বংশ বর

দীপক বড়ুয়া

শুক্রবার , ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৪:২৭ পূর্বাহ্ণ
44

আমার নাম চলন্তিকা।

জন্মের পর থেকেই চটপটে ছিলাম।তখনই মা আমাকে চলন্তিকা নামে ডাকে। স্কুল,কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঐ নামেই বেরুই।

তাই আমি চলন্তিকা।

একদিন আমার বিয়ে দেয় মাবাবা।

শ্বশুর, শাশুড়ি, ভাসুর, জা, নিয়ে আমাদের সংসার।

মিষ্টি সুখের পরিবার।

আমার জার চার মেয়ে।

ঐ একটি কারণে সংসারে ছোটবড়ো কথা হয়। বাসররাতে উজ্জয়ন আমার পাশে বসে হাত ধরে বলেছিলো,

তুমি, সুন্দরী।তবে তোমার মন তোমার চেয়ে বেশী সুন্দর।

কথাটির অর্থ কি, সেই মুহূর্তে কিছুই বুঝিনি।না থেমে উজ্জয়ন আবারও বলে,

সেই মনকে সবসময় স্বচ্ছ,পরিষ্কার রাখবে। যে যাই বলুক।

গভীর রাতে ঘুমিয়েছিলাম।তাই সকালে ঘুম ভাঙেনি। আমার জাদরজার বাইরে থেকে ডাকে।

আমি উঠে দরজা খুলি। লজ্জায় বলি,

দিদি রাত করে ঘুমিয়েছি,তাই কখন সকাল হলো বুঝিনি। সরি দিদিভাই।

না না, সরির প্রয়োজন নেই। প্রথম রাতে এরকমই হয়। স্নান করে এসো। একসাথে নাস্তা করবো।

মাবাবা,ভাসুর, মেয়েরা খেয়ছে দিদি ভাই।আমি বললাম।

হ্যাঁ হ্যাঁ ভাই খেয়েছে, তুমি তাড়াতাড়ি এসো।

স্নান সেরে কাপড় পাল্টিয়ে মার ঘরে যাই।বাবা পত্রিকা পড়ছেন। মা পানের বাটা থেকে পান সাজাচ্ছেন। আমি প্রথমে বাবাকে প্রণাম করি।পরে মাকে।

বাবা বললেন, –সুখী হও মা। তবে, একটি কথা বলবো,শোনো।

নতুন জীবনের তোমার এটা প্রথম দিন।সাধারণ মানুষের চেয়ে আমি ভিন্ন। আমার পরিবারে বউ এনেছি,একথা কোনও দিনই মনে করোনা।এনেছি মেয়ে।মেয়েকে শাসন করা যায়। ভালোমন্দ বলা যায়।বউকে বলা যায়না। বুঝেছ আমি কি বলছি!

আমি ভয়ে ঘোমটা টেনে বললাম,

হ্যাঁ বাবা বুঝেছি।

বুঝলে মাথায় ঘোমটা কেন? ঘোমটা নামাও।

মা কিছুই বলেননা।

চুপচাপ সুপুরী কাটছেন।পানের খিলি বানাচ্ছেন।

কই হলো পানের খিলি? শ্বশুর উঁচু গলায় বলেন।

হ্যাঁ, হয়েছে। নরম গলায় শাশুড়ি উত্তর দিয়ে পানের থালাটি সামনে দেয়।

বুঝতে দেরি হলো না শাশুড়ীমা শ্বশুর বাবাকে ভীষণ ভয় করেন।

এবার তুমি যাও। শ্বশুর বললেন।

আমি ধীরেধীরে পা ফেলে রান্না ঘরে যাই।

দিদিভাই চা তৈরি করে বসে আছেন।

দিদিভাই,ওরা মানে মেয়েরা খেয়েছে?আমি উত্তর দেবার সাথে সাথে বলেন,মিনু, চিনু,রিনু,বীনু সবাই খেয়েছে। বাকী শুধু আমরা দুজন আর ঠাকুরপো। তুমি খেয়ে ঠাকুরপোর জন্য চা নাস্তা নিয়ে যাও ঘরে।

ঘুম ভাঙার সাথে চা না পেলে উজুর মাথা শেষ চরমে থাকে।

এবার বুঝলাম, উজুকে সবাই ভয় পায়।

কী অদ্ভুত! জীবনযাপন।

এক সপ্তাহ পরে উজু আমাকে বলে,

কাল সকালে কক্সবাজার যাবো,হানিমুনে। কাপড় ঘুচিয়ে রাখো।

আমি অবাক।বাবাকে বলেছেতো! উনি যা রাগী।

রাতে মা আমাকে বলেন,

ছোট বউমা, তোমার শ্বশুর ডাকছে।

আমি ভয়ে ঠান্ডা হয়ে যাই। কি জানি,কি জন্য ডাকছেন! ছোট ছোট পায়ে বাবার রুমে যাই।আমাকে দেখে বাবা বলেন,

