ফের রক্তাক্ত পাহাড়

আঞ্চলিক দলের সংঘাত ।। মরছে সাধারণ মানুষ

সমির মল্লিক, খাগড়াছড়ি

রবিবার , ১৯ আগস্ট, ২০১৮ at ৮:৩৬ পূর্বাহ্ণ
269

ফের রক্ত ঝরল পাহাড়ে। সবুজ পাহাড় হিংসার স্রোতধারায় আবারো রক্তাক্ত। জঙ্গলের সীমানা ছাড়িয়ে এখন প্রকাশ্যে হামলার ঘটনা বেড়েছে। তবে এসব ঘটনায় রাজনৈতিক নেতা কর্মীদের পাশাপাশি নিরীহ সাধারণ মানুষও মারা যাচ্ছে। আঞ্চলিক দলের বিরোধে জনমনে আতংক উদ্বেগ বেড়েছে। হামলার প্রতিশোধ নিতে একের পর এক পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটছে। শনিবারের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তিন পথচারী ধীরাজ চাকমা, জীতায়ন চাকমা ও রুপম চাকমা ব্রাশফায়ারে মারা যায়। নিহতদের স্বজনরা জানান, প্রত্যেকে ব্যক্তিগত কাজে ঘর থেকে বের হয়েছিল। তারা কোন আঞ্চলিক সংগঠনের সাথে জড়িত নয়। নিহত জীতায়ন চাকমার মেয়ে পনি চাকমা, জুলি চাকমা, অন্বেষা চাকমা বলেন, আমার নিরপরাধ বাবাকে কেন খুন করা হল? বাবা সকাল বেলা বাসা থেকে নাস্তা করতে বাজারে আসে। এসময় স্বজনদের আহাজারিতে পুরো এলাকায় শোক বিহ্বল পরিবেশ তৈরি হয়। জীতায়ন চাকমার স্ত্রী প্রভাতি চাকমা জানান, সকালে বাজারের উদ্দ্যেশে মানুষটা বের হয়েছে। তিনি এসময় আরো বলেন, স্বামীর আয়ে সংসার চলে। তিন মেয়েই পড়াশোনা করছেই, কীভাবে সংসার চলে। তিনি এসময় প্রশ্ন করে বলেন, কেন নিরাপরাধ মানুষটাকে মরতে হল।

এছাড়া আরেক পথচারী ধীরাজ চাকমাও ঘটনাস্থলে মারা যায়। তিনি একজন প্রকৌশলী। কাজে যোগ দিতে পানছড়ি যাওয়ার জন্য স্বনির্ভরে আসে। এসময় সন্ত্রাসীরা তাকেও গুলি করে। আঞ্চলিক দলের বিরোধে কারণে স্বজনদের মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না সাধারণ মানুষও।

আঞ্চলিক দলগুলোর বিরোধে কারণে পাহাড়ি জনসাধারণে মাঝে দিন দিন আতংক বাড়ছে। তবে শনিবারে হামলার ঘটনায় নিজেদের জড়িত থাকার অভিযাগ অস্বীকার করেছে জেএসএস (এমএন লারমা) এর কেন্দ্রীয় সহ তথ্য ও প্রচার সম্পাদক প্রশান্ত জানান, এই হামলার ঘটনার সাথে আমরা জেএসএস (এমএন লারমা) কোনভাবেই জড়িত নই। এরা অহেতুক আমাদের দোষারোপ করে।

সাম্প্রতিক প্রসীত খীসার ইউপিডিএফ থেকে সৃষ্ট ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) গঠনের পর থেকে নাটকীয়ভাবে হত্যাকাণ্ড বাড়ছে। তবে খাগড়াছড়িতে আঞ্চলিক দলের বিরোধ বর্তমানে তিন অংশে বিভক্ত। এর মধ্যে রয়েছে ইউপিডিএফ (প্রসীত), জেএেসএস (এমএন লারমা) ও নব্য সৃষ্ট ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)। চলতি বছরসহ আঞ্চলিক দল সমূহের মাঝে একাধিকবার পাল্টা প্রতিশোধের ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরের ৪ মে রাঙামাটি যাওয়ার সময় নানিয়াছড়া এলাকার কেঙ্গালছড়িতে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এর প্রধান তপন জ্যোতি চাকমা (বর্মা)সহ ৫ জন নিহত হয়। এই ঘটনায় প্রসীত খীসার ইউপিডিএফকে দায়ী করেছে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)। শনিবার (গতকাল) খাগড়াছড়ির স্বনির্ভরের প্রতিপক্ষের হামলায় ৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনাকে পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবে দেখা হচ্ছে। হামলার জন্য ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) ও জেএসএসকে (এমএন লারমা) দায়ী করেছে প্রসীত খীসার ইউপিডিএফ। পাল্টা হামলায় রাজনৈতিক কর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও মারা যাচ্ছে।

পরিসংখ্যানে জানা যায়, চলমান (নভেম্বরআগস্ট) হত্যাকাণ্ডে প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ এর ১৯ নেতাকর্মীসমর্থক ও জেএসএস (এমএন লারমা) এবং ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) ১১ নেতাকর্মী খুন হওয়ার পাশাপাশি এই পর্যন্ত চারজন সাধারণ মানুষ মারা যায়। সাধারণ মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় পাহাড়িদের মাঝে আতংক বেড়েছে।

