বন্দর : অমিত সম্ভাবনার হাতছানি

হাসান আকবর

বৃহস্পতিবার , ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ
888

দেশের আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার, অমিত সম্ভাবনার সম্পদ চট্টগ্রাম বন্দর। এই বন্দরের মাধ্যমে দেশের নব্বই শতাংশ আমদানি রপ্তানি সম্পন্ন হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের সাথেই দেশের অর্থনীতির গতি প্রবাহ নির্ভর করে। দেশের অগ্রগতি এবং উন্নতির বহু কিছুরই নিয়ন্ত্রক এই চট্টগ্রাম বন্দর। দেশের অতি গুরুত্বপূর্ণ এই বন্দরের অগ্রগতি যেমন হচ্ছে তেমনি বেশ কিছু সমস্যাও রয়ে গেছে। এসব সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান করে বন্দরের উন্নয়ন আক্ষরিক অর্থে নিশ্চিত করতে না পারলে পদে পদে বাধাগ্রস্ত হবে দেশের উন্নয়ন।
চট্টগ্রাম বন্দর গত বছর প্রায় ২৯ লাখ টিইইউএস এবং প্রায় নয় কোটি টন কার্গো হ্যান্ডলিং করেছে। চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেনার টার্মিনাল রয়েছে দুইটি। চিটাগাং কন্টেনার টার্মিনাল এবং নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল। এই দুইটি টার্মিনালে মোট সাতটি বার্থ রয়েছে। যেখানে একই সাথে সাতটি কন্টেনার জাহাজ বার্থিং করতে পারে। এছাড়া বন্দরের জেনারেল জেটিগুলোর মধ্যেও ছয়টি জেটি কন্টেনার বার্থ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মোট ১৩টি জেটিতে কন্টেনার হ্যান্ডলিং এর সুবিধা রয়েছে। এরমধ্যে দশটি জেটিতে ইতোমধ্যে কন্টেনার হ্যান্ডলিং এর বিশ্বের সর্বাধুনিক ইকুইপমেন্ট কী গ্যান্ট্রি ক্রেন স্থাপন করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে সর্বমোট পাকা জেটি রয়েছে -১৫ টি। এছাড়া পন্টুন জেটি – ২ টি, বেসরকারি জেটি-৩ টি, লাইটার জেটি -৮ টি, মুরিং বার্থ-১১ টি, পন্টুন জেটিসহ মোট ১৭ টি জেটির মধ্যে ১৩ টি জেটিতে শোরক্রেন এবং রেল লাইনের সংযোগ আছে। ১১ টি জেটিতে শেড রয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে চট্টগ্রাম বন্দর কন্টেনার হ্যান্ডলিং এ প্রবৃদ্ধি ১২ শতাংশের এবং কার্গো হ্যান্ডলিং এ প্রবৃদ্ধি ১৬ শতাংশের বেশি ধরে রেখেছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান সুযোগ সুবিধা দিয়ে আর খুব বেশি দিন দেশের চাহিদা মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না। অবকাঠামোগত এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নই কেবলমাত্র চট্টগ্রাম বন্দরকে সচল রাখতে পারবে। পারবে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে অতীতের ধারাবাহিকতায় বজায় রাখতে। জেটি নির্মাণ, কন্টেনার টার্মিনাল নির্মাণ কিংবা অত্যাধুনিক ইকুইপমেন্ট সংগ্রহের মতো প্রকল্পগুলো অতীতের মতো বাঁধাগ্রস্ত হলে শুধু চট্টগ্রাম বন্দরই নয়, দেশের উন্নয়নও চরমভাবে ব্যাহত হবে বলে বিশেষজ্ঞ সূত্রগুলো মন্তব্য করেছে।
দেশের অন্তত আগামী একশ’ বছরের চাহিদার কথা মাথায় রেখে চট্টগ্রাম বন্দরের বে টার্মিনাল নির্মাণ শুরু হয়েছে। সাত কিলোমিটার দীর্ঘ বে-টার্মিনাল নির্মাণ করতে প্রথম ধাপে ব্যয় হবে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। আর পতেঙ্গায় লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণে খরচ হবে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। দুই টার্মিনালে ২০ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প দুইটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দরের বহুদিনের সমস্যার সমাধান হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। তবে কাজ দুইটি নিয়ে নানামুখী জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রিতার অভিযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে বে টার্মিনালে ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। শুরু হয়েছে ড্রেজিং। বাকি কাজও পর্যায়ক্রমে শুরু করা হবে বলে জানানো হয়েছে। লালদিয়া টার্মিনালের জন্য জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। লালদিয়ার অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। সাতটি