বন্দরনগরীর শব্দদূষণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে ॥ রোধে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের কাজে নামা জরুরি

মঙ্গলবার , ৬ আগস্ট, ২০১৯ at ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ
53

শব্দদূষণে চট্টগ্রাম মহানগরীর পরিবেশ ক্রমেই দূষিত হচ্ছে। বন্দর নগরী চট্টগ্রামকে একসময় বলা হতো শান্তির শহর। শহরের চারদিকে ছোট বড় পাহাড়, গাছপালা, লেক সমুদ্র সৈকত প্রভৃতি নিয়ে কবির দৃষ্টিতে হয়ে উঠেছিল ‘সিন্ধু মেখলা, ভূধরস্তনী রম্যা নগরী চট্টলা। কিন্তু বর্তমানে সেই ‘চট্টলা’ আর নেই। নেই পাখির কাকলি-কুজনও। পরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে প্রতিদিনই এর পরিবেশ অবক্ষয় হচ্ছে। একই সাথে বাড়ছে মারাত্মক শব্দদূষণ। পাখির কুজনের বদলে শোনা যায় যানবাহনের কানফাটা আওয়াজ। বাসের হর্ণের শব্দ ৯৫ ডেসিবল, মোটর সাইকেলের হর্ণের শব্দ ৮৭ থেকে ৯০ ডেসিবল, কলকারখানার মেশিনের শব্দ ৮০ থেকে ৯০ ডেসিবল। বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থেকে সৃষ্ট শব্দ। কেবল বাইরের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে শব্দদূষণ হচ্ছে না, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন কর্মকান্ড থেকেও শব্দদূষণ হচ্ছে। অন্যান্য শহরের মতো চট্টগ্রামেও রয়েছে আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক এলাকা, শিল্প এলাকা, কিছু নীরব এবং কিছু মিশ্র এলাকা।সব এলাকায় শব্দদূষণের মাত্রা সমান নয়, আবার প্রতিটি এলাকার শব্দের জন্য নির্ধারিত মানমাত্রাও সমান নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) শব্দের সর্বোচ্চ মানমাত্রা দিবাকালীন ৪৫ ডেসিবল, রাত্রিকালীন ৩৫ ডেসিবল নির্ধারিত করেছে। আবার বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর ক্ষমতাবলে শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০০৬ প্রণয়ন করা হয়। শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০০৬ অনুসারে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার জন্য শব্দের মানমাত্রা নীরব (হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় , গ্রন্থাগার) আবাসিক, মিশ্র, ব্যবসায়িক এবং শিল্প এলাকার জন্য দিনের বেলায় যথাক্রমে ৪৫, ৫০, ৬০, ৭০ ও ৭৫ ডেসিবল এবং রাতের বেলায় যথাক্রমে ৩৫, ৪০,৫০, ৬০ ও ৭০ ডেসিবল নির্ধারিত রয়েছে। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এসব তথ্য প্রকাশিত হয়।
এতে আরো বলা হয়, ২০১৭ সালে পরিবেশ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও অংশীদারিত্বমূলক কর্মসূচির আওতায় আটটি বিভাগীয় শহরের শব্দের মাত্রা পরিমাপবিষয়ক জরিপ করা হয়। জরিপ অনুযায়ী, চট্টগ্রাম শহরের সবচেয়ে বেশি শব্দদূষণ হয় করিমউল্লাহ মার্কেট এলাকায় এবং তুলনামূলক কম শব্দদূষণ হয় কোর্ট পয়েন্টে। শহরের ১০টি নির্বাচিত আবাসিক এলাকার মধ্যে ‘বন্দর আবাসিক’ এলাকায় শব্দের মাত্রা নির্ধারিত মাত্রার প্রায় তিনগুণ পাওয়া যায়, যেখানে সর্বোচ্চ শব্দ মান ১৩০ দশমিক ৪ ডেসিবল এবং সর্বনিম্ন শব্দ মান ৫৭ দশমিক ৮ ডেসিবল। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পোর্ট কলোনি মোড়। এ এলাকার শব্দের মান মাত্রা নির্ধারিত মাত্রার দ্বিগুণ। শহরের নির্বাচিত ১১টি মিশ্র এলাকার মধ্যে ইপিজেড (ফ্রি পোর্ট মোড়) এ শব্দের মাত্রা নির্ধারিত মাত্রার প্রায় চার গুণ, যেখানে সর্বোচ্চ শব্দমান ১৩০ দশমিক ৬ ডেসিবল। ‘দক্ষিণ বাকলিয়া’ এলাকার সর্বনিম্ন শব্দমান ৪৫ দশমিক ৮ ডেসিবল। প্রায় একই রকম শব্দমাত্রা পাহাড়তলী, চাক্তাই এলাকার। চট্টগ্রাম শহরের সাতটি নীরব এলাকা জামালখান রোড, সরকারি সিটি কলেজ, পাঠানটুলী, বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল হাসপাতাল, ডায়াবেটিক হাসপাতাল, হামজারবাগ এর মধ্যে ডায়াবেটিক হাসপাতাল এলাকার শব্দের মাত্রা সর্বোচ্চ ১৩২ দশমিক ১ ডেসিবল এবং সর্বনিম্ন মাত্রা ৫৪ দশমিক ৮ ডেসিবল পাওয়া যায়। যেখানে নির্ধারিত মানমাত্রার মধ্যে নীরব এলাকার নির্ধারিত শব্দের মাত্রা সবচেয়ে কম। নীরব এলাকার অবস্থানরত মানুষের মধ্যে হাসপাতালের রোগী, গর্ভবতী নারী, স্কুলের শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা