বঙ্গবন্ধুর নির্বাচিত ভাষণ ও বঙ্গবন্ধুর নির্বাচিত উক্তি

আজকের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্রকাশনা

ড. ফয়সাল কামাল চৌধুরী

শুক্রবার , ৪ অক্টোবর, ২০১৯ at ১১:০০ পূর্বাহ্ণ
54

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আমাদের জাতির পিতা ও স্বাধীন রাষ্ট্রের স্থপতি। বঙ্গবন্ধু হাজার বছরের বাঙালি জাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে বাঙালিদের জন্য একটি স্বাধীন দেশের সৃষ্টি করেছেন। এই কারণেই আমরা বলি বঙ্গবন্ধু হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি এবং তিনিই আমাদের জাতির পিতা।
মুক্তিযুদ্ধ সেই ১৯৭১ সালে হয়েছিল বলে আমরা অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা নই।
স্বাধীনতা যুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধ একটি দেশে একবারই হয়। জাতির পিতা তার ৭ই মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
আমরা স্বাধীনতা সংগ্রামে বিজয়ী হয়েছি, মুক্তির সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।
মুক্তির সংগ্রাম মানে বলতে সকল বাংলাদেশি বাঙালির অর্থনৈতিক মুক্তি, অন্যায় জুলুম থেকে মুক্তি, পেশী শক্তির অত্যাচার থেকে মুক্তি, ক্ষুধা, দারিদ্র থেকে মুক্তি, অশিক্ষা, কুশিক্ষা থেকে মুক্তি, সামাজিক অপরাধ থেকে মুক্তি, দুর্বৃত্তায়ন ও দুর্নীতি থেকে মুক্তি।
এই মুক্তির সংগ্রামতো চলছেই।
মুক্তিযোদ্ধারা তাদের জীবনের সর্বস্ব দিয়ে আমাদেরকে পরাধীনতা থেকে মুক্ত করেছে। আর এই চলমান সংগ্রামে অংশগ্রহণ করে মুক্তিযুদ্ধের বাকী কাজটা শেষ করার দায়িত্ব আমাদের, আসছে প্রজন্মের। মুক্তিযুদ্ধে যেমন সেক্টর ছিল, বাহিনী ছিল, ঠিক তেমনই আগামী দিনের একটি উন্নত, কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ার মুক্তিসংগ্রামের একটি গবেষণাধর্মী, জ্ঞান চর্চার বাহিনী বঙ্গবন্ধু গবেষণা কেন্দ্র। ২০০০ সালের শেষ দিকে কাজ শুরু করা এই গবেষণা ভিত্তিক মেধাচর্চার সংগঠন ২০০৫ সালে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাঙালি জাতি রাষ্ট্রের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বরূপ অনুসন্ধানের আকাঙ্ক্ষা থেকে এই গবেষণাধর্মী সংগঠন এর কাজ করা। বাঙালির রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক মুক্তির রুপকল্প রচয়িতা বঙ্গবন্ধু। বাঙালি জাতি সত্ত্বার পশ্চাদপদতা, অর্থনৈতিক পরাধীনতা, অবহেলিত সামাজিক অবস্থান, সরকারি পদায়নে বৈষম্য ও পূর্ব পশ্চিম বৈষম্য থেকে মুক্তির লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেন।
বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও দর্শনকে সামনে রেখে সচেতন মেধাবী নতুন প্রজন্মকে আগামী দিনের মেধা ভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনে উদ্বুদ্ধ করতে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা পরবর্তী বিভিন্ন বক্তব্য লিখিত আকারে ছাপানো হল ‘বঙ্গবন্ধুর নির্বাচিত ভাষণ’ শিরোনামে। আবার ছাপানো সেসব নির্বাচিত ভাষণ থেকে সমাজ, রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের বিভিন্‌্ন প্রতিষ্ঠান নিয়ে বঙ্গবন্ধুর কিছু দিক নির্দেশনামূলক উক্তি নিয়ে ছাপানো হল “বঙ্গবন্ধুর নির্বাচিত উক্তি”।
আজ এই কলাম লেখার উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশ নামক এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনে যিনি মূল কারিগর ও স্বাধীনতা অর্জনের পর ’৭৫ সালে ঘাতকের নির্মম বুলেটের আঘাতে বিশ্ব ইতিহাসের কলংকময় সেই রাতে শহীদ হওয়ার আগে পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের পরতে পরতে যে সকল সমস্যা ও গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো তিনি এইসব বক্তব্যে তুলে এনেছেন তার অনেকগুলো থেকে আমরা আজো মুক্তি পাইনি।
