বহুমাত্রিক মনিরুজ্জামান আমার ত্রাতা শিক্ষক

অভীক ওসমান

শুক্রবার , ৩ আগস্ট, ২০১৮ at ৩:৩৪ পূর্বাহ্ণ
53

One day you took me somewhere by baby taxi

Outside Chittagong.

We crossed a bridge you said,

`In the war of `71, some Pakistani soldiers

Caught up with me there.

They were about to shoot me,

But they looked into my face, and let me go.

I don’t know why.’

You don’t know why,

But everyone who loves you,

knows why.

The soldiers looked into your face

And met a wall of goodness.

They couldn’t bring themselves to knock it down.”

(William Radice THE OTHER ARMY for Maniruzzaman on his 71st birthday)

রাদিচির উপরোক্ত কবিতায় মনিরুজ্জামানের মুখাবয়বে wall of goodness ছাড়াও Paradox একটা শব্দ ব্যবহার করেছেন। নিখিল মনিরুজ্জামানের সম্পর্কে আমার লেখার মধ্যেও তা প্রতীকায়িত হয়েছে।

. “আমরা তোমাদের কিছুই শিখায়নি, শুধুমাত্র শেখার তৃষ্ণা জাগিয়ে দিলাম” ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দের প্রথমার্ধ্বে মাস্টার্সের শেষ ক্লাসে বিবর্ণ আর্টস্‌ ফ্যাকাল্টির শূন্য করিডোরে দুপুরে মনিরুজ্জামান আমাদের উদ্দেশ্য করে এই আইনেস্টাইনিক বক্তব্যটি দিয়েছিলেন। তিনি আমাদের মাইকেল ও ভাষা বিজ্ঞান পড়াতেন। যখন তিনি মাইকেল পড়াতেন। তখন আবেগে পায়ের বুড়ো আঙুলে উপর দাঁড়িয়ে পাঠ করতেন…‘মহাশোকে শোকাকুল কহিলা রাবণ;-/-যে শয্যায় আজি তুমি শুয়েছ, কুমার/প্রিয়তম বীরকুলসাধ এ শয়নে/সদা! রিপুদলবলে দলিয়া সমরে,/জন্মভূমিরক্ষাহেতু কে ডরে মরিতে?/যে ডরে, ভীরু সে মূঢ়; শত ধিক্‌ তারে!’ আমার মনে পড়ে যায় আমাদের কৈশরোত্তীর্ণ বয়সে গ্রামের বাড়ি বরমা ত্রাহি মেনোকা হাইস্কুল মাঠে শীতের নিশিথে যাত্রা সম্রাট অমলেন্দু বিশ্বাস যেমন নবাব সিরাজদৌল্লার সংলাপ বলে যাচ্ছেন “বাংলা বিহার উড়িষ্যার নবাব…” অনুরূপ আবেগে সুকণ্ঠে মনিরুজ্জামান আমাদের মাইকেল পড়াতেন।

আমি ব্যক্তিগতভাবে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে অনার্স করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার জন্য চলে গিয়েছিলাম। পরবর্তীতে তিনমাস বিলম্বে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে ভর্তি হই। আমার পরম সৌভাগ্য যে ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান হিসেবে ড. মনিরুজ্জামানকে পেয়েছিলাম। শিক্ষক যে পিতার বা অভিভাবকের ভূমিকা রাখতে পারে তার জ্বলন্ত প্রমাণ হচ্ছেন মনিরুজ্জামান। আমি যেহেতু অনার্স স্ট্যান্ড করা ছাত্র এমএতে থিসিস পেপার নেয়ার জন্য তিনি যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলেন। আমি আনিস স্যারের রুম থেকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসি। তিনি পুনর্বার ঠেলে দেন। এইভাবে তার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।

আমরা যখন মনিরুজ্জামানকে দেখি তখন তিনি ক্লিন সেভড, উন্নত নাসা, সুকণ্ঠ, সুদর্শন যুবক। আমার মনে হয়েছিল। পণ্ডিত মুহাম্মদ আবদুল হাই তার এই সৌম্যকান্তি চেহারা দেখেই নিজের জামাতা করেছেন। আমরা নিজেরাও এই ব্যাপারে যথেষ্ট ইমপ্রেস্‌ড ছিলাম।

