বন্ধুদের প্রতীক্ষায় প্রিয় প্রাঙ্গণ

আগ্রাবাদ সরকারি কলোনি উচ্চ বিদ্যালয়

সফিক চৌধুরী

শনিবার , ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৯:০৩ পূর্বাহ্ণ
154

 

মানুষ’ নিয়ে বিভিন্ন উপমা দিতে গিয়ে আমরা প্রায়শই শুনি, কিছু মানুষ থাকে চাঁদের মতো, যাঁদের আমরা বলি, চাঁদমুখ! কিছু মানুষ আছে সূর্য্যি মামার মতো, যাঁরা তীব্র বেগে আলো ছড়াতে জানে! কিছু মানুষ আছে সাদা মেঘের ভেলায় চড়া আকাশের মতো, যাঁদের মন আকাশের মতোই নীল শ্বেত শুভ্র! কিছু মানুষ সমুদ্রের মতোই বিশাল মনের অধিকারী! কিছু মানুষ ফুলসহ এমন সব সুন্দরের মতো! আমি নিশ্চিত, আমার মতো এমন প্রায় সব এলামনাইদের সৌভাগ্য তাঁরা আগ্রাবাদ স্কুলের শিক্ষার্থী ছিলেন! নয়তো উপরে বলা এমন সব মানুষগুলোর সাথে কখনোই হয়তো পরিচিত হতে পারতাম না! জানতে পারতাম না, আসলে বন্ধু আর প্রাণের মানুষ কারে কয় আর ভালোবাসা পেতে হলে আগে অন্যকে ভালোবাসতে জানতে হয়!

ষাটের দশকের শুরুর দিকে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে অত্র এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সন্তানদের শিক্ষা গ্রহনের প্রয়োজনীয়তায় তেমন ভালো কোন বিদ্যালয় না থাকায় এ এলাকার মানুষজন একটি বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। যা পরবর্তীতে বহু ঘাতপ্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামের তৎকালীন সিজিএস কলোনীর বিশিষ্টজন ও কলোনি এসোসিয়েশনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৯৬০ সালে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে আমাদের প্রিয় বিদ্যালয় আগ্রাবাদ সরকারি কলোনি উচ্চ বিদ্যালয়।

আজ থেকে প্রায় ঊনষাট বছর আগে আগ্রাবাদ সরকারি কলোনি উচ্চ বিদ্যালয় নামে যে বিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু, তা আজ এক বিশাল মহিরুহ! এই দীর্ঘ ঊনষাট বছরের পথ চলায় আজ স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশ ছাড়িয়ে সারা বিশ্বেও সমুজ্জ্বল। স্কুলের সেই এলামনাইরা তাঁদের প্রিয় বিদ্যালয়ের ঊনষাট বছর কে সামনে রেখে আবার ও স্কুল ক্যাম্পাস কে আড্ডা হুল্লোড়ে মাতিয়ে রাখার প্রয়াসে আর অনেকদিনের অদেখা বন্ধু আর প্রিয় স্কুল ক্যাম্পাসকে কাছে পাওয়ার হাতছানিতে বিগত কয়েক মাস ধরেই ভীষণ নস্টালজিক ফেব্রুয়ারির ২২২৩, ২০১৯ এ অনুষ্ঠিত প্রাক্তন এলামনাই পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করার প্রয়াসে! স্কুলের এই এলামনাই পুনর্মিলনী নিয়ে স্কুল ক্যাম্পাসে কতটা রঙ লেগেছে তা অনুমান করা না গেলেও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মনে যে খুশি আর আনন্দের সম্মিলিত বান ডেকেছে তা তো বিগত কয়েক মাস ধরেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আর কিছুদিন আগে প্রাক্তন এলামনাই ব্যাচ ’৯৭ আয়োজিত ফুটবল টুর্নামেন্টে আর এলামনাই এসোসিয়েশন আয়োজিত ক্রিকেট টুর্নামেন্টেই দৃশ্যমান ছিল! এলামনাই পুনর্মিলনী’র আগে ফুটবল/ক্রিকেটকে উপলক্ষ করে পুরনো ভালোবাসা আর অনেকদিনের দেখতে না পাওয়া প্রিয় মুখগুলোকে যারা নতুন করে কাছে পেয়েছেন, শুধু তাঁরাই জানেন, প্রতিটা ব্যাচের প্রতিটি ম্যাচ শুধু একটি খেলা ছিলো না, সেটি যেন হয়ে উঠেছিল খেলাকে উপলক্ষ করে ব্যাচগুলোর এলামনাইদের একে অপরের সাথে মিলিত হওয়ার, প্রিয় বন্ধুকে কাছে পাওয়ার এক অপার্থিব ক্ষণ!

