বদলে যাওয়া এক বিদ্যালয়ের গল্প

মনজুর আলম : বোয়ালখালী

সোমবার , ২৩ জুলাই, ২০১৮ at ৬:১৩ পূর্বাহ্ণ
121

ইচ্ছা থাকিলে উপায় হয়” এই বাক্যটা ছোটবেলা থেকে সবাই কম বেশি শুনে আসছেন। তবে পড়ালেখার পাঠ চুকিয়ে যখন মানুষের বাস্তব জীবনে দায়িত্ব চেপে বসে তখন উপরোক্ত বাক্যটির মর্মার্থ বুঝা যায়। আমরা আশেপাশের অনেক বদলে যাওয়া মানুষের গল্প শুনি। আবার সমস্যা সমাধান করে নতুন উদ্যমে এগিয়ে চলার গল্প শুনে অনুপ্রাণিত হই। আজ তেমন একটা বিদ্যালয়ের গল্প উপস্থাপন করছি। বোয়ালখালী চট্রগ্রাম জেলার কর্ণফুলি নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত একটি উপজেলা। এ উপজেলা ব্রিটিশ আমল থেকে দেশ স্বাধীন হওয়া এবং স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রেখে আসছে। তেমনি শিক্ষার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে নেই। এ উপজেলার পূর্ব সীমান্তে রয়েছে আহলা কড়লডেঙ্গা ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের দক্ষিণ কড়লডেঙ্গা গ্রামটি বোয়ালখালী উপজেলার শেষ সীমানায় অবস্থিত। এরপর রয়েছে পটিয়া উপজেলার পূর্ব রতনপুর ইউনিয়ন। প্রত্যন্ত এলাকা হওয়ার কারণে এখানকার লোকজন বেশির ভাগই কৃষিকাজ এবং পাহাড়ে বাগান করে জীবিকা নির্বাহ করেন। বোয়ালখালীর অন্যান্য ইউনিয়নের তুলনায় উক্ত এলাকার শিক্ষা ব্যবস্থা অনেক পিছিয়ে। কারণ অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, দারিদ্র্যতা, সচেতনতার অভাবে শিক্ষাক্ষেত্রে উক্ত এলাকাটি সব সময় পিছিয়ে থাকতো। এই এলাকাতেই রয়েছে দক্ষিণ কড়লডেঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। অজ পাড়ার স্কুল বলে বিদ্যালয়টিতে সব সময় শিক্ষক স্বল্পতা লেগে থাকে। প্রধান শিক্ষক নেই প্রায় ১০ বছর। শিক্ষক আসে, বদলি হয়ে চলে যান পছন্দমত কাছের কোন বিদ্যালয়ে। সবাই কোন মতে দায় সারা অবস্থায় বিদ্যালয়টিতে শিক্ষকতা করে যেতেন। তাছাড়া ম্যানেজিং কমিটি থাকলেও তা ছিল নামে মাত্র। কার্যক্রম ছিলো স্থবির। তাই এলাকাবাসীও এ বিদ্যালয়ের ব্যাপারে তেমন কোন সহযোগিতার হাত বাড়াতেন না। এভাবে ধুঁকে ধুঁকে চলতে থাকা বিদ্যালয়টির নাম কোন এক সময় বোয়ালখালী ছাড়িয়ে দেশের আনাচে কানাচে পরিচিতি পাবে তা ঐ এলাকার কেউ কখনো কল্পনাও করেননি কোন সময়। ২০১২ সালে উক্ত বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন মোঃ ফারুক ইসলাম। যোগদানের পর থেকেই বিদ্যালয়টির পড়ালেখার মান উন্নত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যেতে থাকেন তিনি। পড়ালেখার পাশাপাশি স্কাউটস, খেলাধুলা, বিভিন্ন সাহিত্য ও সাংষ্কৃতিক প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীরা যেন কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতে পারেন সেই লক্ষ্যে কাজ করে যেতে লাগলেন। ২০১৩ সালে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টে ছেলেরা ইউনিয়ন পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় পরিবর্তনের। পরের বছর বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টে ইউনিয়ন পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন এবং উপজেলা পর্যায়ে রানার্সআপ হওয়া। ২০১৫ সালে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টে ইউনিয়ন, উপজেলা পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে উক্ত