মাস্টার্স পরীক্ষার আগেই আমি আকস্মিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ি। চতুর্থ পেপার পরীক্ষার সময় মনিরুজ্জামান আমাকে সিক্‌্‌সিটে পরিক্ষা দেওয়ার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেন। প্রফেসর খালেদা হানুমকে আমার এটেন্ডেন্ট টিচার হিসাবে নিয়োগ করেন। কিন্তু খালেদা হানুম এটেন্ড করেননি। এইভাবেই আমাদের মাস্টার্স পর্ব শেষ হয়ে যায়। সাথে সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো শেষ হয়ে যায়।

ভাইবা পরীক্ষায় এক্সটার্নাল ছিলেন পণ্ডিতবর ড. আহমদ শরীফ। “সাদা সুটেড বুুটেড লাল টাইপরা পক্ককেশ ড. মুহাম্মদ এনামুল হককে মনে হচ্ছিল বাঘের মতো, এখুনি আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বেন (যদ্যপি আমার গুরু, আহমদ ছফা) ইন্টারভিউ দিতে আহমদ ছফার মতো আমার বিপন্ন অবস্থা। ড. আহমদ শরীফ বিভূতিভূষণ এর পথের পাঁচালী থেকে প্রশ্ন করেছিলেন। আমি উত্তর দিয়ে যাচ্ছিলাম। শেষে তিনি বললেন “তুমি বই পড়ে বলছ না সিনেমা দেখে বলছ”। আমার তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা। তখনই মনিরুজ্জামান স্যার বলে ওঠেন “ও ভালো ছাত্র, নার্ভাস হচ্ছে স্যার।” আমাকে সাহস দিয়ে বললেন– “নার্ভাস হয়ো না উত্তর দিয়ে যাও”। মনিরুজ্জামান ছিলেন আমার ত্রাতা শিক্ষক।

মনিরুজ্জামান বৃত্তান্ত

১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৪০ সালে ঝিনাইদহে মনিরুজ্জামান তার পৈত্রিক বাড়ি নরসিংদী জেলার রায়পুর উপজেলার আদিয়াবাদে জন্মগ্রহণ করেছেন। পিতা নাদেরুজ্জামান ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা। মা মোছাম্মৎ ফরিদান্নেছা। তিনি ১৯৫৩ সালে মেট্রিকুলেশন করার পর ভর্তি হন সেন্ট গ্রেগারিস কলেজে (পরে নটরডেম কলেজ)। কিন্তু দুর্ভিক্ষ ও আর্থিক অনটনের কারণে ঘটে অনাকাঙ্ক্ষিত শিক্ষা বিরতিদুরবস্থা অতিক্রম করে শেষ অবধি ১৯৫৭ সালে নটরডেম কলেজ থেকে আইএ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) ও ১৯৬৯ সালে এম এ ডিগ্রি অর্জন করেন।

তিনি অধ্যাপনা শুরু করেন ১৯৬১ সালে জামালপুর আশেক মাহমুদ কলেজে। সেখানে ৭/৮ মাস অধ্যপনার পর ১৯৬২ সালে চট্টগ্রাম কলেজে যোগদান করেন। ১৯৬৭ সালে বরিশালে বি এল কলেজ এবং কিছুকাল পর ১৯৬৮ সালের মে মাস থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেন। ভাষাবিজ্ঞানে পিএইচডি করেন ভারতের মাইশুর বিশ্ববিদ্যালয় হতে। কর্মজীবনের নানা সময়ে নজরুল ইনস্টিটিউটের পরিচালক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সভাপতি এবং কলা অনুষদের ডিন ছিলেন।

