বহুরৈখিক হিরকখণ্ডের নাম আল মাহমুদ

মোস্তফা হায়দার

শুক্রবার , ১ মার্চ, ২০১৯ at ৭:০৮ পূর্বাহ্ণ
74

আমার দেশ ও মায়ের প্রতি যার এতো গভীর ভালোবাসা, যিনি আজীবন খোঁজে বেড়িয়েছেন দেশাত্মবোধ , মায়া, মমতা, এবং স্নেহময়ী মায়ের হিমেল পরশ, যিনি বিলিয়ে গিয়েছেন জীবনের শেষ রত্ন ,সে আর কেউ নন। তিনি হলেন আমাদের সবার শ্রদ্ধার্ঘ কষ্টিপাথর, অকবিতার কবিদের প্রতিবন্ধক এবং কবিতার ঠিকাদারদের জলন্ত অগ্নিশিখা, হৃদয়ের প্রাণস্পন্দন দখল করে রাখা, দুই বাংলায় স্থান করে নেয়া আধুনিক বাংলা কবিতা ও কথা সাহিত্যের সোনালী পুরুষ কবি আল মাহমুদ।
আধুনিক বাংলা কবিতার দূই মহাপুরুষের একজন প্রয়াত হলেও অপর জনের জীবদ্দশায় আমার মতো তিন ডজন বয়স পার করা যুবক কি বা লিখতে পারবে । লিখার মতো এতো শব্দ যোগাড় আছে কিনা আমারও সন্দেহ। যেহেতু সাহস করতে দোষ নেই সেহেতু এই লিখার প্রয়াস।
এই ক্ষুদ্র জীবনে কবির সাথে আমার দুবার সাক্ষাৎ হয়েছে । প্রথমত; কিশোর কন্ঠ ও ইয়ুথ ওভের চট্টগ্রাম বিভাগীয় ’লেখক ও পাঠক সম্মেলন ২০০৫’ এর ৪ঠা মার্চ চট্টগ্রাম প্যারেড ময়দানে। দ্বিতীয়ত: দৈনিক নয়াদিগন্তের ’প্রিয়জন সার্চ ২০০৭’ উপলক্ষে ২০০৮ অনুষ্ঠিত কঁচিকাচার মিলনায়তনে সরাসরি সাক্ষাৎ এবং করমর্দন করার সুযোগ হয়েছিল।
প্রথমবার কবির সাথে কয়েক লবজ কথা বলার তাওফিক দিয়েছিলেন মহান সৃষ্টিকর্তা এবং দুটি ফটো তোলার সুযোগ হয়েছিল । মঞ্চে উঠার আগে কবিকে উৎসর্গ করা গতকল্য লিখা ’হে বটবৃক্ষ ’ কবিতাটির এক কপি কবিকে দিলে কবিতাটি পাঞ্জাবীর পকেটে নিলেন। যদিও তখন আমি এম এম হায়দার সন্‌দ্বীপি নামে লিখতাম।
সে দিন মঞ্চে উঠে কবি তরুণদের প্রাণে কবিতার জোয়ার সৃষ্টি করতে কতগুলো উপদেশবাণী শোনালেন । যার প্রধান হলো – মা মাটি ও মানুষ। এরপর নোলক কবিতাটি আবৃত্তি করলেন। কি ধারাজ ও মধুর কন্ঠে কবিতাটি আবৃত্তি করলে পুরো প্যারেড ময়দান ভর্তি মাঠ একবারে পিনপতনহীন নিরব হয়ে উঠতে পারে তা পাঠক ও বোদ্ধামহল বুঝে নিবেন। আমিতো কবিতা আবৃত্তির অনেক পর পর্যন্ত কবির কন্ঠের ধ্বনি প্রতিধ্বনি শুনতে পেলাম। আজো প্যারেড ময়দানে গেলে কবি কন্ঠের সে ধ্বনি আমাকে নাড়া দেয় ।
আমার মায়ের নোলক ছাড়া ঘরে ফিরবো না ’ কথাটি দেশাত্মবোধের অতল গহবরের ভেতর থেকে বের হওয়া। আসলে কবি নোলক নিয়েই আসল ঘরে যাওয়ার প্রস্তুত নিয়েছেন এবং সফলও হয়েছেন বলে আমার বিশ্বাস। এরপর থেকে শুরু করেছি কবিকে জানার ও বোঝার । কিন্তু ভাগ্য বড়ই বিড়ম্বনার শিকার। তাহলো কবির যে কোন বই পাওয়া খুবই দুস্কর ও দূরহ ব্যাপার ছিল। প্রথমেই পেয়েছি ’নদীর ভেতরে নদী ’ বিক্রমপুরের যাত্রী ’এবং সোনালী কাবিন। তারপর—–
আজো কবিকে চিরসবুজের দেশে চির যৌবনা ও চিরসবুজের মত দেখতে পাচ্ছি।আজ তিনি প্রয়াত । কিন্তু আমার এ চোখ বলে তিনি আমার চেয়ে পুরো বাংলাদেশের মাটি ও মানুষকে পুরোদমে দিয়েই গেছেন। কবি জীবনের উষার প্রান্তে লিখেছিলেন
আমি জানতাম প্রত্যেক বিজয়ীর জন্য থাকে পুরস্কার
যুদ্ধ ফেরত ক্লান্তবীরদের পাওনা,পুলকের প্রস্রবণ
এর ঠিক তিন চরণ পর লিখেছেন ’
কিন্তু একজন কবিকে কি দিবে তোমরা ?
