বদলে যাওয়া সময়ে নারীর অবস্থানের বদল ঘটছে কি?

শিউলি শবনম

শনিবার , ২০ এপ্রিল, ২০১৯ at ৮:৪৫ পূর্বাহ্ণ
100

যেসব নারী সাইক্লিং করে, রান করে তাদের প্রায় সময় শুনতে হয়, তুমি মেয়ে হয়ে এসব করছো কেন? কী লাভ তাতে? সমাজে বিশিষ্টজন হিসেবে পরিচিত, খুব কাছের এক বন্ধু, ক’দিন আগে আমাকে শোনালেন মেয়েদের দৌড়ানো কোনো ভদ্র, শোভন কাজ নয়।’ আমরা যখন গ্রুপ রান করি তখন কে নারী, কে পুরুষ সেখানে আলাদা কোনো লৈঙ্গিক পরিচয় থাকে না। আমরা প্রত্যেকেই তখন একেকজন সাধারণ রানার, অ্যাথলেট। শরীরচর্চা করতে গিয়ে একজন পুরুষকে লাভ-ক্ষতির কোনো প্রশ্নের সম্মুখীন হতে না হলেও প্রতিটি নারীকে হাজারো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়।

এ-শহরে আমার প্রথম পহেলা বৈশাখ উদযাপন। সেটা ছিল ২০০২ সাল। গ্রাম থেকে সবে শহরের কলেজে পড়তে আসা-কৈশোর পেরুনো একদল তরুণ-তরুণী। তুমুল আবেগ নিয়ে আমরা সে-বার বাঙালির বর্ষবরণ উৎসবে যোগ দিই প্রথম। জনসমুদ্র ঠেলে ডিসি হিলের পূর্ব গেট দিয়ে ঢুকে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছানোর চেষ্টা করি বন্ধুরা মিলে। ছেলেবন্ধুরা মেয়েদের সুরক্ষা দেয়ার চেষ্টা করে গেলেও সেই ভিড়ে আমার বন্ধুরাসহ কম-বেশি সব নারীই সেদিন যৌন নিগ্রহের শিকার হই আমরা। আজ থেকে ১৬ বছর আগের সেই দুঃসহ স্মৃতি আমার ভেতর এখনো বিবমিষা জাগায়। আমার বন্ধুদের অনেকেই সে-স্মৃতি আজও ভুলতে পারেনি। বর্ষ বরণের উৎসব আমাদের স্মৃতিতে এক আতংকের নাম হয়ে ওঠে। আমরা সিদ্ধান্ত নিই ভবিষ্যতে আর কখনো পহেলা বৈশাখ উদযাপন না করার।
এখনো এ-শহরের আনাচে-কানাচে, অলি-গলিতে, বিভিন্ন ছল-ছুতোয়, উৎসব-পার্বণে, বাসে-ভিড়ে নারীরা প্রতিনিয়ত যৌন হয়রানির শিকার হয়। তবে আশার কথা হলো, একযুগ আগের বর্ষবরণ আয়োজনের বিশৃঙ্খলায় বেশ শৃঙ্খলা ফিরেছে পুলিশ প্রশাসনের তৎপরতায়, বিচক্ষণতায়। আর উৎসবকে ঘিরে অবধারিতভাবে যৌন সহিংসতার ঘটনা এবার অন্তত এই শহরে ঘটেনি বলে আমার বিশ্বাস এবং পুলিশের তথ্যও তাই।
এক আলাপে কোতায়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মহসীন জানান, শুধুমাত্র নারীদের সুরক্ষা দিতে, যৌন হয়রানি ঠেকাতে ডিসি হিল ও সিআরবির বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশের ১৬টি গোয়েন্দা টিম কাজ করেছে। নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে পুলিশের ওয়াচ টাওয়ার থেকে। ফুটপাতে বসতে দেয়া হয়নি কোনো হকার, যাতে বেচাকেনাকে ঘিরে অহেতুক ভিড় না বাড়ে। উৎসবপ্রিয় মানুষ যাতে সহজে যাতায়াত করতে পারে। এছাড়া ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেবা ৯৯৯ এ ফোন করে তাৎক্ষণিক অভিযোগ জানানোর সুযোগ। যেখানে অভিযোগকারীকে সহায়তা করতে সর্বনিম্ন ২ মিনিট থেকে সর্বোচ্চ ১০ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাবে পুলিশের বিশেষ টিম।