পাশের চেয়ারে বসো। কথা আছে।

আমি দাঁড়িয়ে থাকি। বসতে ভয় পাই। শ্বশুর আবারও বলেন,

তোমাকে বসতে বললাম, বসো।

বসি।বাবা কথা বলতে শুরু করেন,

আমার দুই সন্তান। চাকরি করে সরকারি। আমিও সরকারি চাকুরে ছিলাম। তিলতিল করে আমার আয়ে এই বাড়ি করেছি। চাকরি শেষে বড়ো অংকের টাকা পাই। সেটা ফিক্সট ডেপোজিট করেছি। তোমার মায়ের নামে একটি ডিপোজিট আছে।মাসে সাত হাজার টাকা পায়।নিজের খরচ করে। মাসে আমি পাই বিশহাজার টাকা।সাথে পেনশনের টাকা।

বড়ো ছেলে বেতনের পনের হাজার টাকা আমার হাতে দেয়। ছোট ছেলে আগে দিতো পঁচিশ হাজার টাকা।এই মাস থেকে দেবে বিশহাজার টাকা।

মাসে ষাট হাজার টাকা।

এটা সংসার খরচের। এটার মধ্যেই আমাদের চলতে হয়। বাড়তি কিছু প্রয়োজন পড়লে দোকান ভাড়া থেকে খরচ করি।ও হ্যাঁ দোকান ভাড়া পাই মাসে পনের হাজার। এই টাকা প্রতি মাসে ব্যাংকে জমা হয়।

বাবা,আমাকে এইসব বলছেন কেন? আমি প্রশ্ন করি।

তুমি আমার দ্বিতীয় মেয়ে। দুই ছেলে দুই মেয়ে।চার নাতনি। আর আমরা বুড়ো বুড়ি দুইজন।

বাবা আমাকে কেন বলছেন, বুঝিনি।

যৌথ পরিবারের এটা নিয়ম। যাতে কেউ কাকে ভুল না বুঝে। সন্দেহ না করে। এই সামান্য ভুলে সংসার ভাঙে। অশান্তি বাড়ে। তাই সব বলা।

বাবার মুখে পরিবারের এতো কথা শুনে ভাবি, উনি আমাকে একা শোনাচ্ছেন! কিন্তু কেন?

বাবা আবার বলেন,

এটা আমাদের পরিবারের নিয়ম।আমার বাবা আমাকে যে শিক্ষা দিয়েছেন, সেই শিক্ষা আমার পরিবারে দেই।আরও একটি কথা। আমার বাবা তোমার শাশুড়িকে তুই সম্বোধন করতেন। কারণ একটি! বউমা নয়, মেয়ে মনে করতেন।

আজ থেকে আমিও তোমাকে তুই সম্বোধন করবো।আমি বড়ো বউমাকে তুই সম্বোধন করি।

ঠিক আছে বাবা, তাই হবে। আমি বললাম।

কিছুক্ষণ চুপ থাকার পরে বাবা বলেন,

চলন্তিকা,এবার একটি মূল্যবান কথা শোন্‌। আমার বড়ো ছেলের চারটি মেয়ে। তোর কাছে আমার একটি বর চাইবার আছে। চাইবো?

হ্যাঁ,চান!

সেটা তোকে রাখতে হবে। তানাহলে আমার আগামী বংশ ধরে রাখার কেউ থাকবেনা।

কি চাই বাবা? আমি বাবার কাছে প্রশ্ন রাখি।

একটি নাতি!

বাবা,একটি কথা বলি?

হ্যাঁ,বল মা। নির্ভয়ে বল।

তাতে কি কারো হাত আছে? চাইলে পাওয়া যাবে!

সবতো সৃষ্টিকর্তার হাতে।

আমি জানি, তারপরেও বলছি আমার একটি নাতি চাই। ফুটফুটে ফর্সা নাতি।

আমি বাবাকে দুইহাতে প্রণাম করি। আমাকে বাবা বলেন,

তোকে আশির্বাদ করছি, তোর আশা পূর্ণ হোক মা। ও হ্যাঁ, আরও একটি কথা। উঠে আলমীরা খুললেন। আলমীরা থেকে টাকা বের করে আমার হাতে দিয়ে বলেন,

এতে পনের হাজার টাকা আছে। তোরাতো কাল সকালে কক্সবাজার যাচ্ছিস হানিমুনে। দেখে শুনে খরচ করবি।এটাও আমার বাবার শিক্ষা। সাবধানে থাকবি। রাতে হোটেলে ফিরবি না। আমার ছেলেকে দেখিস।

আচ্ছা,বাবা। আসি।

যারে, মা।

রাতের খাবার টেবিলে সবাই একসাথে বসে। শুধু আমরা দুজন ছাড়া। ওদের খাওয়া শেষে আমি আর জাখেতে বসি। খাবারের ফাঁকে বলি,

দিদি ভাই,আমি কিছুই বুঝছিনা শ্বশুরবাড়ি নিয়ম কি?

