বাংলা বর্ণমালা সংস্কার বিষয়ক প্রস্তাবনা

জ্যোতির্ময় নন্দী

মঙ্গলবার , ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৪:৩৮ পূর্বাহ্ণ
116

বাংলা ভাষা লিখতে গিয়ে সাধারণ বাঙালির যে পরিমাণ ভুল হয়, তেমনটা অন্য কোনো ভাষায় হয় কি না জানি না। আমি নিজে হিন্দি, ইংরেজি প্রভৃতি যে, দু’একটা ভাষা জানি, তাতে ওই ভাষাভাষীদের দরখাস্ত, চিঠিপত্র প্রভৃতিতে বাংলার মতো অত ভুল চোখে পড়ে না। রাস্তা দিয়ে চলাচলের সময় দুপাশে বিভিন্ন দোকানপাট, প্রতিষ্ঠান প্রভৃতির সাইনবোর্ডের দিকে তাকালে দেখা যায়, তাতে বাংলা লেখাগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশই ভুল। অথচ বিদেশি ভাষা ইংরেজির ভুল সে তুলনায় যৎসামান্য, এই ধরুন ২০-২৫ শতাংশ!
বাংলা লিখতে গিয়ে এত বেশি ভুলের জন্য যে বিষয়টা আমার বেশি দায়ী মনে হয়েছে তা হলো, বাংলা শব্দের উচ্চারণের সঙ্গে তার বানানের অসংগতি। আমরা মুখে উচ্চারণ করি ‘খতি’, অথচ বানান লিখতে হয় ‘ক্ষতি’, উচ্চারণ করি ‘ব্রাম্মন’, কিন্তু বানান লিখতে হয় ‘ব্রাহ্মণ’। সাধারণভাবে বাঙালির উচ্চারণে হ্রস্ব-দীর্ঘ নেই, অথচ বর্ণমালায় আছে, যেগুলো বাংলা শব্দের বানান লেখার সময় অহেতুক বিঘ্ন সৃষ্টি করা ছাড়া আর কিছুই করে বলে মনে হয় না। বাঙালির উচ্চারণে শুধু ‘ন’-ই আছে, কিন্তু বর্ণমালায় একটা ‘ণ’-ও জায়গাজুড়ে বসে আছে। অনুরূপভাবে, বাঙালি জিহ্বায় শুধু ‘শ’-ই উচ্চারিত হয়, তবে সেই সঙ্গে কিছু যুক্তাক্ষরে বা বিদেশি শব্দে ‘স’-ও উচ্চারিত হয়, যেমন- ‘স্নান’ বা ‘স্থান’-এ, ‘ইসলাম’, ‘মুসলমান’, ‘সালাম’, ‘সস’, ‘সিরাপ’ জাতীয় শব্দগুলোতে। সুতরাং, বাংলা বর্ণমালায় ‘শ’ ও ‘স’ রাখলেই চলে যেত, কিন্তু সেই সঙ্গে বাড়তি একটা ‘ষ’ রাখা হয়েছে যেন শুধু বাংলা বানান ভুল করে দেওয়ার জন্যই।
বাংলা স্বরবর্ণের অকেজো ‘ঌ’ বর্ণটি আগেই বাদ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু রেখে দেওয়া হয়েছে তার ঠিক আগেকার ‘ঋ’ বর্ণটি। ‘ঋ’ বর্ণটির প্রকৃত উচ্চারণ পর্যন্ত অধিকাংশ বাঙালি জানে না। তারা এটাকে ‘রি’ হিসেবেই যেহেতু উচ্চারণ করে, তাই উচ্চারণানুসারী বানান রীতিতে ‘ঋ’-এর কাজটা ‘র’ দিয়ে অনায়াসেই সারা যায়। যেমন ‘ঋতু’ না-লিখে ‘রিতু’, ‘বৃষ’ না-লিখে ‘ব্রিষ’ ইত্যাদি।
যৌগিক স্বরবর্ণ ‘ঐ’ এবং ‘ঔ’-কেও বর্ণমালা থেকে বাদ দিয়ে, তাদের বদলে ‘ওই’ এবং ‘ওউ’ ব্যবহার করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে ‘ঐক্য’ হয়ে যাবে ‘ওইক্য’, এবং ‘ঔষধ’ হবে ‘ওউষধ’। এতে নিশ্চয় ঐক্যের দৃঢ়তা বা ওষুধের গুণের কোনো ঘাটতি হবে না।
