বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধে অভিযুক্তদের শাস্তি নিশ্চিত করুন

মঙ্গলবার , ৬ নভেম্বর, ২০১৮ at ৪:৫২ পূর্বাহ্ণ
64

খালাসের অনুমতি পাওয়ার পর বন্দর থেকে কারখানায় পরিবহন কাজে ব্যবহৃত গাড়ি একই থাকলেও উধাও হয়ে যায় বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল। এর বদলে গাড়িতে করে কারখানায় আসে নিম্নমানের পণ্য, যা লোড করা হয়েছে পথেই। সম্প্রতি এ অ্যান্ডবি আউটওয়্যার লিমিটেডের এমন অভিনব জালিয়াতি উদঘাটন করেছে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট চট্টগ্রাম। পত্রিকান্তরে গত ২০ অক্টোবর এ খবর প্রকাশিত হয়েছে। খবরের বিবরণে বলা হয় প্লট নং২৯ ও ৩০, সেক্টর-৪, চট্টগ্রাম ইপিজেড ঠিকানার রফতানিমুখী তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান এ অ্যান্ড বি আউট ওয়্যার লিমিটেড। কারখানা চট্টগ্রাম হলেও শূন্য শুল্কের কাঁচামাল আমদানিতে অনেক দূরের মোংলা বন্দর ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির আমদানি করা কাঁচামাল নজরে রাখে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। এ নজরদারিতেই ধরা পড়ে প্রতিষ্ঠানটির পণ্য বদলের এ জালিয়াতি। কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট সূত্র জানায় প্রতিষ্ঠানটির ওপর বন্ড কর্মকর্তাদের সন্দেহ তৈরি হওয়ায় বন্ড কমিশনারেটের একটি টিম মোংলা কাস্টম হাউজে দাখিল হওয়া আগামপত্রের (নম্বর ১৪৪৭৯) বিপরীতে খালাস হওয়া পণ্য রিসিভ করতে অপেক্ষা করতে থাকে চট্টগ্রাম ইপিজেডে। চালানটির তিন কাভার্ড ভ্যান পণ্য ইপিজেডে পৌঁছালে সিলগালা করে ৭ অক্টোবর এর কায়িক পরীক্ষা করে তদন্ত দল। আমদানি নথিতে উন্নতমানের সিনথেটিক ফ্যাব্রিকসের ঘোষণা থাকলেও কায়িক পরীক্ষায় পাওয়া যায় নিম্নমানের ভিন্ন ধরনের পণ্য। পরে অনুসন্ধান চালিয়ে এবং এ এ্যান্ড বি আউটওয়্যারের কর্মকর্তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট নিশ্চিত হয় যে আমদানি পণ্য নির্দিষ্ট কারখানায় পৌঁছার আগেই মাঝপথে উচ্চদামে বিক্রি করে এর পরিবর্তে অত্যন্ত নিম্নমানের কাপড় কাভার্ড ভ্যানে বোঝাই করা হয়েছে।
দেশের শতভাগ রফতানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহিত করতে যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয় সরকার, তাকে বলা হয়ে থাকে বন্ড সুবিধা। এ সুবিধার আওতায় বিনাশুল্কে বিদেশ থেকে কাঁচামাল এনে নিজস্ব বন্ডেড ওয়্যার হাউজে রেখে পুরোটাই সংশ্লিষ্ট কারখানায় ব্যবহার করার কথা। এ সুবিধা যখন চালু হয়েছিল, তখন দেশের বেশির ভাগ শিল্প প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের ৮০ শতাংশ কাঁচামালই আমদানি করতে হতো। কিন্তু গত তিন দশকে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বাজার যেমন সম্প্রসারিত হয়েছে, তেমনি সহায়ক শিল্প গড়ে উঠেছে দেশে। তাই বেশির ভাগ কাঁচামাল এখন আমদানি করতে হয় না। কিন্তু তারপরও এসব শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করা হচ্ছে। বিনা শুল্কে আনীত এসব পণ্যের বেশির ভাগই বিক্রয় হচ্ছে কালোবাজারে। এতে দেশের সহায়ক শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেশী পণ্যের চেয়ে গুণগত মানে খারাপ পণ্যও চলে আসছে বাজারে। এতে অসম প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে এবং দেশের অনেক শিল্প পড়ছে লোকসানের মুখে। আবার বন্ড সুবিধার আড়ালে অর্থ পাচারেরও অভিযোগ রয়েছে। অতিরিক্ত দাম দেখিয়ে পণ্য আমদানি করে বিদেশে অর্থ পাঠানো হচ্ছে। যেসব প্রতিষ্ঠানের নামে বিদেশে অর্থ পাঠানো হচ্ছে সেসব প্রতিষ্ঠানের মালিকও এদেশেরই কোন না কোন অসাধু ব্যবসায়ী। এসব নানা কিছু বিচার করলে এটাই মনে হয় যে বন্ড সুবিধা দেশের শিল্পের জন্য ক্ষতিকর। তাই এ বন্ড সুবিধা নিয়ে নতুন করে ভাববার সময় এসেছে।
বন্ড সুবিধায় যে সব পণ্য আমদানি করা হয় তার শর্ত হচ্ছে, দেশের কারখানায় সেসব ব্যবহৃত হতে হবে। আবার রফতানির সময় তা বিদেশে চলে যাবে। যেমন-বিশেষ কোনো পণ্য প্যাকেজিংয়ের জন্য বিদেশ থেকে প্যাকেজিং সামগ্রী আনতে পারে। ঐ রফতানি পণ্য প্যাকেট করতেই তা ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এসব পণ্য চলে যাচ্ছে খোলাবাজারে। বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের আর একটি উদাহরণ হলো, অতিরিক্ত মূল্য দেখানো। অনেক প্রতিষ্ঠানই আমদানিতে প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে অর্থ পাচার করে যোগসাজশ করে বিদেশে ভিন্ন নামে নিজেদের প্রতিষ্ঠান খুলে সেসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেই পণ্য আমদানি করা হয়। অনেকে আবার রফতানি পণ্যের দাম কম দেখিয়েও অর্থ পাচার করে। অন্যদিকে রফতানি পণ্যের চেয়ে আমদানি করা হচ্ছে বেশি। এভাবে শুল্কমুক্ত সুবিধা নিয়ে দেশ থেকে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা পাচার করে দিচ্ছে একটি অসাধু গোষ্ঠী। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলেও তাঁরা পরোয়া করছে না। এমন কি শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার বিষয়টি প্রমাণ হওয়ার পর উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও উপেক্ষা করছে অনেক প্রতিষ্ঠান।
বন্ড সুবিধার আড়ালে যেসব প্রতিষ্ঠান অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। তা না হলে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাবে। পরিণামে ক্ষতি হবে দেশের অর্থনীতির। একই সাথে অন্যান্য বন্ড সুবিধাপ্রাপ্তসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে। তা হলে ভবিষ্যতে কোন প্রতিষ্ঠান এ ধরনের কাজ করতে উদ্যোগী নাও হতে পারে। বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত সকল প্রতিষ্ঠানই সুবিধার অপব্যবহার করছে এমন কথা আমরা বলছি না। কিছু অসৎ ব্যবসায়ীই এই সুবিধার অপব্যবহার করেই যাচ্ছে। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করা হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে। তবে সে আইন কতটা প্রয়োগ হয়েছে বা হচ্ছে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। আইন থাকলেও যদি আইনের প্রয়োগ না থাকে তাহলে অপরাধ যে বেড়ে যায়-এটা জানা কথা। আমরা চাই, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা গ্রহণ করুক। অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধ করা অসম্ভব।

x