এই ক্ষুদ্র প্রকাশনায় আমরা চেষ্টা করেছি ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ দিয়ে শুরু করে ক্রমান্বয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ জাতির জনকের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ১০ই জানুয়ারি ১৯৭২ রেসকোর্স ময়দানের ভাষণ, ৩১শে জানুয়ারি ১৯৭২ সালে ঢাকা স্টেডিয়ামে ভাষণ, জাতিসংঘে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ২৫শে সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালের ভাষণ, বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির সি.এম.এম কমান্ডার ও ক্যাডেট ভাইদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১১ই জানুয়ারি ১৯৭৫। এছাড়াও সমাজ ব্যবস্থার বহুদিক উল্লেখ করা আরো একটি বিশেষ বক্তব্য।
৭ই মার্চের ভাষণে বাঙালি জাতির উপর যুগে যুগে ইংরেজ ও পাক শাসনামলের দু:শাসনের চিত্র তিনি তুলে ধরেন এবং স্বাধীনতার পটভূমি রচনা করেন। তিনি বক্তব্যের শুরুর দিকে বলেন, “আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়।” তিনি আরো বলেন, বাংলার ইতিহাস – এদেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস। বক্তব্যের মাঝামাঝি এসে তিনি বলেন, আমার বুকের উপর গুলি চালাবার চেষ্টা করো না, সাত কোটি মানুষকে দাবায়া রাখতে পারবা না।
সবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার অকুতোভয় ডাক, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
স্বাধীন বাংলায় প্রত্যাবর্তন করে তিনি বলেন, নেতা হিসেবে নয়, প্রেসিডেন্ট হিসেবে নয়, আমি তোমাদের ভাই, তোমরা আমার ভাই। এ স্বাধীনতা আমার ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না পায়, এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়।
৩১শে জানুয়ারি ১৯৭২ সালে ঢাকা স্টেডিয়ামে এক ভাষণে জাতির পিতা ভারত, রাশিয়া সহ সকল বন্ধু রাষ্ট্রকে ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি বক্তব্যের শেষে বলেন, তোমাদের আমি কি দিয়ে, কি উপায়ে আমার ভালোবাসা জানাবো। তোমরা জান, তোমাদের আমি ভালোবাসি, আর আমিও জানি, তোমরা আমাকে ভালোবাস। —————- আমি সব ত্যাগ করতে পারি, তোমাদের ভালোবাসা আমি ত্যাগ করতে পারি না।
২৫শে সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম ভাষণ দেন। এই ভাষণে তিনি বিশ্ব ব্যাপী শোষিত জনগনের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ দিকসমূহ তুলে ধরেন। বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন দেশের ক্ষুধা, দারিদ্রতা, পরিবেশ বিপর্যয় সহ বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে বলেন, “জনসাধারণের জীবনধারণের মান নিছক বেঁেচ থাকার পর্যায় থেকেও নীচে নেমে গেছে। মাথাপিছু যাদের বার্ষিক আয় ১০০ ডলারেরও কম তাদের অবস্থা আরো শোচনীয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী বেঁেচ থাকার জন্য যে ন্যুনতম খাদ্য প্রয়োজন তারও কম খাদ্য খেয়ে যারা এতদিন বেঁেচ রয়েছে তারা এখন তারা সম্পূর্ণ অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। আরো দরিদ্র ও অভাবী দেশগুলোর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যে আভাস দেয়া হয়েছে তা অত্যন্ত হতাশাজনক। ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধির ফলে খাদ্যের দাম গরীব দেশগুলোর ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। অন্যদিকে ধনী ও উন্নত দেশগুলোই হচ্ছে খাদ্যের মূল রপ্তানিকারক। কৃষি যন্ত্রপাতি ও উপকরণের অসম্ভব দাম বাড়ার ফলে গরীব দেশগুলোর খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা লাভের চেষ্টাও তেমন সফল হতে পারছে না। বিশ্বব্যাপী এই মুদ্রাস্ফীতির ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নয়ন পরিকল্পনার ব্যয় বহুগুণে বেড়ে গেছে। তাদের নিজেদের সম্পদ কাজে লাগানোর শক্তিও হ্রাস পেয়েছে। ইতিমধ্যেই যেসব দেশ দরিদ্র ও ব্যাপক বেকার সমস্যায় ভুগছে তারা তাদের অতি নগণ্য উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলোকেও কেটে ছেঁটে কলেবর ছোট করতে বাধ্য হয়েছে। এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে মাত্র ৫ থেকে ৬ শতাংশ হারে বর্ধিত আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা ছিল। বিশ্বের সকল জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে অগ্রসর না হলে মানুষের দু:খ দুর্দশা এমন বিরাট আকার ধারণ করবে, ইতিহাসে যার তুলনা পাওয়া যাবেনা।”
