ফ্ল্যাট কালচারের যুগে কর্পোরেট হওয়ার চর্চা

ঋত্বিক নয়ন

রবিবার , ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৮:২১ পূর্বাহ্ণ
110

শহর নগরে প্রায় সবাই এখন প্রগতির ঘোড়-সওয়ার। অধিকাংশই পারিপার্শ্বিক কারণে নিরুপায় হয়ে। দু’একজন সখ করে। ক্রমে বিস্তৃত হচ্ছে এই কালচার। বর্তমান যুগটাই যে এমন, নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির যুগ, ফ্ল্যাট কালচারের যুগ। ঘন ঘন ভূমিকম্প এসে সতর্ক করে দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাতে ঘোর দৌঁড় থামায় কে? যখন আসবে, তখন দেখা যাবে- এই নীতিতে চলতে চলতে আমরা ফ্ল্যাট কালচারেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। মফস্বল শহরেও এখন বহুতল ফ্ল্যাট, প্রত্যন্ত গ্রামেও এখন ফাউন্ডেশন সহ বহুতল ভবন।
সুগন্ধী গোলাপী কাগজে লিখা নীল খামের প্রেমপত্র যেমন বিলুপ্ত, যে কোনো বসত বাড়ির সবচাইতে সুন্দর- অঙ্গ ‘উঠোন’ এর ভাগ্যে একই পরিণতি অপেক্ষা করছে। উঠোনের ধুলোতে লুটোপুটির অভিজ্ঞতা আমার আপনার আছে, কিন্তু আমাদের সন্তানদের সেই ভাগ্য কই? তারাও অবশ্য এ নিয়ে মাথা ঘামাই না। দু’ জেনারেশন আগের উঠোন বিভক্ত হয়ে এখন সারি সারি ঘর। শহর নগরের পুকুর ভরাট করে এখন পাইকারী হারে উঠছে ফ্ল্যাট।
আধুনিকতা নামক বাঘের পিঠে সওয়াড় আমরা সবাই। নামার উপায় নেই। তাই ছাদ বাগান, টবে মুলা আর বেগুন চাষের উপায় নিয়ে টিভিতে প্রচারণা চালাতে হয়। অপেক্ষা করছি, বাসার সৌন্দর্য বর্ধন নয়, পারিবারিক চাহিদা মেটানোর জন্য একোরিয়ামে মাছ চাষের প্রচলন হচ্ছে কবে।এ নেশার টাইপ এমন। ডেডলাইন ক্রস না করা পর্যন্ত জানতে-বুঝতে পারবেন না, রিলেটিভের রিলেশন আর বেশি দিন নেই।
শহরের বিবেকের ঘরে কে যেন হঠাৎ তালা মেরে গেছে। ভবন সংস্কৃতির দখলে চলে গেছে এ শহর। কর্পোরেট হবার লেসন প্ল্ল্যান শিখছে শহর। এ শহরে শৈশব এখন আর আকাশ দেখে না, পূর্ণিমার ফুলমুনটাও গ্রিলের নকশায় অন্য রকম। সবাই প্লিজড, প্রগতির বিজ্ঞাপনে। যেন শহরে সমস্যা নেই। কিন্তু প্রাত্যহিক সূর্যোদয়ের অনুমতি চায় প্রকৃতি। সবই জানে, বোঝে, তবু চুপ করে দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে যায় মানুষগুলো যার যার ফ্ল্যাটে। গাছ নেই, পাখি ভ্যানিশ, পুকুর তো কবে মিসিং; সৌজন্যে ফ্ল্যাট কালচার।
বারান্দার রেলিং ঘিরে ছোট-বড় অসংখ্য টব। নানা প্রজাতির পাতাবাহার, ক্যাকটাস থেকে শুরু করে দোপাটি, নয়নতারা, জারুল, হাস্নাহেনা শুধু নয়, নিম, তুলসী, মেহেদির মতো ঔষধী গাছও রয়েছে তাতে। বিশাল ফ্ল্যাটে এক চিলতে অঙিজেন ফ্যাক্টরি কিংবা সবুজে ছাওয়া আঙ্গিনা। প্রকৃতির কোল থেকে বিচ্ছিন্ন নগরবাসীর কেউ কেউ গভীর মমতায় এভাবেই বেঁচে থাকে। শহরের দিগন্ত ছেয়ে ফেলা উঁচু ভবন তৈরির পেছনের কারণ বা পক্ষে-বিপক্ষে তর্ক বহু আছে, কিন্তু বসবাসের বাস্তবতা অস্বীকার করে না বলে অনেকেই নিজের আবাস নিজের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছে।
