বঙ্গবন্ধু টানেলের আনোয়ারা অংশে উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু

ক্ষতিপূরণ পায়নি অনেকে, পুনর্বাসনও হয়নি

এম. নুরুল ইসলাম, আনোয়ারা

শুক্রবার , ১৫ মার্চ, ২০১৯ at ১০:১৩ পূর্বাহ্ণ
307

সকাল থেকে বাড়ির উঠোনে বসে উদাস মনে তাকিয়ে ছিলেন বয়োবৃদ্ধ আবু দাউদ। শত বছরের বাপ-দাদার ভিটায় বুলডোজার দিয়ে উচ্ছেদ শুরু হলে তাঁর চোখে অঝোরে ঝড়ছিল পানি। কিছুই যেন বলার নেই তাঁর। কর্ণফুলীর দড়্গিণ তীরে বঙ্গবন্ধু টানেল প্রকল্পে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে শুরু হয় উচ্ছেদ কার্যক্রম। দিন যতই যাচ্ছে আনোয়ারার বৈরাগ ইউনিয়নের বৈরাগ, বন্দর, মোহাম্মদপুর গ্রামসহ আশপাশের এলাকার লোকজনের মধ্যে দেখা গেছে হতাশা আর কান্না। শিল্পায়নে এলাকার চেহারা বদলে গেছে সত্যি, হারানোর বেদনাও সইতে হয়েছে প্রতিনিয়ত। কোরিয়ান ইপিজেড, কাফকো, সিইউএফএল সহ প্রতিটি বড় প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণ হয়েছে স্থানীয়দের। সেই অনুযায়ী পায়নি ক্ষতিপূরণ বা কাঙিক্ষত পুনর্বাসন। বঙ্গবন্ধু টানেল প্রকল্পের উচ্ছেদ কার্যক্রম নিয়েও দেখা গেছে চরম হতাশা। ভূমি অধিগ্রহণ শুরু হলেও এখনো ক্ষতিপূরণ পায়নি অনেকে। এঅবস্থায় ক্ষোভে ফুঁসছে এলাকাবাসী। যে কারণে উদ্বেগ উৎকন্ঠার মধ্য দিয়ে বিপুল সংখ্যক আইন শৃংখলা বাহিনীর উপস্থিতিতে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৯ টায় বৈরাগ ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর এলাকায় বাড়িঘর উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হয়। তবে শেষ পর্যনত্ম প্রথম দিনে অপ্রীতিকর কোন ঘটনা ছাড়াই কাজ শেষ হয়। ক্ষতিপূরণের টাকা না পেয়ে কান্না নিয়ে ছেড়ে গেছেন নিজের স্থায়ী ঠিকানা। মোহাম্মদপুর গ্রামে উচ্ছেদকালে উপস্থিত ছিলেন বঙ্গবন্ধু টানেল কর্তৃপড়্গের উপ-পরিচালক ড. অনুপম সাহা, বঙ্গবন্ধু টানেলের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিলুর রহমান। এসময় আনোয়ারা থানার পুলিশ, সশস্ত্র ব্যাটেলিয়ন আনসার সদস্য ও ফায়ার সার্ভিসের বিপুল সংখ্যক সদস্য উচ্ছেদ কার্যক্রমে সহায়তা করেন।
তিনটি বুলডোজার বিরামহীনভাবে এ কার্যক্রম পরিচালনায় চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ছাড়াও শতাধিক শ্রমিক অংশ নেন। জানা যায়, বুধবার সন্ধ্যার পর বৈরাগ, বন্দর, মোহাম্মদপুর এলাকায় উচ্ছেদ কার্যক্রমে বাধা দিতে একটি গ্রুপ মাইকিং করে। এতে প্রশাসনের কিছুটা হলেও উদ্বেগ তৈরি হয়। তবে সকালে উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হলে স্থানীয় ক্ষতিগ্রসত্মদের পক্ষ থেকে সেই রকম অপ্রীতিকর কিছু ঘটেনি। স্থানীয় বাসিন্দা নুর মোহাম্মদ বলেন, বিশ্বাস করতে পারছি না এত তাড়াতাড়ি বাড়িঘর হারাতে হবে। পুনর্বাসনের আগে এভাবে উচ্ছেদ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। জানা যায়, মামলা কিংবা ভূমির নামজারি সংক্রানত্ম জটিলতার কারণে অনেকেই এখনো ভূমি ও বসতঘরের কোনটারই মূল্য পায়নি। এঅবস্থায় তাদের ছাড়তে হচ্ছে বাড়িঘর। এঅবস্থায় দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি চেয়ে স্থানীয় লোকজন জেলা প্রশাসন ও টানেল কর্তৃপড়্গের হসত্মড়্গেপ কামনা করেছেন। উচ্ছেদ অভিযানকালে অন্যান্যদের মাঝে উপস্থিত ছিলেন বৈরাগ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল মনসুর চৌধুরী ও বর্তমান চেয়ারম্যান মো. সোলাইমান। এ সময় স্থানীয়দের উদ্দেশে চেয়ারম্যান মো. সোলাইমান বলেন, মাননীয় ভূমি মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ এমপির প্রতিনিধি হিসেবে তিনি এসেছেন। ভূমি মন্ত্রী তার মাধ্যমে জানিয়েছেন- অতি দ্রুত অবকাঠামোর মূল্য পরিশোধের ব্যবস্থা গ্রহণ সহ মামলার নিষ্পত্তি, প্রকৃত মালিককে ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের বিষয়ে সব ধরনের সহযোগিতা করবেন। তাই তিনি উচ্ছেদ কার্যক্রমে সহযোগিতা করার জন্য স্থানীয়দের প্রতি আহবান জানান।
বঙ্গবন্ধু টানেল কর্তৃপড়্গের উপ-পরিচালক ড. অনুপম সাহা বলেন, ক্ষতিগ্রসত্মদের সহায়তা দিতে টানেল কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ সহযোগিতা করে যাচ্ছে। শুধুমাত্র মামলা ছাড়া পারিবারিক বিরোধের কারণে যে সমসত্ম পরিবার এখনো টাকা পায়নি তাদের গণ শুনানির মাধ্যমে অতি দ্রুত টাকা পাওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর কোন ধরনের হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধু টানেলের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ জানান, ক্ষতিগ্রসত্মদের পুনর্বাসনের জন্য ২০ একর ভূমি প্রস্তুত করা হচ্ছে। অতি দ্রুত এর কাজ শেষ করে ক্ষতিগ্রসত্মদের পুনর্বাসনের আওতায় আনা হবে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিলুর রহমান জানান, ক্ষতিগ্রসত্ম ভূমি মালিকদের ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদান করা হয়েছে। আর মামলা সংক্রানত্ম কারণে যারা ক্ষতিপূরণ পায়নি তাদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা প্রদান করে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

x