প্রেম-অপ্রেমের গল্প

ফেরদৌস আরা আলীম

শনিবার , ১৮ আগস্ট, ২০১৮ at ৮:৪০ পূর্বাহ্ণ
44

আদালত লিমাকে তার স্বামীর জিম্মায় দিয়ে দিলে আদালত কক্ষে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। কিন্তু এ ঘটনার মাত্র ৩ দিন আগে ৩ ঘণ্টার ব্যবধানে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবরটি আমাদের মর্মাহত করেছে। জীবদ্দশায় সৈকতলিমার ঘটনাটি জানলে মুনতা হেনার সিদ্ধান্তই বদলে যেতে পারতো। মুনতা হেনার আত্মহত্যার খবর না পেলে রোকনুজ্জামানকেও আত্মাহুতি দিতে হতো না। গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেও এসব কথা বলতে হতো না হয়তোবা। আগের রাতে আত্মঘাতী দুই ছাত্রছাত্রী প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘জীবনে চলার পথে ঘাতপ্রতিঘাত ও যেকোনো সমস্যা আসতেই পারে। কিন্তু আত্মহত্যা কোনো সমাধান হতে পারে না।’

যেন সিনেমার গল্প’। এই ছিল শিরোনাম। কোমল এই শিরোনামটির পরে বিস্ফোরক উপশিরোনামটি ছিল এরকম: জাতপাতের বিরুদ্ধে প্রেমের লড়াই। জামাইকে হত্যা করতে ধনাঢ্য শ্বশুরের কোটি টাকার মিশন। গত রোববার (আগস্ট ১২, ২০১৮) দৈনিক পত্রিকার পাতায় রুদ্ধশ্বাসে এ গল্প পাঠ করার পরে আমাদের সিনেমা বানিয়েদের নিয়ে নতুন করে ভাবতে হলো। কতকাল ধরে আমাদের সিনেমার জন্য আমরা কত কত আজে বাজে বিশেষণ ব্যবহার করেছি! বলেছি, বস্তাপচা, অবাস্তব, মোটা দাগের ভাবনাচিন্তাপ্রসূত কাজ ইত্যাদি ইত্যাদি। ওইসব সিনেমায় বাধার পাহাড় পাড়ি দিতে দিতে নায়কনায়িকা শেষ পর্যন্ত কাঠগড়ায় এসে দাঁড়ায়। মহামান্য আদালতের রায় ঘোষণার পর ওরা কেমন পাখির মতো উড়তে থাকে। ওইটুকু আদালত কক্ষে অফুরান পথ তৈরি হয়। বিপরীত দিক থেকে ছুটতে ছুটতে আসা ওদের দুজনার অন্তহীন পথ মহামিলনে শেষ হয় একসময়। পর্দায় ‘সমাপ্ত’ দেখে পরিচালকের মস্তিষ্কের সুস্থতা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করতে করতে দর্শক বহুবার ছবিঘর ছেড়েছেন নিশ্চয়ই। কিন্তু তাঁদের দূরদর্শিতা বা অগ্রসর চিন্তাভাবনার বিষয়টি আজ প্রমাণিত হলো তো? না, সিনেমা নিয়ে গল্প করার উদ্দেশ্য আমাদের নেই। আমরা এ গল্পটি রোমন্থন করছি ভিন্ন কারণে। প্রজন্মের প্রশংসার জোয়ারে ভাসা দেশে সৈকতলিমার মানবিক প্রেমের সাহস ও আবেগের কাহিনীও এক ধরনের আনন্দ ও সুস্থতার দ্যোতক নিঃসন্দেহে।

