বাঙালিয়ানার উৎসবে প্রাণের সম্মিলন

দিলীপ কুমার বড়ুয়া

শনিবার , ১৪ এপ্রিল, ২০১৮ at ৮:৪৪ পূর্বাহ্ণ
70

ভোরের আলোয় নববর্ষের সূর্যোদয়। চৈত্রের সূর্যাস্তে বৈশাখের নবযাত্রা। আর পহেলা বৈশাখ মানে ঐতিহ্যের আবাহন। বাঙালির সমগ্র অস্তিত্ব ও অনুভবের সঙ্গে মিশে আছে নতুন স্বপ্ন, উদ্যম আর প্রত্যাশার আবির ছড়ানো এ বড় উৎসব নববর্ষ। কালের নিরন্তর যাত্রায় আবার এসেছে নতুন বছর। নতুন সকাল। নতুন দিন। সুবর্ণ বৈশাখে প্রথম সূর্যোদয়ের আলোকচ্ছটায় বাংলা ভাষাভাষীর জীবনে এ এক অমলিন আনন্দের দিন। আলোকিত সত্তার সিঁড়িতে বাঙালির প্রাণের এ উৎসব নববর্ষ বরণ যেন মহামিলনের গান, একান্ত প্রাণে মৈত্রী, শান্তি, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির মেলবন্ধন। বাঙালির সুপ্রাচীন ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, বাঙালিয়ানা ধরে রেখে প্রাণের সম্মিলনে আরও একবার মেতে ওঠবে নব প্রাণের উচ্ছ্বাসে বাঙালি জাতি।

আবহমানকাল থেকে চিরায়ত বাঙালির সর্বজনীন উৎসব বাংলা নববর্ষ। বাঙালি আর বাংলা নববর্ষ এক চিন্তাচেতনা, মননশীলতায় বাঙালি সংস্কৃতি ও জীবনবোধে অভিযাত্রায় একসূত্রে গাঁথা। নববর্ষের আহ্বানে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাই আনন্দে উদ্বেল হয়। মঙ্গল শোভাযাত্রা,হালখাতা, কারুশিল্প লোকসংস্কৃতির বর্ণচ্ছটা, নতুন রঙিন পোশাক, ফুলের সাজসজ্জা এবং নববর্ষ উদযাপনের আকাঙক্ষায় ব্যাকুল থাকে প্রতিটি মানুষ। প্রাণে প্রাণে সঞ্চারিত হবে জীবনের জয়গান। এই উৎসবের মধ্য দিয়ে বাঙালি তার আপন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আলোকে জাতিসত্তার পরিচয়কে নতুন তাৎপর্যে উপলব্ধি করে গৌরব বোধ করে। এই গৌরব ও চেতনাই বাঙালিকে প্রেরণা জুগিয়েছে আপন অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে। তাই জীর্ণতা মুছে দিয়ে জীবনের শুদ্ধতায় দৃষ্টির লাবণ্যে মুগ্ধ বিস্ময়ে ফিরে আসে আকাঙক্ষার দিন পহেলা বৈশাখের সৃষ্টিমুখর পথচলার প্রত্যয়।

ষাটের দশক থেকে বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্তের প্রাণের উৎসব হয়ে উঠছে নববর্ষ। ষাটের দশকের অন্তিম পর্যায়ে ছায়ানট রমনার বটমূলে বাঙালি সম্মিলনের মধ্য দিয়ে যে নববর্ষ উদ্‌যাপনের যাত্রা শুরু করেছিল, তা ক্রমে প্রসারিত চেতনা নিয়ে বাঙালি জাতির মধ্যে বিস্তার লাভ করেছে। এই অঞ্চলের মানুষের জীবনচর্চা ও সাধনায় তা নবমাত্রা যোগ করেছে। সংস্কৃতিচর্চায় ঘটিয়েছে বিস্ময়কর এক জাগরণ। সত্তরের দশকে এই নববর্ষ উদ্‌যাপন আরও প্রসারিত হতে থাকে। রাজধানী ঢাকা সহ বাংলাদেশের সব শহরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মেলা, লোকজ অনুষ্ঠানের বহুমাত্রিকতায় আলোচনা ও সম্মিলনে সর্বস্তরের মানুষ এক অভিন্ন হৃদয়াবেগে ক্লান্তি ও অবসাদের মধ্যে খুঁজে পেতে চাই উৎসবে বৈচিত্র্য আর নতুনত্বের আস্বাদ। চিরায়ত আনন্দউদ্দীপনা আর বর্ণাঢ্য উৎসবে মানুষের স্রোতে বর্ণিল হয়ে ওঠে বর্ষবরণ। বাঙালি মেতে ওঠে নিজস্ব প্রাণের আবহে। যার প্রধান প্রেরণা বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি। সম্রাট আকবরের শাসনামলে কৃষিনির্ভর বাংলায় বৈশাখে নববর্ষ উদযাপন চালু হয়েছিল, নানা বিবর্তনে তা আজো বহমান। এ দেশের বৃহত্তম অসাম্প্রদায়িক উৎসব হিসেবে সর্বস্তরের মানুষের কাছে বাংলা নববর্ষ বহুকাল ধরে বরণীয়। কালের প্রবাহমান ধারায় জাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সুপ্রাচীন কাল থেকেই পহেলা বৈশাখে বাংলা নতুন বর্ষকে বরণের মাধ্যমে অতীতের গ্লানি, দুঃখ, কষ্ট ও হতাশাকে ঝেড়ে ফেলে সকল অপশক্তির অবসানের মনোবাসনায় এ উৎসবের আয়োজন করে আসছে সারা বিশ্বের বাঙালিরা।