তার গ্রন্থপঞ্জি : ভাষা সমস্যা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ (প্রবন্ধ), নূরজাহান ও সাজাহান (সম্পাদনা), পুরুষ পরম্পরা (ছোটগল্প), বাংলাদেশে লোকসংস্কৃতি সন্ধান ১৯৪৭৭১ (গবেষণা), ভাষাতাত্ত্বিক ফিল্ডওয়ার্ক, উরমষড়ংংরধ রহ ইধহমষধফবংয ধহফ খধহমঁধমব চষধহহরহম (রিঃয উৎ. .. ঝরহময), বাংলা ভাষা (হুয়ামুন আজাদ ও অন্যান্য), ১ম খণ্ড (সংকলন), বাংলা ভাষা (হুয়ামুন আজাদ ও অন্যান্য), ২য় খণ্ড (সংকলন), ভাষাতত্ত্ব অনুশীলন (প্রবন্ধ ও গবেষণা), নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরাণী (জীবনী), নিমপাতা তৈ তৈ(ছড়া), ঝঃঁফরবং রহ ঃযব ইধহমষধ খধহমঁধমব, সৃষ্টি সুখের উল্লাসে (সম্পাদনা), প্রলয়কেতন (সম্পাদনা), চট্টগ্রামে নজরুল (সম্পাদনা), সান্নিধ্যে ও গৌরবী স্মরণে (প্রবন্ধ), মৌলানা মনিরুজ্জামান এসলামাবাদী রচনাবলী, ১ম খণ্ড (সম্পাদনা), নজরুল রচনাবলী,৪ খণ্ড (আনিসুজ্জামান ও অন্যান্য), উপভাষা চর্চার ভূমিকা (গবেষণা), সাজাহান (সম্পাদনা), লোকসাহিত্যের ভিতর ও বাহির, বাংলা সাহিত্য : অতীত ও উত্তরাকাল, ইদানীং বিপন্ন বড়ো (কাব্য), নদীতে মেঘের ছায়া (কাব্য) ও গোষ্ঠী পত্রিকা ও সাময়িকী (গবেষণা)। ১৯৮১৮২’র দিকে ড. উদিত নারায়ণ (ভারত) সহ ট্রাইবাল ভাষার উপর গবেষণা করেছিলেন। (. ইলু ইলিয়াসসৃজনে ও মননে ড. মনিরুজ্জামান )

চট্টগ্রামের কৃষ্টিপুত্র মনিরুজ্জামান

স্যারের সেকেন্ড হোম ছিলচট্টগ্রাম। এর জন্যই তিনি চট্টগ্রামের সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে নিয়ে গবেষণা করেছেন। এ সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন : ‘বাংলা সাহিত্যকে পূর্ণাঙ্গ করেছে চট্টগ্রাম তার আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে। এখানকার পুথি, অনুবাদ ও রোমান্টিক সাহিত্যের অভিনব সাধনার স্বীকৃতির পরেই সাহিত্যের ইতিহাস লেখনে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দেখা দেয়। সেই সাথে ‘বাঙলা’ যে বাঙালি মুসলমানেরই ভাষা এবং বাংলাসাহিত্যে তাদের অবদান সে গভীর, তাও প্রতিভাত এবং প্রতিষ্ঠিত হয়।’ এ ক্ষেত্রে গবেষণায় স্যার একটি উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। তার মতে, ‘রাজধানীর বৃত্তের বাইরে সাহিত্যে সৃষ্টির উপদান রাশি হারিয়ে যাওয়া বা নষ্ট হওয়ার আগেই সংগৃহীত হওয়া আবশ্যক। উদ্দেশ্য ভবিষ্যতের মূল্যায়ন। তাই স্থানিক সীমাঙ্কে সেই উপাদানের আংশিক রূপ হলেও যথাসম্ভব সংগ্রহের প্রয়োজনই আমাদের এই প্রয়াস।’ (মনিরুজ্জামান ২০১৬)

