বছরে ক্ষতি ৫শ কোটি টাকা

বহির্নোঙরে বিদেশি জাহাজে পণ্য হ্যান্ডলিংয়ে দীর্ঘসূত্রতা

হাসান আকবর

শনিবার , ২৪ আগস্ট, ২০১৯ at ৫:৫৫ পূর্বাহ্ণ
118

বহির্নোঙরে আসা বিদেশি জাহাজে পণ্য হ্যান্ডলিংয়ে দীর্ঘসূত্রতার কারণে ক্ষতিপূরণ বাবদ বছরে ৫শ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। যৌক্তিক কোনো কারণ ছাড়াই বিপুল পরিমাণ টাকা চলে যাওয়ার পেছনে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম, অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত এবং কিছু মানুষের খামখেয়ালীপনাকে দায়ী করা হয়েছে। এ অর্থ দিয়ে অনেকগুলো লাইটারেজ জেটি নির্মাণ করা যেত বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানায়, বন্দরে পণ্যবাহী জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ প্রতি বছর বাড়ছে। ২০১২-২০১৩ অর্থবছরে বন্দরে জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছিল ২১৩৬টি। গত বছর মোট জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছে ৩ হাজার ৭শটি। বিপুল সংখ্যক জাহাজের অধিকাংশ বন্দরের জেটিতে এসে পণ্য খালাস করলেও বিশ্বের নানা দেশ থেকে আসা বড় বড় মাদার ভ্যাসেলগুলো বন্দরের জেটিতে প্রবেশ করতে পারে না। বন্দরের জেটিতে সর্বোচ্চ ১৯০ মিটার লম্বা জাহাজ ভিড়ানো হয়। অপরদিকে সর্বোচ্চ সাড়ে নয় মিটার ড্রাফট বন্দরের জেটিতে প্রবেশ করতে পারে। অবশ্য জাহাজের দৈর্ঘ ১৯০ মিটার হলে, ড্রাফট কিছুটা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ বন্দরের জেটিতে এর চেয়ে লম্বা এবং বেশি গভীরতার জাহাজ ভিড়তে দেওয়া হয় না। এর থেকে বড় জাহাজগুলো বহির্নোঙরে অবস্থান করে। ওখানে লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে পণ্য খালাস করে। আবার কোনো কোনো জাহাজ বহির্নোঙরে কিছু পণ্য খালাস করে ড্রাফট কমিয়ে বন্দরের জেটিতে প্রবেশ করে।