সামাজিক, রাষ্ট্রীয় অস্থিরতা ও বিপন্নতায় মানব সমাজের স্বপ্নআকাঙক্ষা অমানিশার আঁধারে দিশাহীন। সংকট আর উন্মূল বেদনায় মানুষ খুঁজে চলছে তার আপন সত্তা । সংস্কৃতিচর্চার মধ্য দিয়ে নবীন বোধে বাঙালির প্রাণের উৎসব জীবনচর্যায় ও মননে দীপিত। মঙ্গলআকাঙক্ষায় উজ্জীবিত এক বোধ আমাদের চেতনায় নবীন আলোকে স্বপ্নসঞ্চার করে। মানুষের জীবনচর্চা ও সাধনায় তা নবমাত্রা যোগ করেছে। সংস্কৃতিচর্চায় ঘটিয়েছে আশ্চর্য এক জাগরণ।

বৈশাখের প্রথম দিনটিতে আবহমান সংস্কৃতির ত্রিমাত্রিক ক্যানভাসে নান্দনিক শিল্পকর্ম বাঙালির নিজস্বতার আপন ঐতিহ্য ধরা দেয় নতুনকে বরণের আয়োজনে। বিশ্বায়নের প্রভাবে জীবন যতই দ্রুততর হোক, আমাদের অগোচরে ঠিকই মনের ভেতরে ডানা মেলে বাংলার প্রকৃতি, গ্রামবাংলার চিরায়ত লোকজ ঐতিহ্যের গ্রামীণ মেলা, উৎসবে ভরপুর যাপিত জীবনের প্রতিচ্ছবি। যতই আমরা সভ্যতার ভার্চুয়াল জগতে বদলানোর চেষ্টায় থাকি , তারপরও আমরা শেকড়ের কাছাকাছি কী এক প্রগাঢ় নিবিষ্টতায় জীবনকে উপভোগ করি। যতই যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততা আমাদের চেপে বসুক, চিরন্তন বাংলার রূপ মাধুরী ঠিকই বুকের ভেতরে জেগে থাকে এক অনাবিল মোহময়তায় । এ জন্যই নববর্ষের এই একটি দিনকে উপলক্ষ করে বাঙালির নিজস্ব উৎসবের এমন নিপাট আয়োজন। চিত্ত চৈতন্যের মগ্ন মেলায় প্রাণের সম্মিলনে শত সহস্র কণ্ঠে বৈশাখের মঙ্গল ধ্বনি আমাদের শেকড়ের সন্ধান দিয়ে যায়।

বাঙালির মননে নববর্ষ মানে পথেপ্রান্তরে, পোশাকেপ্রচ্ছদে রঙের প্লাবন, রবীন্দ্র, নজরুল, লালন দর্শন, বাউল সুর। নববর্ষ মানে নতুন পাঁজি, লাল প্রচ্ছদের হালখাতা, চৈত্রসংক্রান্তি, নবান্ন, দিনভর প্রাণময় আড্ডা, প্রতিটি ঘরে লোকজ উৎসবের পরিপাটি আয়োজন। এককথায় বাংলার সর্বজনীন কৃষ্টিসংস্কৃতি, আচারউপাচারের সবসব উপাদানের মিলিত অনুষঙ্গে সময়ের গতিপথে একটি দাঁড়ি টেনে আজ আবার নবযাত্রা। বাঙালিয়ানার উৎসবে আজ সবাই পথে নামবেন । তিলোত্তমা ঢাকাসহ দেশের সব নগর সভ্যতায় উঠে আসবে রূপসী বাংলার প্রান্তিক সমাজ। নাগরিক জীবনের করিডোরে বসবে গ্রামবাংলার সেই চিরন্তন বারোয়ারি মেলা। সবাই কণ্ঠ মেলাবেন রবীন্দ্রনাথের এসো হে বৈশাখ, এসো এসো তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে …? বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিমগ্নভাবে বৈশাখ বন্দনা করেছেন। বৈশাখের বারতা তাঁর কবিতায় সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। বৈশাখের ধ্বংস রূপ, পাশাপাশি নতুন বছরের আগমন সৃষ্টিকে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন তার ’বৈশাখ আবাহন’ কবিতায় । কবিগুরু মঙ্গলআকাঙক্ষায় উজ্জীবিত বোধে আমাদের চেতনাকে করেছেন প্রাণিত। ক্ষুদ্রতা, তুচ্ছতা, নীচুতা, হীনতা, গ্লানি , ক্লেদ নয় ,নবীন আলোকে পথচলার স্বপ্নসঞ্চার করেছেন। জীবনের সব ভোগক্ষুদ্রতা, সংকীর্ণতা, কুসংস্কার দূর করে দিয়ে এক মহাজীবনের উপলব্ধির কথা বলেছেন। তাঁর কবিতার ভাষায়ণ্ড নব আনন্দে জাগো আজি নব রবি কিরণে/শুভ্র সুন্দর প্রীতিউজ্জ্বল নির্মল জীবনে

