‘প্লিজ আয়নার সামনে দাঁড়ান’

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ৬ মার্চ, ২০১৮ at ৫:২৯ পূর্বাহ্ণ
106

ক’দিন পরেই মহান স্বাধীনতার ৪৭ বছর পার করবে জাতি। আর ২০২১ সালে উদযাপিত হবে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসব। অনেক চড়াই উতরাই আর রক্ত সাগর পাড়ি দিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীনসার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম। এই অর্জনের ইতিহাস বহুল চর্চিত। কাজেই ইতিহাসের অলিগলিতে বিচরণ একান্তই অপ্রয়োজনীয়। একটা কারণে অতীত ইতিহাসের বিশেষ একটি অংশের উপর আলোকপাত এখন সময়ের দাবি। আর সে বিশেষ অংশটি হচ্ছে দেশপ্রেম। আমরা জানি, মানবিকতাবর্জিত একজন মানুষ ভোগসর্বস্ব দ্বিপদী রক্তমাংসের প্রাণি ছাড়া কিছুই নয়। তেমনি দেশপ্রেম বর্জিত একটি জাতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি মুছে ফেলে দ্রুত বিশৃংখল জনগোষ্ঠীতে রূপানত্মরিত হতেও বেশি সময় লাগে না। একজন মানবিক বোধহীন মানুষের কাছে নিজের স্বার্থ ছাড়া অন্য সব মূল্যবোধ অর্থহীন শুধু নয়, হাস্যকর বস্তু। তাদের আশ পাশ বা কাছের কেউ যদি মানবিকতা চর্চা করে, তাহলে তাকে নির্বোধ এবং গর্দভের লেজুড় জুড়ে দিয়ে বর্জ্যের সত্মূপে ছুঁড়ে ফেলতে চালাক মানুষটি দ্বিতীয় চিন্তা করেন না।

অথচ দেশপ্রেম এবং মানবিক মূল্যবোধে ভরপুর মানুষগুলোই এদেশের স্বাধীনতার বীজতলা তৈরি করেছেন। মাতৃভাষার বীজ বপন করেছেন নিজের বুকের রক্তভেজা পলিমাটিতে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু উঠে এসেছেন দেশপ্রেম আর গণ মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার লকলকে সবুজ ফসলের খেত থেকে। তাঁর বিশাল বক্ষ জুড়ে ফুটে উঠেছিল ৫৬ হাজার বর্গমাইল সবুজ জমিনের একটি মানচিত্র। বঙ্গবন্ধু দেশপ্রেম, মানবপ্রেমের তীব্র আকর্ষণে নিজের এবং পারিবারিক সুখআহলাদকে নিষ্ঠুরভাবে কোরবানী দিয়েছেন। তাঁর দেশপ্রেমের স্ফূলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়েছিল সাড়ে সাত কোটি বাঙালির হিমোগ্লোবিনে। তাইতো তাঁর অনামিকার একটি ছোট ইঙ্গিতে একটি অসামরিক জাতি রাতারাতি বিশ্বের সবচে’ দুর্ধর্ষ জানবাজ জাতি হিসাবে ইতিহাসের রেকর্ডবুকে স্থায়ীভাবে আসন পেতে বসার সূযোগ পেয়েছে। নিরস্ত্র একটি জাতি বিশ্বের স্বঘোষিত দুর্ধর্ষ এবং সর্বাধুনিক সমরাস্ত্র সজ্জিত একটি বাহিনীকে বাংলার কাদাজলে চুবিয়ে প্রমাণ করেছে, দুর্জয় দেশপ্রেম এবং স্বাধীনতার উদগ্র আকাঙক্ষার কাছে পৃথিবীর কোন দানব শক্তি টিকতে পারেনা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এতদ্রুত যুদ্ধজয়ী এই জাতির দেশপ্রেম এবং মানবিকতার সবুজ বাগান শ্মশান হয়ে গেল কেন? কেন বঙ্গবন্ধুর অনুসারী এবং উত্তরসূরিরা আজ বঙ্গবন্ধুর দেশপ্রেম, মানবপ্রেম এবং আত্মত্যাগের অবিষ্মরণীয় মজুদকে মাটিচাপা দিয়েছে? বঙ্গবন্ধুর কোটপিন, মুজিবকোট কেন বৈষয়িক এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের সবচে’ দামি উপকরণ হিসাবে অপব্যবহার হচ্ছে! আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে মুজিব পিন, কোট, বঙ্গবন্ধুর মুখাবয়ব কেন স্রেফ রাজনৈতিক ফায়দা লুটের বিজ্ঞাপনী উপকরণে রূপানত্মরিত হয়? আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব কী এ’নিয়ে কোন গবেষণা কর্ম করেছেন? না করলে দ্রুত তা করা উচিত। কারণ মহান স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়নত্মীর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আমরা যা কিছু দেখছি, তা আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য ভয়ঙ্কর বিপদ ডেকে আনবে।

বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অর্থনীতি, অবকাঠামো ও মানব সম্পদ উন্নয়নে বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব আসরে বাংলাদেশের নাম উঠে এসেছে সম্মানের আসনে। এই অর্জনে জননেত্রী শেখ হাসিনার ব্যাপক অবদানের পাশাপাশি দেশের জনগণেরও বিপুল অবদান রয়েছে। প্রবাসী রেমিট্যান্স প্রবাহ, গার্মেন্টস বালিকাদের রক্তজল করা শ্রম, কৃষকদের কর্মোদ্যোগের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ইমারত। এই বিপুল কর্মপাগল শ্রম শক্তিই হচ্ছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর অকৃত্রিম অনুসারী এবং বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতির স্থায়ী লোগো। কিন্তু যারা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর রক্তের উপর দাঁড়িয়ে থাকা দল ও সরকারের নেতৃত্বে আছেন, তারা কেন বঙ্গবন্ধুকে বিজ্ঞাপনী প্রদর্শনীর বসত্মুতে নামিয়ে আনলেন? কেন ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থে তারা দলীয় ও জাতীয় স্বার্থকে কোরবানী দিচ্ছেন? বঙ্গবন্ধুর অকৃত্রিম এবং নিঃস্বার্থ জন্ম অনুরাগী এবং কর্মী হিসাবে এই প্রশ্ন করার অধিকার আমরা রাখি। কেন এখন আওয়ামী লীগের কোন ইউনিট সম্মেলন কাউন্সিলর ভোটের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে করা যায় না? সামান্য ওয়ার্ড, ইউনিয়ন বা থানা কমিটি নেতৃত্বও কেন উপর থেকে চাপিয়ে দিতে হয়? বঙ্গবন্ধুর অঙ্গুলি হেলনে যেখানে সাড়ে সাত কোটি বাঙালি মুক্তির নেশায় ঝাঁকে ঝাঁকে মৃত্যু উপত্যকায় ঝাপিয়ে পড়েছে, সেখানে আমাদের জাতীয় নেতারা হাতজোড় করে মিনতি জানিয়েও ছাত্রলীগের ক’জন উচ্ছৃংখল নেতাকে থামাতে পারেন না? চট্টগ্রামের অবিসম্বাদিত জননেতা মরহুম এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর প্রতিটি শোকসভায় জাতীয় নেতাদের সামনে রেখে কেন অশ্রাব্য োগানপাল্টা োগান, চেয়ার ছোড়াছুড়ি, নিত্য মহড়া চলে? আমরা রাজনীতি করেছি আওয়ামী লীগের চরম দুর্দিনে। সপরিবারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর যখন হারিকেন নিয়েও বেশির ভাগ নেতাকে খুুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন মৃত্যুর ঝুকি নিয়ে একজন সদ্য তরুণকে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নিতে হয়েছে। তারপর টানা প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে রক্ত, ঘাম, আত্মগোপন, সংঘাতের বন্ধুর পথ মাড়িয়ে আদর্শিক লড়াই চালিয়ে যেতে হয়েছে বছরের পর বছর। দলীয় সম্মেলনের মাধ্যমে কাউন্সিলর ভোটে থানা নেতৃত্ব থেকে জেলা শাখার নেতৃত্বেও