যে ভবিষ্যতের দিকে দাঁড়িয়ে থাকে বিষন্ন বদনে ’?
বড়ই দু:খের ব্যাপার । আজ আমরা ঠেলাঠেলি ,দলাদলি এবং ডান বামের রাজনীতির পাল্লায় পড়ে কবির বিজয়ী তথা প্রাপ্য হাতে তুলে দিতে পারিনি বলে আমাদের ক্ষমা করবেন। আবার এও জানি , আপনি খ্যাতির জন্য কবিতা লিখেননি। কবিতা লিখেছেন মা, মাটি ও মানুষের জন্য। যদিও এ মাটি ও মানুষ আপনার সাথে বেঈমানী করেছে ।
কবিকে একটা সুসংবাদ জানাচ্ছি যে, এদেশের হাজার হাজার যুবক আপনার জন্য উপরওয়ালার কাছে ক্ষমার সহিত জান্নাত কামনা করে যাচ্ছে। এটাই আপনার পুরস্কার বলে আমি মনে করি । কারণ এদেশের মাটি অনেককে হজম করলেও কাউকে কাউকে হজম করেননি। হয়ত ভবিষ্যতেও। অনেকের মৃত্যু সংবাদে ইন্নালিল্লাহ পর্যন্ত প্রায় মানুষ পড়ার প্রয়োজন মনে করেনি ।
কবিকে নিয়ে উষার জীবনে যারা ভেংচি কেটেছিল,যারা পাগল বলেছিল-আজ তারা আপনার পদনীড়ে মস্তক অবণত করে পদধূলি কুড়াতে খুবই ব্যস্ত। এরপরেও এ প্রজন্ম থেকে কিছু কবিতার ঠিকাদার , অকবিতার বাহক ও অকবি এবং কবিতার খোলামাঠে পরাজিতরা ঠিকই আপনার পেছনে ষড়যন্ত্রের জাল বুনেই চলেছে। আমার মনে হয় এতে আপনার অস্বস্থিবোধ হওয়ার কিছুই নেই। তাছাড়া আপনিতো পরাজিত হওয়ার স্বপ্ন দ্রষ্টা জাতি নহে । অপরদিকে খাটিঁ লোক নাকি বাঁধা বিপত্তিতে না পড়লে কামেল হতে পারে না ।
কবি ’ আমি যদি হেরে যাই ’ কবিতায় লিখেছিলেন
মৌমাছিদের মতো আমারও সময় জ্ঞান আছে ।
আমি জানি একদিন হেরে যেতে হয়
কিন্তু আমি না থাকলে শেয়াল ও বৃদ্ধ বাঘের হুংকার ছাড়া
এঢাকা মহানগরীতে আর কোন প্রার্থনার শব্দ অবশিষ্ট থাকবে কি ’?
