প্লিজ থামুন-

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ২৭ নভেম্বর, ২০১৮ at ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ
12

শীত আসি আসি করেও আসছেনা! খুবই লজ্জা তার! এক পা এগোয়তো, দু’পা পেছোয়! অঘ্রানের প্রথম পক্ষ যাই যাই করছে-যাওয়ার আগে শীত বুড়ির হাতে প্রকৃতি শাসনের ব্যটন তুলে দিতে চায়। কিন্তু শীত বুড়ির আচরণ প্রত্যন্ত গ্রামের কিশোরি নববধূর চেয়েও আড়ষ্ট! এত্তো লজ্জা তার। অঘ্রানের বাড়তি আদর এবং টানা-হেচড়ার পরও সে চৌকাঠ ডিঙিয়ে ঘরে ঢুকবে না! বেশ ক’ বছর ধরে এমন আজব আচরণ শীতের। যদিও পৌষ-মাঘ এই দুমাসকে শীত ঋতু বলা হয়। হলেও ছয় ঋতু বৈচিত্র্যের প্রিয় দেশে এখন মাত্র তিন ঋতুই রাজদন্ডের মালিক। তারাই বছরজুড়ে ছড়ি ঘুরায়। এদের নাম না বললেও সবাই জানে। গ্রীস্ম, বর্ষা ও শীত। বাকি তিন ঋতু কেতাবে মানে কবিতা ও সাহিত্যের অলঙ্কার হয়ে বেঁচে আছে। এর বাইরে তাদের আরেকটা বাড়তি কাজ হচ্ছে, তিন প্রধান ঋতুর মাঝখানের সংযোগ সেতু যোজনা। এই তিন ঋতু শরত, হেমন্ত ও বসন্ত। অথচ বসন্ত ঋতুরাজের জীর্ণ পোষাক পরে রাজ্যহারা রাজা মাত্র।
শরতের কাজ পেছনের বর্ষাকে বাড়তি স্পেস তৈরি করে দেয়া। বর্ষা যতটুকু সম্ভব এই স্পেস আরো বাড়িয়ে নিচ্ছে। আর হেমন্ত পেছনের শরতকে হাল্কা কুয়াশার চাদর, সাদা মেঘ ভেলা ও কাশফুলের শোভা দিয়ে খানিক সোহাগী স্পেস ছেড়ে দেয়। যাতে শরত দাবি করার সুযোগ পায়, সে আছে বর্ষ পনজিকায়। চাইলেই কেউ আসন কেড়ে নিতে পারবেনা হেমন্ত না ঘরকা না ঘাটকা! তার খানিকটা দান করতে হয় শরতকে, বাকিটা শীত-গ্রীস্মের টানাপোড়েনের চাপে চিড়ে চ্যাপ্টা! ধান কাটার মৌসুম থাকায় তার খানিক রূপের খোলতই হয়। নিজের উপস্থিতির জৌলুস জানানোর সুযোগ পেয়ে যায়। না হলে বাঙালি বাংলা নববর্ষ ছাড়া বাংলা সনের মাস তারিখ মনেই রাখেনা! হালে গ্রামের ফসল তোলার নবান্ন উৎসব নগরীতে স্থান পরিবর্তন করায় শহরেও তার দু’একদিন বাড়তি কদর হচ্ছে। কিন্তু উৎসবের মূল উৎস গ্রামের শিশুরা নবান্ন নামে যে একটা অসাধারণ আনন্দ উৎসব ছিল তা কবেই ভুলে গেছে। বসন্তের শুরুর ক’দিন শীতের এক্সটেনশন ছাড়া বাকি পুরোটায় গ্রীষ্মের একক দখলদারি কায়েম হয়েছে। তবুও রাজধানীসহ বড় নগরে বসন্ত মেলার সাড়ম্বর আয়োজন ও শিমুল,পলাশ, কৃষ্ণচূড়ার চোখ ধাঁধানো রঙের সাজ বসন্তের রাজকীয় ঐতিহ্যের পতাকা উঁচিয়ে রেখেছে।
