বর্তমান ও ভবিষ্যতের সংকট বায়ুদূষণ

ড. মুহাম্মদ ইদ্রিস আলি

বুধবার , ১২ জুন, ২০১৯ at ৫:৩৩ পূর্বাহ্ণ
28

প্রাণের নিশ্চায়ক, নির্ভরক বায়ু, পানি, মাটি এবং সবুজ। এসব অমূল্য প্রাণসম্পদের নির্ভরতা ও মিথস্ক্রিয়ায় জীবন লালিত হয়, বাহিত হয়। এসবের নির্মলতা আর বিশুদ্ধতায় প্রাণের পৃথিবীতে প্রাণে স্পন্দন, জীবনে ছন্দ এবং প্রাকৃতিকতা ও নান্দনিকতার চিরায়ত অবস্থান।
পৃথিবীর উপরিভাগে বায়ুমণ্ডলের যে স্তর, তার প্রথমটির বিস্তৃতি ভূভাগ থেকে পৃথিবীকে বেষ্টন করে প্রায় পনের কিলোমিটার। এর নাম ট্রপোস্ফিয়ার। অন্যান্য বিভিন্ন স্তরগুলোর ভিতর এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই গুরুত্বের একাধিক দিক আছে। পৃথিবীর উৎপাদিত যত গ্যাস, বালিকণা, ধুলিকণা, জলবাষ্প, ভাসমান, দৃশ্যমান, অদৃশ্যমান, ধূয়া, প্রাকৃতিক, জীবাশ্ম জ্বালানির নির্যাস, উন্নয়ন অবকাঠামো নির্মাণ আবর্জনা, সবকিছুর গ্যাসীয় বা বায়বীয় নির্যাস বহন করে এই ট্রপোস্ফিয়ার। এ অঞ্চলের তাপমাত্রারও বৈচিত্র্য আছে। পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে উপরের দিকে উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে তাপমাত্রা কমতে থাকে। প্রতি এক কিলোমিটার উচ্চতা বৃদ্ধিতে তাপমাত্রা কমে গড়ে ছয় ডিগ্রি সেলসিয়াস। আরও বিশেষত্ব হলো, পৃথিবীর উপর সংঘটিত যতো প্রকার, ঝড়-ঝঞ্ঝা, ঘূর্ণিঝড়, ঘূর্ণিপাক, দুর্বিপাক, তুফান, বৃষ্টি, শিলাঝড়, বজ্রপাত সবই পৃথিবীপৃষ্ঠের এই ট্রপোস্ফিয়ার অংশে সংঘটিত হয়। এছাড়াও বায়বীয় বা পানিবাহিত সব রোগের জীবানুর পরিবহন এবং সংক্রমণও এই বিশেষ বায়ুমন্ডলীয় অংশে সংঘটিত হয়ে থাকে। পৃথিবীর কর্মকাণ্ড থেকে উৎসারিত বা তাপমাত্রার ঘটন থেকে উৎপাদিত বহুমাত্রিক রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে এই অঞ্চল তথা বায়ুমণ্ডল রাসায়নিকের ঘনত্বে পরিপূর্ণ থাকে। এর সাথে যুক্ত হয় আমাদের দৈনন্দিন জীবনাচার, শিল্পাচার, উন্নয়নাচারের নির্যাস দূষক। কার্বনের অঙাইড, সালফারের অঙাইড, নাইট্রোজেনের অঙাইড, বিভিন্ন প্রকার এসপিএম, টঙিক ধাতব কণা, ওজোনস্তর ক্ষয়কারী সিএফসি, এইচসিএফসি গ্যাস অনু, পরমাণু, রেডিকেল, ফ্রি-রেডিকেল, আয়ন প্রভৃতি।
আমাদের বেঁচে থাকার, প্রাণের স্পন্দনের অন্যতম প্রধান নৈসর্গিক উপাদান হলো বাতাস। বাতাস অঙিজেন ধারণ করে। প্রশ্বাসের মাধ্যমে তা গ্রহণ করে আমরা ফুসফুসে পাঠাই। ফুসফুসে রক্ত কণিকার মাধ্যম দিয়ে তা অঙিহিমোগ্লোবিন আকারে সমস্ত দেহে সংবাহিত হয়। প্রতিমুহূর্তে বাতাস গ্রহণ করে দেহের ফুসফুস এ গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করে যাচ্ছে নীরবে নিভৃতে। আমরা বেঁচে আছি, বেঁচে থাকছি। বিশুদ্ধ বাতাস নির্ভর এই বেঁচে থাকার গুরুত্বের উপলব্ধি আমাদের কাছে কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ? প্রক্রিয়ার ভিন্নতা হলেও সব উদ্ভিদ ও প্রাণি প্রায় একই পদ্ধতিতে বেঁচে থাকে। অঙিজেন প্রয়োজন সব প্রাণের। বাতাসের ভিতর ডুবে থাকা সব প্রাণ সত্তার প্রাণের স্পন্দন হলো বাতাস। বাতাস তাই প্রাকৃতিক মূলধন এবং অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ।
