বইয়ের ঘ্রাণ আকৃষ্ট করে পাঠককে

আকাশ ইকবাল

বুধবার , ১৭ জুলাই, ২০১৯ at ১০:২৯ পূর্বাহ্ণ
17

এই আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির যুগে বই দুই ধরনের। ই-বইও ছাপানো বই। ই-বইকে ভার্চুয়াল ই-বুকও বলা হয়। ই-বুক অর্থ ইলেক্ট্রোনিক্স বুক। ডিভাইস অর্থ্যাৎ, কম্পিউটার কিংবা মোবাইলের মধ্যে পিডিএফ করা যে বই থাকে সেটাকে ই-বই বলা হয়। আর ছাপানো বই মানে হচ্ছে যা আমরা বইমেলা কিংবা পাঠাগার থেকে সংগ্রহ করে পড়ি। ধরে নিন আপনি একজন পড়ুয়া। আপনি একাডেমিক পড়ালেখার পাশাপাশি বাইরের বইও প্রচুর পড়েন। আপনাকে যদি প্রশ্ন করা হয়, ই-বই পড়তে ভালো লাগে না ছাপানো বই অথবা আপনার সামনে দুটো একই বই (একটি ই-বই আরেকটি ছাপানো বই) রাখা হয় তাহলে পড়ার জন্য আপনি কোনটি বেছে নেবেন? নিশ্চয়ই আপনি ছাপানো বইটি নেবেন। গত কিছুদিন আগে চট্টগ্রামের অভিজাত বই বিক্রয় কেন্দ্র বাতিঘরে প্রশ্নটি ১০ জন তরুণ ও প্রবীণ পড়ুয়াকে করেছিলাম। প্রায় সবাই একই উত্তর দিয়েছিল। সবারই দুটো বইয়ের মধ্যে সবাই ছাপানো বই বেছে নেবেন। এরপর তাদের কাছে আরেকটি প্রশ্ন করা হয়েছিল, কেন ছাপানো বই বেছে নেবেন? উত্তরে তারা বলেছিলো, ছাপানো বই পড়তে ভেতর থেকে আলাদা অন্যরকম একটা আকর্ষণ ও অনুভূতি কাজ করে। এখন আপনাকে যদি প্রশ্ন করা হয়, কেন এই আকর্ষণ বা অনুভূতি কাজ করে? ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক অ্যান্ডি ব্রুনিং এই বিষয় নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে গবেষণা করেছেন। আর তাঁর গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে ছাপানো বই পড়ার প্রতি এতো আকর্ষণ বা অন্যরকম অনুভূতি কেন কাজ করে। আসলে এর জন্য দায়ী বইয়ের মধ্যে থাকা এক ধরনের রাসায়নিক ‘ঘ্রাণ’। অবাক হলেন তো? খাবার যেমন, পেটের ক্ষুধা মেটানোর জন্য তেমনি বইও মনের ক্ষুধা মেটায়। আর বইয়ের মধ্যে থাকা সেই ঘ্রাণ আমাদের বইয়ের প্রতি আরও বেশি আকৃষ্ট করে অর্থ্যাৎ ক্ষুধা বাড়ায়। সেই ঘ্রাণের রয়েছে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। মানে, ঘ্রাণ সম্পর্কে বিজ্ঞান কি বলে?
গবেষণায় দেখা গেছে, বইয়ের কাগজ, কালি ও বই ছাপানোর বিভিন্ন ধরনের ব্যবহৃত রায়াসনিক উপাদান এই ঘ্রাণের জন্য দায়ী। যা অনেকগুলো উদ্বায়ী রাসায়নিক উপাদানের সংমিশ্রণে তৈরি। নতুন ও পুরনো বই থেকে প্রায় হরেক রকম উদ্বায়ী জৈব যৌগ নিঃসরিত হয়।
তোমাদের কাছে আরেকটি প্রশ্ন কিংবা ইতোমধ্যে তোমাদের মাথায় প্রশ্ন জাগতে পারে, নতুন ও পুরাতন বইয়ের ঘ্রাণ কি একই? উত্তর হচ্ছে না, এক নয়। কেন এক নয়? তারই পেছনে রয়েছে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও উত্তর। নতুন বইয়ের কাগজ প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় তন্তুগুলোকে কাগজের জন্য উপযোগী করে তুলতে বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান দরকার। যেমন, অম্লতার জন্য ব্যবহৃত হয় সোডিয়াম হাইড্রোঙাইড। তন্তুগুলো ধোয়া হয় হাইড্রোজেন প্রায় অঙাইড সহ আরও অনেক রাসায়নিক দ্রবণে। এসব উপাদান পরস্পরের সঙ্গে বিক্রিয়া করে কিছু উদ্বায়ী যৌগ তৈরি করে। উদ্বায়ী যৌগ যুক্ত হওয়া কাগজগুলো যখন বই আকারে ছাপানো হয় এরপর পড়ুয়ারা বইয়ের পাতা উল্টালেই উদ্বায়ী যৌগ যুক্ত ঘ্রাণগুলো বাতাসে ভেসে নাকে এসে ঢোকে। এই ঘ্রাণের সাথে যুক্ত হয় আরও কিছু ঘ্রাণ। কালিও বাঁধানোর সময় কিছু আঠালো উপাদান ব্যবহৃত হয়। এগুলোর অধিকাংশই জৈব কো- পলিমার। এরপর পড়ার জন্য আমাদের ভেতর থেকে আলাদা অনুভূতি ও আকর্ষণ কাজ করে।
এবার আসি পরনো বইয়ের ঘ্রাণ ছড়ানোর কথায়। পুরাতন বইও ঘ্রাণ ছড়ায়। আচ্ছা, কারও মনে প্রশ্ন জাগে না, বই কেন পুরাতন হয়? তাহলে দুটো প্রশ্নের উত্তর একসাথে দিই। পুরনো বইয়েরও ঘ্রাণ ছড়ানোর জন্য দায়ী বিভিন্ন রাসায়নিক যৌগের বিশ্লেষণ বা ভাঙন। বিশেষ করে সেলুলোজ ও লিগনিনের ভাঙন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বই পুরনো হয়ে গেলে, বইয়ের পাতা হলদেটে হয়ে যায়। সেটার জন্য দায়ী লিগনিন। আমরা জানি কাগজের প্রাথমিক উৎস কাঠের গুড়ো। কাঠে অনেক লিগনি ও সেলুলোজ থাকে। কাগজে সেলুলোজের তন্তুগুলোকে এক সঙ্গে ধরে রাখার জন্য কাজ করে লিগনিন। অক্সিজেনের সংস্পর্শে এসে লিগনিনে জাগরণ ঘটে। ফলে তৈরি হয় অম্ল। সেই অম্ল-ই সেলুলোজ ভেঙে যায়। এতে হলদেটে হয়ে যায় বইয়ের পাতা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অম্লীয় উপাদানগুলোর উপস্থিতিতে অ্যাসিড হাইড্রোলাইসিস বিক্রিয়া ঘটতে থাকে। ফলে আবার সেই উদ্বায়ী জ্বৈব যৌগ তৈরি হয়। যার ফলে উদ্বায়ী জৈব যৌগই হলো পুরনো বইয়ের ঘ্রাণের উৎস।

x