রয়েছেন যারা শব্দদূষণের কারণে সাধারণ মানুষের চেয়েও অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। চট্টগ্রাম শহরের দুটি শিল্প এলাকার মধ্যে জালালাবাদ এলাকার শব্দের মাত্রা বেশি অন্যদিকে মনসুরাবাদ শিল্প এলাকারও কম নয়। এসব শিল্প এলাকার মানুষের শারীরিক ক্ষতির কারণ এ শব্দদূষণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে শব্দের মাত্রা ৮০ ডেসিবলের ওপর হলে বিপজ্জনক। অর্থাৎ এটা স্পষ্ট যে চট্টগ্রামের প্রতিটি মানুষ নিজের অজান্তে বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে জীবনযাপন করছে। জরিপ মতে, চট্টগ্রাম শহরের অধিকাংশ মানুষ জানেন না শব্দ দূষণের ফলে কী ক্ষতি হয়। শব্দদূষণ আইন ২০০৬ সম্পর্কেও তারা কিছু জানেন না। তবে মানুষ শব্দদূষণের উৎসগুলো নির্দিষ্ট করেন এবং মোটরযানের হর্ণকে শব্দ দূষণের মূল কারণ বলে দাবি করেন। শহরের বিভিন্ন এলাকায় হর্ণ গণনা করার পর দেখা যায় বহদ্দার এলাকাটি হর্ণ ব্যবহারের দিক থেকে শীর্ষে। সেখানে ১০ মিনিটে ৬৭২ টি হর্ণ বাজানো হয়, এর মধ্যে ৮৭টি হাইড্রোলিক এবং ৫৮৫ টি সাধারণ হর্ণ। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ২০০২ সালের ২৭ মার্চ হাইকোর্ট হাইড্রোলিক হর্ণ এবং বিকট শব্দ সৃষ্টিকারী যে কোনো ধরনের হর্ণ, গাড়িতে সংযোজনের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন এবং গাড়িতে বাল্ব হর্ণ সংযোজনের নির্দেশ দেন। ‘বাংলাদেশ শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা অনুযায়ী নীরব এলাকাগুলোর চারদিকে ১০০ মিটারের ভেতর কোনো ধরনের হর্ণ বাজানো যাবে না। সরকার শব্দদূষণ রোধে ‘বাংলাদেশ শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬’ প্রণয়ন করে। এছাড়া শব্দদূষণ রোধে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ সহ কয়েকটি আইনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। কিন্তু শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও অংশীদারিত্ব কর্মসূচির জরিপ মতে, সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রায় ৯৭ শতাংশ জানান, তারা কখনো শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন প্রয়োগ করতে দেখেননি। শব্দদূষণের কারণে সাময়িকভাবে বা স্থায়ীভাবে শ্রবণশক্তি হ্রাস বা শ্রবণশক্তি হারানো ছাড়াও জন্মগত জটিলতা, কানে দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ ও বার্ধক্যজনিত সমস্যা হয়। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা শব্দদূষণকে শ্রবণ হ্রাসের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ছাত্রছাত্রী,শিশু, হাসপাতালের রোগী, গর্ভবতী নারী, ট্রাফিক পুলিশ, পথচারী এবং গাড়িচালকেরা শব্দদূষণের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশুনার প্রতি মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে, শিশুরা স্কুলে যাওয়ার সময় হর্ণের বিকটশব্দে ভয় পাচ্ছে, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। শব্দদূষণ প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষেরও শরীর ও মনের ওপর প্রভাব ফেলছে, যা তাদের সাংসারিক জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
অতএব আর কালক্ষেপণের সময় নেই সরকারকে শব্দদূষণরোধে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। আইনভঙ্গকারীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। জনগণকেও এ ব্যাপারে সচেতন করা দরকার। আমাদেরও ব্যক্তিগত সামাজিক আইনিভাবে শব্দদূষণ প্রতিরোধ ও প্রতিকার করা প্রয়োজন। আমাদের উচিত বাসাবাড়িতে উচ্চৈঃস্বরে গান না শোনা, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে উচ্চশব্দের পরিবর্তে সীমিত শব্দে মাইক ব্যবহার করা। এছাড়া কলকারখানা ও নির্মাণকাজে অপেক্ষাকৃত কমশব্দ উৎপন্ন হয় এমন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে হবে। রাত্রিবেলা উচ্চশব্দ সৃষ্টিকারী সব কাজকর্ম থেকে বিরত থাকা বিধেয়। প্রকৃতপক্ষে, সরকার ও সচেতন মানুষ যৌথভাবে কাজ করলে চট্টগ্রাম শহরে শব্দদূষণ রোধ করা অসম্ভব কাজ নয়। তবে এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের সমন্বিতভাবে কাজে নামাটাই জরুরি।

x