বাংলার গ্রামীণ বর্গ ও বাঙালিয়ানার সবুজ-করুণ উপাখ্যান

শিল্পী মনসুর উল করিমের চিত্রকর্ম

শিবলু শফি

শুক্রবার , ১৭ মে, ২০১৯ at ৭:৩৬ পূর্বাহ্ণ
47


একটা বিশেষ ও চেনা চিত্র লাইনের গতি ও ভাবের ঐশ্বর্যকে অভিজ্ঞতার বহুমাত্রিক জল দিয়ে টইটুম্বর করে তুলেছেন শিল্পী মনসুর উল করীম। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের শিল্পচর্চার সুবিশাল এক যাত্রাপথ, কম সময় নয় কিন্তু এখানে আমরা দেখেছি কতো উত্থান-পতনের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতি ও নেতির পরিব্রাজন। শিল্পীর জীবন ও শিল্পচর্চার ধারাবাহিকতা অনেকটা একই সূত্রে প্রোথিত কিংবা প্রবাহিত। অতীতচারিতা আর গ্রামীন জাতীয়তা বোধের বহু তৈর্থিক তুলির স্ট্রোক ও মননবোধ প্রায় একই মাপঝোঁক আর রৈখিকতার তাল কিংবা গতির ছন্দে মেপে চলেছেন বাংলার নদী উপকূলের গ্রামীন চিরচেনা সেই ক্ষয়িষ্ণু মধ্য ও নিম্ন বিত্তের অন্ত ও বহি:জগৎ।
রঙ ও রেখার ভাঙ্গন -পাল্টা যোজন, রঙের মূর্চ্ছনা, রঙরেখার গতি কিংবা রঙরেখার যৌথ কলোনিয়্যাল ইল্যুশন বিভ্রমের পথ ধরেই শিল্পী মনসুর উল করীমের শিল্পপ্লটে ম্রিয়মান গ্রাম প্রলেতারিয়েৎ অনুভূগোল দানাবেঁধে উঠেছে। যেন এক কসমোপলিটন ফিকশনের ভেতর জেগে রয়েছে – বাংলার মেঠো ও নদী পাড়ের জনপদের বাঁক প্রতিবাকের ক্ষয়িষ্ণু গ্রামীণ বর্গ।

তবে অনেক শিল্পকর্মে পুনরারোপন রূপকল্পেই যুথবদ্ধ; চেনা রেখা,স্ট্রোকের নাইভ’ অভিজ্ঞতার আঁচড়। কী আঙ্গিকতায়, কী বিষয়ভাষায় কিংবা কী মৌলিকত্বে প্রশ্নবিদ্ধ হলেও সংবেদনশীল আর নষ্টালজিয়্যাল অনুবোধ নিয়ে ছড়ানো ছিটানো রঙ ও রেখার এক অনবদ্য সাঙ্গীতিক অভিজ্ঞতার ধারাবাহিক প্রামাণ্যচিত্র দৃশ্যপটে-কোর এক্সপ্লেনেশন্যাল’ হয়ে উঠতে দেখা যায়। এছাড়া ইল্যুশন আর বিমূর্তায়নের হাত ধরাধরিতে ক্যানভাসের দৃশ্যপটে নাটকীয় অভিরমণও ঘটায় বৈকি। চেনা রঙরেখায়, চেনা ফর্মে’র কৈশোরিক স্মৃতি-সংহতি নিয়েই নদীমাতৃক আর পদ্মার উপকূল ও জনপদের বিবর্ণ, ইঙ্গিতী মনশ্চিত্রে; – স্ট্রোক কিংবা পাল্টা স্ট্রোকের নন্দন ক্রিড়ায়, প্যারালাল শিল্পীজ অনুরনণ ও অভিজ্ঞতায় ফ্রেমবদ্ধ হয়ে উঠে।

প্রায় একই মাত্রার রূপ-রস-রেখার আলোড়ন নিয়েই সাঙ্গীতিক প্যারানয়্যেড’ যেন কিছু নির্দিষ্ট বিষয় ও ভাষার নির্জীব কক্ষপথেই আবর্তন ঘটে চলেছে । শিল্পীর ক্যানভাস-পট প্রায় পাঁচ দশকের সেই কৃষি নির্ভর গ্রামীণ প্রকৃতি ও মানুষের সিম্বলিক সিনারিও’র বাইরে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক ডামাঢোলেরে নানামুখী সামাজিক অস্থিরতাগুলোকে পাশ কাটিয়ে