না, আমরা কবিকে হেরে যাওয়ার সুযোগ দিবো না। আমরা যুগযুগ ধরে কবির সময় ও জ্ঞান নিয়ে কাল ভেঙে মহাকাল গড়ার অতল সমুদ্রের গহবর সৃষ্টি করবো।যেখান থেকে শুধু অমৃত সোঁদামাটির গন্ধ ছড়াবে , আর এ গন্ধের রন্দ্রে রন্দ্রে আমরাই বিচরণ করার পরিগ্রহ রুপ ত্বরান্বিত করার প্রয়াস চালাচ্ছি ইনশাল্লাহ ।
কবি ‘স্তব্ধতার চাষী’ কবিতায় লিখেছেন
অবিশ্বস্ত চাষা যদি বীজ বুনে তোমার আবাদে
বিস্বাদ শস্যের আটিঁ নিতে হবে ফ্যাসাদে, বিবাদে ।
কবি কতই না যত্ন ও বিচক্ষণাতার সহিত এ সুন্দর কথাটি লিখলেন। বিশ্বাসহীনতার কারণে আজ কিছু কিছু কবি নাম পরিবর্তন করে বর্ণচোরা সাজে কবিতার পারজয়ে ঠিকাদার সাজে, শব্দের কাছে পরাজিত হয়ে নাট্যকার সাজে, খুবই লজ্জাজনক এ জাতের কবিদের জন্য ।
কবি ’হায়রে মানুষ’ কবিতায় লিখেছেন
মানুষ হওয়ার জন্য কত পার হয়েছি সিঁড়ি
গাধার মত বই গিলেছি স্বাদ যে কি বিচ্ছিরি
জ্ঞানের গেলাস পান করে আজ চুল হয়ে শন
কেশের বাহার বিরল হয়ে উজাড় হলো বন ।
আসলে বই গিলাটা শুধু বিচ্ছিরি হলে তো চলতো । কিন্তু কত যে কষ্ট তা লিখার ভাষা এ মুহূর্তে আসছে না । আর সেখান থেকে আপনি পান করেছেন জ্ঞানের গেলাস নয় , জ্ঞানের কলসি। আপনি মুক্তা ছড়িয়েছেন বাংলার পত্রপল্লবে । বিতরণ করেছেন সমুদ্র পরিমাণ । আপনার বইয়ের পরিমাণ কম হলেও শব্দের ওজন কিন্তু সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো আওয়াজ দিয়ে যাচ্ছে ।
আল মাহমুদের ‘সোনালী কাবিন’ আল মাহমুদক বাঁচিয়ে রাখবে। এখানে কবি তার প্রেয়সীকে উপভোগ্য অনুভূতি প্রকাশ করেছেন এভাবে – চরের মাটির মতো খুলে দাও শরীরের ভাঁজ’ । যৌবনের দায় গোছাতে মানসিক শক্তি এবং সামর্থের পাশাপাশি নারীর প্রতি কবি বিশ্বাসের এক কঠিন উপস্থাপনা করেছেন ঠিক এভাবে
সোনার দিনার নেই , দেনমোহর চেয়োনা হরিণী
যদি চাও দিতে পারি কাবিনবিহীন হাতদুটি।
আত্মবিক্রয়ের স্বর্ণ কোনকালে সঞ্চয় করিনি
আহত বিক্ষত করে চারদিক চতুর ভ্রুকুটি।
ভালোবাসা দাও যদি আমি দেব চুম্বন
ছলনা জানি না বলে আর কোন ব্যবসা শিখিনি ।
সুখ ও ভরসার আস্থা নিয়ে যেখানে স্বামী -স্ত্রীর মাঝে হতাশার দানা বাঁধে সেখানে কবি তার প্রেয়সীকে আস্থা ও বিশ্বাসের দানা বাঁধানো নিয়ম শিখিয়েছেন উপরোক্ত লাইনগুলোতে । কবি তার ভবিতব্য সঙ্গীনীকে কি সুন্দর ভাষায় আহবান করেন ’’ নদীর ঢেউয়ের মতো বলো কন্যা কবুল কবুল’ । কি চমৎকার উপমা । এগুলো কবি আলমাহমুদকে ঝিঁয়ে রাখবে সতেজ শুভ্র সবুজ বাংলায়।
‘কবির আত্মবিশ্বাস’ বইটি বাংলার সাহিত্যিকদের এক মুখোশ উম্মোচন করা মোড়ক বলা যায়। আজ বিশ্বাসী পাঠকসহ অবিশ্বাসী পাঠকগণ খুঁজে বেড়ায় ‘কবির আত্মবিশ্বাস’ বইটি । এটি কি কবির কম পাওয়া ?