অন্যদিকে, বাংলা ব্যঞ্জনবর্ণে শুধু বর্গীয়-ব রেখে অন্তস্থ-ব বাদ দেওয়া হয়েছে, বর্ণমালায় দুটি ‘ব’ হয়ে যাচ্ছে, এ যুক্তিতে। কিন্তু অনেক বাংলা যুক্তাক্ষরে এই অন্তস্থ-ব ঠিকই থেকে গেছে, যেমন ‘দ্বার’, ‘স্বর’, ‘ত্বক’ প্রভৃতি শব্দে। অথচ বাংলায় উচ্চারণের সময় এই অন্তস্থ-ব উচ্চারিত হয় না, যেমনটা হয় সংস্কৃতে বা হিন্দিতে। তো, উচ্চারিতই যদি না-হয়, তা হলে সংস্কৃতের লেজুড়বৃত্তি করে আধুনিক বাংলায় উল্লিখিত শব্দগুলোতে ওই ‘ব’টা রেখে লাভ কী। ‘দ্বার’, স্বর’, ‘ত্বক’ না লিখে ‘দার’, ‘সর’, ‘তক’ লিখলে তেমন কোনো ‘খতি’ (ক্ষতি) হবে বলে তো মনে হয় না।
অনেকে যুক্তি দেখাবেন, এভাবে লিখলে অনেক সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দের সঙ্গে অর্থবিভ্রম ঘটবে। এর জবাবে বলব, এতে প্রথম প্রথম একটু কেমন কেমন ঠেকলেও, পরে সব সড়গড় হয়ে যাবে। তাছাড়া বাক্যে শব্দটির প্রয়োগ দেখেও তার সঠিক অর্থ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। যেমন ‘ঠাণ্ডায় তোমার গলার সর ভেঙে গেছে’ বললে, সেটা যে ‘দুধের সর’-এর কথা বলা হচ্ছে না সেটা সবাই ঠিক বুঝতে পারবে। এমনিতেও তো অনেক সমবানানের ভিন্নার্থক শব্দ বাংলায় ব্যবহৃত হয়, বাক্যে যেগুলোর ব্যবহার দেখে আমরা সঠিক অর্থ আঁচ করে নিই, যেমন ‘চাল’ (চাউল, ঘরের ছাউনি, চলনভঙ্গি), কাল (একটা রঙ, সময়) ইত্যাদি। মোটা চালের ভাত খেয়ে ঘরামি যখন চাল ছাইতে ওঠে, তখন আমরা বুঝে নিই, কোন‌ চালের চাল কেমন।
বাংলা ব্যঞ্জনবর্ণে ‘ঞ’ শব্দটিও বাহুল্যমাত্র। যুক্তাক্ষর ছাড়া এর ব্যবহার নেই বললেই চলে। ‘ঞ্জ’ যুক্তাক্ষরের বদলে ‘ন্‌‌+জ’ অনায়াসে ব্যবহার করা যায়, যেমন- ‘রঞ্জন’ না-লিখে, লেখা যায় ‘রন্‌‌জন’। অন্যদিকে, ‘জ্ঞ’র বদলে উচ্চারণানুগ ‘গ্যঁ’ ব্যবহার করা চলে, যেমন- ‘জ্ঞান’-এর বদলে ‘গ্যাঁন’।
‘ঙ’ ও ‘ং’-এর মধ্যে প্রথমোক্তটি রাখাই বাঞ্ছনীয়। ‘ৎ’ বর্ণটিকে সম্পূর্ণ বর্জন করা যেতে পারে।
