ফাইব্রয়েড টিউমার মা হওয়ার পথে অন্তরায়

ডা. প্রধীর রঞ্জন নাথ

শনিবার , ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ at ৬:৫৯ পূর্বাহ্ণ
918

নারীদের প্রজননক্ষম বয়সে জরায়ুতে সবচেয়ে বেশি যে টিউমারটি হয়ে থাকে তার নাম ফাইব্রয়েড বা মায়োমা। এটি নারীদেহে মাতৃত্ব ধারনের অন্যতম শত্রু। তাই এ রোগটির ব্যাপারে সতর্ক থাকা ভালো। খুব নীরবে ও সন্তর্পনে বিভিন্ন আকৃতিতে নারীদেহে এটি বেড়ে ওঠে। পরিসংখ্যান বলেছে, প্রতি পাঁচজনের মধ্যে অন্তত একজনের শরীরে অসুস্থতা দেখা যায়। শতাংশের বিচারে ২৫ শতাংশ নারীদেহে ফাইব্রয়েড থাকতে পারে।

ফাইব্রয়েড কি : ফাইব্রয়েড বলতে মূলত গোলাকার এবং ক্যানসারবিহীন টিউমার বোঝায়। এগুলি তৈরি হয় পেশি এবং সংযোজক কলা (কানেকটিভ টিস্যু) দিয়ে আর সবচেয়ে বেশি হয় মেয়েদের জরায়ু বা ইউটেরাসে। নারীদের তলপেটের যে সব অসুখ হয় তার মধ্যে এই ফাইব্রয়েড অন্যতম। ফাইব্রয়েডকে মায়োমা, লিও মায়োমা বা ফাইব্রোমায়োমাও বলে। ফাইব্রয়েড যেমন একটি মাত্রও হতে পারে, তেমনই একসঙ্গে অনেকগুলোও হয়। খুবই অল্পসংখ্যক ক্ষেত্রে ফাইব্রয়েড জরায়ুর বাইরে যেমন পার্শ্বস্থ লিগামেন্ট বা প্রসবদ্বারের অভ্যন্তরে হতে পারে।

ফাইব্রয়েডের কারণ : ফাইব্রয়েড মৌলিক পেশি কোষগুলোর প্রভূত সংখ্যাবৃদ্ধির ফলে তৈরি হয়। এগুলো আকারে যত বড় হয় ততই তাতে তন্তু মিশে যায়। ফাইব্রয়েড শুরু হয় অপূর্ণ পেশি (মাস্‌ল) কোষ থেকে, আর এর বীজ সুপ্ত থাকে জরায়ুর একেবারে আভ্যন্তরীন স্তরের অব্যবহিত বাইরের স্তর অর্থাৎ মায়োমেটরিয়ামে। ফাইব্রয়েডগুলো বেড়ে ওঠার জন্য ইস্ট্রোজেন হরমোনের ওপর নির্ভরশীল। এই কারণে বয়ঃসন্ধির আগে ফাইব্রয়েড হতে দেখা যায় না এবং মেনোপজের পর ফাইব্রয়েড (সাধারণত) থাকলেও আর বাড়ে না। মেনোপজের পর নতুন করে আর ফাইব্রয়েডে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। ফাইব্রয়েডে আক্রান্ত নারীর গর্ভাবস্থায় ফাইব্রয়েড খুব তাড়াতাড়ি বাড়ে। ফাইব্রয়েডের সঙ্গে সঙ্গে অনেক সময় ইস্ট্রোজেন বৃদ্ধিজনিত উপগর্গ যেমন অ্যানভিউলেশন (ডিম্বানু বার না হওয়া) বা এন্ডোমেটরিয়াল পুলিশ (জরায়ুর একদম ভেতরের স্তরে টিউমার) বা জরায়ুর একেবারে ভেতরের আস্তরণ বা এন্ডোমেটরিয়াল পুরু হয়ে গিয়ে কোনও উপসর্গ সৃষ্টি করতে পারে।

ফাইব্রয়েড কোন বয়সে হয় : যে বয়সে সাধারণত নারীরা সন্তানধারন করেন সেটাই ফাইব্রয়েডে আক্রান্ত হবার বয়স, তবে ফাইব্রয়েডের উপসর্গগুলোর সবচেয়ে বেশি প্রকাশ ঘটে ৩০ থেকে ৪০ বছরের নারীদের মধ্যে। সে সমস্ত নারী গর্ভধারণে অক্ষম, যাদের ছেলেমেয়ে হয়নি (যেমন অবিবাহিতা) বা যাদের সন্তান সংখ্যা খুব কম দেখা গেছে তাদের ফাইব্রয়েড বেশি হয়। আবার যাদের অনেকগুলো সন্তান সন্ততি, তাদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ কম।

