বই কিনবই বই পড়বই

আনোয়ার হোসেন পিন্টু

মঙ্গলবার , ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৮:৪২ পূর্বাহ্ণ
72

কবে থেকে বই কেনা শুরু ঠিক মনে নেই। তার আগে বলা উচিৎ-বইয়ের প্রতি প্রীতির সম্পর্ক কবে থেকে সেটা কিছুটা মনে থাকলেও ব্যাপারটা কিছুতেই ইতিবাচক নয়। যদিও জ্ঞান হওয়া অব্দি বাসায় বসার ঘরে দেখে আসছি তিনটি সেলফে রাখা গাদা গাদা বই। এসব বইয়ের উৎস তিন সহোদর (বাবা ও দুই চাচা) প্রতিষ্ঠিত বইয়ের দোকান ‘নিউজফ্রন্ট’র সুবাদে। কি বই, কেমন বই উল্টে দেখার কোনো উৎসাহবোধ ছিল বলেও মনে পড়ে না। শুধু মনে পড়ে, অনেক ছোটবেলায় মনকে সঁপে দিয়েছিলাম সিনেমার কোলে। প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি পেরোনার আগেই সিনেমার হলে একজন দশ, এগারো বছরের ছাত্রের প্রবেশের মানে কি হতে পারে বলা বাহুল্য।
বলতে বাধা নেই, সিনেমা আমায় কখনো ভাসিয়েছে বানের জলে কখনো হাতে তুলে দিয়েছে ফুলের মালা। মারদাঙ্গা সুরসুরি মার্কা সিনেমার পাল্লায় পড়ে, পড়তে শুরু করি ফুটপাতে বিক্রি করা চটি বই। চটি বইয়ের বিষয় কী ও কেমন এবং তার প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া কতটা ভয়াবহ সেটা বুঝেছিলাম অনেক পরে। মেট্রিক পাশের পর ঘটে গেলো একটা অঘটন। কলেজ সীমানায় ঢোকার দু’মাসের মাথায় বন্ধু অনীলের সুবাদে চট্টগ্রাম ভারতীয় হাইকমিশনে প্রদর্শিত ‘পথের পাঁচালী’ অকস্মাৎ ঘটিয়ে দিলো মনের মধ্যে এক তুমুল আলোড়ন। চটি বই ছেড়ে কোন ফাঁকে হাতে উঠে এলো একদিন বাসার বুকসেলফে রাখা পথের পাঁচালীর কিশোর সংস্করণ ‘আম আঁটির ভেঁপু’।
শুরু হলো একটু একটু করে পাঠ-পর্ব। চট্টগ্রাম কলেজে পড়াকালে (১৯৭৭-৭৮) ফিরোজ কবীর নামে এক সহপাঠীর হাত ধরে আমার প্রবেশ রুশ সাহিত্যে। পূর্ব মাদারবাড়িস্থ তাদের বাসায় একদিন গিয়ে দেখি, খাটের নিচে রাখা দুই ট্রাংক ভর্তি বই। ট্রাংকে রাখার কারণ বুকসেলফ রাখার জায়গা ছিল না তাদের বাসায়। দু’চারটি বই ছাড়া সবই ছিল রুশ-সাহিত্যের গল্প-উপন্যাস। মনে আছে, ফিরোজ আমার হাতে প্রথম তুলে দিয়েছিল ম্যাক্সিম গোর্কির ‘আমার ছেলেবেলা’। গোর্কির নাম শুনি তার মুখেই প্রথম। ‘আমার ছেলেবেলা’ জ্বালিয়ে দিলো ‘পথের পাঁচালী’ সিনেমা দেখার মতো আরেক প্রদীপ। সিনেমা এবং সাহিত্য দুই বন্ধুর সুবাদে (অনীল ও ফিরোজ) আমার জীবন থেকে বিদায় হলো মারদাঙ্গা সিনেমা আর চটি বইয়ের সুড়সুরি।