১১ই জানুয়ারি, ১৯৭৫ বাংলাদেশ মিলিটারী একাডেমির সি.এম.এম কমান্ডার ও ক্যাডেট ভাইদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর দিক নির্দেশনামূলক ভাষণে তিনি দেশব্যাপী ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, চোরাকারবারীদের দৌরাত্ন্য তুলে ধরেন। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, দীর্ঘ ৩ বচ্ছর পর্যন্ত এদের আমি অনুরোধ করেছি, আবেদন করেছি, হুমকি দিয়েছি। চোরা নাহি শুনে ধর্মের কাহিনী। কিন্তু আর না। বাংলার মানুষের জন্য জীবনের যৌবন আমি কারাগারে কাটিয়ে দিয়েছি। এ মানুষের দু:খ দেখলে আমি পাগল হয়ে যাই।
ক্যাডেটদের উদ্দেশ্যে তিনি আরো বলেন, মনে রেখ, জনগন কারা? তোমার বাপ, তোমার ভাই। তোমাদের যে মাইনা আসে, কোত্থেকে আসে? সরকারি, বেসরকারি কর্মচারী যারা এখানে আছেন তাদের সকলের বেতন আসে বাংলার দুখী মানুষের ট্যাঙের টাকা দিয়ে। তোমরা তাদের মালিক নও, তোমরা তাদের সেবক। তাদের অর্থে তোমাদের সংসার চলবে। তাদের শ্রদ্ধা করতে শিখ। তাদের ভালোবাসতে শিখ। নিশ্চয়ই যেখানে অন্যায় হবে সেখানে দমন করবা। কিন্তু নিরপরাধ লোকের উপর যেন অন্যায় না হয় এদিকে খেয়াল রেখ।
এই প্রকাশনায় সর্বশেষ যে বক্তব্য ছাপানো হয়েছে এটি সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে জাতির পিতার একটি বিশেষ বক্তব্য। এ বক্তব্যের শুরুতেই বাঙালি জাতির স্থপতি, রাষ্ট্রের মালিক জনগনের অধিকার নিয়ে যুগান্তকারি যে কথা বলেন তা এরুপ, “আপনি চাকরি করেন, আপনার মাইনা দেয় ঐ গরীব কৃষক। আপনার মাইনা দেয় ঐ জমির শ্রমিক। আপনার সংসার চলে ঐ টাকায়। আমি গাড়ি চড়ি ঐ টাকায়। ———————————। ওদের সম্মান করে কথা বলেন, ওদের ইজ্জত করে কথা বলেন। ওরাই মালিক।” এরপর ঘুনে ধরা সমাজ ব্যবস্থার প্রতি কটাক্ষ করে তিনি আরো বলেন, “ আমাদের লেখাপড়া শিখায়ছে কে? আর ডাক্তারী পাস করায় কে? আর ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করায় কে? আর সাইন্স পাস করায় কে? আর বৈজ্ঞানিক করে কে? আজ অফিসার করে কে? কার টাকায়? বাংলার দুখী জনগণে টাকায়। আপনাদের কাছে আমার জিজ্ঞাসা, শিক্ষিত ভাইরা আপনার লেখাপড়ার খোরপোশ দিয়েছে শুধু আপনার সংসার দেখার জন্য নয়, আপনার ছেলেমেয়ে দেখার জন্য নয়। দিয়েছে তাদেরই আপনি কাজ করবেন, সেবা করবেন। তাদের আপনি কি দিয়েছেন? কি ফেরত দিচ্ছেন? কতটুকু দিচ্ছেন? কার টাকায় ইঞ্জিনিয়ার সাব, কার টাকায় ডাক্তার সাব, কার টাকায় অফিসার সাব, কার টাকায় মেম্বার সাব, কার টাকায় সব সাব। আমার যেন ঘুনে ধরে গেছে। এ সমাজকে আমি চরম আঘাত করতে চাই। এ আঘাত করতে চাই যে আঘাত করেছিলাম পাকিস্তানীদের, সে আঘাত করতে চাই এই ঘুনে ধরা সমাজ ব্যবস্থাকে।” এই ভাষণের একেবারে শেষ দিকে তিনি বলেন, “গ্রামে গ্রামে যান। যেয়ে বলবেন, দুর্নীতিবাজদের খতম করতে হবে। ক্ষেতে খামারে, কলে কারখানায় উৎপাদন বাড়াতে হবে। আপনারা প্রাণ দিয়ে কাজ করেন, ইনশা আল্লাহ্‌ বাংলাদেশ আজকের বাংলাদেশ থাকবে না। জয় বাংলা।”
৪৪ বছর পরও আজো আজকের বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাতির পিতার দিক নির্দেশনামূলক এই বক্তব্যগুলো অত্যন্ত সমীচীন। তাই নতুন প্রজন্মের কাছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্বাচিত ভাষণ ও উক্তি নিয়ে প্রকাশিত এই দুটি প্রকাশনা অত্যন্ত গুরুত্ব পাবে বলে আমি মনে করি। রাষ্ট্র জাতির পিতার অনুপস্থিতিতে বারবার স্বৈরশাসক ও দুর্বৃত্তের রাজনীতির শিকার হয়ে এসব সমস্যা থেকে আজো বের হয়ে আসতে পারেনি। তাই নতুন প্রজন্ম জাতির জনকের এই ক্ষুরধার বক্তব্যগুলোকে আগামী দিনের ঘুনে ধরা সমাজকে আঘাত করতে যথাযথ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে সক্ষম হবে আশা করা যায়।

x