ইহার উপসর্গ ও লক্ষণ : সবচেয়ে বেশি যে উপসর্গ দেখা যায় তা হল পিরিয়ডের সময় অতিরিক্ত ও অত্যধিক রক্তস্রাব অথবা পিরিয়ড একভাবে অনেকদিন ধরে হয়ে যাওয়া। বেশ কয়েক মাস এ রকম হতে হতে অ্যানিমিয়া দেখা দেয়। পিরিয়ডের সময় পেটে ব্যথা অনুভূত হতে পারে। অনেক সময় এমন হয় যে বহু বছর পিরিয়ডের সময় কোনও পেট ব্যথা হত না, হঠাৎ এক মাস ব্যথা শুরু হল। রোগী নিজেই তলপেটে একটা ডেলা বা পিন্ড অনুভব করতে পারেন, তবে সেটা অবশ্য হয় ফাইব্রয়েড আকারে ও আয়তনে যথেষ্ট বড় হবার পর। এর মাপ নির্ধারণ করা হয় গর্ভাবস্থায় জরায়ু যে সময়ে যতটা স্ফীত হয় সেই ভিত্তিতে। ১৪ সপ্তাহ গর্ভধারণের সময় জরায়ুর যে মাপ তার চেয়ে টিউমারটি বড় হলে তবেই রোগী নিজে তলপেটে ভার অনুভব করতে পারবে। পঁচিশত্রিশ শতাংশ নারীর ক্ষেত্রে, ফাইব্রয়েডের একমাত্র উপসর্গ হিসেবে দেখা দিতে পারে বন্ধ্যাত্ব। ফাইব্রয়েড যত বড় হয় ততই তলপেটে ভার অনুভূত হয় এবং এই টিউমার আশপাশের চাপ দিয়ে নানা অসুবিধা সৃষ্টি করতে পারে। যেমন মূত্রথলিতে চাপ পড়লে বার বার প্রস্রাব পায়। ফাইব্রয়েডে ব্যথা সে রকম হয় না যদি না টিউমারটির ক্ষয় শুরু অথবা ডাঁটিযুক্ত ফাইব্রয়েডের ডাঁটি যদি পেঁচিয়ে না যায়। তলপেটে টিপে দেখলে অনিয়মিত, অসমতল আবের মতো টিউমার চিকিৎসক অনুভব করতে পারেন। জরায়ুর আকারও পরিবর্তিত মনে হতে পারে।

জটিলতা : ফাইব্রয়েড খুবই অল্পসংখ্যক ক্ষেত্রে (.৫ শতাংশেরও কম) ক্যানসার বা সারকোমায় পরিবর্তিত হতে পারে। কোনও কারণে ফাইব্রয়েডে যদি রক্ত সঞ্চালনে বিঘ্ন ঘটে তা হলে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে সংক্রামিত হওয়া সম্ভব। তবে তারও চিকিৎসা আছে। ফাইব্রয়েডের ওপর সন্তান সম্ভাবনা ঘটলে গর্ভপাতের আশংকা বেড়ে যায়। এছাড়া শিশু সময়ের আগেই ছোট ভূমিষ্ঠ হতে পারে, মাতৃগর্ভে শিশুর অবস্থান উল্টোও হতে পারে। এই সময় শরীরে ইস্ট্রোজেন বাড়ার কারণে ফাইব্রয়েডও বাড়ে, ব্যথাও হতে পারে।

রোগ নির্ণয় : ফাইব্রয়েড নিশ্চিতভাবে নির্ণয় করার ক্ষেত্রে আলট্রাসনোগ্রাম এক নতুন দিগন্ত এনে দিয়েছে। এতে রোগীকে কোনও কাঁটা ছেঁড়া করতে হয় না। এমনকি একটা ছুঁচও ফোটাতে হয় না। ইহার সাহায্যে রোগ নির্ণয় সম্ভব।

গর্ভাবস্থায় ফাইব্রয়েড : খুব ছোট ফাইব্রয়েড যদি কোনও শারীরিক অসুবিধা না সৃষ্টি করে। তা হলে তার তেমন কোনও চিকিৎসার দরকার হয় না। যদি ফাইব্রয়েড খুব তাড়াতাড়ি বেড়ে যায়।

গর্ভাবস্থা ও ফাইব্রয়েড : ফাইব্রয়েডের ওপর সন্তান সম্ভাবনা ঘটলে গর্ভপাতের গর্ভপাতের আশঙ্কা বেড়ে যায়। এছাড়া শিশু সময়ের আগেই ছোট ভুমিষ্ঠ হতে পারে। মাতৃগর্ভে শিশুর অবস্থান উল্টোও হতে পারে এই সময় শরীরে ইস্ট্রোজেন বাড়ার কারণে ফাইব্রয়েডেও বাড়ে, ব্যথাও হতে পারে। এই সময় অপারেশন করা হয় না, যদি না তেমন অসহনীয় যন্ত্র ও জটিলতার সৃষ্টি হয়। সন্তানের জন্মের পর ফাইব্রয়েড আপনার আপনি অনেক কমে যায়।

হোমিওপ্যাথিক প্রতিবিধান : ফাইব্রয়েড টিউমার নিরাময়ে হোমিওপ্যাথিতে পূর্ণাঙ্গ কেসহিস্ট্রির মাধ্যমে এর বিহীন বিধান করা সম্ভব। যেমন ১) ব্রোমি ২) ক্যালকেরিয়া কার্ব্ব ৩) হাইড্রাস ৪) অরম ৫) বিউফো ৬) কোনিয়াম ৭) ল্যাপিস অল্‌বা ৮) সাইলিসিয়া ৯) মার্কবিনআয়োড ১০) মার্কআয়োড ১১) থাইরয়ডিন ১২) অষ্টিলেগো ১৩) থুজা সহ লক্ষণভেদে আরোও যুগান্তকারী ওষুধ হোমিওপ্যাথিতে আছে। তাই নিজে নিজের ওষুধ খাবেন না। তাতে হিতে বিপরীতে হতে পারে। চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থেকে ওষুধ সেবন করা উচিত।

x