বহির্নোঙরের এই কার্যক্রমের পুরোটাই লাইটারেজ জাহাজকেন্দ্রিক। হাজার দেড়েক লাইটারেজ জাহাজ বন্দরের ওভারসাইট, বহির্নোঙরের হ্যান্ডলিং এবং দেশব্যাপী পরিবহনের সাথে জড়িত। এসব লাইটারেজ জাহাজের ওপর বন্দরের নিয়ন্ত্রণ নেই। লাইটারেজ জাহাজ মালিক, নৌযান শ্রমিক, ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলসহ কয়েকটি সংগঠন লাইটারেজ জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে। বিভিন্ন সময় এসব সংগঠনের বিরোধ এবং পরস্পর বিরোধিতার কারণে লাইটারেজ জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকে। বন্ধ হয়ে যায় বহির্নোঙরে পণ্য খালাস কার্যক্রম। অবশ্য অনেক সময় প্রাকৃতিক দুর্ভোগেও পণ্য খালাস বন্ধ থাকে। এ জন্য অপেক্ষা করতে হয় বহির্নোঙরে অবস্থানকারী বিদেশি মাদার ভ্যাসেলগুলোকে। বেসরকারি সংস্থা এবং সংগঠনগুলোর নানা ঝামেলার খেসারত দিতে হয় এসব জাহাজকে। আবার অনেক সময় সবকিছু ঠিক থাকলেও শুধুমাত্র হ্যান্ডলিং ইকুইপমেন্ট নেওয়ার জন্যও জাহাজগুলোকে এক-দুদিন অপেক্ষা করতে হয়। বহির্নোঙরে অবস্থানকারী জাহাজের পণ্য খালাসের জন্য গ্রাভ একটি প্রয়োজনীয় ইকুইপমেন্ট। এ ইকুইপমেন্ট উপকূল থেকে নিয়ে যেতে হয় লাইটারেজ জাহাজে বোঝাই করে। গ্রাভ বোঝাই করার জন্যও লাইটারেজ জাহাজকে ঘাটে বা জেটিতে ভিড়তে হয়। অথচ চট্টগ্রামে লাইটারেজ জেটির আকাল চলছে অনেক বছর ধরে।
বহির্নোঙরে গত বছর জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছে ১,০৯৯টি। এর আগের বছর হয়েছিল ৮৮৭টি। এসব জাহাজের একেকটিতে বিশ-বাইশ হাজার টন থেকে শুরু করে পঞ্চাশ-বায়ান্ন হাজার টন পর্যন্ত পণ্য থাকে। সিমেন্ট ক্লিংকার, গম, সরিষাসহ বিভিন্ন ধরনের ভোগ্যপণ্য নিয়ে আসা এসব জাহাজের মাধ্যমে বছরে অন্তত চার কোটি টন পণ্য হ্যান্ডলিং হয় বহির্নোঙরে।
চট্টগ্রামের একাধিক আমদানিকারক বলেছেন, বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ অলস জাহাজের ভাড়া গুনতে গুনতে আমাদের অবস্থা কাহিল হয়ে পড়ে। বিভিন্ন সময় একেকটি জাহাজের বিপরীতে লাখ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে। বহির্নোঙরে পৌঁছার পর প্রতিদিন গড়ে তিন হাজার টন পণ্য খালাস করা হবে-এমন শর্তে মালিক জাহাজ ভাড়া দেন, ভাড়ার হার নির্ধারণ করেন। বিদেশি জাহাজ কোম্পানিগুলোর এসব শর্ত মেনেই দেশীয় আমদানিকারকরা পণ্য বোঝাই করে জাহাজ নিয়ে আসেন। কিন্তু বহির্নোঙরে পৌঁছার পর অনেক সময় নানা কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। লাইটারেজ জাহাজের সংকট, শ্রমিক আন্দোলন, ইকুইপমেন্ট নেওয়ার জটিলতা, ঘাট খালি না থাকা ইত্যাদি কারণে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস ব্যাহত হয়। দৈনিক তিন হাজার টনের জায়গায় এক হাজার টন খালাস করতে হিমশিম খেতে হয়। এ অবস্থায় জাহাজের মালিকের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির আলোকে প্রতিদিনের জন্য ফিঙড অপারেটিং কস্ট বা এফওসি বাবদ একেকটি জাহাজকে ১০ হাজার ডলার থেকে ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হয়। আমদানিকারককে এই অর্থ প্রদান করতে হলেও এর দায় চলে আসে সাধারণ ভোক্তার ওপর।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি জাহাজকে ৫ দিন অপেক্ষা করতে হলে কমপক্ষে ৫০ হাজার ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। এই টাকার পুরোটাই পরিশোধ করতে হয় ডলারে। একটি জাহাজকে পঞ্চাশ হাজার ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হলে এগারশ জাহাজকে গড়ে পাঁচশ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করতে হয়। কখনো কখনো ক্ষতিপূরণের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়।
বছর দেড়েক আগে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে একেকটি জাহাজকে ৫০/৬০ কোটি টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে। রড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম এক বছরে ২৫টি স্ক্র্যাপবাহী মাদার ভ্যাসেলের বিপরীতে ভাড়া পরিশোধের পরও শুধু অলস বসে থাকার জন্য ক্ষতিপূরণ দিয়েছিল ৬২ কোটি টাকা। একইভাবে দেশের বড় বড় আমদানিকারককে ওই সময় শত শত কোটি টাকা দিতে হয়েছে।
এখনো নানা কারণে বহির্নোঙরে মাদার ভ্যাসেলকে অলস বসে থাকতে হয়। প্রতিটি জাহাজের বিপরীতে লাখ লাখ ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশি শিপিং কোম্পানিগুলোর কাছে চলে যাচ্ছে।
বহির্নোঙরে পণ্য খালাসে নিয়োজিত শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটের প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটরস এসোসিয়েশনের সভাপতি একেএম শামসুজ্জামান রাসেল দৈনিক আজাদীকে বলেন, অনেক টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। অলস বসে থাকা জাহাজের বিপরীতে যে পরিমাণ টাকা যায় তা দিয়ে অনেক লাইটারেজ জেটি নির্মাণের সুযোগ রয়েছে।
লাইটারেজ জেটি বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, কর্ণফুলী নদীতে পরিকল্পিত এবং সমন্বিতভাবে প্রয়োজনীয় লাইটারেজ জেটি নির্মাণ করা হলে পণ্য খালাসের সুযোগ বেড়ে যাবে। দেশে লাইটারেজ জাহাজের সংকট নেই। বহির্নোঙর থেকে পণ্য নিয়ে আসা লাইটারেজ জাহাজগুলো দ্রুত পণ্য খালাসের সুযোগ পেলে ট্রিপের সংখ্যা বেড়ে যাবে। এতে লাইটারেজ জাহাজ মালিকদের পাশাপাশি বহির্নোঙরে মাদার ভ্যাসেলগুলোতে কাজের গতি বাড়বে। দিনে যদি ১০ হাজার টন পণ্য মাদার ভ্যাসেল থেকে খালাস করা যায়, তাহলে কোনো জাহাজকে অলস থাকতে হবে না। এতে করে এত বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে যাবে না। একইসাথে বৈদেশিক বাণিজ্যে গতি আসবে।

x