এ কবি অন্যের সাহায্যে অনবরত লিখে গিয়েছেন। লিখতে লিখতে কবি চলে গেছেন অনন্তের পানে । হয় কবি নিজেকে দেখে যাওয়ার সময় পাবে না । তবে আমি জানি এ জাতি ঠেকলে আর ঠকলে শিখতে জানে । এর আগে বিবেক ও চোখে আইকামিশ্রিত কষ্টিপাথর লাগিয়ে চলে ।
কবি নিজে শেষজীবনে এসে আবার স্বীকার করলেন সাহিত্যাঙ্গনে যারা আমাকে পরিত্যাগ করেছিল তারাই আমার লেখার প্রশংসা করে পরে আমাকে গ্রহণ করেছিলো। আমি মনে করি এটি আমার কবিতার মৌলিকত্ব ও শক্তির বিজয়’। এটি একজন কবির শেষ অর্জন বলা যায়।
একজন কবি কবিতার গতর খানি সঠিকভাবে উম্মোচন করতে করতে নিয়ে যাচ্ছেন অনন্তের পানে। সে আর কেউ নন। তিনি হলো বাংলার শেকড় সন্ধানী পুরুষ কবি আল মাহমুদ। কবিতার গতর ভাঙচুর করতে করতে বাংলা কবিতাকে এমন জায়গায় দাঁড় করিয়েছেন যেখান থেকে বাংলা কবিতা বিশ্বের মাঝে মাতৃভাষার মর্যাদার মতো সাহিত্য মর্যাদা পেতে বসেছে । হয়তো এ কবি দেখে যেতে পারেননি। তবে আমাদের স্বপ্নের পরশখানি কবিকে শোনাতে আমাদের দোষ কোথায় । কবি আপনার সারল্য সাথী হওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে সামনে যাচ্ছি আমরা।
বাংলোদেশ এবং ভাষারগানের সাথে বাংলাসাহিত্যের এক বিশাল আসন গেড়ে বসা কয়েকজনের একজন হলেন কলামিস্ট আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী। এ ভদ্রলোক সময়ের অচেতনতার কথা বলতে কখনো কখনো কসুর করেন না। সত্য বলার সৎ সাহসও কিন্ত তার আছে। বলার মতো শক্তি থাকার পরও অনেকে যশখ্যাতি অথবা কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণে অথবা হিংসার আবরণে ছানি পড়লেও বলা থেকে বিরত থাকেন । এ জায়গায় এসে আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী আপনার অসম্মানে সরকারের সমালোচনা করেছেন এবং এও বলেছেন – কবি হিসেবে এটা আপনার অধিকার ছিল। এই স্বীকৃতি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য, কবিতার ইতিহাসের জন্য এক মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে নিশ্চিত।
বহুরৈখিক সীমারেখার নতুন সমীকরণও বলা যায় কবি আল মাহমুদকে। জীবনানন্দ চলে গেলেন তাঁর সৃষ্টির বিষয় আসয়ের তীর্যকতা না দেখে। ভুবনপুরের যাত্রী হতে হতে সৃষ্টির এক বিশাল কারখানায় জীবনানন্দকে আমরা আজ বনলতা সেনের হাত ধরে গবেষণার এক যায়গায় বসতে গিয়েও অনেক কিছুর দ্বারস্ত হতে হয়। অথচ সদ্যপ্রয়াত কবি আল মাহমুদ আমাদের জন্য সীমানার সব ইঙ্গিত সুচারুভাবে দিয়ে গেছেন বিজয়ী বেশে। তাঁর কর্মের কাছে আমাদের নতজানু হওয়া ছাড়া আর কিছুই থাকে না । সৃষ্টির এক লীলাও বলা য়ায় । মাটির গন্ধ এবং প্রকৃতির সান্নিধ্যে বেড়ে উঠতে উঠতে এ দেশের সাহিত্যের সাথে আপামর জনতাকে গভীরভাবে পরিচয় করে দিয়েছেন আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে। আমাদের মা মানুষের আঁচলঘেষে থাকা শব্দগুচ্ছকে এমনভাবে গুচ্ছকরে মুখে মুখে রেখে দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন, যেখানে নারীর শাড়ির সাথে ব্লাউজের ম্যাচিং এর মতো করে আমাদের সাহিত্যকে দাঁড় করিয়েছেন এক অনন্যতায়। আল মাহমুদ মাটি ও মানুষের মুখের শব্দের আশ্রয়ের জন্য হাজার বছর বেঁচে থাকবেন। ভালোবাসার অঞ্জলিতে তাঁর রুহের চাষাবাদ হবে সুন্দরের সীমানায়। এ বিশ্বাসের সামিয়ানায় কবির দৃঢ়তার এক বাণী সামনে এসে দাঁড়ায় কবির কবিতায় –
আমার পরমায়ুর চেয়ে দীর্ঘ হয়ে গেছে আমার বিষাদে মাখা
পঙক্তি ! কে আমাকে সংবরণ করবে , বাংলাদেশের
মাটি ছাড়া এই কবিতা পুঁতে রাখার মতো আঁঠাল
কাদা পৃথিবীতে কোথাও কি আছে?
