বরাদ্দ বাড়ানো হোক মানসম্পন্ন গবেষণায়

অধিকতর গবেষণার জন্য প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান

বৃহস্পতিবার , ১৮ এপ্রিল, ২০১৯ at ৬:২৯ পূর্বাহ্ণ
51

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে অধিকতর গবেষণার জন্য বিজ্ঞানী ও গবেষকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। সম্প্রতি রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেলোশিপ, এনএসটি ফেলোশিপ এবং গবেষণা অনুদান প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘এখানে যারা বিজ্ঞানী ও গবেষক আছেন, আরো ভাল করে গবেষণা করুন, যাতে বিশেষ করে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলোয় বাংলাদেশ আরো উৎকর্ষ লাভ করতে পারে। দেশের সকল গণমাধ্যম ও বিদেশে ভারতসহ কয়েকটি দেশের সংবাদপত্রে এ খবরটি প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘কোথায় কোথায় আমাদের আরো বেশি বিনিয়োগ করা দরকার সেভাবেই দেশের জলবায়ু, মাটি,পানি সব কিছুই নিয়েই আপনারা কাজ করবেন, সেটাই আমি চাই। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলব, সেটাই আমাদের লক্ষ্য।
প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বান সময়োপযোগী। স্বীকার করতে হবে যে, শিক্ষা ও গবেষণা খাতে সরকারের ব্যয় এখনো যথেষ্ট নয়। মোট জাতীয় আয়ের দশমিক ১ শতাংশও বরাদ্দ থাকে না গবেষণা খাতে। বিশ্বের মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণাকে প্রাধান্য দিলেও আমাদের দেশে সবচেয়ে অবহেলিত গবেষণা খাত। শিক্ষক নিয়োগের ও পদায়নের ক্ষেত্রে গবেষণাও প্রকাশনা গুরুত্ব না পাওয়ার কারণে শিক্ষকরা গবেষণায় উৎসাহিত হন না। একজন শিক্ষক যদি মানসম্পন্ন গবেষণা ও প্রকাশনা ছাড়াই নামমাত্র প্রকাশনা ব্যবহার করে রাজনৈতিক বিবেচনায় অধ্যাপক হয়ে যান, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তিনি গবেষণায় মনোযোগ দেবেন না। তাই একদিকে গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ানো যেমন দরকার, তেমনি এমন এক গবেষণাবান্ধব উচ্চ শিক্ষা কাঠামো ও পরিবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন। যেখানে শিক্ষকরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মনোযোগী হন। দুঃখ হয়, যখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যৎসামান্য গবেষণা বরাদ্দের অর্ধেকও ব্যয় করতে পারে না। আসলে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ গবেষণাবান্ধব নয়। তার ওপর রয়েছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। একটি গবেষণা প্রস্তাব জমা দেওয়া থেকে গবেষণা প্রতিবেদন পেশ করা পর্যন্ত অর্থ বরাদ্দ ও অনুমোদন পেতে যে পরিমাণ ঝঞ্ঝাট-ঝামেলা পোহাতে হয়, তাতে অনেকেই গবেষণা উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। তখন তারা উন্নতির সহজ পথে হাঁটা শুরু করেন। এমন প্রবণতা টেকসই উন্নয়নের সহায়ক নয়। জনসংখ্যার বিরাট বোঝা নিয়ে বহুমাত্রিক পিছুটানকে পেছনে ফেলে আমাদের দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, দারিদ্র্য বিমোচনে অগ্রগতি, নারীদের কর্মসংস্থানে সাফল্যজনকভাবে এগিয়ে আসা, শিক্ষায় অগ্রগতি, শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যুরোধে ঈর্ষণীয় সাফল্য বাংলাদেশকে নিম্নমধ্যম আয়ের মর্যাদা দিয়েছে। এ গৌরব এদেশ দেশবাসীর জন্য গর্ব ও সম্মানের।
উন্নতমানের গবেষণার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান মোটেই নেই, এমন কথা বলা হলেও এবং মানসম্মত বৈজ্ঞানিক জার্নালের সংখ্যা কম হলেও বহির্বিশ্বের সঙ্গে যৌথভাবে আমাদের বিজ্ঞানীরা গবেষণা প্রকাশ দেশের অগ্রগতির সূচক। কৃষি ক্ষেত্রে আমাদের বিজ্ঞানীদের অগ্রগতি দৃশ্যমান এবং সুফলও সেক্টরওয়াইজ আমরা পাচ্ছি। প্রকৌশল ও কৃষিতে উচ্চ শিক্ষার্থী গবেষকের সংখ্যা বাড়ছে। এখন গবেষণার প্রায়োগিক দিককে প্রাধান্য দিতে হবে। উপযুক্ততা বিবেচনায় উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা বিস্তৃত করা দরকার। উচ্চ শিক্ষার সক্ষমতাকে উপযোগিতা বিবেচনায় অবাধ করতে হবে। এক্ষেত্রে অপচয় নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। পরিসংখ্যানে বস্তুনিষ্ঠতার প্রাধান্য দেওয়া প্রয়োজন।
তারুণ্যকে আলোড়িত করতে সক্ষম কলেজগুলোতে গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সামনে ১১ বছর সময় হাতে আছে। মধ্যম আয়ের দেশে দৃঢ়ভাবে প্রবেশাধিকার পেতে এসডিজির সফল সমাপ্তি একান্তভাবে প্রয়োজন। কয়েকদিন আগে বাংলাদেশ মহাকাশে নিজেদের স্যাটেলাইট পাঠিয়েছে। দেশে নিজেদের জন্য আরো বেশি প্রযুক্তিগত উন্মেষ ঘটানোর প্রয়াস চলছে। সন্দেহ নেই, সরকারের এটি ভালো পদক্ষেপ। তবে সরকার যদি আমাদের দেশের গবেষকদের পেছনে বরাদ্দ আরো বেশি রাখত, তাহলে আমাদের বিদেশমুখীতা আরো হ্রাস পেত। প্রশ্ন জাগে মনে, আমরা নিজেদের নিয়ে ভাবছি না? এদেশের বেশ কয়েকজন নাসা, এনআইএইচ বা বিদেশের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন। বিজ্ঞানকে অবহেলা করার কোন সুযোগ নেই। এ কারণে বাজেটে গবেষণার জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা বিধেয়। এদেশের মেধাবীদের দেশে ধরে রাখতে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মানোন্নয়ন করাও অত্যাবশ্যক। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে-বিদেশের দেশগুলোর সাথে আমাদের তুলনা করা হয়তো আহাম্মকি হবে। কিন্তু গবেষণার পরিকাঠামো তৈরির দায়িত্ব তো আমাদের নিজেদেরই নিতে হবে।

x