বন্যার্তদের পুনর্বাসন এ মুহূর্তে অবশ্য করণীয় জরুরি কাজ

বৃহস্পতিবার , ২২ আগস্ট, ২০১৯ at ১০:২১ পূর্বাহ্ণ
16

দেশে প্রতিবছরই ছোট বড় একাধিক বন্যা হয়ে থাকে। সেই বন্যার স্থায়িত্বের ওপর ভিত্তি করে আবার এর ক্ষয়-ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করে থাকে। বাংলাদেশে প্রতি ১০ বছর পরপর একেকটি বড় আকারের বন্যা আঘাত হানতে দেখা যায়। ছোট হোক বা বড় হোক বন্যা হলেই কিছু না কিছু ক্ষয়-ক্ষতি হয়েই থাকে। চলতি বছরে জুন থেকে মধ্য আগস্ট পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম ও কঙবাজারসহ দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় বন্যায় বাড়ি-ঘর পড়ে যাওয়া ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, বন্যার কারণে ১১’শ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। দেশের ৩১টি জেলায় আউশ, আমন ও আমনের বীজতলা এবং গ্রীষ্মকালীন সবজিসহ দুর্যোগে আক্রান্ত হয়েছে এক লাখ ৭১ হাজার ২৮৯ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল। আমনের বীজতলা ভেসে গেছে বন্যার তোড়ে। এছাড়াও পাট, মরিচ আঁখ জাতীয় ফসল ডুবেছে পানিতে। এতে বন্যাদুর্গত কৃষকরা অনেকটাই দিশেহারা হয়ে পড়েছে। তবে আশার কথা হলো, অনেক জায়গায় পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের আন্তরিকতা ও উৎসাহের কারণে কৃষকরা শুরু করেছে চাষাবাদ। দেশের অনেক এলাকায় এখন আমনের প্রস্তুতিও চলছে। এবারের এ বন্যাটি সম্পর্কে বিগত আরও মাস দুয়েক আগে থেকেই একটা পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছিল। সে পূর্বাভাস ও সতর্কতা অনুযায়ী দেশের সরকার এবং সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলো কিছুটা হলেও পূর্ব প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। তার জন্যই অন্য অনেক সময়ের তুলনায় এবারের বন্যায় সার্বিক ক্ষয়-ক্ষতি কম হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও বাংলাদেশের উজান হিসেবে চীন, নেপাল, ভারত এমন কি মায়ানমারেও বন্যা হয়েছে এবং সেখানে বন্যার কারণে কিছু প্রাণহানিরও খবর পাওয়া গেছে।
বন্যার ক্ষতি সীমাহীন। দুর্ভোগ অবর্ণনীয়। তবে আশীর্বাদও আছে। তাতে পলি মাটি পড়ে উর্বরতা বেড়ে যায় কৃষি জমির। বন্যার পানিতে ক্ষতিকর, বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ ধুয়ে মুছে যায়। গ্রামীণ প্রকৃতি ধারণ করে এক নির্মল রূপ। সে কারণে যে বছর বন্যা হয় তার পরের বছর ফসল ভাল হয়। কৃষক তার খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অনেক বেশি আগ্রহে মাঠে কাজ করে, কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়ায়। উদাহরণ স্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে ১৯৯৮-৯৯ সালের বন্যার পর ১৯৯৯-২০০০ সালে বাম্পার ফলন হয়েছিল সকল কৃষিপণ্যের। বিশেষ করে খাদ্য শস্যের। দেশ হয়েছিল চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। একই রকম হয়েছিল, ২০০৭-০৮ সালে বন্যার পর ২০০৮-০৯ ও ২০০৯-২০১০ সালে। বাম্পার ফলন হয়েছিল খাদ্য শস্যের। জাতিসংঘের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু গবাদি পশু ও পোলট্রি খাতে এবার ক্ষতি হয়েছে ৭০৪ কোটি টাকার বেশি। আক্রান্ত হয়েছে ৭৬ লাখ মানুষ। বন্যা পরবর্তী পুনর্বাসন সঠিকভাবে না হলে নিশ্চিত করে বলা যায় এতে দেশের উন্নয়ন ধারা ব্যাহত হবে। যে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর সেটা কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন হয় সঠিকভাবে পুনর্বাসন কার্যক্রম গ্রহণ করার। সেখানে সেক্টর অনুযায়ী প্রয়োজন হয় আলাদা আলাদা ব্যবস্থা গ্রহণ। যেমন-যদি কৃষি পুনর্বাসনের কথা ধরা হয় তবে সেখানে নিতে হবে কৃষি সহায়ক পুনর্বাসন কর্মসূচি। সেখানে যদি এখনি যেসব এলাকা থেকে বন্যার পানি নেমে গেছে সেসব এলাকার জন্য পূর্বেই উঁচু জায়গায় নাবী জাতের তৈরি করা বীজতলা হতে চারা সংগ্রহ করে তাড়াতাড়ি জমিতে রোপণ করে দিতে হবে। নিচু এলাকার জন্য জলি আমন ধানের বীজ বিশেষ পদ্ধতিতে পুঁতে দিতে হবে। তারপর বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই জমিতে বিনা চাষে গম, ভুট্টা, ডাল, সরিষা ইত্যাদি বুনে দিতে হবে।
রবি শাকসবজি হিসেবে আলু, পিঁয়াজ, রসুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা ইত্যাদি আবাদ করতে হলে বড় অংকের বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। সে খরচ সেসব এলাকার কৃষকেরা মেটাতে পারবে না বিধায় সরকারের ব্যবস্থাপনায় সহজশর্তে তাদের কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। আশার কথা, সরকার ইতিমধ্যে এই ঋণ দেওয়ার জন্য কৃষি ব্যাংকসহ সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়ে দিয়েছেন। মাছ চাষ পোলট্রি শিল্প, গবাদি পশু ইত্যাদির জন্যও একই রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তা-ছাড়া প্রয়োজন হলে তাদের নগদ আর্থিক প্রণোদনাও দেওয়া যেতে পারে। আমাদের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এর কোন বিকল্প নেই।
বন্যার্তদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়ার কাজটি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি অগ্রাধিকার ভিত্তিক কাজ। কাজটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য মাঠপর্যায়ে চাই সততা, আন্তরিকতা ও দক্ষতার সাথে কাজ করে যাওয়া। বর্তমান সরকার জনগণের কল্যাণে নিবেদিত বলেই জনগণের প্রত্যাশাও বেশি। তাই, এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব ও কর্তব্য অনেক। এমন একটি সময়ে সরকারকে বন্যা ত্রাণও পুর্নবাসন কাজ করতে হচ্ছে, যখন রাজধানীসহ দেশের অনেকগুলো জেলায় ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। ফলে কাজটি বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে আমাদের বিশ্বাস সরকারের বন্যা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কাজে প্রতিটি পদক্ষেপ বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসন শতভাগ সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সম্পন্ন করলে এই কঠিন কাজটি সহজ হয়ে উঠবে। জনগণেরও এটাই প্রত্যাশা।

x