ফাদার মারিনো রিগন বাংলার বন্ধু

রেজাউল করিম

বুধবার , ৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ
14

লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে এসেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালে কিছু ‘কুলাঙ্গার’ ছাড়া সবাই স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে যার যা কিছু আছে তা নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা/ তোমাকে পাওয়ার জন্য/ আর কতবার ভাসতে হবে রক্ত গঙ্গায়/ আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন’। আর বাংলার স্বাধীনতাকে আরো বেগবান করেছে ভিনদেশী অনেক নাগরিক। পণ্ডিত রবিশঙ্কর, জর্জ হ্যারিসন, আঁন্দ্রে মলেরো, গিন্সবার্গ, বব ডিলান, অ্যারিক ক্যাপটন, ওডারল্যান্ড এবং আরো অনেকে।
ফাদার মারিনো রিগন বাংলাদেশকে ভালোবেসেছিলেন মনে-প্রাণে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে অনেক বিদেশি নিজ দেশে চলে যান, ভয়ে-আতঙ্কে। কিন্তু ফাদার মারিনো রিগন বাঙালির পাশে দাঁড়ান। একাত্তরে তিনি গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের বানিয়াচর ক্যাথলিক মিশনের প্রধান পুরোহিত ছিলেন। হিন্দু-মুসলিম সবাই তখন ছুটছিল আশ্রয়ের খোঁজে। ফাদার রিগন এসব অসহায় মানুষকে আশ্রয় দেওয়া নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে নেন। এমনকি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দিতে গির্জায় গোপন চিকিৎসাকেন্দ্র খোলেন। নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন বাঙালির স্বাধিকার আদায়ের সংগ্রামের সাথে।
ইতালির নাগরিক ফাদার মারিনা রিগন ১৯২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ভেনিসের ভিল্লাভেরলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৩ সালে ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে চলে আসেন। ঘুরেছেন বাংলার পথে-প্রান্তরে। মেঠোপথ ধরে। কিন্তু স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন বাগেরহাটের মোংলায়। ২০১৪ সালে অসুস্থ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত শুধু মুক্তিযুদ্ধ নয়, দারিদ্রবিমোচন, শিক্ষা বিস্তারসহ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রেখে গেছেন। ২০১৭ সালের ২০ অক্টোবর ৯২ বছর বয়সে এই বীর সেনানীর জীবনাবসান ঘটে। তিনি বাংলাদেশকে মা মনে করেছিলেন, ভালোবেসেছেন। আর শেষ ইচ্ছা ছিল তাঁর সমাধি যেন হয় জীবনানন্দের রূপসী বাংলায়। স্বাধীনতা পক্ষের সরকারের ঐকান্তিক চেষ্টায় রিগানের শেষ ইচ্ছা পূরণ হয়। এক বছর পর গত ২১ অক্টোবর মোংলার মেলবুনিয়া গ্রামে তাঁরই হাতেগড়া সেন্ট পলস গির্জার পাশে সমাহিত করা হয়। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো হয়।
মুক্তিযুদ্ধে তিনি জড়িয়ে পড়েন বাংলাকে ভালোবেসে। পঞ্চাশের মধ্য গগনে কাজের সুবিধার্থে বাংলা শিখতে গিয়ে বাংলাসাহিত্যের প্রেমে পড়ে যান। রিগনের হাত দিয়ে ইতালিয়ান ভাষায় অনূদিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলিসহ অনেক কাব্যগ্রন্থ, লালনের একাধিক গান, জসীম উদ্‌দীনের নক্‌শি কাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট, শরৎচন্দ্রের পণ্ডিত মশাই, চন্দ্রনাথ ইত্যাদি। ইতালীয় নন্দিত রূপকথা পিনোকিও অনুবাদ করেছেন বাংলায়। ফাদার রিগন ধর্মপ্রচারের উদ্দেশে বাংলায় এসে প্রেমে পড়ে যান এর রূপ-প্রকৃতিতে। মোংলায় সেন্ট পলস উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় নিজে মাথায় করে ইট বয়েছেন। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে তাঁর সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। হাজার হাজার গরিব শিক্ষার্থীর জন্য স্পন্সরশিপ প্রোগ্রাম তো ছিলই।
পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ যদ্দিন থাকবে, তদ্দিন বাঙালি ফাদার মারিনো রিগনকে স্মরণ করবে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য। ফাদারকে লাল সালাম। তারা এগিয়ে এসেছিল বলেই তো বাংলার বিজয় ত্বরান্বিত হয়। আমরা তোমাদের ভুলব না।

x