এই একুশ শতকেও প্রবলভাবে পুরুষতান্ত্রিক বৃত্তে আটকে থাকা আমাদের এই ধর্ষকামী সমাজ। যেখানে এখনো ফেনীর নুসরাতের মতো অজস্র নুসরাতকে যৌন হয়রানির অভিযোগ দিতে থানায় গিয়ে দ্বিতীয় দফায় মানসিকভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়, সেখানে পুলিশের ছোট ছোট কিন্তু ইতিবাচক এসব উদ্যোগ আমাদের আনন্দিত করে নিঃসন্দেহে। সম্প্রতি চট্টগ্রামের নওরিন ও বর্ষা নামে দুই ছাত্রীকে ইভ টিজিং ও গণ পরিবহনে যৌন হয়রানির আলাদা দুটো ঘটনায় অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে পুলিশের ত্বরিৎ উদ্যোগও আমাদের আশার আলো দেখায়।
সময়ের ব্যবধানে আমাদের সিদ্ধান্তেরও বদল হয়েছে। ইভ টিজারদের, নারী নিপীড়কদের মুখোমুখি বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে-লড়াই করে, বিশেষ ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর রক্তচক্ষু, অন্ধ মতবাদকে পেছনে ফেলে আমরা এখন বেশ আড়ম্বরতার সাথে, সেজেগুজে, বন্ধুর সাথে গলাগলি করে ডিসি হিল, সিআরবি, শিল্পকলা, চারুকলা ঘুরে নতুন বছরকে উদযাপন করি। মঙ্গল শোভাযাত্রায় যোগ দিই। সুন্দরের পথে মানুষের এই অদম্য যাত্রায় প্রশাসন, রাষ্ট্র পাশে থাকলে কোনো নুসরাতকে যৌন নিপীড়নকারীর দেয়া কুৎসিত আগুনে ঝলসে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হয় না।
১৯৯৯ সালে থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপন করতে গিয়ে বাঁধন নামের এক তরুণীর যৌন হয়রানির ঘটনা কারো ভুলে যাওয়ার কথা নয়। সেই দুঃসহ ঘটনা ভীষণভাবে নাড়া দেয় চট্টগ্রামের তরুণ এক মার্শাল আর্ট শিল্পী ইমরানকে। আমার পেশাগত কাজের সূত্র ধরেই ইমরানের সাথে পরিচয় মাত্র মাসখানেক আগে। চারপাশের অনেক নেতিবাচক ঘটনার ভেতরেও আমাকে স্বপ্ন দেখায় সে তরুণ-বন্ধুটি। যে পুরুষতান্ত্রিক বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসা এ সমাজের আলোকিত এক মানুষ নিঃসন্দেহে। নারীদের আত্মরক্ষার কৌশল শিখিয়ে আত্মনির্ভর ও সাহসী করতে ২০১৬ সালে ইমরান একটি প্রজেক্ট শুরু করে। যার নাম ‘সেল্ফ ডিফেন্স ফর গার্ল’। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন শে্রিণ পেশার নারীরা তার প্রজেক্টের অধীনে গত তিন বছর ধরে এই শহরে, সিআরবির পাহাড়ের পাদদেশে কারাতে শিখছে। আত্মরক্ষার কৌশল শিখে এ-প্রতিকূল সমাজব্যবস্থায় নিজেকে টিকিয়ে রাখতে লড়াই করে যাচ্ছে।