কলেজ পেরিয়ে ভর্তি হলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে। যত না আঁকিয়ে হওয়ার ইচ্ছে তার চেয়ে বেশি ছিলো আঁকাজোখার নন্দনতত্ত্ব ও তার ইতিহাসের তত্ত্ব-তালাশের প্রতি। সেই সাথে মেতে উঠেছিলাম সিনেমা নিয়েও। প্রায় আটত্রিশ বছর আগে অর্থাৎ ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশে চিত্রকলা ও চলচ্চিত্র বিষয়ক বই ছিলো বড়ই অপ্রতুল। প্রকাশকদের উক্ত দু’বিষয়ে বই প্রকাশের কোন উৎসাহবোধ ছিল না বললেই চলে। চলচ্চিত্র বিষয়ক বই বা পত্র-পত্রিকা বলতে ছিল বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটির মুখপত্র ‘ধ্রুপদী’, ‘চলচ্চিত্রপত্র’ আর অন্য দু’চারটি ফিল্ম সোসাইটির কিছু পত্র-পত্রিকা। সুতরাং একমাত্র ভরসা কলকাতা থেকে প্রকাশিত উক্ত বিষয়ের বই। তার উপর বই বা পত্রপত্রিকা যা আসতো ঢাকা ছাড়া অন্য কোনো শহরে নয়। সড়ক বা রেলপথে চট্টগ্রাম থেকে সে-সময় ঢাকা পৌঁছানো ছিল অনেক ঝক্কি ঝামেলার ব্যাপার। যত কষ্টই হোক তারপরও যাওয়া হতো একমাত্র সেইসব বই-পত্রের আকর্ষণে ঢাকা। মনে পড়ে, ট্রেন কিংবা বাস থেকে নেমেই ছুটে যেতাম বায়তুল মোকাররমস্থ স্টেডিয়ামের দ্বিতীয় তলায় ‘ম্যারিয়েটা’ নামের একটি ছোট্ট পরিসরের দোকানে। সবেধননীলমণি সেই দোকানেই আসতো শিল্পকলা বিষয়ক লিটল ম্যাগাজিন ও বইপত্র। যত না বই রাখা হতো সেলফে তার চেয়ে বেশি রাখা হতো ফ্লোরে। হাঁটু গেঁড়ে বসে বই খোঁজার সেইসব মুহূর্তের স্মৃতি জীবনেও ভোলার নয়। সেদিনের ষাটোর্ধ্ব বয়সী চেইনস্মোকার দোকানদারও ছিলেন পোশাক-আশাকে সাধারণগোছের একজন মানুষ। কথা প্রসঙ্গে একবার চট্টগ্রামের নিউজফ্রন্টের নাম শুনে নিমিষেই বলে দিলেন, আমার বাবা ও দুই চাচার নাম। এরপর যতবারই যেতাম খাতির যত্ন করে চা খাওয়াতেন। তাঁকে শেষবার দেখেছি শাহবাগের ‘ম্যারিয়েটা’ বইয়ের দোকানে। ইতিমধ্যে শাহবাগ হয়ে উঠেছে বই বিক্রির মূলকেন্দ্র। তিনিও স্টেডিয়ামের দোকান ছেড়ে চলে এলেন এখানে। কিন্তু বেশিদিন সচল রাখতে পারেননি দোকান। পুঁজির অভাবে এবং ‘পাঠক সমাবেশ’এর দাপটে একদিন দোকান গুটিয়ে হারিয়ে গেলেন সেই ভদ্রলোক মানুষটি।
ঢাকা শাহবাগস্থ এলাকায় ‘পাঠক সমাবেশ’ প্রতিষ্ঠার পর নানাবিধ বিষয়ের বই আসতে শুরু করে ঢাকায়। চট্টগ্রামে নিউজফ্রন্টের অবস্থা তখন প্রায় নিভু নিভু। অথচ বই-পড়ুয়া চট্টগ্রামের নানা প্রবীণজনদের মুখে শুনেছি, ষাট দশকের নিউজফ্রন্টের জৌলুসপর্বের কথা। শুনেছি, বিচিত্র বিষয়ের বই পত্র-পত্রিকার মেলা ছিল যেন নিউজফ্রন্ট। নিউজফ্রন্টের প্রায় পড়তির মুখেই জন্ম ‘কারেন্ট বুক সেন্টার’। এর সুখ্যাতি ছিলো আবার আরেকদিকে। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলের লিটল ম্যাগাজিনের আখড়া ছিলো কারেন্ট বুক সেন্টার। অবশ্য কলকাতা থেকে প্রকাশিত নতুন বই-পত্রের আনাগোনা তেমন ছিল না বললেই চলে। সুতরাং তখনো প্রায় মুখিয়ে থাকতে হতো ঢাকার দিকে, বিশেষ করে চলচ্চিত্র বিষয়ক বই কিংবা কলকাতাস্থ বিভিন্ন ফিল্ম সোসাইটির মুখপত্র ‘চিত্রবীক্ষণ’, ‘চিত্রভাসা’ ‘চিত্রকল্প’সহ আরো কিছু মুখপত্রের জন্য। মনে এলে হাসি পায় আবার গর্ববোধও জাগে এই ভেবে, বইয়ের সংস্পর্শে এসেছিলাম বলেই বুঝি একদিন অনেকের মতো লেখালেখির গুঞ্জনও জেগেছিল মনে। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-পরিজন কেউ কলকাতা যাচ্ছে শুনলেই নির্লজ্জের মত তাদের হাতে ধরিয়ে দিতাম পছন্দের বইয়ের তালিকা। আমৃত্যু মনে থাকবে এমন একটি ঘটনার কথা। ঘটনার নায়ক শ্রদ্ধেয় অনুপম স্যার (অনুপম সেন)। ঘটনার কাল নব্বুই দশক।
তিনি তখন থাকতেন তাঁর উত্তর নালাপাড়াস্থ বাসায়। আমি তখন ‘সত্যজিতের রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থের ডামি নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছি টাকা-পয়সার সন্ধানে। শুনেছি, অনুপম স্যার এসব কাজে অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করেন। শোনামাত্রই ঢুঁ মেরেছিলাম স্যারের বাসায়। অথচ এর আগে কোনো পরিচয় ছিলো না তাঁর সাথে আমার। মনে আছে, তাঁর বাসার ডোরবেল টিপতে হাত কাঁপছিল আমার। লজ্জায় নয়, ভয়ে। এতবড় একজন প্রাজ্ঞ মানুষের বাসায় না বলে ক’য়ে আসাটা কতটা অশোভন হতে পারে সেকথা ভেবে। কিন্তু ফল হলো পুরো উল্টো। কেন এলাম, নাম কি আমার, কোথায় বাসা কিছুই জানতে চাইলেন না। আমার হাতে ধরা ডামিটা দেখে জিজ্ঞেস করলেন-বইটা কিসের? সাহস করে তুলে দিলাম স্যারের হাতে। স্যার পাতা উল্টে উল্টে দেখলেন অনেকক্ষণ ধরে। তারপর নিরুত্তরে চলে গেলেন ভিতরে। একটু পর ছোট একটা খাম হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন-‘এটা রাখুন’। ছোট বড় নির্বিশেষে সবার প্রতি সেই ‘আপনি’ সম্বোধন স্যার ছাড়তে পারেননি বুঝি এখনো। কথা প্রসঙ্গে জানলাম, দু’দিন পর কলকাতা যাবেন একটা বিশেষ কাজে স্যার। মনে এলে এখন লজ্জাবোধে মরি-প্রথমদিনের দেখা বা সাক্ষাতে স্যারকে তৎক্ষণাত বলে বসলাম দু’টি বই আনার কথা। একটি ছিল রবীন্দ্রনাথের তিন কন্যাকে নিয়ে এক লেখকের লেখা ‘তিন কন্যা’ নামের একটি বই, আরেকটি ছিল নির্মাল্য আচার্য্য সম্পাদিত শারদীয় ‘এক্ষণ’।
সপ্তাহ দুই পর স্যার আমার বাসার ল্যান্ডফোনে জানালেন : ‘পিন্টু, আপনার বই দু’টি এনেছি’ শুনে যত না অবাক হয়েছিলাম, তার চেয়ে বেশি মাথা নত হয়ে এসেছিল আমার-স্যারের বদান্যতা দেখে! পরদিন বই দু’টি আনতে গিয়ে উপহারস্বরূপ স্যারের জন্য নিয়ে গিয়েছিলাম ‘রবীন্দ্রসাহিত্যে ব্রাত্যসমাজ’ নামের দু’বছর আগে ঢাকা থেকে কেনা একটি বই।