বিশেষ দুটি যুক্তাক্ষর ‘ক্ষ’ ও ‘হ্ম’ সম্পূর্ণ বর্জনযোগ্য। ক্ষ-এর বদলে ‘খ’ এবং ‘হ্ম’-এর পরিবর্তে ‘ম্ম’ অনায়াসে ব্যবহার করা যাবে। ‘ক্ষ’-এর বদলে ‘খ’ ইতোমধ্যেই অনেক বাংলা শব্দে ব্যবহৃত হয়, যেমন ‘খুদ’ (ক্ষুদ), ‘খুদিরাম’ (ক্ষুদিরাম), ‘খেত’ (ক্ষেত)। একইভাবে ‘খুদ্র’ (ক্ষুদ্র), ‘খত’ (ক্ষত) প্রভৃতি লিখলে, গোড়ার দিকে একটু অসুবিধে ঠেকলেও পরে ঠিক সয়ে যাবে। আর ‘হ্ম’ বর্ণটির ব্যবহার তো বাংলা ভাষায় নিতান্ত সীমিত। এ অক্ষরটি সংবলিত বাংলা শব্দগুলোতে ওটার স্থলে ‘ম্ম’ ব্যবহার করা যেতে পারে। বাংলা উচ্চারণরীতি মেনে আমরা ‘ব্রহ্ম’-কে ‘ব্রম্ম’, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া’-কে ‘ব্রাম্মণবাড়িয়া’, ‘সুহ্ম’-কে ‘সুম্ম’ লিখতে পারি।
বাংলায় কিছু বাড়তি বর্ণ আছে, আবার প্রয়োজনীয় কিছু বর্ণ নেইও বটে, যার ফলে বিদেশি বা বাংলা আঞ্চলিক শব্দের কোনো কোনো বর্ণের প্রতিবর্ণীকরণে অসুবিধের সৃষ্টি হয়। এ ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে মনে পড়ছে ইংরেজি ‘ু’ বর্ণটির বাংলা প্রতিবর্ণের অভাবের কথা। বাংলায় বহুল প্রচলিত অনেক ইংরেজি, আরবি, ফার্সি, এবং সেই সঙ্গে অনেক আঞ্চলিক বাংলা শব্দেও, প্রয়োজন হয় এই বর্ণটি। অনেকে, বিশেষ করে মাদ্রাসা-শিক্ষিতরা, এখানে ‘য’ ব্যবহার করে, যেটা বর্তমান বাংলা বানান ব্যবস্থায় একটা বিরাট ভুল হিসেবেই শুধু গণ্য হতে পারে। কারণ, বর্তমান বাংলা ব্যাকরণে ‘য’-এর যে উচ্চারণ নির্ধারিত আছে, তাতে এই বর্ণটি ‘ু’-এর প্রতিবর্ণ হিসেবে কিছুতেই ব্যবহৃত হতে পারে না। তবে বাংলা বর্ণমালা সংস্কার করে ‘জ’-কে ‘ল’-এর, এবং ‘য’-কে শুধু ‘ু’-এর প্রতিবর্ণ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে, ‘যাওয়া’ বা ‘যাত্রা’ বানানকে ‘জাওয়া’ ও ‘জাত্রা’ হিসেবে লিখতে হবে। অন্যদিকে, ‘জেব্রা’ বানানটি লিখতে হবে ‘যেব্রা’ হিসেবে। তখন অবশ্য ‘জ’-কে বর্গীয়-জ না বলে শুধু ‘জ’, এবং ‘য’-কে ‘অন্তস্থ-জ’ না-বলে ‘ু’-এর অনুরূপ রুঢ়-জ হিসেবে বলতে হবে। অথবা, ‘য’ বর্ণটি পুরোপুরি বাদ দিয়ে ‘ল’ উচ্চারণের জন্যে ‘জ’ এবং ‘ু’ উচ্চারণের জন্য ফুটকিযুক্ত ‘জ’ ব্যবহারই সর্বোত্তম হবে বলে মনে হয়।
নতুন এই বানানরীতি প্রথম প্রথম হাস্যকর বা অদ্ভুত মনে হতে পারে, কিন্তু এতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার পর বাংলা বানান অনেক বেশি উচ্চারণানুসারী হয়ে আসবে, এবং ভুলের মাত্রা লক্ষণীয়ভাবে কমে যাবে বলে মনে হয়।
সংস্কৃত ও অন্যান্য ভাষা থেকে বাংলায় আসা বহু শব্দের উচ্চারণ যুগে যুগে মুখে মুখে পরিবর্তিত হয়ে বর্তমান রূপ ধারণ করেছে। ‘চক্ষু’ বা ‘অক্ষি’ যখন বাংলা উচ্চারণে ‘চক্‌খু’ ও ‘অক্‌‌খি’ হয়েই গেছে, তখন তাদের বানান এখনো পুরনো সংস্কৃত নিয়মে রেখে ফায়দা কী?