সেল্ফ ডিফেন্স প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমি খোঁজ পাই এ-শহরের অনেক সাহসী কিশোরীর, তরুণীর। আবার দেখা পাই এমন অনেক বোরকা- হিজাব পরিহিতা নারীর। যারা মা, বাবা, ভাই ছাড়া আগে একা পথে বেরুনোর সাহস পেত না। চরম রক্ষণশীল পরিবার থেকে উঠে এসে তারা এখন কারাতে শিখছে প্রতিদিন এবং অবশেষে তারাও বিশ্বাস করতে শিখেছে ‘একজন নারীকে রক্ষার দায়িত্ব বাবা, ভাই কিংবা স্বামীর নয়। সে দায়িত্ব তার নিজের।’
সিআরবির বক্ষব্যাধি হাসপাতালের পাশে, পাহাড়ের গা-ঘেঁষে খোলা মাঠটিতে আমি তাদের দেখি। ২০-২৫ জন নারী সুশৃঙখলভাবে দাঁড়িয়ে মার্শাল আর্ট চর্চা করে প্রতি ভোরে। তাদের উচ্চকিত কণ্ঠ, মাটিতে দৃপ্ত পা ফেলা, মুষ্ঠিবদ্ধ হাত যেন এ-সমাজের স্তরে স্তরে জমে থাকা ক্লেদ, কুসংস্কার, বাঁকা দৃষ্টি, অশিক্ষার বিরুদ্ধে এক ঝলক আলো, তীব্র প্রতিবাদ। যৌন নিপীড়ককে, ইভ টিজারকে কীভাবে শায়েস্তা করতে হয়, প্রতিবাদের ভাষা কী হওয়া উচিত সেসব তারা রপ্ত করেছে ইতোমধ্যেই। যে-কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে তারা জানে। তারা জানে নারী মানেই ফুলের ঘায়ে মূর্ছা যাওয়া প্রাণ নয়। প্রাকৃতিক কারণেই শারীরিক বৈশিষ্ট্যে নারী-পুরুষ আলাদা হলেও বুদ্ধিবৃত্তি কিংবা দৈহিক সক্ষমতায় কেউ কারো চেয়ে এগিয়ে বা পিছিয়ে নয়। সবই প্রকৃতপক্ষে নির্ভর করে কে কেমন যাপনের চর্চা করে তার উপর।
নির্ভীক এসব আগুনপাখিকে আমি দূর থেকে দেখি। আমার রানার বন্ধুদের সাথে সিআরবিতে দৌড়াতে দৌড়াতেই প্রতি ভোরে তাদের দেখি। ক’বছর আগেও এ শহরে সাইক্লিং কিংবা রানিংয়ে নারীদের খুব একটা দেখা যায়নি। শারীরিক ফিটনেস রক্ষায় বড় জোর ভোরে হাঁটতে দেখা গেছে। এখন কিশোরী, তরুণী কিংবা সব বয়সী নারী সমানভাবে সাইক্লিং করছে, সকাল-সন্ধ্যা দৌড়াচ্ছে সিআরবি, ডিসি হিল, জিলাপী পাহাড়সহ বিভিন্ন স্থানে। দেশে ও দেশের বাইরে বিভিন্ন ম্যারাথন ইভেন্টে অংশ নিয়ে নারীরাও মেডেল, ক্রেস্টসহ নানান অর্জনে নিজেদের এগিয়ে নিচ্ছে। এসব কর্মকান্ডের সাথে সাথে ভেঙে পড়ছে নারীকে নিয়ে এ সমাজে প্রচলিত দীর্ঘদিনের সামাজিক বাধা নিষেধ, সব ধরনের ট্যাবু। এ- শহরেই গড়ে উঠেছে দ্বি-চক্রযান, এফএনএফ, চট্টলা রানার্সের মত বিভিন্ন সংগঠন। যেখানে তরুণ তরুণীরা একসাথে সাইক্লিং করে, দৌড়ায়। শহরের অদূরে, শহরের বাইরে আয়োজন করে বিভিন্ন ম্যারাথন ইভেন্টের, সাইক্লিং রাইডের।