আজ ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। পেরিয়ে গেছে প্রায় একুশ বছর। এই একুশ বছরে কেনা আমার সংখ্যাধিক বই চলচ্চিত্রের, দ্বিতীয় স্থানে বিভিন্ন গল্পকারের গল্পসংকলন কি গল্পসমগ্র। ছাত্র ছিলাম চিত্রকলার। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি ছেড়ে আসতে না আসতেই ছোট গল্প হয়ে উঠলো আমার প্রধান পঠন-পাঠন ও ভালো-লাগার বিষয়। কেনা শুরু হলো গল্পের বই। অবশ্য এই গল্পপ্রীতির পেছনে লুকিয়ে আছে চলচ্চিত্রের ইন্ধন। চট্টগ্রাম কলেজে পড়াকালে পাঠ্যবইয়ের তালিকায় ছিল শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের প্রথম পর্ব। উপন্যাসের ঘটনার মধ্যে আমার মূল আকর্ষণ ছিল ‘ইন্দ্রনাথ’। স্বপ্ন দেখা শুরু হলো ইন্দ্রনাথকে উপজীব্য করে ছবি নির্মাণের। শুরু হলো চিত্রনাট্য রচনা। মনে এলে হাসি পায়, সম্ভাব্য পোস্টারের লেখায় ‘ইন্দ্রনাথ’ শব্দটির ক্যালিগ্রাফিও করে রেখেছিলাম। গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল মাখা হলো বটে কিন্তু চিত্রনাট্য লেখা শেষ হলো না আজ অব্দি।
প্রায় বছর পনেরো আগে এক শীতের মধ্য লগ্নে কলকাতা বেড়াতে গেলাম। কলকাতা মানে আমার কাছে কলেজস্ট্রিটস্থ বইপাড়া এবং সত্যজিতের বাড়ি। এখনো তাই। নানা দোকান ঘুরে বই কেনা আর বই প্রেমিকদের লাইন ধরে বই কেনা দেখা। এর মধ্যে আমার ব্যাগ ভর্তি হয়ে গেছে বইয়ের ঠাসাঠাসিতে। পরে বুদ্ধি করে কিনলাম একটা ঢাউস চটের থলি। ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে সেটা হয়ে গেলো ভর্তি। সিংহভাগই গল্পের বই আর লিটল ম্যাগাজিন। শরীরও এলো পড়ে। ভাবলাম এবার ফিরে যাওয়া যাক হোটেলে। কিন্তু কিছুতেই জোটাতে পারছি না টেক্সি। দাঁড়িয়ে আছি ফুটপাতে অনেকটা সময়। এদিকে হয়েছে অফিস ছুটি। ট্রাম বা বাসে যে উঠবো সেটারও সুযোগ নেই। সিগারেট কিনতে গিয়ে দেখি, ফুটপাতে একের পর এক লাগানো পুরনো বইয়ের দোকান। এসব দোকান নিয়ে বিশিষ্ট কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, শিল্পী ও চলচ্চিত্রকার পূর্ণেন্দু পত্রীর একটা লেখা পড়েছিলাম ‘আরেক বইমেলা’ নামে। মনে পড়ে গেলো লেখাটির কথা। এখানে নাকি পাওয়া যায় অনেক মূল্যবান ও দুষ্প্রাপ্য বই অনেক কম দামে। ব্যাস, বেড়ে গেলো আমার ব্যস্ততা। নিমিষে হারিয়ে গেলো শরীরে, ক্লান্তি। ব্যাগ আর চটের থলি একটি দোকানে রেখে শুরু হলো দুষ্প্রাপ্য বইয়ের অনুসন্ধান। সত্যি, পূর্ণেন্দু বাবু মিথ্যে বলেননি। পর পর হাতে উঠে এলো কত নামি দামি বই, কোনটা ছেড়ে কোনটা নেবো তার উপর বইভর্তি একটি ব্যাগ ও চটের থলে। তারপরও নিতে হলো দু’টি বই, না নিয়ে উপায় ছিল না। তার একটি হলো ছবিসমেত ‘বুলবুলি পাখির লড়াই’ আরেকটি হলো ‘শরৎচন্দ্রের ইন্দ্রনাথ’। এদ্দিন জানতাম ‘মোরগে-মোরগে