সে যাই হউক, পুরনো বন্ধু/শিক্ষার্থী আর হারিয়ে যাওয়া স্কুল ক্যাম্পাসকে আবার ফিরে পাওয়ার সুতীব্র বাসনায় আমাদের এলামনাই এসোসিয়েশনের এই আয়োজন সত্যিই আশা জাগানিয়া। যে কোন নাগরিক সমাজের এগিয়ে যাওয়ার পেছনে নাগরিকের তিনটি অন্তর্নিহিত শক্তির ভূমিকাই মূখ্য বলে জানিনাগরিকের কল্পনাশক্তি, তাঁর চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতা। আর এসব দক্ষতার উত্তরন ও উন্নয়নের বিকাশ ঘটে ক্রমাগত অনুশীলনের মাধ্যমে। তখন অবশ্য মানুষের আরেকটি দক্ষতাও অর্জিত হয় তা হলো মানুষের মননশীলতা। আমাদের আগ্রাবাদ স্কুল এলামনাই এসোসিয়েশনও এর ব্যতিক্রম নয় বলেই আমাদের বিশ্বাস। আমরা আগামী দিনে আরও এগুবোই ইনশাআল্লাহ, এ কথা আমরা জোর দিয়ে বলতেই পারি। কারণ, এগিয়ে যাওয়ার আর বিকশিত হওয়ার উপাদানগুলো আমাদের এলামনাইদের মাঝে প্রবলভাবেই উপস্থিত। আর আমাদের যখন নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো অসাধারন সাংগঠনিক দক্ষতাসম্পন্ন মেধাবী কিছু এলামনাই আছে যারা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন কোন প্রতিদানের প্রত্যাশা না করে তখনতো একটু নিশ্চিন্তে থাকাই যায়! ধন্যবাদ, ভালোবাসা ও অশেষ কৃতজ্ঞতা নিরবে বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পাদন করে যাওয়া এলামনাইদের মাঝে সেই সব সংগঠকদের প্রতি।

এলামনাই পুনর্মিলনী নিয়ে আবেগ আর উচ্ছ্বাস টের পাওয়া যায়, স্কুলের এলামনাইদের কথা আর কাজে! বিদ্যালয়ের ’৮৮ ব্যাচের এলামনাই সেলিনা আকতার বিদ্যালয়ের ফেলে আসা সেই সব দিনের কথা বলতে গিয়ে বলেন, ‘জীবনের চলতি পথে আমরা অনেকের সাথেই সম্পর্কে/বন্ধুত্বে জড়াই, কিন্তু সব সম্পর্ক/বন্ধুত্বই জীবনে এতটা স্মৃতিকে নাড়া দেয় না, যতটা নাড়া দেয় আর জীবনভর তাড়িয়ে বেড়ায় ফেলে আসা বিদ্যালয়ের বন্ধুরা! আর তাইতো তাঁদের ডাক পেলে নিজেকে গুটিয়ে রাখা অসম্ভব মনে হয়!’ আরেক প্রাক্তন শিক্ষার্থী ’৯৫ ব্যাচের শ্যামল বলেন, ‘পুরনো স্কুল বন্ধুদের সাথে দেখা হওয়ার আকুলতা সে কি আর বলে বুঝানো সম্ভব?’

মানুষ’ নিয়ে বিভিন্ন উপমা দিতে গিয়ে আমরা প্রায়শই শুনি, কিছু মানুষ থাকে চাঁদের মতো, যাঁদের আমরা বলি, চাঁদমুখ! কিছু মানুষ আছে সূর্য্যি মামার মতো, যাঁরা তীব্র বেগে আলো ছড়াতে জানে! কিছু মানুষ আছে সাদা মেঘের ভেলায় চড়া আকাশের মতো, যাঁদের মন আকাশের মতোই নীল শ্বেত শুভ্র! কিছু মানুষ সমুদ্রের মতোই বিশাল মনের অধিকারী! কিছু মানুষ ফুলসহ এমন সব সুন্দরের মতো! আমি নিশ্চিত, আমার মতো এমন প্রায় সব এলামনাইদের সৌভাগ্য তাঁরা আগ্রাবাদ স্কুলের শিক্ষার্থী ছিলেন! নয়তো উপরে বলা এমন সব মানুষগুলোর সাথে কখনোই হয়তো পরিচিত হতে পারতাম না! জানতে পারতাম না, আসলে বন্ধু আর প্রাণের মানুষ কারে কয় আর ভালোবাসা পেতে হলে আগে অন্যকে ভালোবাসতে জানতে হয়!

প্রিয় স্কুলের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, প্রিয় বড় ভাইবোন, প্রানের বন্ধু ও স্নেহের স্বজন, সকলের জন্যই আমাদের উজাড় করা ভালোবাসা। আর এই সব প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে কিছুটা সময় কাটানোর উদগ্র বাসনায় আর পুরনো স্মৃতিকে আবারও মনে করিয়ে দিতেই সকলের এতো আয়োজন। আজকের ডিজিটাল বিশ্বে সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমের কারণে যদিও হারিয়ে যাওয়া অনেক বন্ধুকেই আমরা খুঁজে পাই, কিন্তু ফেবু/ভাইবারে খুঁজে পাওয়া আর কাছে পেয়ে মন খুলে আড্ডা, গান, মানঅভিমান আর কিছুতে কি পাওয়া যাবে? এলামনাইদের বরনের প্রতীক্ষায় প্রিয় স্কুল প্রাঙ্গণ, তাই ২২ আর ২৩ ফেব্রুয়ারি এসো সবাই মিলি প্রানের উৎসবে। আর বিশ্বকবির গানে কন্ঠ মিলিয়ে বলি, “আয় আর একটিবার আয় রে সখা, প্রাণের মাঝে আয়। মোরা সুখের দুখের কথা কব, প্রাণ জুড়াবে তায়।” প্রাণে প্রাণ মেলানোর এলামনাইদের এই আয়োজন সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হউক, এই শুভকামনা।

- Advertistment -