বর্ষায় সবুজ পাহাড়ের গায়ে পরগাছার মত জড়িয়ে থাকে সাদা মেঘ

আলাউদ্দিন শাহরিয়ার : বান্দরবান

সোমবার , ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ১১:১৭ পূর্বাহ্ণ
117

পাহাড়ের সৌন্দর্য ফুটে উঠে বর্ষায়। পাহাড়গুলো সাজে রাজকন্যার মতো। দেখে ঠিক মনে হতে পারে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জেলা বান্দরবান যেন একটি সবুজ কার্পেটের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দু’চোখ যেদিকে যায় শুধুই সবুজের সমারোহ। বিশুদ্ধ শান্তির পরশ বয়ে চলে চারদিকে। চলে মেঘ আর পাহাড়ের মধ্যে লুকোচুরি খেলা। পাহাড়ের বৃক্ষগুলোও যেন প্রাণ ফিরে পায় বর্ষায়। প্রকৃতি যেন সবটুকু উজাড় করে দিয়ে পেখম মেলে বসে আছে সৌন্দর্য বিকাশে। বর্ষায় পাহাড়ের ঝরণা ধারা জলরাশি গুলোও ডানা মেলে ধরে অন্যরকম এক রূপে।
ভ্রমণপিপাসুরা জীবনের ছক থেকে একটু বেড়িয়ে হারিয়ে যেতে পারেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি খ্যাত বান্দরবান জেলায়। বৃষ্টির সময় পাহাড় দেখার মজা আলাদা। ঘুরে বেড়াতে পারেন বান্দরবানের অন্যতম দর্শণীয় স্থান নীলাচলের মেঘে ঢাকা পাহাড়ে। মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্স লেকের স্বচ্ছ জলে প্যাডেল বোটে, ভাসাতে পারেন সাঙ্গু নদীতে ডিঙ্গি নৌকাও। আর মেঘ ছুঁয়ে দেখার স্বপ্ন’কে সত্যি করতে ঘুরে আসতে পারেন, মেঘের রাজ্য স্বপ্নিল নীলগিরি, নীলদিগন্ত, চিম্বুক, ক্যাওক্রাডং পাহাড়ে। পাহাড় ভ্রমণ যাদের বেশি পছন্দ, সময় নিয়ে আজি তারা বেড়িয়ে পড়ুন পার্বত্য জেলা বান্দরবানের উদ্দেশ্যে। বর্ষায় পাহাড়ের সৌন্দর্য যারা দেখেননি, তাদের জন্য মোক্ষম সুযোগ এখন। সবুজ পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে বেড়াতে ভালো লাগবে নিঃসন্দেহে। এ জেলায় রয়েছে বেড়ানোর মতো অসংখ্য সুন্দর সবজায়গা। যেদিকেই চোখ যায়, শুধুই যেন সৌন্দর্যের ছড়াছড়ি। পর্যটন শহরের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে বোমাং রাজার বাড়ি। এখানে বান্দরবান বোমাং সার্কেল চীফ রাজা সহ রাজপরিবারের উত্তরসূরীরা অনেকে বসবাস করেন। এই জেলায় সাঙ্গু এবং মাতামুহুরী নামে দুটি নিজস্ব নদী বয়ে গেছে আপন মহিমায়। এ নদীর দুটি উৎপত্তিস্থলও কিন্তু বান্দরবান। বাংলাদেশ সীমান্তের ঝরণা ধারা থেকে উৎপত্তি হয়ে সমুদ্রে মিশে গেছে।
এদিকে বৈচিত্রময় বান্দরবানের অন্যতম পর্যটন স্পট নীলাচলের সৌন্দর্য হচ্ছে অন্যরকম। বৃষ্টিতে সাদা মেঘ ছুঁয়ে যায় নীলাচল ট্যুরিষ্ট স্পটটির অবকাঠামোগুলো। দূর আকাশের মেঘ ভেসে আসে নীলাচল পাহাড়ের চূড়ায়। ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের মুহূর্তে মেঘ ভিজিয়ে দিয়ে যায় এখানে। মেঘে ছুঁয়ে দেখার স্বপ্নটা সত্যি হতে পারে এখানেও। যান্ত্রিক জীবনের নানা কর্মব্যস্ততার ফাঁকে কিছুটা প্রশান্তি এবং প্রাকৃতিক নির্মল ছোঁয়ায় ঘুরে বেড়াতে ছুটে যেতে পারেন নীলাচলে। কারণ বৃষ্টির ছোঁয়ায় পাহাড়গুলো যেন ফিরে পায় নতুন প্রাণ, চারিদিকে ঢাকা পড়ে সবুজের আবরণে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বান্দরবান সারাদেশে একনামে পরিচিত। শুধু এ নামেই নয়, পার্বত্য এ জেলাটির রয়েছে আরো অনেকগুলো নামও। পাহাড় কন্যা, পর্যটন কন্যা, বাংলার দার্জিলিং, নৈসর্গিক ভূমি এবং অনেকে মেঘ পাহাড়ের দেশও বলে থাকেন বান্দরবান পার্বত্য জেলাটিকে। আর নামগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভ্রমণপিপাসু মানুষের ভালোলাগা আর ভালোবাসা। পর্যটনের অপার সম্ভাবনাময় জেলাটিকে প্রকৃতি সাজিয়েছে দু’হাত ভরে। ভ্রমণপিপাসু মানুষের চাহিদা মেটানোর সব উপকরণই রয়েছে এ জেলায়।
ঢাকা থেকে বেড়াতে আসা পর্যটক দম্পতি জাকিয়া সুলতানা ও রেদোয়ান হাসান বলেন, বর্ষায় পাহাড় যতটা আতঙ্কের তার চেয়ে বহুগুণ বেশি সুন্দর। পাহাড়ের সৌন্দর্য ফুটে উঠে বৃষ্টির পরশে। দূর থেকে সবুজ পাহাড়গুলো দেখে মনে হয়, যেন সবুজ কার্পেটের উপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিবছরই বর্ষায় বান্দরবান, রাঙামাটি এবং খাগড়াছড়ি তিনটি জেলায় ভ্রমণে আসি। তবে আমাদের ভালোলাগা আর পছন্দের জায়গায় বান্দরবান অন্যতম। অনেক স্মৃতি আর ভালোলাগা মুহূর্ত জড়িয়ে আছে বান্দরবান। বর্ষার সৌন্দর্যের সঙ্গে অন্যসময়গুলো মেলানো কঠিন। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থার আরেকটু উন্নয়ন দরকার। শুনলাম বান্দরবান সড়কটি প্রশস্ত করা হচ্ছে, তীন্দু, লিক্রে সড়ক নির্মাণের কাজও দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। পর্যটন শিল্পের সম্প্রসারণের কথাটি মাথায় রেখে নিরাপত্তা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মকান্ডগুলো বাস্তবায়নের দিকে নজর দিতে হবে সংশ্লিষ্টদের।
অপরদিকে দেশের অন্যতম পর্যটন সম্ভাবনাময় বান্দরবান জেলাকে প্রকৃতির নিপুণ শিল্পকর্মের অনন্য স্থান বললে বোধহয় ভুল হবেনা। আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে পাহাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা, সফেদ মেঘেদের ভেলা, পাহাড় চূড়া থেকে প্রবাহিত অসংখ্য ঝর্ণাধারা, থানচিতে সাঙ্গু নদীর মোহনায় সাজানো পাথরের সমাহার, নদীর পাড়ে পাথরের সান বাঁধানো প্রাকৃতিক দেয়াল, উঁচু পাহাড়ে গহীণ অরণ-সুনসান নিরবতার কারণে পর্যটকদের সহজেই কাছে টানে বান্দরবান। ঋতু বৈচিত্যের সঙ্গে বান্দরবানের রূপ বদলায়, সৌন্দর্যে আসে বৈচিত্রতা। তবে একেক ঋতুতে বান্দরবানের সৌন্দর্য একেক রকম। বর্ষায় পাহাড়ি জেলাটি রূপ লাবণ্য যেন ভিন্নমাত্রায় ফুটে উঠে। ধূলি ধূসরিত পরিবেশ হয়ে উঠে স্বচ্ছ। নীলাচল, নীলগিরি, চিম্বুক, নীলদিগন্ত, ক্যাওক্রাডং, বগালেক, সাকাহাফং পাহাড়ের সবুজাভ চূড়ায় শুভ্র মেঘেদের বিচরণ এবং যখন-তখন অঝোরধারায় বৃষ্টিতে পাহাড়ি পথ হয়ে ওঠে বিপদজ্জনক। শিহরণ জাগে মনে। সেই সঙ্গে কয়েক হাজার ফুট উপর থেকে নেমে আসা দামতুয়া, তিনাপ সাইতার, রিজুক, জাদিপাই, চিংড়ি, নাফাকুম, ঝুরঝুড়ি, শৈলপ্রপাতের ঝর্ণাধারার দৃশ্য যে কারোর নয়ন জুড়ায়। আবার শীতে অন্যরূপে হাজির হয় বান্দরবান। চারিদিকে তখন সবুজের সমারোহ, পাহাড়ের চূড়ায় গহীণ অরণ্য। সাঙ্গু ও মাতামুহুরী দুটি নদীর স্বচ্ছ জলে নৌ-ভ্রমণ, অবগাহনের আনন্দই আলাদা।