যেসব সংস্কৃত শব্দে ‘রেফ’-এর পর ব্যঞ্জনবর্ণ আছে, যেমন ‘ধর্ম’, ‘সর্ব’, ‘পূর্ব’ প্রভৃতি, সেগুলো রূপান্তরিত হয়ে পালি-প্রাকৃতে ‘ধম্ম’, ‘সব্ব’, ‘পূব্ব’ হয়ে যায়। ঊনবিংশ শতকে বাংলা গদ্যের জন্মের সময় মৃত্যুঞ্জয় তর্কালঙ্কার, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রভৃতির হাতে পুনরায় শব্দগুলোর সংস্কৃতায়নে সেগুলোর মাথায় ‘রেফ’ চাপিয়ে দেওয়া হয় বটে, কিন্তু পালি-প্রাকৃতের পথ ঘুরে আসার চিহ্ন হিসেবে ব্যঞ্জনবর্ণের দ্বিত্বটাও থেকে গিয়ে সেগুলোর নতুন চেহারা দাঁড়ায় ‘ধর্ম্ম’, ‘সর্ব্ব’, ‘পূর্ব্ব’ ইত্যাদিতে। এখন আবার সেগুলোর বানান সংস্কার করে মূল সংস্কৃত চেহারায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
কাজেই বলা চলে, যুক্তিসংগতভাবে নতুন কিছু চালু করলে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঠিকই চলে যায়। আমাদের বর্ণমালা এখনো একান্তভাবে সংস্কৃত বা দেবনাগরী বর্ণমালার অনুসারী। আমাদের ব্যাকরণ অর্ধেক সংস্কৃত ব্যাকরণ (কারক, সন্ধি, সমাস, প্রত্যয়, ণ-ত্ব বিধান, ষ-ত্ব বিধান প্রভৃতি অংশ) এবং বাকি অর্ধেক ইংরেজি ব্যাকরণ (পদ, পদাশ্রিত নির্দেশক, বাচ্য, উক্তি প্রভৃতি অংশ)-এর অনুকরণে রচিত। এই লেজুড়বৃত্তি পরিহার করে একটা যথার্থ বাংলা বর্ণমালা ও বাংলা ব্যাকরণ রচনার সময় আসলে অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে।
কিন্তু আমাদের বরেণ্য ভাষাবিদ পণ্ডিতরা, সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, একাডেমি প্রভৃতির শিক্ষক, গবেষক ও অন্যান্য কর্তাব্যক্তিরা কেউ এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটা করে উঠতে পারেননি, না পূর্ববঙ্গে, না পশ্চিমবঙ্গে; ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসকরা বিদায় নেওয়ার ৬৮ বছর এবং স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ৪৪ বছর পরেও। কৃত্তিবাসী রামায়ণের লঙ্কাকাণ্ডে এক জায়গায় আছে, লঙ্কায় অশোককাননে বন্দিনী সীতার খবর নিতে যাওয়ার জন্য রাম যখন তার বানর বাহিনীর বীরদের অনুরোধ করছিলেন, তখন ‘বড় বড় বানরের বড় বড় পেট,/লঙ্কায় যেতে বানর মাথা করে হেঁট’, আমাদেরও এখন যেন সেই দশাই হয়েছে!
প্রসঙ্গটি নিয়ে আরও দীর্ঘ, ব্যাপক, অনুপুঙ্খ আলোচনার অবকাশ আছে নিশ্চয়। তবে এখানে বিশেষজ্ঞ হিসেবে নয়, বাংলা ভাষার একজন পুরনো মজুর হিসেবে আপন অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলা বর্ণমালার নিম্নরূপ সংস্কারের প্রস্তাব করছি-
স্বরবর্ণ : অ, আ, ই, উ, এ, ও।
ব্যঞ্জনবর্ণ : ক, খ, গ, ঘ, ঙ; চ, ছ, জ, য (অথবা জ), ঝ; ট, ঠ, ড, ঢ; ত, থ, দ, ধ, ন; প, ফ, ব, ভ, ম; র, ল, শ, স, হ, ড়, ঢ়, য়, ং, ঃ, ঁ।

x