বাতাসের দূষণ উদ্ভিদ প্রাণির জীবন চক্রকে দারুণভাবে সংকটাপন্ন করে তুলবে। এটি পরম সত্য। মানুষ প্রাণী নিরঙ্কুশ ভাবে বাতাস নির্ভর। সেই বাতাস যখন দূষণে আক্রান্ত হয় তখন সংকটটি বিস্তৃত হয় অস্থিত্বে। টিকে থাকার, বাঁচা মরার। সারা দুনিয়ায় বাতাসের দূষণ আজ জীবনের অস্তিত্বকে সংকটাপন্ন করে তুলেছে। বিশ্বময় বায়ুদূষণে অস্থির জীবনযাত্রা। বাতাস প্রবাহের দেশীয় বা আন্তর্জাতিক সীমানা নেই। বাতাস দূষণকে পরিবাহিত করে । তাই এক অঞ্চলের সৃষ্ট দূষণ অন্য অঞ্চলের জীবনযাত্রাকেও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
সবুজ, পানি এবং বাতাসের একমাত্র গ্রহ এই পৃথিবী। আজ যখন আমাদের দেখতে হয় যে এই পৃথিবীর প্রায় ৮ মিলিয়ন মানুষ প্রতিবছর মৃত্যুবরণ করছে শুধুমাত্র সূক্ষ্ম ধুলিকণার দূষিত বায়ু সেবনের কারণে। আর এদের অর্ধেকের বেশি নারী ও শিশু। তারপর পরিসংখ্যান যখন বলে, পৃথিবীতে প্রতি বছর স্ট্রোকে যে মানুষ মারা যায় তার ২৪% অর্থাৎ প্রায় ১.৪ মিলিয়ন মারা যায় বায়ুদূষণে। তেমনি ফুসফুসের রোগ ও ক্যান্সারে মৃত্যুর হার শতকরা ৪৩ অর্থাৎ বছরে ১.৮ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয় বায়ুদূষণজনিত ক্যান্সারে। সারা দুনিয়ায় হৃদরোগের মৃত্যুর মোট ২৫% বায়ুদূষণের কারণে ঘটে। আর এতে পৃথিবীতে বছরে মৃত্যুবরণ করে সর্বমোট ২.৪ মিলিয়ন মানুষ। এভাবে পৃথিবীর মানুষের প্রাণ সংহার হচ্ছে মানুষের সৃষ্ট বিষায়ণে। রান্নাসৃষ্ট ধোয়া এবং উষ্ণায়ণে আগুনসংশ্লিষ্ট দূষণে বছরে মৃত্যুবরণ করে কমপক্ষে ৩.৮ মিলিয়ন মানুষ, যার অধিকাংশই রান্না সংশ্লিষ্ট নারী ও শিশু। ঘরের বাইরে পথ ও কর্মস্থলের দূষিত বায়ু সেবনে মরণকে বরণ করে বছরে প্রায় ৪.২ মিলিয়ন মানুষ। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৯১ ভাগ মানুষ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্থির করা বায়ু মানদণ্ডের চেয়ে অনেক বেশি দূষিত বায়ু সেবন করে।
দুর্ভাগ্য হলো, বায়ুদূষণ এখনো জরুরি স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে আমাদের দেশে সরকারি আলোচনা পর্যালোচনায় গুরুত্ব পায় না। স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার ২০১৯ রিপোর্টে বলা হয়েছে বিশ্বে বায়ুদূষণে প্রতি বছর মৃত্যুবরণ করে ১২ লাখ মানুষ। যাদের ৫১.৪% এর বয়স ৭০ বছরের নিচে। বায়ু দূষণের ব্যাপকতার কারণে দেশে দেশে গড় আয়ু কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশের ঢাকা চট্টগ্রাম মহানগরের মানুষ মানসম্পন্ন বাতাস গ্রহণ থেকে বঞ্চিত। এ জন্য ক্যান্সার এবং হৃদরোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। অতি সূক্ষ্ম কণায় ভরা দূষক-বাতাসের মানদণ্ডে বিশ্বের শীর্ষ ভারতীয় চৌদ্দটি শহরের সাথে বাংলাদেশের ঢাকার অবস্থান। চট্টগ্রাম তার পরেই। বায়ুদূষণ ক্রমান্বয়ে এমন জায়গায় পৌছে যাচ্ছে যে, তা অগ্রাহ্য করলেই চরম বিপদ নেমে আসবে। প্রাণসঞ্জীবণী পৃথিবীর এ অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদটিও যদি আর নিরাপদ না থাকে, তবে জীবনের জন্য, মানুষের জন্য নির্ভরক আর কিছু থাকেনা। দূষিত বায়ু নিয়ে আমাদের উদ্বেগ উৎকন্ঠা তেমন নেই। আমরা হয়তো এটিকে প্রাকৃতিক বিষয় মনে করেই তৃপ্ত হই। দিন দিন আমরা রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বাড়িয়েই চলেছি। বিআরটিএ এর তদারকি কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছায়নি। তরল জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর আমাদের বাহনগুলো। মানসম্পন্ন গণপরিবহনের ধারণা আমাদের দেশে এখনো কার্যকারিতা পায়নি। প্রচলিত কার্বনের অঙাইড নির্গমনের জ্বালানি আমাদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে ভয়ংকর ভাবে দূষিত করছে। আমরা বৃক্ষনিধন থেকে সরে আসিনি। অদূর ভবিষ্যতে সরে আসার কোন পরিকল্পনার আমাদের হাতে আছে বলে জানা নেই। দেশে সতের কোটি মানুষ একবার শ্বাস ত্যাগ করলে যে পরিমাণ কার্বন ডাই অঙাইড নির্গমন ঘটে এবং এর জন্য যে পরিমাণ তাপ সৃষ্টি হয় তার হিসাব আমরা কষিনি। জীবাশ্ম জ্বালানি এবং অন্যান্য গ্যাস আমাদের পরিবেশ উষ্ণায়ণের অন্যতম কারণ। অঙিজেন তৈরির কারখানা হলো আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা গাছগাছালি। ইট সিমেন্টের পৃথিবীতে আমরা গাছকে উন্নয়নের অনুসঙ্গ মনে করি না। আর জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে ভূমির সংকোচন বৃক্ষরোপণে আমাদের আগ্রহ-অনুরাগকে মুছে দিয়েছে। উষ্ণায়ণ তাই আমাদের উপর চেপে জেকে বসেছে। আমরা ক্রমেই সবুজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি। বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাসপ্রশ্বাসের অধিকার আমাদের কে ফিরিয়ে দেবে? ভবিষ্যত প্রজন্মের মুক্ত বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাসপ্রশ্বাসের আধিকার আমরা কিরূপে নিশ্চিত করবো? যে বাতাস আমাদের প্রাণদায়ী, প্রাণবায়ু, যে বাতাস আমাদের আচ্ছাদিত রাখে নির্মল নির্ভরতা দিয়ে ; সে বাতাস আক্রান্ত আমাদেরই কর্মে । এ কেমন নির্মমতা! এ কেমন নিষ্ঠুরতা! প্রকৃতির প্রতি নিষ্ঠুর এ উপহাস আমরা কবে ত্যাগ করবো। সত্তার সাথে বৈরিতা আমাদের অস্থিত্বের সাথে প্রতারণা। অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। সিওপি ২৩ এ কার্বন নিঃসরণ এবং বৈষ্ণিক উষ্ণায়ণই ছিল আলোচনার মুখ্য বিষয়। সত্তাকে নিরাপত্তা দেয়াই এখন জরুরি।
আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের নিরাপদ বাতাস প্রাপ্তিতে আমাদের জাতীয় পরিকল্পনা কি আমরা কি জানি? ঋতু বৈচিত্র্যের বাংলাদেশে বিভিন্ন ঋতুতে বিশেষ করে গরমকালে বাতাসে দূষণের যা অবস্থা, তা আমরা সকলেই কম বেশি জানি। ঋতু ভিত্তিক বায়ু দূষণের গৃহীত পরিকল্পনাসমূহ এখনো দৃশ্যমান নয়। ঘনবসতির জনসম্পৃক্ত দেশে যা অত্যাবশ্যক হওয়া জরুরি। আমাদের নারী শিশুসহ সকল বয়সের মানুষের নিরাপদ প্রাণবায়ু পাওয়ার নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য পরিবেশ আমাদের সৃষ্টি করতে হবে। সিওপি ২৩ এ জার্মানির বনে টালানোয়া ডায়ালগের মতো আমাদের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে ”কোথায় আমরা আছি, আমরা কোথায় যেতে চাই, কিভাবে আমরা সেখানে যেতে পারি।” বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমাদের সার্বজনীন প্রতিশ্রুতি হোক নির্মল বাতাসের নিরাপদ প্রতিবেশ, নিরাপদ দেশ, নিরাপদ পৃথিবী।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, কর্ণফুলি গবেষক

x