ফানি ফণী

দেবাশীষ বল

মঙ্গলবার , ১১ জুন, ২০১৯ at ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ
50

ঘন্টাখানেক আগেও দুপুরটাকে পানসে বলা যেত কিন্তু এখন কোনভাবে তাকে আর পানসে বলা যাবে না কারণ কিছুক্ষণ আগেই বৃষ্টির ‘এই হবো হবো’ টাইপ যে কোষ্ঠকাঠিন্যটা ছিল সেটা আমাশয়ে রূপ নিয়ে বার আউলিয়ার এই চাটগাঁ শহরটাকে ধুয়ে মুছে সাফ করার মিশনে নেমেছে।
এ ধরনের দুপুরগুলো বেশ ইন্টারেস্টিং হয়। অন্তত ভাব বিলাসী বাঙালিদের জন্য তো অবশ্যই। এমন দুপুরে মুখ গোমড়া করে রাখা আকাশটার দিকে তাকিয়ে থাকার মধ্যে কোথায় যেন একটা মজা আছে। বাঙালি এমন দুপুরে জানলার ফাঁক দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস খেতে খেতে বৃষ্টি দেখে আর ভাবে জল পড়ছে পাতা নড়ছে, রোদ মুখ লুকিয়েছে আর মেঘের বাচ্চারা ডেকেই চলেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। সব মিলিয়ে বেশ একটা কবি কবি ভাব। আমারও তেমনি একটা কবি কবি ভাবের ভূত চেপেছে মাথায়। চিনি ছাড়া চা-টায় ছোট করে চুমুক দিতে দিতে ভাবছিলাম এই যে লোকে বলে এ দেশে কাকের চেয়ে কবির সংখ্যা বেশি তাতে মূল দোষ কবিদের নয়, আবহাওয়ারও হাত আছে আর খানিকটা আছে ব্যর্থ প্রেমের অজুহাত।
যাই হোক, আমিও বাকি সবার মত জানলার বাইরে মুখ বের করে চারদিকটা দেখছিলাম। মোবাইল আর ল্যাপটপ স্ক্রিন আমাদের এমনিতেই বাইরের দুনিয়ার দিকে ভালো করে তাকাবার সুযোগ দেয় না তাই বৃষ্টির উছিলায় আজকের এই ‘এসো প্রকৃতি দেখি’ কর্মসূচি বেশ ভালোই লাগছে এবং তাতে যে লাভ হয়েছে সেটা অস্বীকার করার কোন জো নেই। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা টুকরো টুকরো মজাগুলো দেখতে পেলাম ।
ঝড়ো বাতাসটা শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত ইলেকট্রিকের তারগুলোতে দুটো কাককে পাশাপাশি বসে থাকতে দেখলাম। কি নিয়ে গল্প করছে কে জানে তবে ওদের ফ্যাকাসে চোখে কোথায় যেন একটা মুক্তির আনন্দ আছে যেটা আমাদের মত গৃহবাসীদের আপাত উজ্জ্বল চোখে অনুপস্থিত। সিম্বলিজম এর কি অসাধারণ এক উৎসব! নিজেকে আধুনিক দাবি করা আপাত সভ্য শিক্ষিত এই আমি বসে আছি জানলার ভেতরে, চার দেয়ালের মাঝখানে, আর দৃষ্টি দিয়ে বাইরেটার মজা নিচ্ছি ওদিকে ভিজে যাওয়ার চিন্তাকে থোরাই কেয়ার করে আপন মনে আমার দিকে না তাকিয়ে কাক দুটো হয়তো মনে মনে গেয়ে চলছে যেখানে খুশি উড়ে যাওয়ার গান ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা…’
