প্রয়োজনীয়তা, ব্যাপ্তি ও গভীরতা বুঝেই বড় পরিকল্পনা নিতে হবে

শুক্রবার , ২৬ এপ্রিল, ২০১৯ at ৬:২৯ পূর্বাহ্ণ
35

দৈনিক আজাদীর উদ্যোগে গত ২০ এপ্রিল আয়োজিত ‘শিক্ষায় চট্টগ্রাম: একগুচ্ছ প্রস্তাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল চট্টগ্রাম শহরে আরো সরকারি স্কুল-কলেজ স্থাপনে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, চট্টগ্রামে সরকারি স্কুলের অপ্রতুলতা আছে। এটা নিয়ে আমি কাজ করতে চাই। এসময় তিনি চট্টগ্রামে প্রস্তাবিত নতুন দুইটি সরকারি স্কুল স্থাপনে প্রয়োজনীয় ন্যূনতম জমির পরিমাণ প্রয়োজনে শিথিল করার উদ্যোগ নেয়া হবে বলেও ঘোষণা দেন।
দৈনিক আজাদীর পক্ষে চট্টগ্রামে সরকারি স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠার যে প্রস্তাব, সেটাকে সময়োপযোগী উল্লেখ করে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম শহরে সরকারিকরণের যে প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন, খুবই সঠিক সময়ে এ দাবিটা তুলেছেন। এটা ইমার্জেন্সি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও আমাদের মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে এ বিষয়ে কথা বলবো।
চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। এর যানজট- জলজট সমস্যার সমাধান করা হলে তার সুফল গোটা বাংলাদেশ পাবে। কারণ এ নগরীর মাধ্যমে দেশের মোট রফতানির ৮০ এবং আমদানির প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়। ফলে চট্টগ্রামের উন্নয়নের মাধ্যমে সামগ্রিক অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনা সম্ভব। চট্টগ্রাম থেকে সবচেয়ে বেশি আমদানি শুল্ক আসে। এর একটি অংশ নগরীর উন্নয়নে ব্যয় করার প্রস্তাব অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত। এর সুফল ভোগ করবে পুরো দেশবাসী। তাই চট্টগ্রামের সমস্যাকে আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ছোট ছোট সিটি কর্পোরেশন যেটুকু অর্থ বরাদ্দ পেয়ে থাকে, অর্থনীতিতে বড় অবদান রেখেও চট্টগ্রাম অনেক সময় তা পায়নি। আমরা লক্ষ্য করছি, চট্টগ্রামের উন্নয়নে দৃষ্টি না দিয়ে মংলা বা পায়রা বন্দরকে এর বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলেছে বিগত সময়ে। আমরা অন্য বন্দর তৈরির বিরোধী নই, কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরের প্রয়োজন হবে আরো অনেক দিন। গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ হলে এ অঞ্চলের সম্ভাবনা কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। তাই চট্টগ্রামের উন্নয়নে সবার দৃষ্টি দেয়া আবশ্যক। এতে দেশের অর্থনীতির বিকাশ আরো ত্বরান্বিত হবে। বলা বাহুল্য যে, শিক্ষায় উন্নয়ন জরুরি হয়ে পড়েছে।
তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় এক কোটির কাছাকাছি জনসংখ্যার ঢাকা মহানগরীতে সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা ৩৫টি এবং কলেজের সংখ্যা ১৫টি। অন্যদিকে, প্রায় ৬০ লাখ মানুষের চট্টগ্রাম মহানগরীতে সরকারি মাধ্যমিক স্কুল মাত্র ৯টি, কলেজ মাত্র ৭টি। এ ধরনের বৈষম্য চোখে পড়ার মতো। সময়ের ব্যবধানে লোকসংখ্যার পাশাপাশি বেড়েছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। কিন্তু শিক্ষালাভের সুযোগ ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়েছে। গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এখানে গড়ে ওঠেনি নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কারিগরী শিক্ষার অবস্থাও একই। প্রয়োজনীয় শিক্ষক, শিক্ষা উপকরণের ঘাটতিসহ আনুষঙ্গিক সুযোগ সুবিধার অভাবে চট্টগ্রামে চাহিদানুযায়ী মানসম্পন্ন কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। চট্টগ্রামে ১৩টি প্রাইভেট পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট আছে কিন্তু অনেকগুলোতেই রয়েছে নানা সংকট। এদিকে, স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ প্রযুক্তিবিদ না পাওয়ায় ৯০ এর দশকের মাঝামাঝি চট্টগ্রামে গড়ে ওঠা কয়েকটি দেশীয় সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান খুব অল্প দিনেই ব্যবসা গুটিয়ে চলে যায়। সব মিলিয়ে শিক্ষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিষয়ে খুব বেশি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করার সুযোগ নেই।
আজাদীর গোল টেবিল বৈঠকে চট্টগ্রাম শহরে আরো অন্তত ১০টি সরকারি স্কুল এবং ৫টি সরকারি কলেজ স্থাপন, সরকারি পর্যায়ে একটি নতুন স্কুল স্থাপনে মহানগরে জমির শর্ত শিথিল করে ২ একরের স্থলে এক একর জমি নির্ধারণ, মহানগরীর সরকারি স্কুলগুলোতে ৬ তলার পরিবর্তে দশতলা ভবন নির্মাণ এবং ঐতিহ্যবাহী কলেজিয়েট স্কুলের কলেজ শাখায় জরুরি ভিত্তিতে শিক্ষক পদায়নের প্রস্তাব দেয়া হয় দৈনিক আজাদীর পক্ষ থেকে। এ সব প্রস্তাবনা সুবিবেচনায় নিয়ে এগোতে পারলে ইতিবাচক ফল পাবে চট্টগ্রামবাসী, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
শিক্ষাবিদদের মতে, যেহেতু দেশে শিক্ষার সব স্তরেই মানের সংকট রয়েছে, তাই এ কাজের ব্যাপ্তি ও গভীরতা বুঝেই বড় পরিকল্পনা নিতে হবে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত মানসম্পন্ন সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে এক পলকে জাতি অনেক দূর এগিয়ে যাবে। তখন আমরা উন্নত মানবসম্পদ দিয়ে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সক্ষম হব।

x