বসার জায়গা নেই, তবুও নিয়োগ আড়াই শতাধিক নকলনবীশ

চট্টগ্রাম রেজিস্ট্রি অফিস : সাত কোটি টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ

হাসান আকবর

বৃহস্পতিবার , ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৬:১৫ পূর্বাহ্ণ
541

ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত লোকবল নিয়ে চট্টগ্রামের রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে বেহাল অবস্থা দেখা দিয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় বহু বেশি লোকবল নিয়োগ দেয়া হয়েছে চট্টগ্রামের ২২টি রেজিস্ট্রি অফিসে। নকল নবীশ পদে নিয়োগ দেয়া ২৫৩ জন লোকের বসারই জায়গা নেই। নয়া নিয়োগ পাওয়া এসব লোক সকাল সন্ধ্যা কর্মকর্তাদের দুয়ারে দুয়ারে ধর্ণা দিচ্ছে। সাত কোটিরও বেশি টাকার বাণিজ্য করতে গিয়ে প্রয়োজনের তুলনায় বহু বেশি সংখ্যক লোকবল নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। অপরদিকে নয়া নিয়োগ পাওয়া লোকজনের বসার শেড নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। তাতেও সাড়া মিলেনি। দুদকের পক্ষ থেকে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
চট্টগ্রামে ২২টি রেজিস্ট্রি অফিস রয়েছে। কোর্ট হিলের জেলা রেজিস্ট্রার অফিসসহ নগরী এবং উপজেলা মিলে এসব অফিস রয়েছে। অফিসগুলোতে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক দলিল রেজিস্ট্রি হয়। জমি, ফ্ল্যাট, বিভিন্ন ধরনের চুক্তি মিলে শত শত দলিল রেজিস্ট্রি হয় চট্টগ্রামে। রেজিস্ট্রিকৃত দলিল বালামে তোলা এবং নকল সরবরাহ দিতে হয়। প্রতিটি রেজিস্ট্রি অফিসে এসব কাজ করার জন্য নকল নবীশ রয়েছেন। যারা প্রতিটি দলিল হুবহু নকল করে বালামে তোলেন এবং নকল তৈরি করেন। চট্টগ্রামের রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে পাঁচ শতাধিক নকল নবীশ রয়েছেন।
গত বছর কয়েক নকল নবীশ নিয়োগ বন্ধ ছিল। এ অবস্থায় বিপুল সংখ্যক দলিল আটকা পড়ে। দলিল বালামে তোলার কাজও ব্যাহত হয়। বিষয়টির সুরাহার জন্য সারাদেশে নকল নবীশ নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হয়। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে কত নকল নবীশ প্রয়োজন তার একটি চাহিদা পত্র চাওয়া হয়। চট্টগ্রামের জেলা রেজিস্ট্রার বিভিন্ন অফিসের চাহিদা উল্লেখ করে শ’ খানেক লোকবল নিয়োগের একটি চাহিদাপত্র ঢাকায় প্রেরণ করেন। কিন্তু লোকবল নিয়োগের পর দেখা যায়- চাহিদার চেয়ে বহু বেশি লোকবল নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তাদেরকে কাজ দেয়া দূরের কথা, বসার জায়গাও নেই বিভিন্ন অফিসে। মাস্টার রোল ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া এসব নকল নবীশ প্রতি পৃষ্ঠা নকলের জন্য ২৪ টাকা করে পেয়ে থাকেন। প্রতি পৃষ্ঠা নকলের জন্য সরকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে ৪০ টাকা আদায় করে। এর মধ্যে ১৬ টাকা সরকারি খাতে রেখে ২৪ টাকা নকল নবীশকে দেয়া হয়। এর বাইরেও অবশ্য নকল নবীশদের বেশ কিছু আয় রয়েছে বলেও সূত্র জানিয়েছে। নকল নবীশের জন্য এসএসসি পাস প্রয়োজন হলেও সারা দেশে উচ্চ শিক্ষিত বহু যুবক যুবতী এ কাজে যোগ দিয়েছেন। প্রতিটি নিয়োগের পেছনে তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। চট্টগ্রামে ২৫৩ জন নকল নবীশ নিয়োগে সাত কোটির বেশি টাকার লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