স্কুল ফেরত একটা ছোট্ট বাচ্চা ওর নিজের চেয়ে দেড় গুণ ওজনের একটা ব্যাগ নিয়ে আস্তে আস্তে ঘরে ফিরছে। কতই বা বয়স হবে ওর ছয়, বড়জোর সাত। হায়রে শিক্ষা ব্যবস্থা! ছোটবেলায় পড়েছিলাম জাপানে নাকি ছোটবেলা থেকেই পায়ে লোহার জুতো পরানো হতো যেন বড়বেলাতেও পা ছোটই থাকে। আজকালকার স্কুল পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের বইয়ের সংখ্যা আর সিলেবাসের বহর দেখে জাপানী প্রথাটার কথা মনে পড়ে যায়। পার্থক্য শুধু এটাই যে এদেশে পায়ের বদলে লোহার খোলসটুকু পরানো হয় মগজে যাতে ভালো রেজাল্ট, এ-প্লাস, এ-স্টার এসব সুন্দর সুন্দর শব্দগুলোর পরিমণ্ডল থেকে বেরিয়ে প্রকৃত শিক্ষার বিরাট উন্মুক্ত আকাশে সে নজর দিতে না পারে।
একজন মাঝবয়সী মা তার মেয়েকে নিয়ে স্কুল থেকে গল্প করতে করতে ফিরছিলেন। এমন সময় বৃষ্টির বাগড়া। কিন্তু বাকিদের মতো বৃষ্টির ছাঁট থেকে বাঁচতে দৌড়ে কোন একটা বিল্ডিংয়ের নিচে না গিয়ে মা-মেয়ে দুজনেই পায়ের জুতোগুলো হাতে নিয়ে একজন আরেকজনের হাত ধরে হাসতে হাসতে আবার হাঁটা ধরলো। আমার অনভ্যস্ত শহুরে চোখে ব্যাপারটা দারুণ লাগলো। বৃষ্টিতে মা-মেয়ের এই মজা করা দেখে ঘরে ফুলবাবুটি হয়ে বসে থাকা এই আমি কেন যেন খুশি হয়ে উঠলাম। আমার মেয়েটা বড় হলে আমিও…
বছর দশেক ধরেই দেখছি ঝড়টড় নিয়ে বেশ একটা হৈ চৈ পড়ে যায় ফেসবুক থেকে শুরু করে সব ধরনের মিডিয়াগুলোতে আর সেখানে ঝড়ের সম্ভাব্য তীব্রতার সাথে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ঢেলে তাতে তিন চিমটি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ মিশিয়ে বেশ উপাদেয় ও উত্তেজক একটা এনার্জি ড্রিংক তৈরি করে তা পরিবেশন করা হয় আমাদের কাছে। আমরাও বেশ একটু ভয় আর অদ্ভুত পুলক নিয়ে অপেক্ষা করি ঝড় মহাশয়ের। মহাশয় বলছি কারণ ঝড়ের নামগুলোতে বেশ একটা পুরুষ পুরুষ গন্ধ আছে। ওই যে যাকে নিয়ে সেবার বেশ আলোচনা হলো সেই ‘মহাসেন’ থেকে শুরু করে আজকের ফণিভূষণ, সবার নামে বেশ পৌরুষ থাকলেও বাংলাদেশে আসলেই তাদের মধ্যে পৌরুষের বড্ড অভাব দেখা দেয়। বাংলাদেশকে বোধহয় এরাও ভয় পায়!
মহাসেন -ফণিভূষণরা যেন চেহারায় বাহুবলি আর শরীরে টেলি সামাদ! ঝড়েদের কান থাকলে নিশ্চিত শুনতে পেতো লাখখানেক শহুরে বাসিন্দার ‘এঙাইটিং ওয়েদার শো’ দেখার সুযোগ পণ্ড হওয়ার দীর্ঘশ্বাস। এমন সব মাজা ভাঙা, হওয়ার কথা দিয়েও না হওয়া ঝড়গুলোকে ভেবেই রবি ঠাকুর ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ লিখেছিলেন কিনা কে জানে!
এই যে আসবো, হবো, উড়িয়ে নিয়ে যাবো ভাব করে শেষে পিছু হটা এটা বড় অদ্ভুত। নামগুলো পুরুষবাচক না হয়ে নারীবাচক হলে ডাক্তারি ভাষায় এই আচরণকে সম্ভবত ‘ফলস লেবার পেইন’ বলা যেতে পারতো! কিন্তু ঝড়ের নামগুলো অধিকাংশই পুরুষবাচক। তাহলে একে কি বলবো? ধ্বজভঙ্গ?