ঋতুর সাতকাহন নয়, আসলে রাজনীতির উত্তাপকে আরো সুস্বাদু আমেজ দিতেই ঋতু স্যূপের ডিশ পরিবেশন করা হলো। দেশজুড়েই জাতীয় নির্বাচনের এখন টানটান উত্তেজনা। ক’দিন আগেই জিম্বাবুয়ের সাথে হয়ে গেল ওয়ান ডে ও টেষ্ট সিরিজ ক্রিকেট। এখন চলছে ওয়েষ্ট ইন্ডিজের সাথে। তিন ম্যাচ ওয়ান ডে সিরিজে দেশের মাঠে জিম্বাবুয়েকে ওয়াইট ওয়াশ এবং দু’টেষ্ট সিরিজে ড্র করেছে বাংলাদেশ। তাও সাকিব, তামিমের মত তারকা ছাড়াই। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে প্রথম টেষ্ট চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী ক্রিকেট স্টেডিয়ামে মাত্র আড়াই দিনেই জিতে গেছে। তাও চট্টগ্রামের কিশোর নাঈম হাসানের অভিষেক ইনিংসে বিশ্বরেকর্ড গড়া পাঁচ উইকেটের সৌজন্যে। টেষ্টের বিশ্ব রেকর্ডে এখন নাঈম হচ্ছেন অভিষেক টেষ্টের প্রথম ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেয়া সবচে’ কম বয়সী বোলার। এটা চট্টগ্রাম তথা দেশের বিশাল এক অর্জন। কিন্তু ক্রিকেট সাফল্যের এই বর্ণাঢ্য অর্জন নির্বাচনী উত্তেজনার বিপুল ফেনার আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে। শনিবার ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত নির্বাচনী মাঠের হেভিওয়েট জোটগুলো তাদের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেনি। এদেশে এম পি পদে অভিষিক্ত হওয়া কতোবড় প্রাপ্তি তার কিছু নমুনা ইতোমধ্যে আমরা পেয়ে গেছি। ক্ষমতাসীন দলে এক আসনের বিপরীতে মনোনয়ন দৌড়ে সর্বোচ্চ ৪০ প্রার্থী, বিএনপিতে ২৫/৩০ প্রার্থী পর্যন্ত প্রতিযোগিতায় আছেন। ৩০০ আসনের বিপরীতে মনোনয়ন প্রত্যাশী ১৫/২০ হাজারের কাছাকাছি! অবিশ্বাস্য হলেও এটাই বাস্তবতা। কারণটা খুব সোজা, পাঁচ বছর মেয়াদে এম পি হওয়া মানে আলাদিনের চেরাগ হাতে পাওয়া! রাতারাতি ভিআইপিসহ সব রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা প্রাপ্তির অবাধ লাইসেন্স।
রাজনীতি নামের পণ্যটি কতো আকর্ষণীয় এবং কতোবড় ক্ষমতার উৎস তার আলামত কুৎসিতভাবে ফুটে উঠেছে, মনোনয়ন দৌড়ের এই প্রতিযোগিতায়। ক্ষমতাসীন দলে যে ক’জন সিনিয়র নেতার মনোনয়ন নিশ্চিত, তারা ছাড়া বাকি সবাই টানা দেড় সপ্তাহের বেশি ধর্ণা দিচ্ছেন রাজধানীতে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটে ১৪ দল, জাতীয় পার্টি ছাড়াও বি, চৌধুরীর ঐক্যফ্রন্ট এবং বহু ইসলামী দল যুক্ত হচ্ছে বা হয়েছে। এদের সবাইকে কিছু খুচরো আসন ছেড়ে দিয়ে বাকি আসনে দলের প্রার্থী দিচ্ছে আওয়ামী লীগ।
এই ফাঁকে চলেছে, ভাগ্যের তালা খোলার তীব্র প্রতিযোগিতা। আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ড এবার প্রার্থী আধিক্যের কারণে সাক্ষাৎকার বাতিল করে দেয়। এতে মৌসুমী প্রার্থীদের মূল প্রার্থীর সাথে দেন দরবার করে মোটা প্যাকেজ প্রাপ্তির প্রকল্প প্রায় ফ্লপ মেরেছে। তারা কিন্তু হাল ছাড়েনি। পরে থাকে ঢাকায়, নিজের অনুগামীসহ। ‘ইয়েস কার্ড’ পাওয়া প্রার্থীকে ‘বিদ্রোহী’ হওয়ার চাপ প্রয়োগ করে যদি নগদ হাতানো যায়, এই ভরষার বাতি হাতে! মনোনয়ন প্রত্যাশীদের চেয়েও অনুগামীদের উত্তেজনার পারদ কয়েকগুণ বেশি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এরা সার্বক্ষনিক প্রার্থীর গুণাবলীর বিশাল ফর্দের সাথে সম্ভাব্য প্রতিযোগীর নেতিবাচক নানা দিক ও অক্ষমতা- অযোগ্যতার অক্লান্ত কিচ্ছা রচনা করে চলেছে।