তবে চট্টগ্রামে আরো কিছু যুবক যুবতী নিয়োগের আশায় ঘুরছেন। তারা জেলা রেজিস্টার অফিসে এসে নিয়োগের জন্য তদবির করছেন। জেলা রেজিস্ট্রার নিয়োগকৃত লোকজনকে বিভিন্ন উপজেলায় পাঠিয়ে পদায়নের চেষ্টা করলেও অধিকাংশ সাব রেজিস্টিার অফিসে বসার জায়গা নেই। এতে সাব রেজিস্টাররা নয়া নিয়োগ পাওয়া লোকবল গ্রহণে অক্ষমতা জানিয়েছেন। তবুও চট্টগ্রামের বিভিন্ন রেজিস্ট্রি অফিসে ২৫৩ জনকে পদায়ন করা হয়। এর মধ্যে সদর রেজিস্ট্রি অফিসে ৯৫ জন। চান্দগাঁও রেজিস্ট্রি অফিসে ৩২ জন, পাহাড়তলী রেজিস্ট্রি অফিসে ৫ জন,সীতাকুণ্ডে ১৮ জন, মীরসরাইতে ৮ জন, জোরারগঞ্জে ৬ জন, কাজীর হাটে ৬ জন, নানুপুরে ২ জন, ফটিকছড়িতে ৭ জন, হাটহাজারীতে ১৩ জন, ফতেয়াবাদে ১ জন, বোয়ালখালীতে ৬ জন, পটিয়ায় ৬ জন, রাউজানে ১৫ জন, আনোয়ারায় ৫ জন, বাঁশখালীতে ১৫ জন, আধুনগরে ২ জন, সন্দ্বীপে ৯ জন, সাতকানিয়ায় ১৪ জন এবং রাঙ্গুনিয়াতে ৫ জন নকল নবীশ পদায়ন করা হয়।
চাহিদার চেয়ে বহু বেশি নকল নবীশ নিয়োগ দেয়ার কথা স্বীকার করেছেন জেলা রেজিস্ট্রার নাজমা ইয়াসমীন। এ বিষয়ে গতকাল তিনি দৈনিক আজাদীকে বলেন, চাহিদার চেয়ে বেশি লোকবল দেয়ায় আমরা বসার জায়গা দিতে পারছি না। আমরা একটি নতুন শেড নির্মাণ করে দেয়ার প্রস্তাব করেছি। এখনও পর্যন্ত বরাদ্দ আসেনি। নতুন শেড করা হলে নকল নবীশদের বসার জায়গা হবে। আর বসতে পারলে কাজও পাবে। বহু কাজ জমা হয়ে আছে বলেও তিনি জানান।
টাকা নিয়ে নিয়োগ দেয়া এবং কেউ কেউ টাকা দিয়েও নিয়োগ না পেয়ে অপেক্ষমান থাকার বিষয়টি বেশ আলোচিত হচ্ছে। নকল নবীশদের মাস্টার রোলের ভিত্তিতে অস্থায়ী নিয়োগ দেয়া হলেও পরবর্তীতে তাদের মাঝ থেকে পদোন্নতি দিয়ে আত্মীকরণ করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে জেলা রেজিস্টার নাজমা ইয়াসমীন কিছু জানেন না বলে জানান। তিনি বলেন, আমরা কোন লোকবল নিয়োগ দিইনি। ঢাকা থেকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এখন কেউ লেনদেন করেছেন কিনা বা কার সাথে করেছেন তা আমার জানা নেই। তবে এ ধরনের কাজে কেউ টাকা দিয়ে নিয়োগ পেয়েছেন বলে তিনি মনে করেন না।
চট্টগ্রামে ২৫৩ জন নকল নবীশ নিয়োগে সাত কোটির বেশি টাকার বাণিজ্যের খবরটি দুদকে দেয়া হয়েছে। দুদকের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান করা হচ্ছে। দুদকের মহাপরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, নকল নবীশ নিয়োগে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্যের বিষয়টি আমরা শুনেছি। এবিষয়ে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। শুধু নকল নবীশই নয়, রেজিস্ট্রি অফিসের আরো বিভিন্ন দুর্নীতির তথ্য উপাত্ত আমাদের কাছে আসছে। সবকিছু খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি যে কোন ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদকের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট বলেও মন্তব্য করেন।

x