লড়াই’র কথা, কিন্তু একদা বাঙালি সমাজ যে বুলবুলি পাখির লড়াই আনন্দেও যে মেতেছিল জানা ছিল না। কিন্তু বিস্ময়ে দ্বিগুণ হতবাক হলাম ‘শরৎচন্দ্রের ইন্দ্রনাথ’ হাতে নিয়ে। খুব বেশি বড় না হলেও মলাটশুন্য বইটির প্রথম পাতা পড়ে এই প্রথম জানলাম ‘ইন্দ্রনাথ’ শরৎবাবুর কোনো কাল্পনিক চরিত্র নয়, যাকে নিয়ে শরৎচন্দ্র ‘ইন্দ্রনাথ’ রচনা করেছেন তিনি এবং তার বাবা-মা, ভাইবোনসহ পুরো পরিচয় তুলে ধরেছেন ছবিসহ পুরো বইটির লেখক। অনেক পরে বুলবুলি পাখির লড়াই’ বইটি উপহার দিয়েছিলাম বাংলাদেশের বিশিষ্ট পক্ষী বিশারদ ইনাম (ইনাম আল হক) ভাইকে। আর ‘শরৎচন্দ্রের ইন্দ্রনাথ’ বইটি যক্ষের ধনের মত আগলে রেখেছি নিজের কাছে। দুঃখের বিষয় এমন একটি প্রয়োজনীয় বই কে লিখেছেন, মলাট ছিল না বলে তাঁর নাম জানা হলো না আজও।
বই প্রসঙ্গে ম্যাঙ্মি গোর্কির একটি কথা বার বার মনে পড়ছে এ-মুহূর্তে। কথাটি অনেকটা এরকম : জীবন নিতান্তই একঘেয়ে, দুঃখ-কষ্টে ভরা, কিন্তু মানুষ বই পড়তে বসলেই সেসব কথা ভুলে যায়। কথাটা যে মিথ্যে নয় এবং চরম সত্য, জীবনে বহুবার প্রমাণ পেয়েছি সে-কথার। খুব যে বেশি পড়েছি তাও নয়। আবার যতটা পড়েছি সেই স্বল্প পঠন-পাঠন থেকে আমার যা অর্জন ঘটেছে জীবনে সেটাও বা কম কি?
আমার বয়স আজ ষাটের ঘরে। যার অর্ধেক কেটে গেছে পত্রিকার অফিসে চাকরিসূত্রে। সেই তিরিশ বছরে সিংহভাগ কেনা বইয়ের চেহারাই শুধু দেখে গেছি, দেখা হয়নি তার শরীর। কিনেছি আর পড়ার ঘরকে করে তুলেছি বইয়ের গোডাউন। পত্রিকার চাকরি এমনই এক চাকরি, পুরো চব্বিশ ঘন্টা যার উদ্বেগে ভরা। আবার এই উদ্বেগের ভেতরে থেকেও অনেকে পড়েছেন, লিখেছেন প্রতিমাসে বইয়ের পর বই। সেই এলেম আমার নেই। অগত্যা চাকরি ছাড়লাম দু’মাস আগে-আর কিছুর জন্য নয়, শুধু তিরিশ বছর ধরে কেনা অপঠিত সেইসব বই পড়বো বলে।
বইয়ের জন্য একসময় হা-পিত্যেশ ছিল। পছন্দের বই পাওয়া ছিল অনেক কষ্টের। সেই কষ্ট এখন নেই, কারণ হাতের কাছেই গড়ে উঠেছে এক আরশী নগর। তথা ‘বাতিঘর’ নামের একটি বড় গ্রন্থালয়। কিনি বা না কিনি প্রায় প্রতিদিন যাওয়া হয় সেই ‘বাতিঘর’ এ।
ছাত্রজীবনে যখন পকেটে টাকা ছিল না তারপরও কেনা হতো বই। এখন টাকা হয়েছে-কিন্তু মাঝে মাঝে ভাবি, পড়ার ঘর যে বইয়ে ঠাসা, ঢুকতে গেলে সাবধানে ঢুকতে হয়, কখন না ভেঙে পড়ে যায় আবার ফ্লোরে রাখা বইয়ের পিলার! অনেকবার পণ করেছি আর নয় বই কেনা, মন বলে, ‘যা আছে পারবে কি পড়ে শেষ করতে এত বই বেঁচে থাকতে?’ সত্যি পারবো না। পারা সম্ভব নয়। তবুও কিনি, তবুও ফিরে যাই বারে বারে বইয়ের কাছে-বই যেন আমায় ডেকে বলে ‘আয় আয় পিন্টু, কিনিস বা না কিনিস, অন্তত দেখে যা একবারটি আমায়।’

x