দেশের ১০ প্রতিষ্ঠান উপরোক্ত দুইটি প্রকল্পের কাজ করতে ইতোমধ্যে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ভারত, চীন, সিঙ্গাপুর, কোরিয়া, আরব আমিরাত, নেদারল্যান্ডস ও ফ্রান্সের প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ পেতে চালাচ্ছে তৎপরতা। চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানিয়েছে, বে-টার্মিনালে একটি ১৫০০ মিটার দৈর্ঘ্যের মাল্টিপারপাস টার্মিনাল, ১২২৫ মিটার দীর্ঘ কনটেনার টার্মিনাল ও ৮৩০ মিটার দীর্ঘ কনটেইনার টার্মিনাল-২ তৈরি করা হবে। এ জন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। বে-টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পটি পিপিপি (সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব) এবং জি টু জি (সরকার টু সরকার) পদ্ধতিতে সম্পন্ন করার জন্য প্রশাসনিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বে-টার্মিনাল হলে চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান সক্ষমতা তিনগুণ বেড়ে যাবে। এখন ৯ দশমিক ৫ মিটারের বেশি ড্রাফটের কোনো জাহাজ বন্দরে নোঙর করার সুযোগ পাচ্ছে না। কিন্তু বে-টার্মিনাল হলে ১২ থেকে ১৪ মিটার ড্রাফটের জাহাজও সরাসরি জেটিতে নোঙর করতে পারবে। এখন নাব্য সংকটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ প্রবেশ করাতে জোয়ারের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু বে-টার্মিনালে দিনরাত ২৪ ঘণ্টাই নোঙর করতে পারবে জাহাজ। বে টার্মিনাল যথাযথভাবে কাজ শুরু হলে দেশের আগামী একশ’ বছরের বন্দরের চাহিদা পূরণ হবে বলেও বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন।
অপরদিকে পতেঙ্গা এলাকার ১৪ ও ১৫ নম্বর খালের মাঝামাঝি লালদিয়ার চরে ৭৫ একর জায়গায় নির্মিত হবে লালদিয়া টার্মিনাল। ওখানে নদীর গভীরতা বিদ্যমান বন্দরের চেয়ে বেশি থাকায় ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ অনায়াসে বার্থিং নিতে পারবে। আগামী ২০২১ সালের মধ্যে লালদিয়া টার্মিনাল অপারেশনে যেতে চায় বন্দর কর্তৃপক্ষ। তিন হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পটির কাজ আজই শুরু করার মতো সক্ষমতা বন্দরের রয়েছে। বন্দরের তহবিলে দশ হাজার কোটিরও বেশি টাকা অলস পড়ে আছে। এত টাকা তহবিলে থাকার পরও তিন হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্পের জন্য বিদেশীদের উপর কেন নির্ভর করতে হবে তা নিয়েও ইতোমধ্যে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
বে টার্মিনাল এবং লালদিয়া টার্মিনাল নিয়ে কিছুটা সময় লাগলেও আগামী মাস তিনেকের মধ্যে জাহাজ ভিড়বে বন্দর কর্তৃপক্ষের নির্মিত পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনালে (পিসিটি)। পতেঙ্গা এলাকায় বিমানবাহিনীর জহুরুল হক ঘাঁটির পাশে বোট ক্লাবের সন্নিকটে রাস্তার বাঁকে ৩২ একর ভূমি অনেকটা অনুৎপাদনশীল খাতে পড়েছিল। বন্দর কর্তৃপক্ষের এই ভূমিতে কাস্টমস, পুলিশ এবং মেরিন ফিশারিশ এবং রেডক্রিসেন্টের অফিস পরিচালিত হতো। বন্দর কর্তৃপক্ষ রাস্তাটি সোজা করে দিয়ে নদী পাড়ের উক্ত ৩২ একর জমিতে পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল (পিসিটি) নির্মাণ প্রকল্প গ্রহন করে। ১৮৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে পিসিটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এরমধ্যে জেটিসহ অবকাঠামোগত নির্মাণের জন্য ব্যয় ধরা হয় ১১৬০ কোটি টাকা। বাকি টাকা দিয়ে ইকুইপমেন্ট ক্রয়সহ আনুষাঙ্গিক প্রয়োজন মেটানো হবে। ইয়ার্ড এবং জেটি নির্মাণের কাজ পুরোদমে চলছে। এই টার্মিনালে চারটি জেটি হবে। এর মধ্যে ৬০০ মিটার লম্বা তিনটি কন্টেনার জেটিতে এক সঙ্গে তিনটি কন্টেনারবাহী জাহাজ বার্থিং করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি তেল খালাসের জন্য ২২০ মিটার লম্বা একটি ডলফিন জেটিও নির্মিত হবে। পেছনের ৩২ একর জমিতে তৈরি হচ্ছে ব্যাকআপ সুবিধা। আগামী ডিসেম্বরে পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনালে জাহাজ ভিড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ অগ্রসর হচ্ছে বলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান। এই টার্মিনালে বছরে সাড়ে চার লাখ টিইইউএস কন্টেনার হ্যান্ডলিং করা যাবে বলে উল্লেখ করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নয়া এই টার্মিনাল চট্টগ্রাম বন্দরের সার্বিক কার্যক্রমে যথেষ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান ছয়টি জেটিকে নিয়ে কর্ণফুলী কন্টেনার টার্মিনাল (কেসিটি) নির্মাণের প্রকল্প বহুবছর ধরে ফাইলবন্দি হয়ে রয়েছে। বন্দরে অভ্যন্তরে বর্তমানে যেই ছয়টি বার্থে কন্টেনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রম চলে সেগুলো বাস্তবে কার্গো হ্যান্ডলিং এর জেটি। এগুলো কন্টেনার হ্যান্ডলিং এর জন্য যথাযথভাবে উপযোগি নয়। এগুলোকে ভেঙ্গে নতুন করে কন্টেনার টার্মিনাল নির্মাণ করার পরিকল্পনা গ্রহন করা হয়েছিল বহু বছর আগে। কিন্তু হয়নি। এই প্রসঙ্গে বন্দরের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেছেন,বর্তমানে জেটিগুলো ভেঙ্গে ফেলার মতো অবস্থায় বন্দর কর্তৃপক্ষ নেই। উক্ত ছয়টি বার্থে বছরে দশ লাখ টিইইউএস এর বেশি কন্টেনার হ্যান্ডলিং হয়। এগুলো ভেঙ্গে ফেলা হলে এই বিপুল সংখ্যক কন্টেনার হ্যান্ডলিং করানোর মতো অবকাঠামো বন্দরের নেই। নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল ইতোমধ্যে পুরোদমে চালু হয়ে উঠছে। পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল এবং বে টার্মিনাল চালু করে ওখানে জাহাজ হ্যান্ডলিং শুরু করা সম্ভব হলে বন্দরের ছয়টি জেটি ভেঙ্গে কেসিটি বাস্তবায়ন করা হবে বলেও উল্লেখ করেছেন বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্ল্যানিং এন্ড এডমিন) মোহাম্মদ জাফর আলম। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল জুলফিকার আজিজ দৈনিক আজাদীকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে বেড়েছে। দেশের আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যের চাহিদা পুরোপুরি মোকাবেলা করার মতো দক্ষতা এবং সক্ষমতা আমাদের রয়েছে। একই সাথে ভবিষ্যতের চাহিদা মেটাতে আমরা নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহন করছি। নতুন নতুন পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছি। চট্টগ্রাম বন্দরকে নিয়ে সংশয়ের কোন অবকাশ নেই বলেও বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল জুলফিকার আজিজ উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে চট্টগ্রাম বন্দরের ভূমিকা বরাবরের মতো অব্যাহত থাকবে। আমরা আমাদের অবস্থান থেকে ভবিষ্যতের চাহিদা মোকাবেলায় কোন ধরনের সমস্যা হবে বলে মনে করছি না।
পোর্ট ইউজার্স ফোরামের সভাপতি ও চিটাগাং চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন হচ্ছে। বহুমুখী উন্নয়ন। বন্দরের কর্মকান্ড নিয়ে আমরা যেমন খুশী, তেমনি কিছু কিছু ব্যাপারে চিন্তিতও। তিনি বলেন, বন্দরের বিভিন্ন কন্টেনার টার্মিনাল নির্মান এবং পরিচালনায় বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণের কথাবার্তা হচ্ছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠান কীভাবে টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনা করবে, উৎপাদনশীলতা কিভাবে হিসেব করা হবে, বন্দরের রয়্যালটি শেয়ারিং কত নির্ধারণ হবে, কত বছর তারা এটি পরিচালনা করবে, এরপর কীভাবে বন্দরের কাছে হস্তান্তর করবে, কাজের মান সন্তোষজনক না হলে বিদেশিদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে-এ বিষয়গুলোও খুব গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো নির্ধারণ না করে বিদেশিদের টার্মিনাল পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হলে তা বিপদ ডেকে আনতে পারে। বন্দরের ফান্ডে পর্যাপ্ত টাকা থাকার পরও বিদেশিদের টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেয়ার আগে সবকিছু নিয়ে আরো বেশি করে ভাবার পরামর্শ দেন চেম্বার প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, আমরা বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়ার বিপক্ষে।

x