বাংলার গণসঙ্গীতের শিকড় সন্ধান

প্রদীপ ঘোষ

মঙ্গলবার , ৫ জুন, ২০১৮ at ৪:৩৩ পূর্বাহ্ণ
16

দিনাজপুর জেলায় এক রাজার মৃত্যুর পর ইংরেজ কোম্পানি রাজার নাবালক পুত্রের প্রতিনিধি হিসেবে দেবী সিং নামক এক ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেন। ১৭৮১ সালে সেটেলম্যান্টের সময় রংপুরের বিস্তৃর্ণ অঞ্চল দখল করে নেন এবং বিভিন্ন কর আরোপ করেন। কৃষকরা দিশেহারা হয়ে অলংকার, জমিজমা এবং সন্তানসন্ততি বিক্রি করে করের টাকা শোধ করতে বাধ্য হন। আদালতের দ্বারস্থ হয়েও গ্রামীণ কৃষকরা বিচার বঞ্চিত হতেন। এমন এক পরিস্থিতিতে বিক্ষোভ দানা বেঁধে ওঠে। এই বিক্ষোভ ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে সারা উত্তর বাংলাজুড়ে। বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে বাঁকুরা, বিষ্ণুপুর ও বীরভূমেও। প্রজারা দেবী সিংএর কিছু লেঠেলকে হত্যা করে ঘোষণা দেয় যে তারা আর খাজনা দেবে না। এ বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন ধীরাজ নারায়ণ, শিবচন্দ্র নন্দী, নুরুলুদ্দীন, ইসরাইল খাঁ প্রমুখ নেতারা। এ বিদ্রোহের কথা আমরা খুঁজে পাই রতিরাম দাসের ‘জাগের গানে’। গানটি ছিল এমন,

শিবচন্দ্র নন্দী কয় শুন প্রজাগণ

রাজার তোমরাই অন্ন, তোমরাই ধন।।

রঙ্গপুরে যাও সবে হাজার হাজার

দেবী সিং এর বাড়ি লুট, বাড়ি ভাঙ্গ তার।।

শিবচন্দ্রের হুকুমেতে সব প্রজা খ্যাপে

হাজার হাজার প্রজা ধায় এক খ্যাপে

লাঠি নিল খন্তি নিল নিল কাঁচি দাও

আপত্য করিতে আর না থাকিল কাও।। ইত্যাদি

১৮৫৫ সাল। বাংলার সর্বপ্রাচীন আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায় অরণ্যের অধিকার ভোগ করে আসছিল হাজার বছর ধরে। ইংরেজ বেনিয়ারা সে অধিকার উচ্ছেদের পাঁয়তারা শুরু করে। ১৭৮৪ সালে এর বিরুদ্ধে প্রথম রুখে দাঁড়ায় সাঁওতাল নেতা বাবা তিলকা মাঝি। ভাগলপুরের কাছে তিলকপুরের জঙ্গলে ইংরেজ সেনাবাহিনী তিলকা মাঝি ও বেশ কিছু সাঁওতালকে হত্যা করে গাছে ঝুলিয়ে রাখে। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রতিশোধের আগুন জ্বলে ওঠে সাঁওতাল আদিবাসীদের মনে। ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন সাঁওতাল পরগোনার ভাগনাডিহি গ্রামের মাঠে এক জনসভায় সাঁওতাল নেতা সিধু আর তার ভাই কানু এক সাঁওতাল স্বাধীন রাজ্যের ঘোষণা দেন। প্রায় দশ হাজার সাঁওতাল এ সভায় স্বাধীনতার কথা উচ্চারণ করে শপথ গ্রহণ করে। ঐ দিনই অত্যাচারনির্যাতনের প্রতিবাদে দশ হাজার সাঁওতাল রওনা দেন কলকাতার পথে মিছিল করে। লোককবিরা সেই কাহিনী বিবৃত করলেন তাদের গানে এভাবে

