পয়লা বৈশাখের ইতিকথা

শতদল বড়ুয়া

রবিবার , ১৪ এপ্রিল, ২০১৯ at ৭:২৪ পূর্বাহ্ণ
81

প্রতিবছর আমরা বরণ করি একটি নতুন বাংলা বছরকে। পুরানো বাংলা সনের বিদায় এবং নতুন সন বরণ করি আমরা বাঙালিরা নানা আয়োজন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে।
এই বাংলা সনের পিছনে কতকগুলো না জানা কাহিনী রয়েছে। বাংলাদেশের পয়লা বৈশাখ বা নববর্ষ বাঙালি জাতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। নববর্ষ উৎসব একটি জাতীয় উৎসব। এ উৎসব জাতি-ধর্ম-শ্রেণী নির্বিশেষে সমস্ত বাঙালির জাতীয় মহোৎসব।
পয়লা বৈশাখ বা নববর্ষ উপলক্ষে যে সব স্মৃতি বিজড়িত তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো : পুরাতন বছরে পাওয়া না পাওয়ার হিসাব চুকিয়ে নতুন আশায় পসরা সাজিয়ে নতুন বছরে পর্দাপণ। বছর মানুষের সৃষ্টি। পৃথিবীর সব সভ্য দেশেই নিজস্ব অব্দ বা বর্ষ গণনার রীতি প্রচলিত আছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। আমাদের দেশের নিজস্ব অব্দ হলো “বঙ্গাব্দ” বা বাংলা সন। ইতিহাস পর্যালোচনায় জানতে পারি, আমাদের দেশে বর্ষ আরম্ভ হতো অগ্রহায়ণ মাস থেকে। রাজস্ব আদায় ও ঋণ পরিশোধের জন্য এ মাস ছিলো যথার্থ সময়। কালের গতি পরিবর্তনশীল। ক্রমান্বয়ে অগ্রহায়ণের পরিবর্তে বৈশাখ থেকে বর্ষ গণনা শুরু হলো। বাংলা সন প্রচলনের পিছনে দু’জন মুসলমান সম্রাটের নাম জড়িত। সে সময় সৌর বছরও মুসলমানদের হিজরী সনের অর্থাৎ চান্দ্র বছরের সমন্বয়ে বাংলার সুলতান হোসন শাহের প্রচেষ্টায় বাংলা সন চালু হয়। ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দের কিছু সময়ের মধ্যে বাংলা সনের সূচনা হয় বলে ধারণা করা হয়। বাংলা সনের প্রবর্তক হিসাবে আবার অনেকে সম্রাট আকবরের নামও উল্লেখ করেন।
তাঁদের মতে হিজরী সন থেকে দশদিন কম ধরে আকবর বাংলা সন প্রবর্তন করেন। এটাকে কেউ কেউ সমর্থন করেন না। তারা বলতে চায়, বাঙালি সত্তার গোড়াপত্তন ঘটে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজাদের আমলে। বাংলা সন সুলতান হোসেন শাহের আমলে প্রথম প্রচলিত হলেও আকবরের আমলে এটি একটি সর্ব ভারতীয় সমসমূহের অন্যতম সন হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। বছরের প্রথম দিনটি প্রতিদিনের মতো একটা দিন। কিন্তু তবু কোথায় যেনো এর মধ্যে একটা অপূর্ণতা রয়েছে। আমরা সহজ-সরল বাঙালিরা বিশ্বাস করি বছরের প্রথম দিনটি যেমন যাবে, সারা বছরই তেমন যাবে। তাই বছরের প্রথম দিনে স্বতঃস্ফূর্ত থেকে অনাবিল আনন্দে দিনযাপন করতে চায় ধনী-দরিদ্র সকলেই।
পয়লা বৈশাখে সবচেয়ে বেশি দৃষ্টিকাড়ে “হাল খাতা” উৎসব। নানা বৈচিত্র্যে সজ্জিত করা হয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। পূত-পবিত্র মনে “হাল-খাতাঃ মহরৎ করা হয়। জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সকলেই এই উৎসবে যোগদান করে ব্যবসায় সফলতা কামনায় একাগ্রচিত্তে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করে থাকেন।
নববর্ষের পূণ্য দিনে গৃহস্থরাও নানাবিধ অনুষ্ঠান পালন করে থাকেন। কোথাও কোথাও হাল-চালনা উৎসব হয় এদিনই। সারা বৈশাখ মাস ধরেই কোন না কোন অনুষ্ঠান চলে বিভিন্ন জায়গায়। চট্টগ্রাম জেলায় বলীখেলা, “আমানী” খাওয়া, ঢাকা ও কুমিল্লা জেলায় গরুর দৌড়, রাজশাহী ও মালদহতে গম্ভীরা অনুষ্ঠান মহাসমারোহে শুরু হয়।