ইউপিডিএফ সূত্রে জানা যায়, নভেম্বর থেকে জুলাই পর্যন্ত দলটির প্রায় ১৬ জন নেতা কর্মী খুন হন। ইউপিডিএফ একাধিক বিবৃতিতে দাবি করে সংস্কারবাদী জেএসএস নেতা (পেলেসুদর্শনঅংশুমান চক্র) খুন, গুম, অপহরণ, চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। তারা ইউপিডিএফ নেতা মিঠুন চাকমাসহ এ পর্যন্ত কমপক্ষে ১৬ জন ইউপিডিএফ’র নেতাকর্মী, সমর্থককে খুন করে। তবে মিঠুন চাকমা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ছিল ইউপিডিএফ (প্রসীত) জন্য একটি বড় ধাক্কা। খাগড়াছড়ি জেলা সদরের নিজ বাড়ির সামনে থেকে তুলে নিয়ে খুন করা মিঠুন চাকমাকে। এই ঘটনার এক মাস বিরতি আবারো খুন এই ইউপিডিএফ কর্মী। ১৭ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ি জেলা সদরের রাঙাপানি ছড়ায় দীলিপ চাকমা খুন হন। এই ঘটনার তিন পর জেলার দীঘিনালা উপজেলার জামতলীকে গুলি করে সাইন চাকমা সুপারা নামে এক ইউপিডিএফ(প্রসীত) কর্মীকে হত্যা করা হয়। পরের মাসে খাগড়াছড়ি সীমান্তবর্তী উপজেলা বাঘাইছড়িতে নতুন মনি চাকমা নামে এক কর্মী মারা যায়। প্রতিপক্ষের গুলিতে তার মৃত্যু হয়। এছাড়া খাগড়াছড়ি জেলা সদরে এপ্রিল মাসে সূর্য বিকাশ চাকমা(৪৫) নামে এক সমাজ কর্মী মারা যায়। তার মৃত্যুর প্রতিবাদে খাগড়াছড়িতে বিক্ষোভ মিছিল করে ইউপিডিএফ। একই সপ্তাহের খাগড়াছড়ির পানছড়িতে খুন হন ইউপিডিএফ সংগঠক নতুন কুমার ত্রিপুরা (৪০)। ২২ মে খাগড়াছড়ির দীঘিনালার ইউনাইটেড পিপল্‌স ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এর সাবেক কর্মী নিহত হয়েছে। নিহতের নাম উজ্জ্বল কান্তি চাকমা ওরফে মার্শাল (৫৫)

খাগড়াছড়ি থেকে দীঘিনালায় নিজ বাড়িতে ফেরার পথে জেরান চাকমাকে অপহরণ করে দুবৃর্ত্তরা। আজো খোঁজ মেলেনি তার। ইউপিডিএফ নেতা মাইকেল চাকমা জানান, গুম করার পর জেরানকে খুন করা হয়। এদিকে ২৮ মে রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে সঞ্জীব চাকমা (৩০), অতল চাকমা (৩০) ও স্মৃতি চাকমা (৫০)কে ব্রাশ ফায়ার করে খুন করা হয়। এছাড়া একাধিক ঘটনায় নানিয়াচর, বাঘাইছড়ি ও পানছড়িতে কিরণ চাকমা, জনি তঞ্চঙ্গ্যা ও সুনীল বিকাশ চাকমা নামে তিন ইউপিডিএফ কর্মী মারা যায়। সকল হত্যাকাণ্ডের পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিজেএসএস-(এম এন লারমা) ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)কে দায়ী করেছে প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ। তবে সকল অভিযোগ অস্বাকীর করে জেএসএস (এমএন লারমা) কেন্দ্রীয় তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সুধাকর ত্রিপুরা জানান, ইউপিডিএফ এর আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণেই এসব হত্যাকান্ড ঘটেছে।

নয় মাসে একাধিক হামলাপাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলায় জেএসএস(এমএন লারমা) এর র্শীষ ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) দলীয় প্রধানসহ ১১ জন মারা যায়। ৩ মে রাঙামাটির নানিয়াচর উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেএসএস (এমএন লারমা) কেন্দ্রীয় সহসভাপতি শক্তিমান চাকমা খুন হন। শক্তিমান চাকমা ছিল দলটির অন্যতম প্রধান নেতা। শক্তি চাকমার নেতৃত্বে রাঙামাটির নানিয়াচরে জেএসএস(এমএন লারমা) এর প্রভাব বলয় গড়ে উঠে। প্রতিষ্ঠার মাত্র ৬ মাসের মাথায় দলীয় প্রধানকে হারিয়ে অস্তিৃত্বের সংকটে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)। নানিয়াচর উপজেলার চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে দুবৃর্ত্তদের গুলিতে নিহত হয় ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক আহ্বায়ক তপন জ্যোতি চাকমা (বর্মা)। এসময় আরো চারজন নিহত হয়। এছাড়া জুন ও জুলাই মাসে সুরেশ বিকাশ চাকমা, জঙ্গলী চাকমা, পঞ্চানন চাকমা ও বিজয় কুমার চাকমা, শান্তি রঞ্জন চাকমা নামে এক জেএসএস কর্মীকে গুলি ও জবাই করে হত্যা করে। হত্যাকাণ্ডের জন্য ইউপিডিএফ (প্রসীত)কে দায়ী করেছিল জেএসএস (এমএন লারমা)। তবে এসব ঘটনায় নিজের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করে প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ।

ইউপিডিএফ এর কেন্দ্রীয় সংগঠক মাইকেল চাকমা মুঠোফোনে জানান, স্বনির্ভরের প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনা অত্যন্ত পরিকল্পিত। ইউপিডিএফ নেতা মিঠুন চাকমাকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে ঠিক একই কায়দায় সন্ত্রাসীরা আজকের এই হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে। তবে হামলার ঘটনায় নিজেদের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) ও জেএসএস (এমএন লারমা)

x