কিংবা রেঁনেসা ও রেঁনেসা-উত্তর বিশ্ব শিল্পকলাকে ধাঁধাচ্ছন্ন অন্তর্বেশ সৃষ্টিকারী কিছু বিশ্ব-বরেণ্য শিল্পীর ; বিমূর্ত নন্দনকলার সেই কলোনিয়্যালাইজড এ্যবেস্ট্রেক্ট ইম্প্রেশনিজমে’র প্রভাব বলয়ের বাইরে পা বাড়াতে সচেষ্ট হননি। এমনকি শিল্পীবোধ ও চেতনশক্তির অধিকাংশই ভাবনাপট জুড়েই নদী-মাতৃক গ্রামীণ প্রকৃতি ও জনপদের এক বিমূর্ত আর অতীতচারীতার সংবেদনে মোড়া তথ্যচিত্র। গোটা পাঁচ দশক জুড়েই শিল্পী মনসুর উল করিম অনেকটা একাই ভ্রমণ করছেন ঐ চিরচেনা এক শ্বাশত ক্যানভাস জুড়ে ; সেখানে ঠাঁই হয়নি শিল্পের অন্যান্য নতুন মত- পথ কিংবা আলোকরশ্মি, এমনকি ডি-কলোনাইজড আইডিয়া’, যুগাস্থিরতা, নবীন ফর্ম কিংবা কসমোপলিটন বহুমাত্রিকতার কোনো রোমান্থন’ও মেলেনা কিংবা পাশ কেটে গেছেন সজ্ঞানে অথবা নির্জ্ঞানে। পাশ্চাত্যের রেঁনেসা ও রেঁনেসা পরবর্তী কিছু আলোড়িত শিল্পইজম, শিল্পভাবনা ও চিন্তার বহুমাত্রিক সংক্রমনে প্রলুব্ধ ছিলেন শিল্পী। মাতিস,পিকাসো, ঢালী, রেমব্রান্ট , মার্ক শাগালের মতো ক্যানভাস জগৎ কাঁপানো শিল্পীদের বিষয় ও ভাবনার চিত্রজগতের প্রভাব ও বৈভবের আদলেই গড়ে উঠেছে মনসুর উল করিমের চিত্র বনাম শিল্পী অধিজগৎ। বাংলাদেশের শিল্পকলা চর্চার স্বাধীনতা-উত্তর বলয়ে শিল্পী এস এম কিবরিয়ার পরবর্তীতে মধ্য ও নিম্নবিত্তের নদী ও কৃষি নির্ভর গ্রাম জনপদের জীবন বৈভব ও ঐশ্বর্য-ক্ষয়-পতন কিংবা টিকে থাকার সংগ্রাম আর সংবেদনশীল গল্পাভাষ এই পর্যন্তও সবচেয়ে নিরঙ্কুশভাবে শিল্পী মনসুর উল করিমের চিত্রপ্লটে সদা জাগরুক রয়েছে। সবদিক দিয়ে মনসুর উল করিমকে তাই ঐ প্রজন্মের শেষ উত্তরসুরীও ধরে নেয়া যেতে পারে। অন্যদিকে বাংলার শ্বাশত লোক কিংবা মরমীয়া ফর্ম’ও শিল্পীর চিত্র-ভাবনায় বা আঙ্গিকের রূপকল্পেও নোঙ্গর ফেলেনি। এছাড়া ট্রান্সফর্মেশন বা রূপান্তরের মতো কন্টেম্পোরারী’ শিল্প অভিঘাতগুলো স্পর্শ কিংবা নিরীক্ষার স্বাদ না নিয়েই মনোটোন্যাল ও ক্ষয়িষ্ণু গ্রাম জনপটচিত্রকে এ্যাভারেজ’ ধারণ করে নিতে ব্যস্ত ছিলো শিল্পী মনসুর উল করিমের চিত্র-প্লট।
আবার শিল্পী মনসুর উল করিমের একাডেমিক ভিত্তির দিকে তাকালে সাক্ষাৎ পাই নব্য-কলোনিয়্যাল কিছু এ্যানলাইটেন্ট মিডলক্লাস’ বা বিদেশ (পশ্চিম) ফেরৎ আলোকিত মধ্যবিত্ত শিল্প বুদ্ধিজীবীর। ৭০’ দশকের শুরু থেকেই শিল্পী রশিদ চৌধুরী ও শিল্পী মর্তুজা বশীরসহ অন্যান্য কয়েক জন মিলে চট্টগ্রামে একাডেমিক শিল্প চর্চার সূত্রপাত ঘটে। বাংলাদেশে শিল্পচর্চার ইতিহাসগত দিক থেকে অন্তত ঘটনাটি খুবই দৃষ্টান্তবহুল । কলোনিয়্যাল বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এরা