বেঁচে থাকার অপরিহার্য বায়ু অঙিজেনের উৎস কি? সেন্ট্রাল এসি নাকি টব? তাজা গাছের সবুজ সান্নিধ্য অনেককে বেশি টানে। হোক না ছোট্ট টবে ছোট গাছ তবু তো প্রকৃতির প্রতিনিধি। টবের কাছে গেলে প্রশান্তিতে মন ভরে যায়। ওই প্রশান্তিই হয়ত বেঁচে থাকার অঙিজেন।
ঝম ঝমিয়ে বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দেয় টবের গাছপালা। এক চিলতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে শহুরে কিশোরী ভিজতে ভিজতে হারিয়ে যায় দূরে … ঘাসে ভরা প্রান্তরে যেখানে আকাশ মিশেছে মাটিতে। গাছেরা সব ভেজা হাওয়ায় মাতাল হয়ে এ ওর গায়ে লুটিয়ে পড়ছে। ধন্যবাদ নির্মাতা কোম্পানিকে। যারা এমন দক্ষিণমুখী বারান্দা বানিয়েছে। এ শহরে অনেক ফ্ল্যাটে দেখা যায় পরিকল্পনাহীন আর্কিটেকচার। ডিজাইনের জন্য অযথা জায়গা খরচ হয়েছে অথবা অতিরিক্ত কিপটেমির জন্য বসবাসের জায়গা পরিণত হয়েছে দমবন্ধ খোঁয়াড়ে। একটু পরিকল্পনা একটু সৃজনশীলতা যদি খাটানো যায় তাহলে এক চিলতে আবাসেও আনা যায় প্রকৃতির আলো-বাতাস। যারা এ সব ঘরদোর বানাচ্ছেন এ বিষয়ে তাদের পর্যাপ্ত পড়াশোনা থাকলে ক্রমশ বেড়ে ওঠা অ্যাপার্টমেন্ট কালচার অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক হবে। পরিবেশও রক্ষা পাবে খানিকটা হলেও।
এখন শিশুরা ঠিকই বড় হচ্ছে- তবে তারা পাচ্ছে না সোনালী রোদের আলো, বর্ণিল মেঘের ছায়া, রঙধনুর আলোর ঝলকানি অথবা নির্মল বাতাস! যেখানে নেই উন্মুক্ত খেলার মাঠ, নেই গাছ-গাছালি, ফুল ও পাখির কলরব। আমাদের শিশুরা এখন মাছ চিনে না, গাছ চিনে না-পায় না প্রকৃতির আলিঙ্গন। আকাশ সংস্কৃতির অপচ্ছায়া এখন গ্রাস করে নিচ্ছে শিশুদের দূরন্তপনা ও স্বপ্ন সুখের শৈশবকে। চারদেয়ালের ভেতর তার জন্য সব বন্দীত্বের আয়োজন! টেলিভিশন, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, ফেসবুক, ভিডিও গেম আর মোবাইল গেম রীতিমতো ভুতের বোঝা হয়ে চেপেছে শিশুদের মনে। ডরিমন, পকিমন গিলে খাচ্ছে শিশুদের স্বপ্ন বিলাস।
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানা গেছে দাদা-দাদী, নানা-নানীর সাহচর্য শিশুদের দীর্ঘজীবী করে। এখন দাদা বাড়ি, নানা বাড়ি বা মামার বাড়ি বেড়ানোর উচ্ছ্বাস শিশুদের জীবনে নেই। শহুরে শিশুরা নদী দেখে না, সাঁতার জানে না। ঝড়ের দিনে আম কুড়ানোর অসাধারণ রোমাঞ্চকর সাহসিকতা তাদের জীবনে ঘটে না! কারণ পারিবারিক সংস্কৃতি বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে। শিশুরা পাচ্ছে না যৌথ পারিবারিক বন্ধনের আনন্দ। বিচ্ছিন্ন, ছন্নছাড়া পরিবারগুলোর মাঝে নিরানন্দ বিষন্নতায় শৈশব কাটছে শিশুদের।

x