বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে চলচ্চিত্র ও শ্যাম বেনেগাল

শৈবাল চৌধূরী

মঙ্গলবার , ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ১০:২৫ পূর্বাহ্ণ
24

বেটার লেট দেন নেভার কথাটিকে সত্যি প্রমাণ করে শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ চূড়ান্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারত যৌথভাবে এ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রকল্পের অধীনে একটি কাহিনী চিত্র ও একটি প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হবে।

দুই দেশের সরকার প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত নেয় ভারতের কোনো পরিচালকের পরিচালনায় কাহিনিচিত্র অর্থাৎ বায়োপিকটি নির্মাণ করা হবে। প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের বেলায় পরিচালক নির্বাচনের বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

বায়োপিক নির্মাণের জন্যে ভারত তিনজন পরিচালকের নাম প্রস্তাব করে পাঠায় বাংলাদেশকে; শ্যাম বেনেগাল, গৌতম ঘোষ ও কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। এই তিনজনের মধ্য থেকে বাংলাদেশ শ্যাম বেনেগালের নাম চূড়ান্ত করে ভারতকে জানিয়েছে। গত ২৭ জুলাই তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম পুরো বিষয়টি সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন। সরকারকে ধন্যবাদ অনেক দেরীতে হলেও অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উদ্যোগটি নিয়েছেন। এখন এর বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আমরা।

এ ধরনের বায়োপিক কখনোই ব্যক্তি উদ্যোগে সম্ভব হয়না। অন্ততঃ আমাদের মতো দেশে। রিচার্ড এ্যাটেনবরোর গান্ধী ছবির বেলাতেও ভারত সরকারের আর্থিক, সামরিক, রাজনৈতিক সব রকমের সহযোগিতা ছিল। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নির্মিতব্য বায়োপিক নির্মাণে বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশের সহযোগিতা থাকবে। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে বায়োপিক নির্মাণের সময় রাজনৈতিক সহায়তাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটা না হলে ছবি নির্মাণের সময় পদে পদে সমস্যায় পড়তে হয়।

বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর ৪৩ বছর পেরিয়ে গেছে। ইতিহাসের নিরিখে এটা খুব বড় সময় না হলেও বাস্তবতার দিক থেকে অনেক দীর্ঘ সময়। সবচেয়ে বড় কথা এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশ অনেক দিন সামরিক শাসন ও অন্যান্য অপশাসনের আওতায় ছিল। এর ফলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাংলাদেশের ইতিহাস বারবার বিকৃত হয়েছে। একাত্তরের যুদ্ধ ও স্বাধীনতা পরবর্তী বিভিন্ন প্রজন্ম এদেশের প্রকৃত ইতিহাসের অন্বেষণে রীতিমত দ্বিধাগ্রস্ত। কাজেই বঙ্গবন্ধুর বায়োপিক নির্মাণ প্রকল্পটি জাতীয় স্বার্থেই অত্যন্ত অপরিহার্য। যা প্রকৃত ইতিহাস স্বাধীনতা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরবে। এরপর যে কাজটি করা দরকার সেটি হলো, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে কয়েক পর্বের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ। এবং এ কাজটি সরকারিভাবেই করা বাঞ্ছনীয়।

শ্যাম বেনেগালকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর বায়োপিকটি কেন নির্মাণ করা হচ্ছে এ নিয়ে ইতোমধ্যেই একটু কথা উঠেছে। আমাদের মনে হয়, এ নিয়ে কোনো বিতর্ক না ওঠাই ভালো। গান্ধী ছবিটির পরিচালক একজন অভারতীয়। এক্ষেত্রে পরিচালকের দক্ষতাটাই প্রধান বিচার্য হওয়া উচিৎ। শ্যাম বেনেগাল একজন অভিজ্ঞ ও প্রতিভাবান পরিচালক। তাঁকে সর্বোতভাবে উভয় দেশ থেকেই সহায়তা করা উচিৎ যাতে করে কাজটি ভালো হয়।

শ্যাম বেনেগাল ভারতের একজন প্রথিতযশা পরিচালক। হিন্দি সিনেমার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন যিনি ১৯৭০ এর প্রারম্ভে। হিন্দি নিউ ওয়েভ সিনেমার জনক বলা হয় তাঁকে। হিন্দি চলচ্চিত্র জগতে অনেক প্রতিভাধর কলাকুশলী তাঁর আবিষ্কার। অভিনয় শিল্পী নাসিরুদ্দিন শাহ, ওমপুরী, অনন্ত নাগ, সাধু মেহের, কূলভুষণ খারবান্দা, শাবানা আজমী, স্মিতা পাতিলা, নীনা গুপ্তা সিনেমাটোগ্রাফার গোবিন্দ নিহালনি, কে.কে. মহাজন এঁদের মধ্যে অন্যতম।

