বইয়ের সাথে দিনগুলি

আনন্দময়ী মজুমদার

মঙ্গলবার , ১৫ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৬:১৯ পূর্বাহ্ণ
20

খশখশে বারান্দায় বসে ভাবি, কবিতা সে-জিনিস যা মানবসঙ্গের মতো, খাদ্য-ভাণ্ডারের মতো, জল-বরষনের মতো, নিঃশ্বাসের অমল বাতাসের মতো, কারুর কাছে। সেই লোকগুলো সেই টান বই পড়ার জন্য, বই নিয়ে মেতে থাকার জন্য, জানাকে জীবনের সবচেয়ে বড় জায়গায় রাখতে গিয়ে, বিশ্বের তাবৎ অনুভব আর চিন্তাকে নিজের ভিতর অনুরণিত করতে চাওয়ার পথে উপেক্ষা, তির্যক মন্তব্য, সামাজিক একঘেয়েমি ইত্যাদি নিয়েই বয়ে যেতে হবে। এইসব করতে গিয়ে নিজেই আয়না তৈরি করতে হবে। কারুর দেওয়া আরশিতে কাজ হবে না।
ঘরকন্নায় আঠার মতো লেপ্টে থেকে নিজের লেখা গল্পের বইয়ের পৃষ্ঠা জুড়ে গেলে বইপত্তর-কবিতা এসব এসে ছাড়িয়ে নেবে। এই হল বাঁচোয়া। সংসার-সমাজ খুব ভালো। কিন্তু নিজের কুয়োয় আটকে থাকা সংসার, সমাজ ভাল না।
অসামাজিক কথা হল?
আইসল্যান্ডে বড়দিনে উপহার হিসেবে বই চালাচালি হয়। পাবলো নেরুদার সময়ে তাঁর দেশে শ্রমিকেরা পড়ত কবিতা। আমাদের অনেকের মাতামহী পিতামহীরা বইপোকা ছিলেন শেষ বয়েসেও। জীবনানন্দ দাশের মা এক হাতে খুন্তি চালাতেন আরেক হাতে পত্রিকার জন্য লিখতেন কবিতা।
পৃথিবীর নিরিখে বইপড়া জনগোষ্ঠী শতকরা হিসেবে বরাবর কম ছিল। কিন্তু গণনা কমে বাড়ে সামাজিক পরিবেশ, ইতিহাস সচেতনতা আর গণমাধ্যমের সঙ্গে সংযোগ রেখে।
একটা বয়েসের পর কয়জন বাঙালি মহিলা ঘরকন্নার সব দায়িত্ব আঁচ নিভাতে নিভাতে একটাও বই শেষ করেছেন, যা কাজের বাইরে পড়া, জানতে ইচ্ছে করে।
তারপরে জানতে ইচ্ছে করে তাদের বই পড়া লোক হিসেবে দেখলে নিতান্ত অসামাজিক আর একটেরে বলে খারিজ করতে ইচ্ছে করে কিনা। আরো জানতে ইচ্ছে করে তাঁরা যখন লেখায় হাত দেয় তখন তাঁদের যে একটা বিশেষ সময়, ভুবন আর নির্জনতা আবশ্যিক হয়ে ওঠে, সেটা সংসারের ফাঁকে তাকে বের করতে হয়, অর্থাৎ কিনা সব কাজ শেষ করে তবে সে কাজে হাত দিতে হয় কিনা। চোখে দেখে জোরালো অনুমান এখানে জেন্ডার গ্যাপ আছে।
বইয়ের সঙ্গে ঘরকন্নার বিবাদ কবে ঘটল? এটা যে মনগড়া সে-কথা বলার সময় পেরিয়ে যায়নি আশা করি।
যে রাঁধে সে চুল বাঁধের মতো যে বই পড়ে সে ঘরও করে।
আর আক্ষেপ হয় কারণ জানি, টেলিভিশনের রোমহর্ষক সস্তা সিরিয়ালগুলি ফেসবুকের মত, আমাদের স্বাভাবিকতা, সুস্থতা, সুন্দরের পানে ধাবমান হবার শক্তি, চিন্তা, বোধ সম্পর্ক সব ছিনিয়ে নিয়েছে।
বাস্তব মানুষের ওপর আরোপ করছে অবাস্তব শাদা-কালো অদ্ভুত লেবাস।
অথচ বই পড়া আর লেখা মানুষকে নিজের ছোট বৃত্ত লাফ দিয়ে পেরিয়ে গিয়ে মহৎ কোনো বড় আকাশ, বিশ্ব, অনন্ত সময় আর অভঙ্গুর কালিক নঙার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক মনে করিয়ে দেয়। সেই অমোঘ সম্পর্ক অস্বীকার করার দায় আমাদের ছোট ছোট পুতুলনাচের ওপর পড়বেই।
৮০ থেকে ৯০ এর দশকে আমাদের জন্মদিনের উপহার ছিল আবশ্যিকভাবে বই।
আজ যে-বন্ধু আমাদের একটা বইয়ের দিকে নেক নজর দেবেন না, তিনি একসময় আমাকে চেনাচ্ছেন বড় বড় লেখক আর চিন্তকদের।
হায় ! তাঁর কাছে এই পাঠ, এই লেখা, এই চিন্তন, এই অনুভব আর অনুরণন এই চাহিদা, এখন শৌখিন মজদুরি।
দুঃখ বয়ামে জমাই আর শীতকালের আচার বানাই। স্বাদু হোক, হোক মুখরোচক আমাদের বইয়ের সঙ্গে লিপ্ত মুহূর্ত, আমাদের কবিতার সঙ্গে লিপ্ত থাকার মুহূর্ত।

- Advertistment -