নরসিংদী পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের দুটি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে জানাশোনা ছিল না এমন নয়। নরসিংদী সরকারি কলেজে স্নাতকোত্তর পর্বে ওই দুই পরিবারের দুই শিক্ষার্থী (মেধাবী ছাত্রছাত্রী) পরস্পরের প্রতি অনুরক্ত হতেই পারে। সুরেশ সরিষার তেলের কর্নধার সুধীর সাহা শহরের নামকরা মানুষ। বিত্তশালী তো বটেই। পাল পরিবারের একটি মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হলে মনের আনন্দে মণকে মণ মিষ্টি বিতরণ করার মতো বড় মনের মানুষ তিনি। কিন্তু ওঁচা জাতের ওই পরিবারের ছেলেটি, হোক সে হিসাব বিজ্ঞানে ১ম শ্রেণিতে প্রথম, সাহা পরিবারের মেয়ের যোগ্য পাত্র সে কিছুতেই হতে পারে না। কিন্তু গোল বাঁধালো মেয়েটি। সে জানিয়ে দিল সৈকত পালকে সে ভালবাসে; বিয়ে করতে হলে তাকেই করবে। অন্য কাউকে নয়। টানা দুবছর মেয়েকে গৃহবন্দী করে রাখেন পিতা। মাস তিনেক আগে মেয়েকে নিয়ে কোলকাতা যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। শাহজালাল বিমানবন্দরে সুযোগ বুঝে লিমা সেখানে কর্মরত সৈকতের এক আত্মীয়কে জানিয়ে দেয় যে তাকে বিয়ে দেবার জন্যেই কলকাতা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মেয়েকে ভালোই চেনেন সুধীর সাহা। তাই পুলিশের সহায়তা নিয়ে বিমানে তোলেন তাঁকে। কিন্তু কোলকাতা বিমানবন্দরে নেমে লিমা সোজা সেখানকার পুলিশ সদস্যদের কাছে গিয়ে বিষয়টি তাঁদের অবহিত করেন এবং দেশে ফিরতে চান। কোলকাতা পুলিশ তার পিতাকে মেয়ে নিয়ে ঢাকায় ফিরতে বাধ্য করেন। ঢাকায় নেমে বাবা এবং ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের ফাঁকি দিয়ে বিমানবন্দরের বাইরে এসে সৈকতের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে নিউমার্কেট এলাকায় চলে যায় লিমা। পুরান ঢাকার মহাবীর মন্দিরে গিয়ে ধর্মীয় রীতিতে বিয়েটা সেরে কোর্ট ম্যারেজটিও সম্পন্ন করে নেয় তারা। সন্ধ্যায় লিমার মা সৈকতকে ফোন করে খবরটা শোনেন। কিন্তু ও দিকে বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশনের কিছু কাগজপত্রে লিমা সই করেনি বলে সুধীর সাহা সেখান থেকে বেরুতে পারছেন না। দ্বিতীয়ত যেহেতু আর কিছু করার নেই মেয়ের বিয়েটা তাঁরা সামাজিকভাবে দেবেন সুতরাং সৈকত লিমা প্রত্যর্পণ করুক। বিমানবন্দর থানাপুলিশের উপস্থিতিতে স্ত্রীকে শ্বশুরের কাছে রেখে সৈকত চলে যায়। এক আত্মীয়ের বাসায় রাখা হয় লিমাকে। দুদিন স্বামীর সঙ্গে ফোনে তার কথা হয়। ২৭ মে রাত দশটায় সৈকতকে লিমা জানায় যে মানসিক রোগী সাজিয়ে তাকে কোথাও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এরপর থেকে লিমার ফোন বন্ধ হয়ে যায়। খোঁজ নিয়ে গুলশান ১ এর বিকন পয়েন্ট লিমিটেড নামের একটি রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে লিমার অবস্থানের কথা জানতে পারে সৈকত। সেখানকার চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করে সে বুঝতে পারে যে স্ত্রীকে উদ্ধার করা সহজ নয়। অতঃপর আদালতের শরণাপন্ন হতে হয় তাকে। ১০০ ধারায় মামলা করে সৈকত তার স্ত্রীকে যা সে নয় তাই সাজিয়ে রাখা হয়েছে এবং চিকিৎসার নামে কিছু একটা চলছে বলে দাবি করে। আদালতের নির্দেশে গুলশান থানা পুলিশ লিমাকে উদ্ধার করে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে রাখার ব্যবস্থা করে। সুধীর সাহা এরপর হাইকোর্টে রিট করে মেয়েকে নিজের জিম্মায় রাখার দাবি জানান। দুপক্ষে যখন মামলা চলছে তখন সুধীর সাহা অন্য একটি মিশন হাতে মাঠে নেমে গেছেন। সৈকতকে অপহরণ করার জন্য নরসিংদী শহর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদকসহ ন’জনকে নিয়োগ করেন তিনি। টোপ হিসেবে প্রাণের ভয় দেখিয়ে সৈকতের এক বন্ধুকে দলভুক্ত করা হয়। তার ফোন পেয়েই সৈকত এদের হাতে বন্দী হয়। গত ১৬ জুন রাত পৌনে দশটায় নিউমার্কেটের ৩নং গেটের কাছে একটি নোহা মাইক্রোবাস থেকে এক যুবকের ‘বাঁচাও’ আর্তনাদ কিছু পথচারীকে আকর্ষণ করে। সৌভাগ্য বশত নিউমার্কেট পুলিশ ফাঁড়ির জনৈক এ এস আই শাদা পোশাকে ওই পথে ছিলেন। তিনি পরিচয় জানতে চাইলে মাইক্রোবাসের কয়েকজন নিজেদের নরসিংদী ডিবি পুলিশ বলে পরিচয় দেন কিন্তু পরিচয়পত্র দেখাতে ব্যর্থ হন। এবং সৈকত কপালগুণে বেঁচে যায়।