যে বিষয়টি উন্মুক্ত করেছিলেন সেটা হলো শিল্পের প্রথাগত জগৎ থেকে বেরিয়ে বহুমাত্রিকতাকে Sharing Human-Experience with time, Received করার প্রবণতা জাগ্রত রাখার পাশাপাশি ব্যক্তি ও ভৌগলিক কিংবা প্রাকৃতিক মনন ও জ্ঞানের আত্ম-পরিচিতির ডিসকোর্স’ তুলে ধরা। ১৯৭৩ সালে ফ্রান্স ফেরৎ বাংলাদেশে “টেপেস্ট্রি” শিল্পের পাইওনিয়ার শিল্পী রশিদ চৌধুরীর হাত ধরেই মূলত চট্টগ্রামে একাডেমিক শিক্ষার দ্বার উন্মোচন হয়। শুধু তাই নয়, প্রথম “পেইন্টার্স গ্রুপ” নামে একটি সংগঠন সেই সময়ে চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলার কলাভবনে দেশ বরণ্য শিল্পীদের নিয়ে বড়ো একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করে। শিল্পী মনসুর উল করিমের ভাষ্য মতে – চট্টগ্রামে প্রথম জাতীয় প্রায় সব শিল্পীদের শিল্পকর্ম দিয়ে আয়োজিত হয়েছিল এ প্রদর্শনী । প্রায় কাছাকাছি সময়ে ইটালি ফেরৎ ইটালিয়ান ক্ল্যাসিক্যাল ঘরানার শিল্পী মর্তুজা বশীর অন্যদিকে কাজী আবদুল বাসেতের মতো গুণী শিল্পীদের হাত ধরেই শিল্পী মনসুর উল করিমদের প্রথম ব্যাচ যাত্রারম্ভ করে। এখানে শিল্পী হাসি চক্রবর্তী, দেবদাস চক্রবর্তী, চন্দ্রশেখর বিশ্বাস প্রমুখদের মতো নামকরা শিল্পীরাও যার যার প্রতিভায় ভাস্বর হয়ে উঠেছিলেন। তবে শিল্পী চন্দ্রশেখর মোটামুটিভাবে এই সমসাময়িক পরিসরে সবচেয়ে এ্যাক্সট্রা-ক্যালিবার’’ ও মাল্টি-টেলেন্টেড শিল্পী হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। কেউ কেউ’তো এ পর্যায়ে শিল্পী চন্দ্রশেখর’কে সবচেয়ে প্রতিনিধিত্বমূলক পথ প্রদর্শক হিসেবেও চিহ্নিত করতে চান । তবে এখানে কেউ কারো ফলোয়ার’ নয় অনেকাংশেই যার যার মতোই মোটামুটি বেড়ে উঠেছিলেন। অবশ্য এ ধারায় শিল্পী মনসুর উল করিমের শিল্প তীর্থ একটু ভিন্ন দিকে নোঙ্গর করে । শিল্পী রশিদ চৌধুরীকে ফলো’ করতে গিয়ে তিনি রশিদ চৌধুরীর মূল শিল্পপ্রভা থেকে অনেকখানিই বর্গচ্যুত হয়ে পড়েছিলেন কী? স্পষ্টতই পশ্চিমী রেখা, রঙ ও স্ট্রোকের বিমূর্ত স্পর্শে পদ্মা উপকূলের জনপদে কৃষি-ক্ষয়িষ্ণুদের টিকে থাকার শ্বাশত সমাজচিত্র প্রায় একই মাত্রার মনোটোনাস ফ্রেমেই এঁকে গেছেন দীর্ঘদিন ধরে । শিল্পীর এ প্রখর মাটির কাছাকাছি ধানসিঁড়ির প্রথাবাহী বাঙালীয়ানা বিশেষ এক বর্গ অধ্যুষিত হয়ে পড়লেও রোমাঞ্চ ও সাঙ্গীতীকতায় টইটুম্বর মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। যেটি বাংলাদেশের সমসাময়িক অস্থির রাজনীতি আর চলমান সমাজবাস্তবতার প্রেক্ষাপট ও বহুমাত্রিকতার সাথে তাল মেলাতে নাপারা আরেক ক্ষয়িষ্ণু-পর্ব। অদ্ভুত ঋজুতায় দূরত্ব তৈরি করে নিয়েছেন শিল্পী, নিজস্বতার অন্তর্কাঠামোয় গড়া এ শিল্পবলয়ে।
