বঙ্গোপসাগরের ঢেউ যেন আছড়ে পড়েছিল গ্যালারিতে

ক্রীড়া প্রতিবেদক

বৃহস্পতিবার , ১১ অক্টোবর, ২০১৮ at ১০:৫৬ পূর্বাহ্ণ
22

সমুদ্র কন্যা কক্সবাজার। পর্যটন নগরী কক্সবাজার। এই নগরী যে হতে পারে একটি ক্রীড়া নগরীও সেটা যেন প্রমাণিত হচ্ছে দিন দিন। দেশের সর্ব বৃহৎ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম কমপ্লেক্স এখন কক্সবাজারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনেক ক্রিকেট স্টেডিয়াম রয়েছে যা একেবারে সমুদ্রের কিনারায়। বাংলাদেশের মানুষেরও তেমন প্রত্যাশা ছিল। একদিন কক্সবাজারে সমুদ্রের কূল ঘেঁষে গড়ে উঠকে একটি স্টেডিয়াম। সেটা এখন বাস্তবে রূপ লাভ করেছে কক্সবাজারে। তবে সাগর কন্যা এই কক্সবাজারের মানুষ যে কতটা ফুটবল পাগল সেটা প্রমাণ করল আরেকবার। গতকাল ছিল অনেকটা বৈরি আবহাওয়া। ঘূর্ণিঝড় তিতলির কারণে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল কক্সবাজারে। কিন্তু এই বৃষ্টি কিংবা বৈরি আবহাওয়া ঘরে আটকে রাখতে পারেনি কক্সবাজারের দর্শকদের।
প্রথমবারের মত কক্সবাজারে বসেছে কোন আন্তর্জাতিক ফুটবল আসর। আর সে আসরকে বরণ করতে কোন কিছুর কমতি ছিলনা কক্সবাজার বাসীর। দলে দলে তারা মাঠে এসে বাংলাদেশকে সমর্থন যোগানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। ছোট্ট এবং পুরানো স্টেডিয়াম। ধারণ ক্ষমতা হয়তো সর্বসাকূল্যে দশ হাজারের মত। কিন্তু পঙ্গপালের মত ফুটবল পাগল মানুষ ছুটে এসেছে স্টেডিয়ামের দিকে। যেন হাত মেলানো দূরত্বে থাকা বঙ্গোপসাগরের ঢেউ আচড়ে পড়ছিল স্টেডিয়ামে। ক্ষণে ক্ষণে গর্জে উঠছিল গ্যালারি। মাত্র দশ হাজারের মত ধারণ ক্ষমতা থাকলেও গ্যালারিতে গাদাগাদি করে দর্শক ছিল প্রায় পনেরো হাজারের মত। দূর-দূরান্ত থেকে ছুট আসলেও সবার ভাগ্যে জুটেনি টিকিট। আর সে কারণে স্টেডিয়ামের বাইরে অপেক্ষায় ছিল আরো হাজার সাতেক দর্শক। বাংলাদেশ ও ফিলিস্তিনের মধ্যকার বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপের সেমিফাইনাল ঘিরে কক্সবাজারের বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্টেডিয়াম হয়ে উঠেছিল উৎসবমুখর। সিলেট জেলা স্টেডিয়াম থেকে লাল-সবুজের উৎসব শুরু হয়েছিল । তার ধারাবাহিকতা ছিল সমুদ্রপাড়েরর শহর কক্সবাজারেও। সিলেট জামাল ভূঁঁইয়াদের সেমিফাইনালে তুলতে পারলেও কক্সবাজার পারেনি তাদের ফাইনালে নিতে।
গত কয়েক দিনের যে উৎসব ছিল ফুটবল ঘিরে। জেমি ডে’র শিষ্যদের বিদায়ে তা থামলো কক্সবাজারে। সমুদ্রের ঢেউয়েই যেন ভেসে গেলো লাল-সবুজের সব উৎসব। আগামীকাল শুক্রবার বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের ফাইনালে এখন কেবলই দর্শক স্বাগতিকরা। সেখানে শিরোপার লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে দুই অতিথি দল ফিলিস্তিন ও তাজিকিস্তান। তবে তাতেও অখুশি নন কক্সবাজারের দর্শকরা। মাত্র দুটি সেমিফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়েছে কক্সবাজারে। আর এই ম্যাচ দুটি সফলভাবে আয়োজন করতে কক্সবাজারের ক্রীড়া সংগঠকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আন্তরিকতার কোন ঘাটতি ছিলনা। ফিলিস্তিনের মত শক্তিশালী দলের বিপক্ষে বাংলাদেশ যে দুর্দান্ত খেলেছে তাতেই খুশি দর্শকরা। যদিও তারা চেয়েছিল দল যেন ফাইনালের টিকিট নিয়ে কক্সবাজার থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিতে পারে। কিন্তু সেটা হয়নি। কক্সবাজারের মানুষের প্রত্যাশা ছিল বাংলাদেশ জিতবে। সে প্রত্যাশা আরো বেড়েছিল মাঠে জামাল ভূঁঁইয়াদের পারফরম্যান্স দেখে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ছেলেরা সমানতালে লড়লেন অসম শক্তির বিরুদ্ধে। শারীরিক গঠনে ফিলিস্তিনের খেলোয়াড়রা যদি হন গালিভার, তাহলে বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা লিলিপুট। শক্তি-সামর্থ্যেও তাই। এমন একটি দলের সঙ্গে ৮ মিনিটে পিছিয়ে পড়ে বাকি সময় যেভাবে লড়েছে বাংলাদেশ তা প্রশংসার দাবি রাখে। শুধু একজন ভালো মানের স্ট্রাইকার না থাকায় ফুটবলের ফুল ফুটিয়েও জিততে পারলো না বাংলাদেশ।
মাঠে দুই দলের যে পার্থক্য, তা মোটেও চোখে পড়েনি। জিততে না পারলেও বাংলাদেশ মন ভরিয়ে দিয়েছে দর্শকদের। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া উপেক্ষা করে যারা ছাতার নিচে মাথা গুজে গ্যালারিতে বসে খেলা দেখেছে তাদের হারে দুঃখ পেলেও দলের পারফরম্যান্সে দারুণ খুশি। ম্যাচ শেষে বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা যখন গ্যালারির সামনে গেলেন তখন সব দর্শক দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে তাদের অভিবাদন জানিয়েছেন। কক্সবাজারের দর্শকরা জাতীয় পতাকা, বাদ্যযন্ত্র আর খেলোয়াড়দের ছবি সম্বলিত ব্যানার নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন গ্যালারিতে। বৃষ্টিতে ভিজে পুরো সময়ই তারা গলা ফাটিয়ে সমর্থন দিয়েছেন দলকে। একটা গোলের জন্য অধির আগ্রহে থেকেও দেখতে পাননি তারা। ফুটবলে গোলটাই যে আসল তা প্রমাণ হলো আরেকবার।

x