বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা জাগাতে কাজ করতে হবে

শুক্রবার , ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৬:২১ পূর্বাহ্ণ
86

আমি ভালোবাসি আমার ভাষাকে, আমি তার গান গাই,
ছড়ায় চাঁদের জোছনা এবং সূর্যের রোশনাই।
কখনো ছড়ায় শোভা অপরূপ
দ্যুতি ঝরে পড়ে টুপ টুপ টুপ
হৃদয়টা ওঠে ঝলমল করে, ছড়ায় রুপোলি হাসি-
মায়ের মতোই আমার এ ভাষা, তাই তাকে ভালোবাসি।

বছর ঘুরে আমাদের দরজায় এসে উপস্থিত হয়েছে ফেব্রুয়ারি মাস। এ মাসের সাথে জড়িয়ে আছে বাঙালি ও বাংলা ভাষার অসীম গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস। তবে ফেব্রুয়ারিই কেবল ভাষার প্রতি ভালবাসা প্রকাশের মাস নয়, আমরা মনে করি প্রতিটা মাস, প্রতিটা দিন ভাষার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের সময়। তবে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলার স্বীকৃতি আদায়ের মাস। মাতৃভাষা রক্ষার মাস। মায়ের মুখের ভাষার অম্লানতা রক্ষার লড়াইয়ে জীবন উৎসর্গকারীদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করার মাস। ফেব্রুয়ারি এলেই আমরা বলি, ‘একুশ আমার অহংকার’। বাংলায় হাসি, বাংলায় কাঁদি, বাংলায় করি গান। এজন্যই বাঙালি জাতি ইতিহাসের পাতায় পেয়েছে স্বতন্ত্র সম্মানের স্থান। কেননা বিশ্বের মধ্যে বাঙালিই একমাত্র জাতি যারা মাতৃভাষা রক্ষার দাবিতে জীবন উৎসর্গ করেছে । রাজপথে ঢেলেছে বুকের তাজা রক্ত। বাঙালির এ বীরত্বপূর্ণ ত্যাগের প্রতি সম্মান জানাতে বিশ্ববাসীও কার্পণ্য করেনি । ২১শে ফেব্রুয়ারি পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি।
মাতৃভাষা মানবজাতির জন্য সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে এক বিরাট নিয়ামত ও সৃষ্টিকর্তার সেরা দান। অনেক বিস্ময়কর নিদর্শনের মধ্যে ভাষা একটি অন্যতম বিশেষ নিদর্শন। মাতৃভাষাই মানুষের জীবনে স্বাভাবিক কাজকর্মের প্রকৃষ্টতর বাহন। কেননা, মাতৃভাষা হলো প্রকৃতিগত নিজ ভাষা। পৃথিবীতে বিচিত্র ধরনের অসংখ্য মাতৃভাষা প্রচলিত আছে।এ ভাষা মানুষের মনের ভাব প্রকাশের সর্বোত্তম মাধ্যম। বস্তুত ভাষার ব্যবহার মুখে কথা বলা অথবা কলমে লেখার মাধ্যমে হয়ে থাকে। স্রষ্টার পক্ষ থেকে সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসার এক অসাধারণ নিয়ামতস্বরূপ মানুষ দুভাবেই ভাষা প্রয়োগের ক্ষমতা পেয়েছে। মানুষকে ভাষা শিক্ষাদানের লক্ষ্য মনের ভাব অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কথা বলা ও মনোভাব আদান-প্রদান করা মানুষের সহজাত কাজ। সে কর্মের সহায়ক কেবল মাতৃভাষা। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনিই মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে ভাব প্রকাশ করতে (ভাষা) শিখিয়েছেন।’
ভাষার গুরুত্ব বা উপযোগিতা কিসে? এ বিষয়ে দুটি বিষয় উল্লেখ করার মতো। এক হল কোনো এক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভাবের আদান প্রদান বা তথ্য বিনিময় করার জন্য উদ্ভাবিত এক মাধ্যম। এই অর্থে ভাষা একটা সাধনী বা সাধিত্র মাত্র। এখানে আবেগ বা হৃদয়ের কোনো ব্যাপার নেই। ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তাটাই মুখ্য। আর দ্বিতীয় যে ব্যাপারটা মনে আসে সেটা হল সেই জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, সাহিত্য, সঙ্গীত, প্রকৃতি বা আবহাওয়াকে কাব্যিক ভাবে প্রকাশের একটা মাধ্যম। এখানে আবেগ বা হৃদয়ের ব্যাপার জড়িত।
সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম তাঁর এক লেখায় বলেছেন, ভাষাকে নদীর সঙ্গে আমরা তুলনা করি; কিন্তু আমাদের এই ভাষানদীকে আমরা যে দূষিত করছি প্রতিদিন, তা নিয়ে কি ভাবি? একটি দূষিত নদী যখন সমুদ্রে গিয়ে পড়ে, সমুদ্রও তো বিপদগ্রস্ত হয়, তাহলে বাংলা ভাষার দূষিত নদী মানব ভাষাসমগ্রের সমুদ্রে পড়ে কী অবদান রাখছে তার স্রোত আর চরিত্র গঠনে, কে জানে। এই দূষিত নদীকে সেই ভাষা সমগ্রসমুদ্র খুব সমীহের চোখে দেখবে, তা বলা যাবে না। তবে সান্ত্বনা-যদি তাকে সান্ত্বনা হিসেবে নেন বাংলা ভাষার সামপ্রতিক রূপবদলের প্রবল সমর্থকেরা-হলো এই যে এ রকম দূষণে পড়েছে এই উপমহাদেশের অন্য কটি ভাষাও।
বাংলা ভাষা এখন প্রতিদিনের চর্চায় কী দাঁড়িয়েছে, তার কিছু উদাহরণ, ওই ভাষার মাসের শুরুতে নানা মাধ্যম ও জায়গায় আমার শোনার অভিজ্ঞতা থেকে তুলে ধরছি। এই উদাহরণগুলো শুদ্ধবাদ ও যা হবে-তা-হবে বাদের মধ্যে বিতর্কটা আরেকবার হয়তো মনে করিয়ে দেবে। কিন্তু এভাবেই যদি বাংলা ভাষা এগোয়, নদীর মতো অবধারিতভাবে, তা হলে বাংলা ভাষার আরেকটা নাম আমাদের তৈরি করে নিতে হবে। এর নাম আমরা বাংহিংলিশ বা এ রকম কিছু দিতে পারে, যেহেতু বাংহিংলিশে বাংলা, ইংরেজি ও হিন্দির একটা চমৎকার সহঅবস্থান রয়েছে। এতে সুবিধা হবে, শুধু ফেব্রুয়ারি মাসটা এলে আমরা বাংলা ভাষা নিয়ে ভাবব, বাকি নয় মাস বাংহিংলিশের সেবায় নিয়োজিত থাকব।
এ বিষয়ে আমাদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। ভাষার প্রতি ভালোবাসা জাগানোর মধ্যে রয়েছে আমাদের ভাষাচর্চার ভবিষ্যৎ।

x