ভাই বলি তাই সভাজনের কাছে

গুভাবাবুর আদেশ পাঁয়ে সাঁওতাল ক্ষেপেছে।

আছে সব জড়ো হয়ে

আছে সব জড়ো হয়ে, পূর্ব মুখে তির মারিছে গাছে

কতশত কর্মকার সঙ্গেতে এইন্যাছে।

তীরের ফলা বানাইছে।।

এর পরে এলো সিপাহি বিদ্রোহ। আগুন সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়েছিল। এই যুদ্ধে ছড়িয়ে পড়েছলিেন পঞ্চকোটের অন্তর্গত কাশিপুরের জমিদার বা রাজা নীলমোহন সিং বা নীলমণি সিংদেও। এজন্য ইংরেজ সরকার নীলমণি সিংদেরকে আলিপুর জেলে বন্দি করে। রাঢ় অঞ্চলের ভাদু আর টুসু গানে এই ঘটনার প্রভাব। রাজা নীলমোহন বা নীলমণি সিংদেওকে বাহবা দিয়ে লোকশিল্পীরা গান বেঁধেছেন ভাদু উৎসবেণ্ড

হায় একী হইল, সিপাই পল্টন খেপিল

চারিদিকে মার মার কাট কাটযত সিপাই খেপ্যেছে

কাশিপুরের মহারাজা মহল ছাড়্যে আস্যেছে।

কাশিপুরের মহল ছিলছিল সুখের বিন্দাবন

সে মহলে ঘাস বিরালোকি কইরেছে নীলমোহন।

ভাদু গানেও যেমন,টুসু গানেও তেমনই ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছেন পুরুলিয়া,মানভূমের সাধারণ মানুষ। তারাও কাশিপুরের রাজা নীলমণি সিংদের বীরত্ব কাহিনী প্রচার করেছেন টুসু গানের মাধ্যমে।

কাশীপুরের মহারাজা ধনী নীলমহন

তুমার কাছে হার মানল রাঙামুখা পল্টন।

সিপাইরা সব লুট করল পুরুল্যার খাজাঞ্চিখানা

রাঙামুখা সাহেবগুলার হল কিগো লাঞ্ছনা।

পল্টনরা এগাই আল্য যাবেক রুনাথপুর

তুমি তাদের বাধা দিলে হুকুম দিলে করতে দূর।

প্রাণ বাঁচাতে ফিরে গেল যত সাহেব পল্টন

কাশীপুরের মুহারাজা ধন্য নীলমহন।

লক্ষণীয় বিষয় এই যে রাঢ় অঞ্চলে ভাদু বা টুসু গান সাধারণত মেয়েরাই গায়, নিজেরাই গান বাঁধে, নিজেরাই পুজো করে ভদ্রেশ্বরী আর তোষলা দেবীর। তাঁদের মনেও এই বিদ্রোহ আলোড়ন তুলেছিল। ঘরে ঘরে ভাদু বা টুসু উৎসবে গাওয়া হতো এসব লোকগান। এই মহাবিদ্রোহে সারা ভারত জেগে ওঠে। বিদ্রোহের অন্যতম নেতা নানা সাহেব,তাঁতিরা টোপি, ফৈজাবাদেও মৌলভি আহমদুল্লাহ, বিহারের জায়গিরদার কুঁয়র সিং, হরিয়ানার জায়গিরদার রাও তুলারাম, ওড়িশার সুরেন্দ্র, সাই, অসমের মণিরাম দেওয়ান ও পিয়ালি বড়ুয়া প্রমুখ। দিকে দিকে ইংরেজের বিরুদ্ধাচারণ শুরু হয়েছিল। আর এই প্রতিবাদী আচারণে বাংলার লোককবিরাও পিছিয়ে থাকেননি। মালদহের গম্ভীরা গানে দেখি এই সার্বিক জনগণের কথাচিত্রণ্ড