উঠে আসার সূযোগ হয়েছে। সহযোগী ও ভ্রাতৃ সংগঠন যুবলীগ, ছাত্রলীগেরও সম্মেলন কাউন্সিলর ভোটে নেতৃত্ব নির্বাচিত হয়েছে। ভোটে প্রতিদ্বন্ধিতা হয়েছে। কিন্তু ভোটাভুটির পর প্রতিদ্বন্ধিতা শেষ। প্রতিযোগি নেতারা পরষ্পরকে বুকে জড়িয়ে নিয়েছেন। এক সাথেই দলের কাজ পরিচালনা করেছেন। পেশাগত এবং রাজনীতিতে কর্পোরেট সংস্কৃতির ভাইরাস ঢুকে পড়ার পর সক্রীয় রাজনীতি থেকে সরে আসলেও দেশপ্রেম এবং বঙ্গবন্ধুর প্রতি আদর্শিক টানতো দিনে দিনে আরো শানিত হয়েছে। তাইতো যখন দেখি, বড় বড় নেতাদের বড় কথার সাথে কাজের কোন মিল নেই, তারা ভুলে গেছেন, জীবন কোন অবিনশ্বর বসত্মু নয়। চলে যেতে হবে বিত্তবৈভব, ক্ষমতা, ভোগের সব উপকরণ ফেলে রেখে। কেবল কর্ম ফলই বাঁচিয়ে রাখবে তাঁকে। যেমন বাঁচিয়ে রেখেছে বঙ্গবন্ধুসহ জাতীয় সব কীর্তিমানদের। কেন দলে, ভ্রাতৃ সংগঠনে এত রক্তপাত! প্রকৃত মানুষের গাইড হচ্ছে তার বিবেক ও দেশপ্রেম। এই দু’বসত্মু ছাড়া মানুষটা ঝঞ্জা বিক্ষুদ্ধ সাগরে কান্ডারিহীন একটি নৌযান মাত্র। তিনি যত বড় নেতা বা পদাধিকারী হোন না কেন। শুধু একজন বঙ্গবন্ধু বা একজন শেখ হাসিনা দেশকে সুখ সমৃদ্ধির শিখরে তুলে নিতে পারবেন না। যদি তাদের যোগ্য উত্তরাধিকারী এবং সহযোগী না থাকেন। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য দলগতভাবে আওয়ামী লীগ এবং সরকারে নিবেদিত এবং বঙ্গবন্ধুর সত্যিকার উত্তরসূরি দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের ঘাটতি এখন প্রচুর। যারা এখনো বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক উত্তরাধিকারী, তারা প্রকৃত অর্থেই সংখ্যালঘু। এ অবস্থায় যা ঘটার তাই ঘটছে। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও দলীয় কোন্দলে রক্ত ঝরছে। আওয়ামী লীগ বা সহযোগী সংগঠনের উৎসব মূখর এবং গঠনতন্ত্র নির্দেশিত সময়ে সম্মেলন করা সম্ভব হচ্ছে না। ছোটখাট জমায়েতেও রক্তপাত সংঘর্ষ, চেয়ার ছোড়াছুড়ি, বড় নেতাদের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করার মত ঘটনা চলছেই। বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত আদর্শ এবং দেশপ্রেমের অবিনাশী মন্ত্র হারিয়ে গেলে এ রকম ঘটতে থাকবে সামাল দেয়ার জন্য কোন দেবদূত আসবেন না। এর অনিত্মম পরিণতি কত করুণ হতে পারে ’৭৫ এর ১৫ আগস্ট এবং ’০৪ এর ২১ আগস্টের ভয়াল আতঙ্ক থেকে শিক্ষা না নিলে জাতির কপালে আরো বড় ট্র্যাজেডি আঘাত হানা অস্বাভাবিক নয়। তাই প্রিয় নেতাদের কাছে অনুরোধ, বড় বড় কথা নয়, ফিরে যান নিকট অতীতে। দাঁড়ান আয়নার সামনে। নিজেকে প্রশ্ন করুন, দেশপ্রেম এবং বিবেক আপনি কতটুকু ধারণ করেন?

x