ফ্ল্যাট মালিকদের সুবিধা-অসুবিধা

সোহেল মারমা

রবিবার , ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৮:২৪ পূর্বাহ্ণ
1427

যারা শহরে একটি নিজস্ব ঠিকানার জন্য সারা জীবনের ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের পুরোটা রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিচ্ছে কিছু অসাধু ও প্রতারক প্রতিষ্ঠান সেই নিরীহ মধ্যবিত্তের স্বপ্ন ভেঙে খানখান করছে। তাদের বসিয়ে দিচ্ছে পথে। তবে ফ্ল্যাট মালিকদের সুবিধা ও অসুবিধার ওইসব বিষয়গুলো কাটিয়ে তোলার চেষ্টা চলছে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষ থেকে।
জানা গেছে, ফ্ল্যাট নিয়ে প্রতারণা ঠেকাতে সরকার রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ করে। কিন্তু এ বিষয়ে একদিকে জনসচেতনতার অভাব, অপরদিকে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনকে প্রভাবিত করার মতো অর্থ, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিপত্তি, পেশাদারি, যা ডেভেলপারদের রয়েছে, তার সঙ্গে ফ্ল্যাট-ক্রেতারা পেরে উঠছেন না। এত সমস্যা সত্ত্বেও এই আইনে মামলা দায়েরের দৃষ্টান্ত বিরল। অথচ হাজার হাজার ফ্ল্যাট-ক্রেতা ডেভেলপারের হাতে প্রতিনিয়ত নাজেহাল হওয়ার ঘটনা ঘটছে।
এ ব্যাপারে রিহাব চট্টগ্রাম অঞ্চলের চেয়ারম্যান আবদুল কৈয়ুম চৌধুরী আজাদীকে বলেন, ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে যেসব অভিযোগ উঠছে, সেগুলো নিয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এজন্য রিহাবের পক্ষ থেকে একটি কমিটিও তৈরি করা হয়েছে। ওই কমিটিই এসব বিষয় নিয়ে কাজ করছে।
রিহাব চেয়ারম্যান বলেন, ক্লায়েন্টদের মধ্যে বর্তমানে যে আস্থার সংকট রয়েছে। তা কাটিয়ে উঠার জন্য আমরা নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এটা কাটাতে না পারলে রিয়েল এস্টেট ব্যবসাও ঘুরে দাঁড়াবে না। ব্যবসাটি কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না।
সরকারের কাছে রিহাবের পক্ষ থেকে যেসব দাবি উঠছে, ওইসব দাবি পূরণে সরকার এগিয়ে আসলে এ ধরণের সংকট অনেকাংশে কেটে যাবে বলে মনে করছেন আব্দুল কৈয়ুম চৌধুরী। ওইসব দাবি-দাওয়ার মধ্যে মধ্যবিত্ত পরিবারদেরও সুবিধার কথা বলা হয়েছে।
তবে এখনো আবাসন ব্যবসাটি ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না জানিয়েছেন তিনি।
প্রতারণার শিকার ফ্ল্যাট মালিকদের অভিযোগ, যারা ফ্ল্যাট ক্রয় করে তারা পরস্পরকে চেনে না এবং অনেকে ভিত্তির কাজ শেষ হওয়ার পরই ফ্ল্যাট বুকিং দেয়, তাই ক্রেতার পক্ষে এসব দেখার কোনো সুযোগ নেই। প্রায় ক্ষেত্রে ডেভেলপাররা নকশা কারিগরি মানসম্মতভাবে করে না এবং নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মানও রক্ষা করে না। ওই বিষয়টি নিয়ে ক্রেতার নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ সীমিত থাকে। প্রতারণার শিকার হওয়ার আরও বহু জায়গার মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ, স্যানিটারি ফিটিংস, রং, ডিসটেম্পার ইত্যাদি ক্ষেত্রে। ডেভেলপাররা গুণগত মান নিন্মপর্যায়ে রেখে মোট চুক্তিমূল্যের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ব্যয় সাশ্রয় করে থাকে এভাবেই। কাজ অসম্পূর্ণ রেখে নিবন্ধন শেষ করতে পারলে ২৫-৩০ শতাংশ কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই ডেভেলপারের গায়েব হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতারা বাধ্য হয়েই প্রতারণাগুলো মুখ বুজে মেনে নিয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ে সব অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করে ফ্ল্যাট বুঝে নিচ্ছে। কিছু কিছু ডেভেলপার ভবনের শুধু একটি কাঠামো দাঁড় করিয়ে ফ্ল্যাটের ভেতরের সব কাজ ফ্ল্যাট-ক্রেতার ওপর চাপিয়ে মেয়াদ শেষে চুক্তি অনুযায়ী অন্যান্য সিভিল ওয়ার্ক, স্থাপনাসমূহ যথা ট্রান্সফরমার, জেনারেটর, সোলার প্যানেল, লিফট, ইন্টারকম স্থাপন না করে দুই-তিন বছর কোনো যোগাযোগ করে না।
ওইসময় ক্রেতারা ঘোরাঘুরিতে ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে পড়ে। এমন প্রতারণা বিষয়ে কিছু ক্ষেত্রে মামলা করে তিন-চার বছর পর্যন্ত ঝুলে থাকছে। না বাড়ি নির্মাণ সমাপ্ত হচ্ছে, না তারা তাদের বিনিয়োগ ফেরত পাচ্ছে। অনেক জমির মালিকও এভাবে ডেভেলপারের হাতে প্রতারিত হচ্ছে। অথচ ওই একই কোম্পানি অন্য নামে অন্য ব্যবসা করছে এমনকি হাউজিং ব্যবসাও করে যাচ্ছে। সরকারি সংস্থা চউক (চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) এ বিষয়ে তেমন নজরদারি থাকে না।
তবে রিহাব প্রতিবছর আবাসন মেলার আয়োজনের মধ্য দিয়ে ক্লায়েন্টদের সুবিধা ও অসুবিধার অনেক কিছুই সমাধান করে দিচ্ছে। রিহ্যাবের সদস্যভুক্ত ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ক্লায়েন্টরা দেখেশুনে সাধ্যের মধ্যে ফ্ল্যাট ক্রয় করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এদিকে সরকারিভাবে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষদের জন্য ফ্লাট নির্মাণ করে দেওয়ার পাশাপাশি ক্রেতাদের ফ্ল্যাট কেনার ওপর আগ্রহ তৈরির চেষ্টা চলছে।
সম্প্রতি সরকার ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে ফ্ল্যাট ও জমি কেনার ক্ষেত্রে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আগে ফ্ল্যাট কেনায় কালোটাকা সাদা করার সুযোগ ছিল। এখন থেকে নতুন করে জমি যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ ফ্ল্যাট ও জমি কিনলে আয়তনের ওপর এলাকাভেদে নির্দিষ্ট পরিমাণ কর দিলে আর কোনো প্রশ্ন করবে না জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

x