বিদ্যালয়ের মেয়েরা জেলা চট্টগ্রাম জেলা পর্যায়ে রানার্স আপ হওয়ার গৌরব অর্জন করে। সেই সাথে একই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তিশা জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়। বঙ্গমাতা ফুটবল খেলা পাল্টে দিলো বিদ্যালয় এলাকার পরিবেশ। একটি মাত্র খেলার কারণে দক্ষিণ কড়লডেঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়টি বোয়ালখালী ছাড়িয়ে চট্টগ্রাম জেলায় পরিচিতি লাভ করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টে ছেলেমেয়ে উভয়ই ইউনিয়ন পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন, ছেলেরা উপজেলা পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে জেলা পর্যায়ে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। জেলা পর্যায়ের খেলায় ভালো খেলেও সেমিফাইনালে হারতে হয়েছিল। সেমিফাইনালে হারলেও চট্টগ্রাম জেলার শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় এবং সেরা গোলদাতা নির্বাচিত হয়েছিল উক্ত বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বর্তমানে ২০১৮ সালের বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গমাতা ফুটবলে ছেলে এবং মেয়েরা ইউনিয়ন পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে উপজেলা পর্যায়ে অংশগ্রহণ করার অপেক্ষায় আছে। এই বিদ্যালয়ের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোঃ ফারুক ইসলাম দৈনিক আজাদীকে জানান২০১২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে তিনি দক্ষিণ কড়লডেঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। বোয়ালখালীর প্রত্যন্ত এলাকা হওয়ার দরুণ সবদিক থেকে পিছিয়ে ছিল এই বিদ্যালয়টি। তাছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থার করুণ দশার কারণে কোন শিক্ষক বেশিদিন উক্ত বিদ্যালয়ে থাকতে চাইতেন না। সুযোগ পেলেই বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যেতেন। এখানকার সিংহভাগ মানুষ খেটে খাওয়া। পাহাড়েই কাজ করে তারা জীবিকা নির্বাহ করেন। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী হওয়ার কারণে পড়ালেখায় বিদ্যালয়টি ছিলো অনেক পিছিয়ে। কারণ মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষক, ম্যানেজিং কমিটি এবং অভিভাবকদের এক হয়ে কাজ করতে হবে। কিন্তু এই এলাকায় সচেতনতার অভাবে পড়ালেখার মান উন্নয়নের কাজটা বার বার বাধাগ্রস্ত হয়ে আসছিল। তারপরও শুরু হলো বিদ্যালয়টিকে গুছানোর কাজ। বিদ্যালয়ে কোন প্রধান শিক্ষক ছিলেন না। দুইজন মাত্র শিক্ষক অনেক কষ্টে বিদ্যালয় চালাতে হিমশিম খেতাম। এই দুরবস্থা থেকে মুক্তি পেতে সিদ্ধান্ত নিলাম দুইজন প্যারা শিক্ষক রাখবো। যেই কথা সেই কাজ। দুইজন প্যারা শিক্ষক নিয়ে নেমে পড়লাম শিখন শেখানো কাজে। বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বসার চেয়ার টেবিলগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়াতে চেয়ার টেবিল যোগাড় করার কাজে সম্পৃক্ত হলাম। এলাকার যাদের মোটামুটি আর্থিক অবস্থা ভালো তাদের ডেকে চা চক্রের ব্যবস্থা করতাম। সাথে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরা। এভাবে অল্পদিনেই চেয়ার, টেবিলের সমস্যা সমাধান করে ফেললাম। বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর না থাকার কারণে ক্লাস চলাকালীন