ঐএকই সময়মঞ্চে চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক আলাদা মাত্রার শিল্পভাষা ও বয়ানের দিগ-বীজ অঙ্কুরিত হয়ে উঠতে শুরু করে। রেঁনেসা ও রেঁনেসা পরবর্তী পেইন্টিংসের শিল্প অভিঘাতগুলো যেমন শিল্পীদের মনোজগতে আলোড়ন তুলেছিল তেমনি রশিদ চৌধুরী মর্তুজা বশীর প্রমুখদের দেখানো পথ ধরেই এক নৈসর্গীক ও পরিমিত ব্যক্তি স্বাতন্ত্রিক বলয়ে শিল্প অধ্যাস বুনতে সচেষ্ট হয়েছেন। যে রেখা, রঙ ও স্ট্রোকের বিমূর্তনন ক্রিয়ায় এতো বছরের একটি শিল্প ইতিহাস ভ্রমণ একই প্যারালাল রেখায় ধাবমান – ইটালিয়্যান ক্লাসিক্যাল মর্তুজা বশীর আবার কম্পোজিশন, রঙ রেখা কোনোদিকেই মিল ছিলনা সমসাময়িক রশীদ চৌধুরীর বা অন্যান্যের সাথে। তবে আমেরিকান ও নব্য পশ্চিমী শিল্প চিন্তা ও মতবাদগুলো বিশেষ করে ডুশাম্প ইফেক্ট’ পরবর্তী এদের মৌলিক শিল্প চিন্তন ও ভাবনা কিংবা তাদের শিল্পী সংবেদনের উপর অতিমাত্রায় প্রভাব সৃষ্টি করলেও এদের মধ্যে মাত্র কয়েকজনই নিজস্ব শিল্পী আইডেন্টিটি নিয়ে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন। অবশ্য মনসুর উল করিমের চিত্রকর্ম এই বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য বা এড়িয়ে কলোনিয়্যাল অবসেশনে’ই স্থিত হয়েছিলেন।
শিল্পের অর্গানিক ফর্ম’ কিংবা অকৃত্রিম অবয়ব নানান মাত্রায় প্রতিফলিত। অর্গানিক ফর্ম বলতে মূলত উপকূলীয় জনপদের কৃষি ও গ্রামীণ নিসর্গলগ্ন শ্রেণির মূল ল্যান্ডের সকল অধিবাসীদের অবয়বিক ধরন, রেখার বিন্যাস ও গতির শ্বাশত ঝলক। অর্থাৎ স্ট্রোক বা রেখার টোন ও সাইকি’টাই গভীর বাঙালিয়ানার শিল্প-নির্যাসে ভরপুর। এটি শিল্পী মনসুর উল করিমের চিত্র-বিন্যাস ধারায় সবচেয়ে সংবেদনশীল ও উচ্চকিততম পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে । অন্যদিকে “পিরামিডিক্যাল ফর্ম” নিয়ে নিরীক্ষা হলেও বিষয় ও ভাষায় গ্রামীণ নিম্ন ও মধ্যবিত্তের টিপিক্যাল সাইকি’- মনো-ভূগোল আর শৈশব কৈশোর অতীতচারীতার দ্বৈরথ লিপিবদ্ধ হয়ে চলেছে। ইন্টার আর মাল্টি-ডিসিপ্লিনারী শিল্প-ব্যাপ্তীর এক ধাঁধাচ্ছন্ন ও উন্মুক্ত কসমোপলিটন জগৎ তাদের সম্মুখে। রেঁনেসা উত্তর সেই নব্য শিল্প প্রভার কারিগরী দ্যুতি , অভিঘাতী আর গ্রামীণ উপকূল ও জনপদের বিমূর্ত আলেখ্য এ দু’য়ের মধ্যে থেকে শিল্পী মনসুর উল করীম তার নষ্টালজিয়্যাল নর্ম’ শিশুসুলভ অস্থির সারল্যে নিজস্বতার বয়ান মেলে ধরতেই অভ্যস্ত।