চট্টগ্রামের সাহিত্য ও সংস্কৃতির উপর গবেষণা গ্রন্থে রয়েছে : বাংলা সাহিত্যে চট্টগ্রামের অবস্থান, চট্টগ্রামের অঞ্চলগত অবদান, দুই মহা কবি : নবীন সেন ও হামিদ আলী, বরণীয় কৃতী পঞ্চক, মাহবুব উল আলমআবুল ফজলসুচরিত চৌধুরীমাহবুব উল আলম চৌধুরী ও অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ, আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ, মুহম্মদ এনামুল হক, আহমদ শরীফ, .আবদুল করিম, আবদুল হক চৌধুরী, আবদুস সাত্তার চৌধুরী ও অন্যেরা, বুলবুল চৌধুরী, জগদানন্দ বড়ুয়া, কামাল এ খান, সত্য সাহা, মোহনলাল দাশ ও অন্যেরা, রমেশ শীল, মরমী ও সুফি সাধনার পাদপীঠে সিদ্ধজনেরা, ভাণ্ডারী শিল্পী আবদুল গফুর হালি, সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামী পুরুষেরা : মনিরুজ্জমান এসলামাবাদীকমরেড কাকাবাবু, শিক্ষাবিদ প্রিন্সিপাল আবুল কাশেমআসহাব উদ্দিন আহমদ.মুহাম্মদ ইউনূস, বৌদ্ধ সংস্কৃতি চর্চা : বেণীমাধব বড়ুয়ামনীন্দ্র বড়ুয়াঅমিতাভ বড়ুয়াশিমুল বড়ুয়াকবি বিমলেন্দু বড়ুয়াসুমন বড়ুয়ারেবতী প্রিয় বড়ুয়া এবং বিশ্বশান্তি প্যাগোডার মহাপুরুষ জ্যোতিঃপাল মহাথেরো, অধুনাস্তিক তৎপুরুষ : রেনেসাঁপথিক দ্রোহী আহমদ ছফা, চট্টগ্রামের তরুণ কবিপ্রজন্ম : অরুণ সেন, খুরশীদ আনোয়ার, মহীবুল আজিজ, চট্টগ্রামের কথা সাহিত্যের উদ্ভাস : বিপ্রদাশ বড়ুয়া, হরিশংকর জলদাস ও দেবাশীষ, চট্টগ্রামের সাহিত্যে নিরীক্ষা : চৌধুরী জহুরুল হক, চট্টগ্রামের রঙ্গব্যঙ্গ সাহিত্য: সত্যব্রত বড়ুয়া, ফাহমিদা আমিন, সবিহ্‌উল আলম ও মোহাম্মদ হোসেন খান, উত্তরাধুনিক আন্দোলন : এজাজ ইউসূফী, নারীর সাধনা : উমরতুল ফজল, বেগম মুশতারী শফি, আনোয়ারা আলম এবং কবি নারীদ্বয়, প্রবন্ধ চিন্তায় ব্যতিক্রমী একজন সিদ্দিক আহমেদ, কক্সবাজার পর্ব: রেনেসাঁ ব্যক্তিত্ব অধ্যক্ষ মোশতাক আহমদ, শিক্ষাবিদ শফিউল আলম, অনুবাদক জাফর আলম, দরিয়া নগরে কবিতার আসুমদ্র ঝড়, মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩২ পরিবার ও নতুন চন্দ্র সিংহ চট্টগ্রামের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার সংস্কৃতি: আজাদী ও পূর্বকোণের কথা স্মরণ: ছোট দেশের এক বড় বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম।

কোহিনূর ও প্রকাশক মোহাম্মদ আবদুল মালেকের কথা

কোহিনূরের এবারের উদ্যোগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ভাষাবিদ ও চট্টগ্রাম সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অন্যতম অনুরাগী গবেষক ড.মনিরুজ্জামানএর চট্টগ্রামের সাহিত্য সংস্কৃতি বিষয়ক গ্রন্থ ‘সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে চট্টগ্রাম’। এটি এই বহুমুখী লেখকের ত্রিংশতিতম রচনাকর্ম।

তুমি হে জগৎপিতা, এ কি রীতি তব?

মাইকেলের মেঘনাধবধ কাব্যের ট্র্যাজিডি পড়াতেন তিনি। একমাত্র কন্যা দোলার বাসচাপায় মর্মান্তিক মৃত্যুতে এক পালক কন্যাকে উৎসর্গ করেছেন উপরোক্ত গ্রন্থ। যেমন– “এক সন্তানহারা পিতার অতৃপ্ত বুভুক্ষু হৃদয়ের প্রাপ্তি ঐশ্বরিক কন্যা জোবাইদা খানম লুসি ও ফটিকছড়ির সিংহহৃদয় জামাতা এস. এম. মোহাম্মদ আলী (ব্যাংকার) এবং দৌহিত্র নাজমুস সাকিব, দৌহিত্রী সুমাইয়া বিন্‌তে আলীর করকমলেযারা আমার ও আমার স্ত্রীর অন্তর এবং বাস্তব জগতকে ঘিরে রেখেছে।”

