প্রেমিক ও বিপ্লবী প্রণয় কান্তি

আলম খোরশেদ

শুক্রবার , ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৬:১৭ পূর্বাহ্ণ
24

প্রণয় কান্তি। নামের মধ্যেই ছড়ানো ভালবাসার সুকান্ত সৌরভ। মানুষটাও ছিলেন তাঁর নামেরই মতো সুন্দর ও সংবেদী। কবিতা লিখতেন, লিখতেন অগ্রসর চিন্তায় জারিত এই সময়ের সমাজভাষ্য। ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ, নিবিষ্ট শিক্ষক। সারাজীবন শিক্ষকতাই করেছেন, প্রধানত প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যালয়ে, আর বাকিটা সময় জীবনের পাঠশালায়, মানুষের মিলনমেলায়। প্রকৃতির প্রতিই ছিল তাঁর প্রধান প্রবণতা, আর আস্থা ছিল বিজ্ঞান ও যুক্তির সৌন্দর্য-শক্তিতে। নিজে যেমন ছিলেন নিরন্তর প্রশ্নশীল, তেমনি কৌতূহলী-অন্যের প্রশ্নরাজির প্রতিও ছিলেন সমান মনোযোগী ও শ্রদ্ধাভাবাপন্ন। আর উত্তরের অনুসন্ধানটুকু তাঁর কাছে ছিল জীবনযাপনেরই এক অনিবার্য ও অনিঃশেষ অনুষঙ্গ। এর জন্য তিনি যেমন প্রকৃতির কাছে যেতেন, তেমনি সার্বক্ষণিক যাত্রা ছিল বইয়ের পাতার অভিমুখেও।
কী বিপুলই না ছিল তাঁর পাঠতৃষ্ণা, আর কী গভীর ও অনুপুঙ্খই না ছিল তাঁর পাঠ্যাভ্যাসের ধরন। কিন্তু সবার ওপরে ছিলেন একজন আজন্ম যোদ্ধা। তিনি যেমন যুদ্ধ করেছেন সমাজের যত কলুষ আর অসংগতি, যত অসুন্দর ও অবিচারের বিপক্ষে। তেমনি নিজের শরীরের ভেতর বাসাবাঁধা অচিকিৎস্য অসুখের বিরুদ্ধেও ছিল তাঁর এক নিজস্ব নিরন্তর লড়াই; স্থির, প্রসন্ন এবং সম্পূর্ণ অনুযোগবিহীন। তিনি জানতেন একদিন এই অসম লড়াইয়ে তাকে আত্মসমর্পণ করতে হবে, কিন্তু সেকথা ভেবে তিনি তাঁর জীবনের ব্রতযাত্রা থেকে এক মুহূর্তের জন্যেও সরে আসেননি আরাম ও আপোষের অন্বেষণে।
মানুষের মুক্তি, আমাদের অসুস্থ সমাজদেহ থেকে বৈষম্যের চিরঅবসান এবং জীবনের সর্বত্র সুন্দর, শুভ ও শিল্পের জয়ের জন্য তাঁর যে অবিচল সংগ্রাম ও সাধনা, তাতেই ব্যাপৃত রেখেছিলেন তিনি নিজেকে আমৃত্যু। তিনি আজ সশরীরে আমাদের মাঝে নেই আর ঠিকই, কিন্তু তাঁর স্বপ্নটুকু রয়েছে অক্ষত; যার সঙ্গে তাঁর স্মৃতিধন্য আমাদের তৎকালীন প্রতিষ্ঠান বিশদ বাঙলা, কি বর্তমানের বিস্তার: চিটাগং আর্টস কমপ্লেক্স-এর লক্ষ্য ও গন্তব্যের কোন ফারাক নেই। উপসংহারে তাই, তাঁর জীবনসঙ্গিনী ও শিল্পপ্রণয়িণী অনুপমা অপরাজিতাকে আমরা বিনম্র এই আশ্বাসটুকু দিতে চাই যে, আমাদের যাবতীয় স্বপ্ন ও কাজের মধ্যেই নিরন্তর বেঁচে থাকবেন একজন বিরলপ্রজাতির মানুষ: শিক্ষক, সাহিত্যিক ও প্রেমিক প্রণয় কান্তি, তাঁর স্মৃতি ও সত্তার সবটুকু সৌরভ নিয়ে।

x