যদিও এ-সমাজের এক শ্রেণির ঊনমানুষের দল নারীর চলার পথ বারবার বাধাগ্রস্ত করে তুলতে চেয়েছে বিভিন্ন সময়। এখনো সে-ধারা অব্যাহত। বেশ চটপটে, সুদক্ষ এক তরুণী সাইক্লিস্টকে জানি। বয়স ও উচ্চতার তুলনায় যার ওজন প্রায় দ্বিগুণ। সে তার মেদ ঝরিয়ে ঝরঝরে হতে চায়। এজন্য দৌড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তার ছেলেবন্ধুর সম্মতি নাই বলে সে দৌড় শুরু করতে পারে না। ছেলেবন্ধুর দুঃশ্চিন্তা এতবড় শরীর নিয়ে একটা মেয়ে দৌড়ালে মানুষ হা করে তাকিয়ে থাকবে। মানুষ হা করে তাকাবে সেটা সত্য। কিন্তু সে দায় আমার নয়। সেজন্য আমি নিজের ক্ষতির পাল্লা আরো ঝুঁকতে দেবো কিনা সে সিদ্ধান্ত আমাকেই নিতে হবে।
যেসব নারী সাইক্লিং করে, রান করে তাদের প্রায় সময় শুনতে হয়, তুমি মেয়ে হয়ে এসব করছো কেন? কী লাভ তাতে? সমাজে বিশিষ্টজন হিসেবে পরিচিত, খুব কাছের এক বন্ধু, ক’দিন আগে আমাকে শোনালেন মেয়েদের দৌড়ানো কোনো ভদ্র, শোভন কাজ নয়।’ আমরা যখন গ্রুপ রান করি তখন কে নারী, কে পুরুষ সেখানে আলাদা কোনো লৈঙ্গিক পরিচয় থাকে না। আমরা প্রত্যেকেই তখন একেকজন সাধারণ রানার, অ্যাথলেট। শরীরচর্চা করতে গিয়ে একজন পুরুষকে লাভ-ক্ষতির কোনো প্রশ্নের সম্মুখীন হতে না হলেও প্রতিটি নারীকে হাজারো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়।
আমার রানার বন্ধু শিরিন। যিনি একজন সিঙ্গেল মাদার। প্রকৃতই এক লড়াকু নারী। তিনি যখন বছর খানেক আগে স্বাস্থ্য সুরক্ষার অংশ হিসেবে দৌড় শুরু করেন সিআরবিতে, তখন ভোরে হাঁটতে আসা একদল মহিলা শিরিনকে তীব্রভাবে কটূক্তি করে। প্রথম শ্লেষ বান শিরিনের গায়ে ওড়না নেই, দ্বিতীয়ত একজন নারী হয়ে জনসম্মুখে তিনি দৌড়ানোর ধৃষ্টতা দেখাচ্ছেন।
তবে শিরিনের বলিষ্ঠ উত্তর সেসব কূপমন্ডুক নারীকে বেশিদূর আগাতে দেয়নি সেদিন। ‘এই অগ্রসর, চ্যালেঞ্জিং সময়ে মানুষ যখন নতুন নতুন গবেষণা নিয়ে ব্যস্ত , নারীরা যেখানে মঙ্গলগ্রহে, চাঁদে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে সেখানে আপনি পড়ে আছেন বেহুদা ওড়না নিয়ে। আমার বুক ঢাকার কথা আমাকে ভাবতে দিন। আপনার দৃষ্টিভঙ্গিটা বরং পাল্টান।’
নারীর বুকে ওড়না থাকা না থাকা এ-সমাজে এখনো খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ঘরে আগুন লাগলে ঘর ছেড়ে দৌড়ে বেরুনোর আগেও নারীকে ভাবতে হয় তার ওড়নাটা নিতে সে ভোলেনি তো! নারীর স্বাভাবিক শরীরবৃত্তীয় সমস্ত ব্যাপার এ-সমাজের চোখে যতদিন স্বাভাবিক হবে না ততদিন মানবিক সমাজ গড়ে উঠবে না। সে সমাজ কতদূর?

লেখক: সাংবাদিক, একুশে টেলিভিশন

x