শ্যাম বেনেগালের জন্ম ১৯৩৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর তেলেঙ্গানা রাজ্যের সেকেন্দ্রাবাদ শহরে। ৮৪ বছরের দীর্ঘ জীবনে এখনো তিনি সমান সক্রিয়। এখনো সিনেমা বানিয়ে চলেছেন। বার্ধক্য স্পর্শ করেনি তাঁকে এখনো। দীর্ঘ জীবনে তাঁর ক্যারিয়ারও অত্যন্ত বর্ণাঢ্য। এ পর্যন্ত ৬৬টি ছবি নির্মাণ করেছেন স্বল্প দৈর্ঘ্য, প্রামাণ্য চলচ্চিত্র ও কাহিনিচিত্র মিলিয়ে। এটা একটা রেকর্ড যা রীতিমত শ্লাঘার বিষয়। ১৯৬২ সালে ‘ঘের বেথা গঙ্গা’ প্রামাণ্য চলচ্চিত্রটি নির্মাণের মধ্য দিয়ে তাঁর সুদীর্ঘ ফিল্ম ক্যারিয়ারের সূচনা। ৫৬ বছরের ফিল্ম ক্যারিয়ারে শ্যাম বেনেগাল ২৭টি প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন যা রীতিমত পৃথক বিবেচনার দাবিদার, বিশ্ব চলচ্চিত্রে যা বিরলই বটে। আরো আছে দুটি বায়োপিক। ২৭টি ডকুমেন্টরির মধ্যে দুটি আছে বিশাল ব্যক্তিত্বকে নিয়ে, সত্যজিৎ রায় (১৯৮২) ও নেহেরু (১৯৮৫)। দুটিই অত্যন্ত উঁচুমানের প্রামাণ্য চলচ্চিত্র।

যে দুটো বায়োপিক শ্যাম নির্মাণ করেছেন এ দুটিও অত্যন্ত সুনির্মিত। মেকিং অফ মহাত্মা (১৯৯৬) ও নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস : দি ফরগটেল হিরো। নামেই বোঝা যাচ্ছে কোন দুজনকে নিয়ে বায়োপিক দুটি নির্মিত। এর মধ্যে নেতাজীকে নিয়ে নির্মিত বায়োপিকটি সর্বস্তরে প্রশংসিত হয়েছে। আশা করা যায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়েও তাঁর কাজটি মানসম্পন্ন হবে।

প্রায় চল্লিশটি কাহিনিচিত্র নির্মাণ করেছেন শ্যাম বেনেগাল। ১৯৭৩ সালে অংকুর ছবিটি নির্মাণের মধ্য দিয়ে তাঁর ফিকশন ক্যারিয়ারের শুরু। এই ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে শাবানা আজমী, সাধু মেহের ও অনন্ত নাগের অভিষেক ঘটে। এই কাহিনিচিত্র নির্মাণের পূর্বে তিনি ২০টি ডকুমেন্টরি ও ২টি শর্ট ফিল্ম তৈরি করেন। তাঁর কাহিনিচিত্রগুলির মধ্যে খুবই উল্লেখযোগ্য গুলি হলো; নিশান্ত (১৯৭৫), মন্থন (১৯৭৬), ভুমিকা (১৯৭৭), চরণদাস চোর (১৯৭৫), কন্ডুরা (১৯৭৮), জুনুন (১৯৭৮), কলিযুগ (১৯৮০), মান্ডি (১৯৮৪), অনুগ্রহম (১৯৭৭), সুসমান (১৯৮৭), ত্রিকাল (১৯৮৫)

দেশভাগ নিয়ে একটি মর্মস্পর্শী ট্রিলজি রয়েছে তাঁর মাম্মো (১৯৯৪), সর্দারি বেগম (১৯৯৬) ও জুবেইদা (২০০১)। তিনজন নারীর জীবন অবলম্বনে এই রাজনৈতিক ট্রিলজি শ্যামের ক্যারিয়ারের মুকুটে আলাদা তিনটি উজ্জ্বল পালক।

শ্যাম বেনেগাল ভারতের রাষ্ট্রীয় শীর্ষ চারটি সম্মানের দুটি ‘পদ্মশ্রী’ ও ‘পদ্মবিভুষণ’ অর্জন করেছেন যথাক্রমে ১৯৭৬ ও ১৯৯১ সালে। ২০০৭ সালে তিনি পেয়েছেন ভারতের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় চলচ্চিত্র সম্মান ‘দাদা সাহেব ফালকে আজীবন সম্মাননা।’ সাতবার শ্রেষ্ঠ পরিচালকের জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন।

শ্যাম বেনেগাল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও সংগ্রামীদের নিয়ে একটি টিভি সিরিয়াল নির্মাণ করেছেন। ‘ভারত এক খোঁজ’ শিরোনামের এই টিভি সিরিয়ালও যথেষ্ট সমাদৃত হয়েছে।

সব মিলিয়ে বলা যায় এ মুহূর্তে ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পের সবচেয়ে সম্মানিত ও যোগ্য চলচ্চিত্রকার শ্যাম বেনেগাল। মৃণাল সেন এখনো জীবিত বটে, তবে তিনি বয়সের (৯২ বছর) কারণে অবসরে। কাজেই বঙ্গবন্ধুর বায়োপিক নির্মাণে শ্যাম বেনেগালই যোগ্য নির্মাতা। কর্মঠ এই নির্মাতার সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা বায়োপিক নির্মাণে পূর্ব অভিজ্ঞতা তাঁকে বঙ্গবন্ধুর বায়োপিক নির্মাণে যথেষ্ট সহায়তা করবে। আমাদের দায়িত্ব তাঁকে বাংলাদেশের সম্মানের সঙ্গে স্বাগত জানানো এবং তাঁর কাজে সর্বোতভাবে সহযোগিতা করা। আমাদের নিজের স্বার্থে।

x