বান্দরবানের আবাসিক হোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম বলেন, বৈচিত্রময় সৌন্দর্যের সঙ্গে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জেলা হিসাবেও বান্দরবানের সুনাম রয়েছে। এখানে ১১টি ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠী’সহ ১৪টি সম্প্রদায়ের বসবাস রয়েছে। দেশের কোথাও একসঙ্গে এতটি সম্প্রদায়ের বসতি নেই। এছাড়াও দেশের সর্বোচ্চ পাহাড় চূড়া, ঝরণা ধারা, পাহাড়ের চূড়ায় প্রাকৃতিক লেক, নদী, ঝুলন্ত সেতু, আলীর সুরঙ্গ, বাদুরগুহা, দেবতা পাথর, বৌদ্ধ ধর্মীয় স্বর্ণ জাদি মন্দির, রাজবাড়ি কি নেই এ জেলায়। পর্যটকদের মন জোড়ানো সমস্ত আয়োজন রয়েছে এখানে। পর্যটকদের নিরাপদ এবং আরামদায়ক ভ্রমণ নিশ্চিত করতে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনীয় সবধরণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
এদিকে কি নেই পর্যটনের অপার সম্ভাবনাময় বান্দরবান জেলায়। এখানে রয়েছে সদর উপজেলায় পাহাড়ের চূড়ায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে শৈল্পিক ছোঁয়ায় গড়ে তোলা নীলাচল পর্যটন স্পট। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় দেড় হাজার ফুট উচ্চতায় পাহাড়ের চূড়ায় দর্শণীয় স্থানটির অবস্থান। এখানে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, সিঁড়ি, গোলঘর, ভাস্কর্য এবং কটেজ। নীলাচল থেকে দেখা মিলবে সূর্যাস্তের দৃশ্যও। স্পটটি দিনের চেয়েও রাতের চাঁদের আলোয় সময় কাটানো অতি রোমাঞ্চকর। বর্ষায় মেঘ ভেসে বেড়ায় নীলাচল পাহাড়ে। মেঘে ভেসে বেড়ানোর ইচ্ছাটাও পূরণ হবে বৃষ্টির সময় এখানে বেড়াতে এলে। আর নীলগিরি ট্যুরিস্ট স্পটটি পর্যটকদের কাছে স্বপ্নীল একটি নাম। আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন কার না জাগে, মেঘে গা ভাসানোর ইচ্ছে কার না করে। তবে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন পূরণ না হলেও মেঘে গাঁ ভাসানো সম্ভব এখানে। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় তিন হাজার ফুট উচ্চতায় পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত নীলগিরি। বর্ষায় হাত বাড়ালেই মেঘ ছোঁয়া যায় এখানে, অনেকটা মেঘের দেশে ভেসে বেড়ানোর মত। ঘন মেঘের চাদরে হারিয়ে যেথে নীলগিরি হচ্ছে উপযুক্ত স্থান। পাহাড়ী আকাবাঁকা সড়কের ৪৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে জমাতে হয় নীলগিরি যেতে। অন্যদিকে বাংলার দার্জিলিং খ্যাত চিম্বুক পাহাড় দর্শণীয় স্থানটি শৈল্পিক ছোঁয়ায় সাঁজানো হয়েছে প্রশাসনের উদ্যোগে। একাধিক পর্যবেক্ষণ পয়েন্ট তৈরি করা হয়েছে। রাত্রি যাপনের জন্য রয়েছে রেস্টহাউজও। চিম্বুক পাহাড়ের আশপাশ ঘিরেই পাহাড়ি মুরুং (ম্রো) জনগোষ্ঠীর বসবাস। জেলায় সবকটি উপজেলার সাথে টেলিযোগাযোগের ব্যবস্থা রক্ষার জন্য চিম্বুকে বাংলাদেশ তার ও টেলিফোন বোর্ড একটি বেইজ স্টেশন ও টাওয়ার স্থাপন করেছে।