গত প্রায় দু’মাসে আঁকা ২০টির মতো ছোট বড় ফরমায়েশি চিত্র নিয়ে “মেঠো পথের গান” বা The Cosmic Tune শিরোনামে প্রদর্শনীর আয়োজন করে চট্টগ্রামের নব্য প্রতিষ্ঠিত “চিত্রভাষা” গ্যালারি। ৫০’টিরও অধিক সফল প্রদর্শনীর সুদীর্ঘ যাত্রাপথে ফরিদপুরের রাজবাড়ির এ গুণী শিল্পী ইতিমধ্যে একুশে পদকসহ নানান সম্মানও জনক পদকে ভুষিত হয়েছেন । দেশ বিদেশের নানান মিউজিয়্যাম ও শিল্প প্রতিষ্ঠানে এ শিল্পীর শিল্পকর্ম সংগ্রহের নজিরও আছে। Eternal Expression এর আদিম ছোঁয়ায় কালার’, টেক্সার ও প্রতীকীবাদের যৌথতায় মনসুর উল করিমের এবারকার প্রদর্শনীর চিত্র-কাহনে এসেছে শিল্পীর জাতিতাত্ত্বিক আত্মপরিচিতির নিউক্লিক’ বয়ান। গাঢ়, উজ্জ্বল মৌলিক রঙের অনুধ্যানে বিমূর্তের সেই চেনা চরাচরে এঁকে গেছেন নিজেরই জীবন চক্রের গভীরতর অনুসন্ধান। যথারীতি পাহাড়, নদী, নারী ও সামাজিক বিক্ষিপ্ততার অস্থির চালচিত্রের সাথে জুড়েছে অভিজ্ঞতা ও অভ্যস্ততার নন্দনবীক্ষণ । প্রকৃতির অনিঃশেষ গ্রামীণ নৈসর্গের ছড়ানো ছিটানো যুথবদ্ধ এ জীবন-বর্গ ধ্যানে কিংবা জাগরনে বাঙালিয়ানার কোর’ বৈভবকেই প্রতিনিধিত্ব করে চলেছে যথারীতি। খানিকটা টিপিক্যাল’ ও গ্রাম-পুরান বাঙালিয়ানায় মোড়া এ যাদু-বাস্তব বৈভবকে শিল্পী মনসুর উল করিম ৫’ দশকের অভিজ্ঞতার দীর্ঘ বিজারনে তথা শিল্পের ‘ঐ নূতনের কেতন উড়ে’ ধারার নতুন প্রজন্মের বহুমাত্রিক কলা-বিক্রিয়ার সাথে আদান-প্রদান কিংবা ডানা মেলা ভাব বিনিময়ে অদ্ভুভাবে অনভ্যস্ত।
শিল্পীর এটি কততম প্রদর্শনী সেটি উল্লখ না থাকলেও এটি “চিত্রভাষা গ্যালারি”র সবেমাত্র তৃতীয় আয়োজন। আলোকচিত্র শিল্পী মইনুল ভাইয়ের ‘চিত্রভাষা’ গ্যালারি পরিসরে একটু ছোট হলেও খোলা মেলা বারান্দা ও নান্দনিক সাজসজ্জায় গল্প আর আড্ডার সুন্দর পরিবেশ রয়েছে। চট্টগ্রামে খুলশীর রোজভ্যালি’ আবাসিকের ৬’ নম্বর রোডের লাল ইটের দালানটির ৬’তলার উন্মুক্ত ফ্ল্যাটে প্রদর্শনী কক্ষটির পরিসর ছোট হলেও নান্দনিক রুচির পরিচয় বহন করছে । যদিও দেয়ালে ফিক্স করা অন্যান্য শিল্পকর্মের উপর নতুন প্রদর্শনীর শিল্পকর্মগুলো ঝুলবার ফলে এক প্রকার “Counter Fact/ কাউন্টার ফ্যাক্ট” বা ভিজুয়্যাল নয়েজ’ তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে পেশাধারী স্বার্থে হলেও প্রদর্শনীর যথাযথ সিলেক্টিভ কিউরেটিং’সহ “ভিজ্যুয়্যাল ব্যালেন্স” কিংবা স্পেসগত ভারসাম্য’কে একবিংশ প্যারালাল বহুমাত্রিকতায় গুণগত পরিবর্তন আনার কথা আমাদেরকে ভাবতে হবে । যাই হউক, ‘চিত্রভাষা’ গ্যালারি’র উত্তরোত্তর আরো ঋদ্ধ ও বহুমাত্রিক প্রদর্শনী সফলতা কামনা করছি।

x