গত ১৪ আগস্ট ‘মধুর মিলন’ শিরোনামে দৈনিকের পাতায় আবার খবর হয়ে এসেছে লিমাসৈকত। আদালত লিমাকে তার স্বামীর জিম্মায় দিয়ে দিলে আদালত কক্ষে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। কিন্তু এ ঘটনার মাত্র ৩ দিন আগে ৩ ঘন্টার ব্যবধানে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবরটি আমাদের মর্মাহত করেছে।

জীবদ্দশায় সৈকতলিমার ঘটনাটি জানলে মুনতা হেনার সিদ্ধান্তই বদলে যেতে পারতো। মুনতা হেনার আত্মহত্যার খবর না পেলে রোকনুজ্জামানকেও আত্মাহুতি দিতে হতো না। গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেও এসব কথা বলতে হতো না হয়তোবা। আগের রাতে আত্মঘাতী দুই ছাত্রছাত্রী প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘জীবনে চলার পথে ঘাতপ্রতিঘাত ও যেকোনো সমস্যা আসতেই পারে। কিন্তু আত্মহত্যা কোনো সমাধান হতে পারে না।’ এই সঙ্গে প্রতিবেদকের বিস্তারিত ভাষ্যে পাঠককে স্তব্ধবাক হতে হয়। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকপিতা শিক্ষক হিসেবে ছাত্রছাত্রীর মন তো বোঝেনই নি, পিতা হিসেবে কন্যার মনও বোঝেন নি। সৈকতের মতোই স্নাতকে ১ম শ্রেণিতে ১ম স্থান প্রাপ্ত রোকুনজ্জামানের ক্ষেত্রে জাতপাতের কোনও ব্যাপার ছিল না। প্রেমিকার আত্মহত্যার খবর পেয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে রোকনুজ্জামান শেষটায় চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিল? মাবাবা, ভাইবোন কারও কথা ভাবলো না সে? এমন প্রেম, প্রেমের এমন প্রাণ, প্রাণে এমন শক্তিসাহস কি সহজলভ্য কিছু? সহজলভ্য যে নয়, শরৎচন্দ্র সারাজীবন ধরে সেকথাটাই নানাভাবে বলে গেছেন। ‘বিলাসী’ গল্পে (পাঠ্য বলে বহুলপঠিত) স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়ে বলেছেন, যেশক্তি বা সাহস কায়স্থ সন্তানকে বিষধর সাপের গর্তে হাত ঢুকিয়ে মরার সাহস যোগায় তার নাম প্রেম। বলেছেন, এ শক্তির বিপরীত টান সমাজকে কি দিতে পারে সমাজপতিরা তা ভাবেন না কেন? প্রেম তো যৌবন শক্তি নিশ্চয়ই। বঙ্গদেশের দুবার মূর্তি ধরে এসে (একবার চৈতন্যদেবে, আরেকবার নজরুলে) সে যে কী তুলকালাম কাণ্ড করেছে (কথাটা কোন মহাজনের?) ইতিহাস তার সাক্ষী।

একটা বিষয়ে আমাদের মধ্যে দ্বিমতের কোনও অবকাশ নেই যে দ্রুত, অতি দ্রুত আমাদের পরিচিত পুরনো পৃথিবীটা বদলে যাচ্ছে। দেখেশুনে, বিশেষ কিছু মাপকাঠিতে পাত্রপাত্রী নির্বাচনের পুরনো পদ্ধতি আর বিশেষ কোনও কাজে আসছে না। অভিভাবককুল নিজেদের বিষয়বুদ্ধির বিচারে যা ভালো মনে করছেন এই দারুণনিদারুণ সময়ে তার যে কানাকড়ি মূল্যও থাকছে না তা এখন পরিষ্কার বোঝা যায়। যে হারে সংসার ভাঙছে বা জোড়াতালির সংসারে অশান্তির যে আগুন জ্বলছে কোনও বৈপ্লবিক সিদ্ধান্তে তার পরিবর্তন সম্ভব নয়। কিন্তু কিছু সহজ চিন্তাভাবনা, কিছু সহজ সমাধান পথ নির্দেশক হতেই পারে। পারস্পরিক জানাশোনা সুস্থসুন্দর সুখী দাম্পত্যের ভিত্তি তৈরির কাজে সক্ষম বলেই মনে করি। অভিভাবক সেক্ষেত্রে যথার্থ বন্ধুর ভূমিকা পালন করতে পারেন।

x