সম্মাননাসংবর্ধনা

২০১০ সালে অধ্যক্ষ নীলুফার জহুর, . ইলু ইলিয়াস, অধ্যাপক রুহু রুহেল সম্পাদিত মনিরুজ্জামান সংবর্ধনা স্মারক প্রকাশিত হয়। সম্পাদকমণ্ডলী বলছেন, “বিশ ও একুশ শতকের এক অনন্য বাঙালিমনীষী প্রফেসর ড.মনিরুজ্জামান। সত্তর বছর পূর্তি ও একাত্তরে পদার্পণ উপলক্ষে তাঁর গুণমুগ্ধ সুহৃদ ও এককালীন ছাত্রছাত্রীর দল তাঁকে সংবর্ধিত করে উষ্ণ আন্তরিকতায়আয়োজন করে সংবর্ধনা স্মারক প্রকাশের। এই সংবর্ধনা স্মারকের জন্যে তাঁর ব্যক্তি জীবন ও কর্মসাধনার নানা গুণাম্বিত আলেখ্য রচনা করেছেন দেশ ও বিদেশের বরেণ্য ব্যক্তিবর্গযারা তারই গুণমুগ্ধ ভক্তঅনুরাগী, সহযাত্রী, সহকর্মী ও ছাত্রছাত্রী। এসব রচনায় একদিকে যেমন উদ্ভাসিত হয়েছে মনিরুজ্জামানের মনীষার ব্যাপ্তি ও দীপ্তি, অন্যদিকে তেমনি বিশ্লেষিত হয়েছে তাঁর সুদীর্ঘ সময়ের সৃজন ও মননশীল সাহিত্য ও ভাষা কর্মের পরিপ্রেক্ষিত ও প্রাসঙ্গিকতা, নান্দনিক সৌকর্য ও নিহিত আর্থতাৎপর্য। এই সম্মাননা গ্রন্থের রিভিউ করতে গিয়ে ইতিহাস বিভাগের প্রফেসর গোলাম কিবরিয়া বলেছেন, “বইয়ের শেষে পিক্টোরিয়াল অ্যালবামটি একটি শিল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে।” তাছাড়া মনিরুজ্জামান “চট্টগ্রামের গোষ্ঠী পত্রিকা ও সামাজিক নামে” একটি বই সম্পাদনা করেন। যেখানে ২০১৫ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আপডেট করা আছে।

কবি মনিরুজ্জামান

আমরা ছাত্রাবস্থায় তাকে গীতিকার হিসেবে জানতাম। কিন্তু তিনি প্রচুর কবিতা লিখেছেন। এই প্রসঙ্গে শামসুর রাহমান উদ্ধৃত করছি। ‘স্বরবৃত্তসন্মোহ্‌’ আট পঙ্‌্‌ক্তির ছোট একটি প্রেমের কবিতা। কিন্তু এই কবিতা প্রাণে আলোড়ন সৃষ্টি করে। মনিরুজ্জামানের অন্তরে যে একজন প্রকৃত কবির বসবাস রয়েছে এবং সে কখনো দিব্যি জেগে ওঠে– ‘তোমার হাতে দিয়েছিলেম আকাশ ভরা দ্যুতি/শেষ প্রদীপের আলোয় দেখা একটি অরুদ্ধতি।/তোমার হাতে রেখেছিলাম প্রাণের আকিঞ্চন,/বুকের মাঝ দুলিয়ে ছিলেম তোমায় অনুক্ষণ।/ফেললে মুছে আমার গভীর অবুঝ আর্তনাদ/মিলিয়ে গেল রেখায় আঁকা সজল বাকা চাঁদ;/তোমার পানে তাকিয়ে আমি পাইনে খুঁজে আর/দৃষ্টি ভরা আলোর গানে প্রেমের পারাবার।/এমন কবিতা যে কবির লেখনী জন্ম দিতে পারে তার/লেখনী কখনো বন্ধ্যা হওয়া উচিত নয়।’ (শামসুর রাহমান)