আজিকার এ দিনে রবীন্দ্রনাথের গানের অনুরণনে উচ্চারণ করতে ইচ্ছে জাগে আলোকের এই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও … / আজ এই সকালে ধীরে ধীরে তার কপালে/এই অরুণ আলোর সোনার কাঠি ছুঁইয়ে দাও ।/ বিশ্বহৃদয় হতে ধাওয়া আলোয় পাগল প্রভাত হাওয়া,/সেই হাওয়াতে হৃদয় আমার নুইয়ে দাও/ আজ নিখিলের আনন্দধারায় ধুইয়ে দাও,মনের কোনের সব দীনতা মলিনতা ধুইয়ে দাও ।

বাঙালির জীবনধারায় নববর্ষ শুধু একটি সকালে পান্তাইলিশ আর দিনভর মেলাআনন্দই নয়। এ দিনকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে একটি জাতির বিকাশ, সুপ্রাচীন ঐতিহ্য, সমৃদ্ধময় সংস্কৃতিকৃষ্টির মৌল দর্শন এবং তা বাঙালির শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যের বহিঃপ্রকাশ। বাঙালির সঙ্গে, বাঙালির চেতনা বিকাশের উৎসধারায় বৈশাখ বা নববর্ষ সব সময় জড়িয়ে ছিল, জড়িয়ে আছে অঙ্গাঙ্গিভাবে। পহেলা বৈশাখ শুধুমাত্র প্রকৃতিতেই নয় বরং প্রতিটি বাঙালি হৃদয়েই নিয়ে আসে নতুনের বার্তা। পহেলা বৈশাখ মানেই বাউলের একতারাতে সুর, ঢাকির ঢাকে বাঁশের কাঠি, বংশিবাদকের ঠোঁটে সুরের ইন্দ্রজাল, বাঙালির পরনে বৈশাখী পোশাক, পান্তাইলিশ, হালখাতা, মিষ্টি বিতরণ ইত্যাদি। এ দিন আসলেই যেন হিংসা ভেদাভেদ ভুলে হৃদয় আলিঙ্গনে মিলিত হওয়া বাঙালিয়ানার বহিঃপ্রকাশ।

বৈশাখ যুগে যুগে বাঙালির জীবনপঞ্জিকে সাজিয়েছে নব নব রূপে। বাঙালি বৈশাখকে নানা সময় নানাভাবে গ্রহণ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের দিনে, বাঙালির জীবনে নববর্ষ বা বৈশাখ এসেছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক শক্তির উৎস হয়ে। আমাদের বাংলা সাহিত্যে বৈশাখ একটি বিশেষ স্থানজুড়ে রয়েছে। বহু কবিসাহিত্যিক বৈশাখ কে নিয়ে রচনা করেছেন কবিতা, গান, ছড়া। বাংলার কাব্যে, বাংলার সাহিত্যে বাংলার ঋতু পরিবর্তন বিধৃত হয়েছে কবিসাহিত্যিকদের সৃজনে। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের কবিতা ও গানে নববর্ষ এসেছে জাগরণের আবাহনে ।

নতুন বছর সবার মনে অনাবিল আনন্দ আর সুখের বার্তা বয়ে আনুক। আঁধার কেটে আলো আসুক সবার জীবনে । পেছনে ফেলে আসা বছরটিতে আমাদের অনেক গৌরবময় অর্জন রয়েছে সমৃদ্ধির ধারাবাহিক সাফল্যের গৌরবগাথায়। দেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের কাতারে স্থান করে নিয়েছে। বিভিন্ন সূচকে বিস্ময়কর অগ্রগতি পরিলক্ষিত। তারপরও অপশক্তির অপতৎপরতা সবাইকে হতবাক এবং হতাশ করে। দেশজুড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা , নারী ধর্ষণ, হত্যা আর নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে চলেছে। মূল্যবোধের অবক্ষয়, নৈতিকতার অধ:পতনের ঘটনা সমাজে অস্থিরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। মানবতা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে বিভিন্ন ঘটনায় । এরকম অনেক গ্লানিময় বোঝা নিয়ে বিদায় নিচ্ছে ১৪২৪ বঙ্গাব্দ।

এবারের নববর্ষ হোক উত্থানের, উন্নয়নের । নির্মূল হোক অপশক্তির নাশকতা, সহিংসতা । সবার জীবনযাত্রায় আসুক প্রাণচাঞ্চল্য, শুচি হোক ধরা। সব বৈরিতা পেছনে ফেলে সমৃদ্ধ মানবিক বাংলাদেশ গড়ার সংকল্পে সবাই একযোগে নতুন উদ্দীপনায় এগিয়ে যাবে আলোয় আলোকময় সুবর্ণ বন্দরে।

লেখক : রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত), কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক

x