বরফ গলছে

রেজাউল করিম

বুধবার , ৯ অক্টোবর, ২০১৯ at ১০:২৩ পূর্বাহ্ণ
45

এই পৃথিবী এখন তো আর সেই পৃথিবী নেই, কেননা এখানে আগুন জ্বলছে। প্রতি সেকেন্ডে, ঘণ্টায়, দিনে, বছরে উষ্ণতা বাড়তে বাড়তে ক্রমেই জলন্ত অগ্নিপিণ্ড হয়ে উঠছে পৃথিবী। নেভানোর জন্য সময় মাত্র দশ বছর। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভয়ঙ্কর বিপদ। মানব সভ্যতার জন্য অপেক্ষা করছে মহাপ্রলয়ের মতো বিপর্যয়। জাতিসংঘ নিয়োজিত ‘ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’ (আইপিসিসি)-এর বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিশ্ব উষ্ণায়ন ছিল শুধুই বিপদের আগাম পূর্বাভাস। এবার সরাসরি তার ফল ভুগতে শুরু করেছে মানবগ্রহ। আর বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে তিন থেকে চার ডিগ্রি সেলসিয়াস। গ্রীষ্মকালের স্থায়িত্ব বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল। বড় শহরগুলো হয়ে উঠতে পারে ‘তপ্ত দ্বীপ’। প্রতিনিয়ত বাড়ছে তাপমাত্রা। আবহাওয়ার বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফাগুনে বৃষ্টি-তাও আাবার বর্ষার মতো। প্রাকৃতিক জলীয় বাষ্প, কার্বন ডাই অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড এবং ওজোনের মতো গ্রিন হাউজ গ্যাসগুলো থেকে গ্যাস নির্গমন হয়, তাতে পৃথিবী তপ্ত হয়ে উঠছে। সে সাথে গলছে বরফ। বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। তলিয়ে যেতে পারে অনেক নীচু অংশ। অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারে নানা প্রজাতির জীবজন্তু, মাছ, উদ্ভিদ। মানবকুলের বসবাস অনুপযোগী হতে পারে বিশ্ব।
নিউইয়র্ক থেকে সাংহাই উপকূলবর্তী শহরগুলো নিয়মিত বন্যার কবলে পড়বে। উত্তর মেরু ও নিকটবর্তী এলাকায় বরফ গলতে ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। এর পরে হিমালয় ও দক্ষিণ মেরুতেও হিমবাহ ও বরফের স্তর অত্যন্ত দ্রুত হারে গলে যাবে। সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় মাছের ভাণ্ডার কমবে দ্রুত হারে, ফলে খাদ্য সঙ্কট অবশ্যম্ভাবী। গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমনের এ ধরনেরই প্রত্যক্ষ প্রভাব টের পাওয়া যাবে অদূর ভবিষ্যতে। সম্প্রতি পেশ করা জাতিসংঘের পরিবেশ সংক্রান্ত প্যানেলের সামপ্রতিক রিপোর্টে এই অশনিসঙ্কেত রয়েছে।
গত অক্টোবরে জাতিসংঘের এই প্যানেলের প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়েছিল, বিশ্ব উষ্ণায়ন রুখতে বড় জোর ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময় পাওয়া যাবে। তারপরে ৩৬টি দেশ থেকে একশো জনেরও বেশি বিজ্ঞানীকে নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়। গত কয়েক মাসে দু’টি রিপোর্ট পেশ করেছেন তাঁরা। পরিবেশ প্যানেলের ভাইস চেয়ারপার্সন কো ব্যারেটের কথায়, ‘এই রিপোর্টটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই প্রথম পরিবেশবিজ্ঞানীরা পৃথিবীর প্রত্যন্ত প্রান্তে পৌঁছে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। তাঁরা হিমালয়েও গিয়ে কাজ করেছেন, আবার মেরু অঞ্চলেও গিয়েছেন। এবং তাঁরা দেখেছেন যে, এই সব প্রত্যন্ত এলাকাতেও জলবায়ু পরিবর্তনের স্পষ্ট নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।’
পরিবেশবিজ্ঞানীরা বলছেন, বর্তমান হারেই যদি কার্বন গ্যাস নির্গমন চলতে থাকে, তা হলে ২১০০ সালের মধ্যে সমুদ্রের পানির স্তর তিন ফুটেরও বেশি বেড়ে যাবে। ফলে উপকূলবর্তী এলাকায়, যেখানে আগে একশো বছরে এক বার বন্যা হত, সেখানে প্রতি বছরেই বন্যা হবে। বিপদে পড়বেন এই সব উপকূলবর্তী এলাকায় বসবাসকারী ৬৮ কোটি মানুষ। পৃথিবীতে যে কয়েকটি বরফের চাদরে (আইস শিট) ঢাকা অঞ্চল রয়েছে, তাদের মধ্যে অন্যতম গ্রিনল্যান্ড। যেটি ইতিমধ্যেই গলতে শুরু করেছে। গ্রিনল্যান্ডের বরফের চাদর যদি বেশি মাত্রায় গলে যায়, তা হলে চারপাশের পানির স্তর বিশ ফুটেরও বেশি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বরফ গলছে দুই মেরুতেও। উত্তর মেরু অঞ্চলে বরফ গলার হার সব থেকে বেশি। পরিবেশবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই বরফ গলা প্রক্রিয়া আর থামানো সম্ভব নয়। ‘এর ফলে আগামী দু’শো বছরে সামুদ্রিক পানির স্তর কয়েক মিটার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে,’ দাবি ইউনিভার্সিটি অব আলাস্কার অধ্যাপক রেজিন হকের। ইতালিতে মঁ ব্লঁ পর্বতমালার একটি হিমবাহ যে কোনও সময়ে ভেঙে যেতে পারে এই আশঙ্কায় সেখানকার সব জনবসতি সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আঞ্চলিক প্রশাসন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গলতে শুরু করেছে প্লানপিনসিউ নামের এই হিমবাহটি। প্রতি দিন ২০-২৫ ইঞ্চি সরে আসছে সেটি। ফলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যে কোনও মুহূর্তে পাহাড় থেকে ধসে পড়বে এই বরফের নদী। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত প্রাক্তন বিশেষ দূত ম্যারি রবিনসন বলেন, আমাদের নিজেদের রক্ষা করার জন্য নিজেদেরই পরিকল্পনা করতে হবে।

x