তৎকালীন পাকিস্তান আমলে যারা বাঙালি জাতীয়তাবাদ বা সংস্কৃতির কথা বলতেন তাদেরকে পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীরা দেশের শত্রু হিসেবে নেক নজরে দেখতো। এক কথায় বলতে গেলে পয়লা বৈশাখ উদযাপনে বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হতে হতো। বাঙালি চেতনার অনুষ্ঠান পয়লা বৈশাখ বা পঁচিশে বৈশাখ আসলে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীরা আতংকিত থাকতো।
শেষ পর্যন্ত পয়লা বৈশাখ ও রবীন্দ্রজয়ন্তী একটা অপরাধমূলক ব্যাপার হিসেবে তাদের নিকট পরিগণিত হয়েছিলো। তখনকার দিনে পূর্ববঙ্গে পয়লা বৈশাখ ছুটি থাকতো না। কিন্তু পয়লা জানুয়ারি ছুটি থাকতো। আজ কিন্তু আমরা সেই নিপীড়ন থেকে মুক্ত।
এইতো গেলো পয়লা বৈশাখের ইতিকথা। এর পাশাপাশি বাংলা সংস্কৃতির ঐতিহ্য বৈশাখী মেলারও রয়েছে নানা কথোপকথন। আমাদের দেশে আবহমানকাল থেকে বৈশাখী মেলা চলে আসছে। ইতিহাসেও কিন্তু এ মেলার সঠিক নিরূপণ নেই। কোথায় এই মেলা সর্বপ্রথম শুরু হয়, উৎস কোথায় তা অদ্যাবধি অস্পষ্ট। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই মেলা বসে। আরব দেশে ওকাজ মেলা, প্রাচীন গ্রীসে অলিম্পিক মেলা উল্লেখযোগ্য। তাই অনেকে অনুমান করেন যে, বৈশাখী মেলা অলিম্পিক কিংবা ওকাজ মেলারই সংস্করণ।
একটি নির্দিষ্ট স্থানে বৈশাখী মেলা বসে। কিছু সময়ের জন্যে দোকানপাট বসে, মেলা শেষ হয়ে গেলে আবার ঐ জায়গা নির্জনতায় পর্যবসিত হয়। তাই বৈশাখী মেলার উদ্দেশ্য সামাজিক। এতে কোন ধর্মীয় চেতনার প্রতিফলন হয় না। নতুনের আগমনে আনন্দের শিহরণ জাগে, মেলাকে করে তোলো প্রাণচঞ্চল। নানা লোকের পদভারে পরিপূর্ণতা লাভ করে বৈশাখী মেলা। প্রয়োজনের তাড়া নেই। অপ্রয়োজনের আকর্ষণে মানুষ মিলিত হয় এবং আনন্দের মিছিলে সবাই হারিয়ে যায় ক্ষণিকের জন্যে।
বৈশাখী মেলার না শুনলেই আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার হৃদয় আনন্দে নেচে উঠে। কারণ এই মেলা সকল বয়সের মানুষের নিকট গ্রহণযোগ্য। বহু লোকের সমাগমে মুখরতা পায় আত্মার আনন্দ। আবার এই আনন্দ অনেক ক্ষেত্রে নিরান্দের কারণ হয়ে দাঁড়ায় কিছু দুষ্ট লোকের কূটকৌশলের কারণে। বিচিত্র দ্রব্য-সামগ্রীর ন্যায় বিচিত্র লোকেরও সমাগম ঘটে বৈশাখী মেলায় । এদের অপ্রীতিকর ঘটনায় মেলার আনন্দ নিমিষেই মিইয়ে যায়। জুয়ার পাল্লায় পড়ে অসহায় মানুষকে ঘরে ফিরতে হয় খালি হাতে।
মুক্ত নীল আকাশের নীচে এই বৈশাখী মেলা কর্মব্যস্ত বাঙালি জীবনে একঘেঁয়েমী দূর কের আনন্দের স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে যায় সবাইকে। স্বাধীন বাংলায় বেঁচে থাকার স্বপ্ন সবার। নতুন বছরের নতুন আশায় দীপ্ত প্রত্যয়ে আনন্দ শিহরণে রোমাঞ্চিত বৈশাখী মেলা তাই আপন মহিমায় মহিমান্বিত। বাংলা সন বাঙালি জাতির জীবনে নিয়ে আসুক অনাবিল আনন্দ আর অকৃত্রিম ভালোবাসা। বর্তমান বিজ্ঞানের যুগে যতো আমরা অগ্রগামী হয় না কেনো অতীত ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে হলে সকলের মমত্ববোধ জাগ্রত হওয়া একান্ত বাঞ্চনীয়। হিংসা দ্বন্দ্ব ভুলে গিয়ে সকলে সকলের প্রতি মৈত্রীভাব পোষণ করে যদি মেলার সম্মিলনীর মতো স্বদেশের শান্তি প্রতিষ্ঠায় সকলে ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে এক কাতারে দাঁড়াতে পারি তাহলে আগামী বাংলা নববর্ষ হতে আমাদের সকরের জন্য চিরসবুজ। বাংলার অনাবিল আনন্দের শুভ নববর্ষ হোক মঙ্গলময়। লেখক : সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক

x