(জন্মদিনের কবিতা -নগলীর কথা নয় ছাষাবাদের গল্প)
কবিতার যন্ত্রণায় কবির চতুর্পাশ বৈশাখের তাড়ন্যবাতাস বয়ে এ সমাজের কাছে দাঁড়ায় এক শিল্পচতুর হিসেবে। যা শিল্পের চাদরে বসে থাকা অথবা টিকে থাকার নাম হয়ে যায় এক সময় কবি। সে হয়ে যায় আমাদের কাছে মধ্যমণি অথবা কবি আল মাহমুদের ভাষায় কহিনূর । এমন বিশ্লেষণ শুধু তার মুখেই মানায়। শুনুন কবির চরণে-
শিশুকাল থেকে শুনে এসেছি আকাশ থেকে একটা ফোঁটা পড়বে
পর্বতের গাত্রে এই ফোঁটা পাথরের উদরে হিরের জন্ম দেবে
আমরা ঐ মহা হিরক খন্ডের নাম দেব কহিনুর। এই ফোঁটা
মানুষের উপর পড়লে সে হয়ে যাবে কবি ।
(ম্যাজিক -নগলীর কথা নয় ছাষাবাদের গল্প)
কবি আপনি আসলে একজন কহিনুর একখন্ড হিরক হয়ে থাকবেন এই শব্দকারিগরদের কাতারে । আপনার জন্মজাতকে বেড়ে উঠা স্রোত খুবই গতিশীল । ব্যাপকতার এক বাহুবল নিয়ে আপনাকে জপবে আগামীর আসরে । কবিতার সংসারে শব্দ – বাক্য এবং চরণের চরতলির কাছে বটবৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে একদিন আপনার স্তূতি গাইবে নিশ্চিত। ইমরুল কায়েস আরব্যকাব্যের জন্য যেমন সমাদৃত তেমনি আপিন গ্রামীণ শব্দ এবং লোকজসংস্কৃতির শেকড়ের ভর করে দাঁড়িয়ে থাকবেন আমাদের বাংলাসাহিত্যের মাঝে, কবিতার সংসারে এবং কবিতার সমজদারে । ভালোবাসা এক মহীরুহের নাম ছিল । আজ সেটি যখন বিষাদের পেয়ালায় বসে ঘুণার পাত্র তৈরিতে ব্যস্ত তখন আপনাকে খোঁজে নিবে মাল্য পড়াতে। জাতির অস্থিমজ্জা হাইব্রিড পোল্‌ট্রির মতো স্লো পয়জনিংএ আক্রান্ত । বিবেকের এক কোণে বসে গেছে শোলমাছের পচন ধরা গ্যাংরিং রোগ । যে রোগের মুক্তি মৃত্যু অথবা রক্তক্ষয়ী এক সংঘাত ছাড়া আর কী বা হতে পারে ! তবে আপনার শব্দের কাছে যদি নতজানু হয় বিষাদের বিবেক তাহলে নিশ্চিত একদিন আমরা হারানো অথবা সম্মান দিতে না পারা কবিকে খোঁজে নেবো সাদা সামিয়ানার নীচে। প্রত্যয়ের আয়নায় চড়ে আপনাকে পেয়ে যাবো ভালোবাসার আবে হায়াতের কাছাকাছি। সুন্দরের সবটুকু সেদিন উজাড় করে আঁচল ভরে ছড়িয়ে দেবো দিগন্তের সবটুকুতে ।
ভাষার মাসে আপনার প্রস্থানে আমরা কিন্তু গর্বিত । যে বা যারা ভালোবাসতে পারেনি তারাও কিন্তু ভেতর অন্তিতে ঝলসে যাচ্ছে। আপনার ভক্তদের ধারালো তলোয়ারের নিচে তাদের সবটুকু ইচ্ছে হত্যা হতে চলেছে। আপনি সবুজের সীমানায় ভালো থাকুন। অনন্তের পরিধিতে আপনার উদয়কাল ফুলেল সজ্জায় ভরে যাক শেষবিচার দিবস পর্যন্ত । ভালোবাসাময় শ্রদ্ধায় কবি।

- Advertistment -