এদিকে মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্সে রয়েছে দুটি আকর্ষণীয় ঝুলন্ত সেতু। ছোট্ট পরিসরে গড়ে তোলা চা বাগান। চিড়িয়াখানা, প্রাকৃতিক লেক, রফওয়ে, ট্যুরিস্ট ভ্রমণ ট্রেইন, শিশু পার্ক এবং প্যাডেল বোটে লেকে ভ্রমণের সুবিধা। রয়েছে রাত্রী যাপনের ব্যবস্থাও। এছাড়াও শৈলপ্রপাত ঝর্ণা হচ্ছে প্রাকৃতির অপরূপ সৃষ্টি। শৈলপ্রপাতের স্বচ্ছ পানির জলধারাটি সর্বদা বহমান। মনমাতানো এ দৃশ্য স্মৃতিতে ধরে রাখার মত। এই স্পটের পাশেই স্থানীয় বম জনগোষ্ঠীর পাহাড়ি নারীরা কোমর তাঁতে বুনা কাপড়সহ বিভিন্ন পণ্যসামগ্রি বিক্রি করেন। বান্দরবানে উৎপাদিত মৌসুমি ফলমূল সবসময় পাওয়া যায় এইখানে। অপরদিকে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান হিসাবে পরিচিত বৌদ্ধ ধাতু স্বর্ণ মন্দির এবং রামজাদী মন্দির হচ্ছে স্থাপত্যের অপূর্ব এক নিদর্শন। মিয়ানমার, শ্রীলংকাসহ কয়েকটি রাষ্ট্র থেকে আনা শ্রমিক এবং শিল্পীরা এটি দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় নির্মাণ করেছে। জাদিতে রয়েছে ছোট, বড় প্রায় শতাধিকেরও বেশি বৌদ্ধ মূর্তি। এদিকে পর্যটন শিল্পের সঙ্গে নতুন সংযোজন নীলদিগন্ত ট্যুরিস্ট স্পট। থানচি সড়কের জীবন নগর পয়েন্টে প্রশাসনের উদ্যোগে স্পটটি গড়ে তোলা হয়েছে। অন্যদিকে নীল জলের প্রাকৃতিক জলাশয় কিংবদন্তি বগালেক। এই লেকটি সৃষ্টির পেছনে রয়েছে অনেক অজানা কাহিনী। পাহাড়িরা এটিকে দেবতার লেক বলেও চেনে। পাহাড়ের উপরে সান বাঁধানো বেষ্টনিতে প্রায় ১৫ একর জায়গা জুড়ে বগালেকের অবস্থান। এই লেকের পানি দেখতে নীল রঙের। সমুদ্র পৃষ্ঠ হতে প্রায় দু’হাজার ফুট উচ্চতায় পাহাড়ের চূড়ায় প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি বগালেকের। রুমা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই লেক। আর পাহাড়ের উপর থেকে অবিরাম ঝরে পড়ছে রিজুক ঝর্ণার পানি। সাঙ্গু নদীপথে রুমা থেকে সামনের দিকে যেতেই ঝমঝম শব্দে ঝর্ণার পানি ঝরে পড়ার দৃশ্য চোখে পড়ে। রিজুক ঝর্ণার হিমশীতল স্বচ্ছ পানি খুবই ঠান্ডা। এছাড়াও আলীকদমের দামতোয়া ঝর্ণা, কুরুকপাতা ঝর্ণা, রুমায় অবস্থিত তিনাপ সাইতার ঝর্ণা হচ্ছে প্রকৃতির অপরূপ দান। আর দেশের সর্বোচ্চ পর্বত চূড়া গুলোও এ জেলায় অবস্থিত। ন্যাচারাল এডভেঞ্চার ক্লাব ও নর্থ আল পাইন বাংলাদেশের দাবি সাকা হাফং বা থ্লাংময় পাহাড় চূড়া দেশের সর্বোচ্চ পর্বত চূড়া। যার উচ্চতা ৩৪৮৮ ফুট। আর তাজিংডং (বিজয়) পাহাড়ের উচ্চতা সমুদ্র পৃষ্ঠ হতে প্রায় ৩৪০০ ফুট। এছাড়া কেওক্রাডং পাহাড়ের উচ্চতা ৩১৭২ ফুট। পর্বত চূড়াগুলোর প্রথমটি থানছি উপজেলায় এবং অপরদুটি রুমা উপজেলায় অবস্থিত। রুমা থেকে তাজিংডং (বিজয়) চূড়ার দূরত্ব প্রায় ২৫ কিলোমিটার এবং কেওক্রাডং পাহাড়ের দূরত্ব রুমা উপজেলা থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার। পাঁয়ে হেঁটে যেতে হয় পর্বত চূড়া গুলোতে। তবে শুষ্ক মৌসুমে জীপ গাড়িতে করে তাজিংডং চূড়ার কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব।