আল মাহমুদ বলেন, ‘মনিরুজ্জামানের কাব্যে সেই গুণ আছে যা আমাকে কিছুক্ষণ তন্ময় হয়ে স্বপ্ন দেখার সুযোগ দিয়েছে। এ ধরনের কবিরা যত দূরেই থাকুন, অনাত্মীয়/হতে পারেন না। প্রেম ও প্রকৃতির মধ্যে এখনো/গুঞ্জরিত হচ্ছে এক তরুণ আত্মা। মনিরুজ্জামান সেই আত্মামগ্ন আত্মার অধিকারী।

উপর্যুক্ত স্মারকগ্রন্থে, ‘নদীতে মেঘের ছায়া’ কাব্যগ্রন্থটি বারবার আলোচনা হয়েছে। প্রিয় পাঠক, আসুন একবার তাঁর কবিতার প্রদর্শনী দেখি, ‘চাঁদ নয়, পাখি নয়সন্ধ্যার হাঁসের ঘ্রাণ তাও নয়…/শুধু বিষাদকাতর চোখ দুটি সাথী করে রেতী নদীর অতীত সঙ্গীতে,/অথবা কপোতাক্ষের ক্ষীণরেখা তলে, সতত হে নদ…/যা ফেলে এসেছিলে।’ (ফুলের কাছে স্বদেশের ভূগোল নেই/নদীতে মেঘের ছায়া)

বহুমাত্রিক মনিরুজ্জামান

ভাষা বিজ্ঞানী হিসেবে খ্যাতিমান প্রফেসর ড. মনিরুজ্জামান বাংলা ভাষার একজন বিশিষ্ট কবি, গীতিকার, কথাসাহিত্যিক ও শিশু সাহিত্যিক। তিনি বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও ম্যাগাজিনগবেষণাপত্র সম্পাদনা করেছেন। তিনি চট্টগ্রামের লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাস ও চর্চা নিয়ে একটি বৃহদাকায় কাজ করেছেন। গ্রামের বাড়িতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। চর্বিতচর্বণ হবে বলে আমরা এসম্পর্কে তেমন কিছু লিখছি না।

ক্ষমা করবেন

সম্মাননাগ্রন্থে আনন্দমোহন রক্ষিত স্যারের কাছে ক্ষমা চেয়ে কবিতা লিখেছেন। মাওলানা মনিরুজ্জামান এছলামাবাদীর তিনি সম্পাদন করেছেন। মাওলানা ও আমার জন্মের আতুড়ঘর একই গ্রামে। সেজন্য আমি গর্ববোধ করতাম। ২০০৮’এর দিকে “মাওলানা মনিরুজ্জামান এছলামাবাদীর হতাশ জীবন” নামে একটি গ্রন্থ এ্যাডন, ঢাকা প্রকাশ করে। এর জন্য স্যারের মন মানসের সাথে আমার নৈকট্যবোধ হয়। গুরুর ঋণ কিঞ্চিৎ শোধবার জন্য স্যারের কাছ থেকে কিছু ডকুমেন্টস্‌্‌ আমি এনে রেখেছিলাম। চিটাগাং চেম্বার সচিবালয় আন্ডারপ্রেসার কাজ করতে গিয়ে নিজের রুটি রুজি রিজিকের কথা চিন্তা করে সময় দিতে পারিনি। পরবর্তীতে দেখলাম আমাদের অনুজ সতীর্থরা ফুলে ও ফসলে ভরে দিয়েছেন মনিরুজ্জামানের উঠোন। স্যারের সাথে বাংলা সম্মিলনে বেশ ক’বার দেখা হয়েছিল। তার কোনো ফলস্‌্‌ ভ্যানিটি ছিল না। নগরীর কোনো মিটিংয়ে সন্ধ্যায় পথ চলতে দেখা হয়েছে। কখনো কখনো তিনি মাগরিবের নামাজের জন্য ছুটছেন। ধর্মাচারী শুশ্রুমণ্ডিত রাদিচে কথিত মুখাবায়বে ধিষষ ড়ভ মড়ড়ফহবংং, সৌম্য, সুকণ্ঠ, মনিরুজ্জামানের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শণ করছি। দুখের পাষাণে ঘষা সুবাষি চন্দন মনিরুজ্জামান স্যার, আল্লাহ আপনাকে হায়াতে তৈয়বা দিন। অকৃতি, অধমকে ক্ষমা করবেন।

x