রাজনীতি যে, বিশাল লাভজনক কর্পোরেট বাণিজ্য তা সংসদ নির্বাচন ঘিরে বনেদি, সাবেক আমলা ও কর্পোরেট রাজনীতিকদের অস্বাভাবিক মনোনয়ন দৌড়ে স্পষ্ট। নীতি-আদর্শ ও জনকল্যাণ বিমুখ রাজনীতি কতো অসুন্দর হয়, নতুন করে তার প্রদর্শনী দিল আমাদের রাজনৈতিক দল ও জোটগুলো। এখন মনোনয়ন ঘোষণার পর কী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, এ’নিয়ে নয়া আতঙ্কের মাঝে থাকতে হবে । আমাদের রাজনীতিতে সংসদ সদস্য হওয়াই যে মূল অভিষ্ট, জনকল্যাণ বা নীতি-আদর্শ চর্চা নয়, তা নোংরাভাবে ফুটে উঠেছে। এর জন্য দায়ী, ক্ষমতার রাজনীতির লাগামহীন সুবিধা ও অন্যায্য প্রাপ্তিযোগ। রাজনীতির দুষণ সমাজ ও রাষ্ট্রের সবক্ষেত্র বিশেষ করে কর্পোরেট, আর্থিক ও সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানকেও কলুষিত করেছে। শিল্প-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, মিডিয়া কোন সেক্টরেই এখন ন্যূনতম শুদ্ধতা নেই। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নীতি-আদর্শের ছাতা মেলে ধরে তাঁকেও খাটো করা হচ্ছে। টি, ভি চ্যানেলগুলোতে জমজমাট নির্বাচনী টকশোগুলোয় যে ব্যাক্তিরা গলার রগ ফুলিয়ে শব্দদুষণ জোরদার করছেন, তা মানুষকে নাটক, সিনেমার চেয়েও বেশি বিনোদিত করছে। আমরা ভুলে গেছি, আমাদের পরিবার আছে, সন্তান আছে! তারা আমাদের দ্বিচারিতা, মিথ্যাচার, লোভ, অন্যায় খুব কাছ থেকে দেখছে। পিতা-মাতার পবিত্র অবস্থানকে আমরা কলুষিত করছি। সন্তানের মনে আমরা রোল মডেলের বদলে খলনায়ক বা দানবের অবস্থান পোক্ত করছি। আমরা তাদের মনোজগতে হয় দানব অথবা ভাঁড় হিসাবে স্থায়ী আসন গেঁড়ে বসছি! তারা আমাদের দ্বিচারিতাকে ঘৃণা করছে- প্রচন্ড ঘৃণা! এই ঘৃণার আগুন আমাদের সব অন্যায় অর্জনকে পুড়ে ছাই করে দেবে! সীমিত জীবনে ধন আর ক্ষমতার দামে আত্মজদের ঘৃণা কেনাই কী আমাদের শেষ পরিণতি? জীবনতো খুবই ছোট্ট! এই ছোট্ট জীবনে বিশাল দামে আত্মজদের ঘৃণা থেকে বাঁচতে আমরা কী দেশ, মানুষ ও মানবতার কল্যাণে নিজেদের নিবেদিত করতে পারিনা?
প্লিজ যে অবস্থানেই থাকিনা কেন, আসুননা একবার অন্তত বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়াই! নিজকে প্রশ্ন করি, ভালো মানুষের খোলসে কেন আমি অতিকায় কর্পোরেট ভোগ দানবকে তোষণ করে যাচ্ছি? আমি কেন মানুষের-আত্মজের ঘৃণা নিয়ে মরবো? না, হবেনা- আমাকে ঘুরে দাঁড়াতে হবেই- হবে!

x