তোকে বুঝতে হবে না কিছু। খেয়ে নেতো!

ওমা একি! দিদিভাই সকালে তুমি করে বললো,এখন তুই সম্বোধন!বাবার কথা বলার পর বোধহয় এটাই পরিবারের নিয়ম।

রাতে শোবার ঘরে শুতে যাই।

দেখি,উজ্জয়ন কি একটা বই পড়ছে।আমাকে দেখে প্রশ্ন করে,

কাপড় ঘুচিয়েছ? আমার কাপড় বেশী নেবে না।তিনটা শার্ট,দুটো পেন্ট,দুটো হাফ পেন্ট, দুটো সেন্টো গেনজি।

ওমা বলে কি! এলাম মাত্র! কি চিনি,?আমি ওর কাপড়ের কি জানি!তবু আলমীরা খুলে দেখিয়ে বলি,-এটা নেবো,ওটা নেবো।সব শেষে আমার কাপড় নেবার ফাঁকে বলি,

একটি কথা বলি?

হ্যাঁ, বলো।বই থেকে চোখ না তুলে বলে।

কক্সবাজার যাবো, বাবাকে বলেছিলে?

বাবাইতো যেতে বললো। সবকিছু বাবার কথায় হয়।

পনের হাজার টাকা হাতে দিয়ে বললাম,

বাবা দিয়েছেন।

তোমার কাছে রাখো। যাওয়াআসা,হোটেলে থাকাখাওয়া,সপিং করে বাবাকে লিখিত হিসেব দেবে।

আমি?

হ্যাঁ,তোমাকেই দিতে হবে।এটা এই পরিবারের নিয়ম।

আমি আমাদের পরিবার দেখেছি। আত্মীয়দের দেখেছি।বন্ধুর পরিবার দেখেছি। এরকম নিয়মের পরিবার কোনোদিনও দেখিনি। যেন একটি স্বর্গপুরী।না চাইতে সব পাওয়া!

ভোরে আমার শাশুড়ি ডাকে। ওঠ্‌ মা। নাস্তা খাবি,বাথরুম করবি,দেরী হয়ে যাবে।চোখ খুলে দেখি,পাশে উজ্জয়ন নেই। দরজা বন্ধ। নিশ্চয়ই ও বাথরুমে ঢুকেছে।

একটু পরে বাথরুম থেকে উজ্জয়ন বেরুয়।আমার রাগ হয়।রেগেই বলি,

আমাকে ডাকলে না কেন? মা কি ভাববেন বলোতো!

তুমিতো ঘুমুচ্ছিলে,মিষ্টি ঘুম। চোখ দুটো যা লাগছিলো, অপূর্ব! তুলতুলে মুখটা! অবর্ণনীয়! হাতের চিকন লম্বা আঙুলের নখের উপর টুকটুকে লাল রঙের নখপলিস। দুর্দান্ত। কখন লাগালে গো! এই টুকটুকে লাল রঙটা আমার খুব পছন্দ।

ওর প্রশংসায় বুকটা ভরে যায়।

খুবতো রোমান্টিক! দেখে মনে হয়না। কি ভেবে হঠাৎ আমার গালে টুক করে একটু আদর করে বলে,

তাড়াতাড়ি করো,না হয় বাবা ডাকতে আসবে। বাবার হাতে যাওয়া আসার বাসের টিকেট।

যত দেখছি,ততই এই পরিবারের কাজে,কথায় অসাধারণ মিল খুঁজে পাই। তারপরেও বিশ্বাস হয়না।

কি করে সম্ভব! এটা সত্যি না মিথ্যে। এমুহূর্তে বাবার কথাটা বারবার মনে পড়ে।

বংশ ধর! একটি নাতি চাই। পরিবারের আগামী বংশধর। আমি কি ঐ সহজ, সরল, মানুষটির স্বপ্নপূরণ করতে পারবো?

এখানে আমার কি শক্তি আছে? সব শক্তিতো সৃষ্টিকর্তার। এ ভগবান আমাকে আশির্বাদ করো,আমার শ্বশুরের স্বপ্ন যেন পূরণ করতে পারি। বারবার শ্বশুর বলছেন,

বাস আটটা পনেরই ছাড়বে।

উজ্জয়ন, চলন্তিকা তাড়াতাড়ি কর।

আমরা দুজনে বেরুবার আগে বাবামাকে প্রণাম করি।

সাবধানে থাকিস। রাত করে হোটেলে ফিরবি না।

বাবা বলেন। দুজনে ট্যাক্সিতে উঠি। ট্যাক্সি ছাড়ে। বাস স্টেশনের দিকে।

x