এনামুল হক এবং চাক্তাই চালপট্টি ও পাহাড়তলী পাইকারী বাজারের কয়েকজন চাল ব্যবসায়ী জানান, ‘এক সময় সরকারের নির্দেশনা মেনেই আমরা চটের বস্তায় চাল আমদানি করতাম। তবে এটি করতে সময় লাগত প্রায় ৭-৮ মাস। পরবর্তীতে গত বছরের শেষের দিকে চালের সংকট মোকাবেলায় সরকার চটের বস্তায় চাল আমদানির আইনটি শিথিল করে। ওই সময় শুল্কহার ২ শতাংশের সুযোগ নিয়ে অনেক ব্যবসায়ী প্লাস্টিক বস্তায় লাখ লাখ টন চাল আমদানি করেন। তবে বর্তমানে সরকার ফের ২৮ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করে দেয়ায় কমে গেছে আমদানি। এছাড়া বাজারে মন্দাভাবের কারণে আগে আমদানিকৃত প্রচুর চালও অবিক্রিত থেকে গেছে। এখন আমদানিকৃত এত বিপুল পরিমাণ চালের প্লাস্টিক বস্তা পরিবর্তন করা খুবই কঠিন। হঠাৎ এসব বস্তা তুলে দিলে ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়বেন।’ তারা মূল জায়গাগুলোতে নজরদারি করতে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান। এছাড়া আড়ত কিংবা গুদামে অভিযান না চালিয়ে ধান-চালের কলগুলোর পাশাপাশি যেখানে প্লাস্টিক বস্তা তৈরি হয় সেখানে অভিযান চালানোর দাবি জানান।
খাতুনগঞ্জের একজন পাইকারি আটা-ময়দা ব্যবসায়ী জানান, ‘পাটের তৈরি বস্তায় আটা-ময়দা পরিবহন করা কঠিন। কারণ পাটের বস্তায় আঁশ ও ছিদ্র থাকে। দেখা যায়, আটা ও ময়দার সাথে এসব আঁশ মিশে যায়। অনেক সময় ধুলাবালি বস্তার ছিদ্র দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। এতে আটা-ময়দার গুণগত মান নষ্ট হয়।’ তবে পাটের বস্তা আটা-ময়দার জন্য উপযোগী করে তৈরি হলে এটি ব্যবহারে তাদের কোনো আপত্তি নেই বলে জানান এই ব্যবসায়ী। পাশাপাশি আটা ময়দার ক্ষেত্রে বিষয়টি ভেবে দেখার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।
চালের বাজারে প্লাস্টিক বস্তার ছড়াছড়ির বিষয়টি নিশ্চিত করে পাহাড়তলী বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এসএম নিজাম উদ্দিন বলেন, আমরা যেহেতু আমদানিকারক থেকে বস্তা কিনে বিক্রি করি, তাই আড়তে প্লাস্টিক বস্তা চোখে পড়াটাই স্বাভাবিক। তবে চালের মোকামগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি প্লাস্টিক বস্তা তৈরির কারখানা বন্ধের দাবি জানান এই ব্যবসায়ী নেতা।
চট্টগ্রাম রাইচ মিল মালিক সমিতির সভাপতি শান্ত দাশগুপ্ত দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘এখনো আশুগঞ্জ ও হবিগঞ্জ থেকে প্লাস্টিক বস্তায় দেশিয় চাল আসছে। সরকারকে আগে ওসব জায়গায় নজরদারি বাড়াতে হবে। এছাড়া সরকারিভাবে প্লাস্টিক বস্তায় চাল আমদানি হয়েছে। এখন সরকারি গুদাম থেকে ওসব চাল দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে যাচ্ছে।’ এসব চাল শেষ না হওয়া পর্যন্ত আইনটি শিথিল করার দাবি জানান শান্ত দাশ।
চাক্তাই খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি সোলায়মান বাদশা বলেন, ‘সরকার চটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করলেও ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ডাল ও ধনিয়াসহ বেশকিছু ভোগ্যপণ্য প্লাস্টিক বস্তায় আমদানি করছেন। এসব পণ্য হঠাৎ করে চটের বস্তায় ভরা সম্ভব নয়। এজন্য ব্যবসায়ীদের কিছুদিন সময় দিতে হবে।’
এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘পাটের বস্তা ব্যবহারের বিষয়ে আমরা ব্যবসায়ীদের সাথে বসেছিলাম। ব্যবসায়ীরা আমাদের বলেছিলেন, আমদানি চাল প্লাস্টিক বস্তায় আসে। এক্ষেত্রে সেগুলো পরিবর্ততে আমরা তাদের সময় দিয়েছিলাম। সে সময়টা শেষ হয়ে গেছে। এখন প্লাস্টিক বস্তার বিরুদ্ধে আমারা অভিযান শুরু করেছি।’
উল্লেখ্য, পাটের বহুমুখী ব্যবহার, সম্প্রসারণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ১৯টি পণ্যের ক্ষেত্রে চটের বস্তার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে সরকার। সর্বশেষ গত ১২ আগস্ট পোল্ট্রি ও ফিশ ফিডের মোড়কে পাটের বস্তার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। এর আগে গত ২০১৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর ধান, চাল, গম, ভুট্টা, সার এবং চিনি সংরক্ষণ ও পরিবহনে বাধ্যতামূলকভাবে পাটের বস্তা ব্যবহারের নির্দেশ দেয় বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। এরপর ২০১৭ সালের ২৪ জানুয়ারি পেঁয়াজ, আদা, রসুন, ডাল, আলু, আটা, ময়দা, মরিচ, হলুদ, ধনিয়া ও তুষ-খুদ-কুঁড়ার মোড়ক হিসেবে পাটের বস্তার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। এদিকে পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন, ২০১০-এর ধারা-১৪ অনুযায়ী পাটের মোড়ক ব্যবহার না করলে অনূর্ধ্ব এক বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। এ অপরাধ পুনঃসংগঠিত হলে সর্বোচ্চ দণ্ডর দ্বিগুণ করার কথাও বলা আছে বিধানে।

x