বুঝি ফিরিঙ্গি দল এবার ভাইদের ধোবে নিলে খাঁটা

সিপাহী সব মিলে অদের করলে বলির পাঁঠা।

গরু আর শূয়রের চর্বি দিয়ে করলে যে রে টোটা

হিন্দু আর মুসলমানের বুকে মার‌্যা দিল খঁটা।

জাতি ধর্ম নাই এক ফঁটা।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে প্রজাদের খাজনা বৃদ্ধির প্রতিবাদে পাবনা জেলার বিভিন্ন প্রান্তে কৃষক সমিতি গড়ে ওঠে। ঐ আন্দোলনের সূত্রে অন্যান্য কয়েকটি জেলাতেও কৃষকদের মধ্যে জোট বাঁধার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে যে সর্বব্যাপী কৃষক বিপ্লব শুরু হয় তার জন্য ১৯৮৫ সালে ইংরেজ সরকার শেষপর্যন্ত বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন বিধিবদ্ধ করতে বাধ্য হয়। এই আন্দোলনের নেতা ছিলেন ঈশানচন্দ্র রায়, প্রজারা তাঁকে রাজা সম্বোধন করত। এই আন্দোলনে জমিদারি প্রথার বিলোপ হয়নি তবে জমিদারদের অত্যাচার ও ইংরেজদের ক্রমাগত প্রজানিপীড়ন,জমি থেকে প্রজাদের উচ্ছেদ করার জমিদারের নিরঙ্কুশ মতা বন্ধ করা সম্ভব হয়েছিল। ১৮৭২ সাল থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন চলেছিল ১৮৮৪ সাল পর্যন্ত। এই আন্দোলনের সপক্ষে লোককবিরা গান রচনা করে জনজাগরণ ঘটিয়েছেন। পাবনা জেলার ইতিহাস গ্রন্থের লেখক রাধারমণ সাহা এই আন্দোলন উপলক্ষে গাওয়া কয়েকটি প্রতিবাদী লোকসঙ্গীত সংগ্রহ করেছেন।

দৌলতপুরের কালী রায়ের বেটা

ঈশান রায় বাবু।

ছোট বড় জমিদার রেখেছেন কাবু।

তার নামের জোরে গগন ফাটে

আষ্ট(রাষ্ট্র) আছে জগৎময়।

কৃষক বিদ্রোহের ফলে জমিদাররা পড়েন মহামুশকিলে, দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অভাবী কৃষকরা মরিয়া হয়ে লুট করেন জমিদারের বাড়ি। ‘সিরাজগঞ্জ বিদ্রোহ’ বলে এর পরিচয়। এই অবস্থারই এক চিত্র ফুটে উঠেছে তৎকালীন লোককবিদের কণ্ঠে।

বঙ্গদেশে কলি শেষে ঘটল বিষম দায়

মনিব লোকের জের হয়েছে বিদু্রকের জ্বালায় ।

যত প্রজা লোকে জোটে থেকে জমিদারকে বেদখল দ্যায়

নালিশ করে শান্তি রক্ষা,জুলুমনিষেধ প্রজার পক্ষে

তার রাজা হর নিশান (ঈশান) বাবু কালসাফ জমিদার।

গোপালনগরের জমিদারের লুঠল বাড়িঘর।

নিসান রায়ের হুকুম এ লোক চলে হাজার হাজার

অনুরূপ আরেকটি গানও তখন খুব প্রচলিত ছিল। লোককবিদের কাছ থেকে এই গণজাগরণের গানের সংগ্রহ করেছেন পাবনার রাধারমণ সাহা। এটি শুধু কৃষকের অবস্থার কথা জানানোই নয়, কৃষকের প্রতি অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের লোকসঙ্গীতও।

গোপালনগণের জমিদাররা তারা কেঁদে ম’ল

ডেমরা থেকে রাজু সরকার বাড়ী লুটে নিল।

কাশিঁ কাঁদে মহেশ কাঁদে কাঁদে তাহার খুড়ি

গোলামের ব্যাটা বিদু্রক আসে লুটল সকল বাড়ী।

বিদ্রশুক আসে লুটে নিল গাছে নাইক পাতা

জংগলের মধ্যে লুকায়ে থাকে ফুচকি মারে মাথা।

x