সময়ে বহিরাগতদের কারণে অনেক সমস্যায় পড়তে হতো। স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সহায়তায় সামনের সীমানা প্রাচীরও নির্মাণ করে ফেললাম। সরকারি অনুদানের অর্থ দিয়ে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, গেইট নির্মাণ থেকে শুরু করে সবগুলো কাজ করাতে লাগলাম। বিগত তিন বছরে অজো পাড়া গাঁয়ের এ বিদ্যালয়টি পরির্বতন হয়ে গেল। দূর থেকে কেউ বর্তমানে এই এলাকায় গেলে বিদ্যালয়ের পরিবেশ দেখে প্রশংসায় ভাসায়। খেলাধুলার সাফল্যেও ধারাবাহিকতার কারণে স্থানীয় চেয়ারম্যান এবং এলাকাবাসীর সহায়তায় বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ফুটবল খেলার জার্সি এবং অন্যান্য সরঞ্জাম যোগাড় করলাম। বিদ্যালয়ের গরিব শিক্ষার্থীদের খাতা, কলমের ব্যবস্থা করার জন্য মাঝে মাঝে ছুটে যাই পরিচিত স্বচ্ছল বন্ধুবান্ধবদের কাছে। সাথে নিজেও সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করি গরিব শিক্ষার্থীদের মুখে হাসি ফোটাতে। সারাদেশ জুড়ে প্রত্যেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড ডে মিল চালু করার জন্য কর্তৃপক্ষ নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মোতাবেক আমার বিদ্যালয়ের শতভাগ শিক্ষার্থী এখন মিড ডে মিলের আওতাভুক্ত। শিক্ষার্থীরা এখন বাড়িতে খাবার খেতে যায় না। বাড়ি থেকে খাবার এনে শিক্ষকদের সাথেই বিদ্যালয়ে খায়। এতে করে শিক্ষার্থীর ঝরে পড়া রোধ সহ, বিদ্যালয়ের শিখন শেখানো কাজে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। তাছাড়া বিভিন্ন জাতীয় দিবসগুলো জাঁকজমক করে উদযাপন করার ফলে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জাতীয় দিবসের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখছে। তবে বর্তমানে একটা শহিদ মিনারের অভাবে জাতীয় দিবসগুলোতে শহিদ মিনারে পুষ্পস্তবক দিয়ে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শ্রদ্ধা জানাতে না পারার ব্যাপরাটি তার কাছে খারাপ লাগে বলে তিনি জানান। এরপরও বিদ্যালয় আঙ্গিনায় একটা শহিদ মিনার নির্মাণ করার জন্য অনেকের সাথে তিনি যোগাযোগ করে যাচ্ছেন বলেও জানান। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নিয়ে নতুন ম্যানেজিং কমিটি, পিটিএ কমিটি, অভিভাবকদের সহায়তার ফলে বর্তমানে দক্ষিণ কড়লডেঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি উপজেলা ছাড়িয়ে জেলার আনাচে কানাচে পরিচিতি পেয়েছে। শুধু তাই নয় ২০১৭ সালে মোঃ ফারুক ইসলাম চট্টগ্রাম জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হওয়ার ফলে উক্ত বিদ্যালয়ের পরিচিতি আরও বেশি বৃদ্ধি পায়। চেষ্টা করলে মরুর বুকেও উদ্যান করা যায় কথাটা শুনতে কঠিন মনে হলেও যারা পরিশ্রমী তারা কঠিনকে জয় করতে পারেন অনায়াসে। বোয়ালখালীর অজো পাড়ার গাঁয়ের দক্ষিণ কড়লডেঙ্গা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বদলে যাওয়াই প্রমাণ করে সদিচ্ছা, কাজের প্রতি ভালোবাসা এবং আন্তরিকতা থাকলে যেকোন পরিবেশেই সফলতা লাভ করা যায়। তাই প্রত্যাশা এখন একটাইদক্ষিণ কড়লডেঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়টির মতো বদলে যাক সারাদেশের পিছিয়ে পড়া প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোর অবস্থা। নিশ্চিত হোক মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা।

x