যাক গে। এমন আবহাওয়ায় ডাক্তারি আমার পোষাবে না।
জানালার ভেতর থেকে উঁকি দিয়ে বাইরেটা দেখতে গিয়ে অনেক সময় অনেক কিছু দেখতে না চাইলেও দেখা হয়ে যায়। তেমনই একটা ঘটনা দেখলাম হাতখানেক দূরের বিল্ডিংটার নিচে। জায়গাটা অনেকটা ফাঁকা অনেক বছর ধরে, সেখানে টিনের ঘর বানিয়ে কেয়ারটেকারকে থাকতে দেয়া হয়েছে। দেখলাম এই বৃষ্টির মধ্যে একটু স্নান করার লোভটা সামলাতে না পেরে ভদ্রলোক ঘরের ভেতর থেকে একটা সাবান নিয়ে এলেন। এদ্দুর পর্যন্ত ঠিকই ছিল, ঝামেলাটা শুরু হল তখনই যখন নিজের গায়ে বড়োসড়ো সাবানটা ঘষতে ঘষতে তিনি দুহাতসমেত দুই উরুসন্ধিস্থ মধ্যপ্রদেশে এন্ট্রি নিলেন। রানের জন্য এলোপাথাড়ি ব্যাট চালানো আমাদের রুবেল হোসেনের মতো কেয়ারটেকার মহাশয়ও দেখলাম সমানে মধ্যপ্রদেশের কেয়ার টেক করছেন। আসলে উনাকে খুব একটা দোষ দেয়া যায় না, যা গরম পড়েছে আর তাতে যা ঘাম বের হচ্ছে মধ্যপ্রদেশে শৈবালে শৈবালে সংঘাতটা খুব একটা অস্বাভাবিক না। আটপৌরে বাঙালির জন্য লাকি মলম অপরিহার্য তা নিয়ে আমার আর কোন সন্দেহ রইল না।
এমন সময় রাস্তায় উদয় হলো পিডিবি-র সেই লক্করঝক্কর গাড়িটা। গত ছ’মাস ধরে একই একটা লোককে গাড়ির ওপর মই ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। আজও দেখলাম টাকমাথা ভদ্রলোকের হাতে একটা বাঁশের মই। লোকটার নাম মইনুল হলে মানাতো ভালো!
খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আর কিছু দেখার আগেই মান্ধাতা আমলের গাড়িটা ভরা মাসের পোয়াতি বেড়ালের মতো অনেক কষ্টে হেলেদুলে দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেলো।
ফণীর দেখা না পাওয়ার হতাশা নিয়ে এবার বাইরের মহল থেকে মনোযোগ ফিরিয়ে অন্দরমহলে নজর দিয়ে দেখি ড্রয়িং রুমের স্যামসাং টেলিভিশনটার ভেতর থেকে হাজারটা অভিযোগ ছুঁড়ছে জি বাংলার সিরিয়াল (কিলার?) এর মাসিমা ও বৌদিরা। তাতে দেখাচ্ছে কয়েকজন মহিলা মিলে নিষ্ঠার সাথে চঘচঈ-র (পরনিন্দা-পরচর্চা) ওপর পোস্ট ডক্টরেটটা সেরে নিচ্ছেন। এসব টিভি প্রোগ্রামের ডাই-হার্ড দর্শক ও মেকার (যাদের আমি সিরিয়াল কিলার বলি) এই উভয় প্রকার মনুষ্যপ্রাণীরা যে মগজ বিতরণের সময় লাইনের শেষে ছিলেন এবং শেষ দিকে যে স্টকে খানিকটা টান পড়েছিলো তাতে আমার কোন সন্দেহ নেই।
এই দেখুন, আমিও পরনিন্দা শুরু করেছি!
আসলে পরনিন্দা-পরচর্চা জিনিসটাই মারাত্মক ইন্টারেস্টিং। আমরা যে-সময়ে সময়ে পরনিন্দা-পরচর্চার লেজটা দিয়ে আরেকজনের কানটা চুল্কে দেই তাতে যে অসম্ভব আনন্দ আছে তার সাথে তুলনীয় কিছু বিরল। পিএনপিসি ছাড়া আড্ডা কখনো জমেনি,জমে না, জমবেও না। ভালো করে খেয়াল করে দেখেছি বাঙালি দুটো আসবাবপত্রের ওপর সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে এবং এই দুটো জায়গাতেই তারা সবচেয়ে ভালো ‘অগ্রজ অনুভূতি’ পায়। (অর্গাজমকে ভদ্র ভাষায় অগ্রজ অনুভূতি বলছি)। আসবাব দুটোর একটা বিছানা, আরেকটা চায়ের টেবিল। প্রথমটাতে তাকে চরম পুলক দেয় টি-টুয়েন্টি যৌনতা আর পরেরটাতে সে ক্লাইমেঙ পায় পরচর্চায়। পিএনপিসি-র এমনি মহিমা!
বাইরের আবহাওয়া দেখে বুঝতে পারছি ক্ষণজীবী ফণি আর ক্ষণেই নেই, তার ব্যালেন্স এখন শুন্য এই !
বিঃদ্রঃ আলোচনাটা তুফান থেকে শুরু হয়ে পরচর্চায় গিয়ে ঠেকেছে দেখে কতোজন নাক সিটকাচ্ছে হু NOPSE ! ]

x