অপরদিকে রহস্যময় থানচি উপজেলা ভ্রমণ দারুন রোমাঞ্চকর। বান্দরবানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের শেখড়ে রয়েছে দূর্গম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থানচি। পাহাড়, আকাশ, নদী এবং ঝর্ণা এখানে মিলেমিশে একাকার। সবুজ পাহাড়ের গাঁয়ে পরগাছার মত জড়িয়ে আছে সাদা মেঘ। ভাগ্য সহায় হলে যাত্রাপথে রাস্তায় মেঘ এসে ধরা দিতে পারে আপনাকে। জেলা সদর থেকে থানচি উপজেলার দূরত্ব ৮৫ কিলোমিটার। পাহাড়ের গা ঘেসে উচু নীচু রাস্তায় ছুটে চলে গাড়ীগুলো। হঠাৎ নীচের দিকে তাকালে শিউরে উঠে গা, কত উচু দিয়ে চলাচল করছে গাড়ি। যাত্রীবাহী বাস এবং জীপ গাড়ি দুটোরই ব্যবস্থা রয়েছে। বাসে থানচিতে যেতে সময় লাগে প্রায় চার ঘন্টা। থানচি থেকে ইঞ্জিন চালিত বোটে যেতে হবে দর্শণীয় স্থান রেমাক্রীতে। মধ্যেখানে নদীর চড় বেয়ে পাঁয়ে হাঁটার পথও রয়েছে। সবমিলিয়ে রেমাক্রী পৌছাতে সময় লাগবে তিন থেকে চার ঘন্টা। রেমাক্রী’তে পাথরের ফাঁকে ফাঁকে প্রবাহিত সাঙ্গু নদীর স্বচ্ছ পানির দৃশ্য মুগ্ধ করে পর্যটকদের। রেমাক্রীতে সাঙ্গু নদীকে মনে হয় পাথরের নদী এবং বয়ে চলেছে ঝর্ণার স্বচ্ছ পানি। সত্যিই অন্যরকম এক ধরণের সৌন্দর্য লুকিয়ে রয়েছে এখানে। রেমাক্রীতে পাথরে ভাজে ভাজে রয়েছে বিপদের শঙ্কা। রেমাক্রীমুখ থেকে নাফাকুম ঝর্ণা এবং বাদুর গুহা যেতে পাহাড়ের ঢালে ঢালে প্রায় তিন-চার ঘন্টা পাঁয়ে হাটার রাস্তা। দূরত্ব প্রায় এগারো-বারো কিলোমিটার। নেই নাফাকুম যাবার কোনো রাস্তাও। ভ্রমণ পিপাসুরা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে বন-জঙ্গল মাড়িয়ে নাফাকুমে যাচ্ছেন। যাবার পথে ছোটছোট কয়েকটি খাল-ছড়াও পার হতে হয় পর্যটকদের। তবে চলাচলে রাস্তা এবং থাকার কোনো ব্যবস্থা না থাকলেও ভ্রমনে নিরাপত্তা স্বার্থে পর্যটকদের সঙ্গে একজন স্থানীয় গাইড নেয়ারও নিয়ম রয়েছে প্রশাসনের। নাফাকুম ঝর্ণার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে ভ্রমণের সকল ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে নিমিষেই। এদিকে সবুজের মাঝখানে প্রাকৃতিক লেক। নাম তার প্রান্তিক লেক। প্রায় আড়াই একর পাহাড়ি এলাকা জুড়ে প্রান্তিক লেকের অবস্থান। বান্দরবান-কেরানীহাট সড়কের হলুদিয়ার সন্নিকটে প্রান্তিক লেক অবস্থিত। অপূর্ব সুন্দর লেকের চারপাশ নানান প্রজাতির গাছ গাছালিতে ভরপুর। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকলেও প্রান্তিক লেক এখনো অবহেলিত। পর্যটন স্পট হিসেবে প্রান্তিক লেকের পরিচিতি কম হলেও লেকের সৌন্দর্য সত্যি দৃষ্টি নন্দন। অন্যদিকে দেশের সবচেয়ে উঁচু সড়কপথও বান্দরবান জেলায়। থানচি-আলীকদম সড়কটি সমুদ্র পৃষ্ঠ হতে প্রায় তিন হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত। এই সড়কের ডিম পাহাড় চূড়াটি পর্যটন শিল্পে যুক্ত করেছে নতুন মাত্রা। পাহাড়টি অনেকটায় ডিম আকৃতির। এছাড়াও লামা উপজেলার মিরিঞ্জা পর্যটন স্পট, আলীকদমের আলীর সুড়ঙ্গ এবং নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার উপবন পর্যটন স্পটটি সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ পর্যটকেরা। ভ্রমণপিপাসু মানুষের পাশাপাশে স্থানীয়রাও ভিড় জমান স্পটগুলোতে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো: দাউদুল ইসলাম জানান, বৈচিত্রময় বান্দরবানের পর্যটন শিল্পের বিকাশে নতুন নতুন আরো কিছু দর্শণীয় পর্যটন স্পট খোঁজা হচ্ছে। দামতুয়া ট্যুরিষ্ট স্পটের সৌন্দর্য বর্ধণে অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ করা হচ্ছে। নিরাপত্তা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা’সহ পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে প্রশাসন। পর্যটকদের ভ্রমণে কোনো ধরনের ঝুঁকি নেই এখানে।
কিভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে সরাসরি এসি-ননএসসি বাসে আসা যায় বান্দরবান। আর চট্টগ্রামের বহাদ্দা হাট বাস টার্মিনাল থেকে প্রতি ত্রিশ মিনিট অন্তর পূরবী-পূর্বাণী নামে দুটি বাস সার্ভিস চালু রয়েছে। এছাড়াও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কের কেরানীহাট রাস্তার পয়েন্ট থেকে সরাসরি বাস সার্ভিস চালু রয়েছে। সিএনজি গাড়িতেও আসা যায় দ্রুত। কক্সবাজার থেকে বান্দরবানের সঙ্গে সরাসরি বাস সার্ভিস চালু রয়েছে।
কোথায় থাকবেন
বান্দরবানে পর্যটকদের থাকার জন্য অনেকগুলো আবাসিক হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট এবং গেস্টহাউজ রয়েছে। হলিডে ইন রিসোর্র্টে দুই হাজার থেকে আট হাজার টাকার মধ্যে রাত্রী যাপনের সুব্যবস্থা রয়েছে। যোগাযোগ হলিডে ইন- ০১৫৫৬৯৮০৪৩২। ফোন-০৩৬১-৬২৮৯৬। ভেনার্স রিসোর্টে রয়েছে তিন হাজার থেকে ৬ হাজার টাকায় রাত্রি যাপনের সুব্যবস্থা। যোগাযোগ:-০৩৬১-৬৩৪০০। পালকি গেস্ট হাউজে রাত্রি যাপনে গুণতে হবে এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত। যোগাযোগ-০৩৬১-৬৩১৫৫৫, মোবাইল-০১৮১২৬৮৬৭৫৫। সাইরু রিসোর্ট এ রাত্রি যাপনে আপনার গুণতে হবে ১০ হাজার থেকে ১৮ টাকা পর্যন্ত। যোগাযোগ-০১৫৩৪১১১১১১। বননিবাস রিসোর্টে রাত্রী যাপনে গুণতে হবে দুই হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। যোগাযোগ-০১৭২৫১৫৯৪১৫।
কীভাবে ঘুরে বেড়াবেন
বান্দরবান জেলায় দর্শণীয় স্থানগুলো ঘুরে বেড়ানোর ভাড়ায় চালিত ট্যুরিস্ট সার্ভিস চালু রয়েছে। এছাড়াও সিএনজি-মাহেন্দ্র জীপ গাড়িও ভাড়ায় পাওয়া যায়। কিন্তু দু’একজনের জন্য রিজার্ভ ট্যুরিস্ট গাড়িগুলোর ভাড়া অনেক বেশি। সেক্ষেত্রে দলবল নিয়ে স-পরিবারে আত্মীয় পরিজন নিয়ে একসঙ্গে বান্দরবান ভ্রমণে এলে খরচটা অনেকটাই সাশ্রয়ী হয়।

x